আদালতে ধাক্কা খেয়েও নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে মরিয়া ট্রাম্প

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

আদালতে ধাক্কা খেয়েও নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে মরিয়া ট্রাম্প। স্ট্রিম গ্রাফিক
আদালতে ধাক্কা খেয়েও নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে মরিয়া ট্রাম্প। স্ট্রিম গ্রাফিক

মেইল ব্যালট নিয়ে আদালতে বড় ধাক্কা খেলেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেষ্টা থামেনি। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পুরো সরকারি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সন্দেহ ছড়াচ্ছেন তিনি।

সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের মেইল ব্যালট বা ডাকযোগে ভোট সীমিত করার নির্বাহী আদেশকে আটকে দেয়। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ট্রাম্প থামার পাত্র নন। রাজ্য পরিচালিত নির্বাচনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। এ জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা বিস্তৃত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডাক বিভাগের মাধ্যমে মেইল ব্যালট যাচাইয়ের এই ব্যর্থ চেষ্টা মূলত ওই পরিকল্পনারই ছোট অংশ।

মাত্র কয়েক দিন আগেই, বিচার বিভাগ সারা দেশের অন্তত ৩০ শীর্ষ নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে হুমকিমূলক চিঠি পাঠায়। ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং নির্বাচনের নথিপত্রে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্যই এই চাপ প্রয়োগ করা হয়। বড় জালিয়াতির প্রমাণ ছাড়াই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা রাজ্য নির্বাচনের ভোটার তালিকা তন্নতন্ন করে খুঁজছেন, যাতে অনাগরিকদের শনাক্ত করা যায়। সম্প্রতি ট্রাম্পের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি) মার্কওয়েইন মুলিন ভোটিং মেশিনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

স্বাধীন ‘ইলেকশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিশন’ থেকে সদ্য অপসারিত বেঞ্জামিন হোভল্যান্ড বলেন, ‘বিষয়টি এখানেই শেষ হচ্ছে না। সরকারি কাঠামো, কেন্দ্রীয় সংস্থা ও জনগণের করের টাকা ব্যবহার করে এমন একটি বয়ান প্রচার করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। এর ফলে দিন শেষে সাধারণ ভোটার ও নির্বাচন কর্মকর্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, তিনি ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের চেষ্টা করছেন। কিন্তু নির্বাচন ব্যবস্থায় জালিয়াতির বিষয়ে তাঁর দাবিগুলো বারবার তদন্তে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, তাঁর এই পদক্ষেপগুলো বিনা কারণেই ভোটের ফলাফল নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২০ সালে নির্বাচনের ফলাফল উল্টাতে গিয়ে শুধু আদালত নয়, নিজের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি।কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প নিজের চারধারে শুধু অনুগত ব্যক্তিদেরই ঠাঁই দিয়েছেন। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে ট্রাম্পের যে একগুঁয়ে ধারণা রয়েছে, তা এই অনুগতরা অক্ষরে অক্ষরে পালনে ইচ্ছুক। তাঁরা ট্রাম্পের এই ইচ্ছাকে পুঁজি করে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে একের পর এক আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

মেইল ব্যালট নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত মূলত ট্রাম্পের ধারাবাহিক আইনি পরাজয়ের তালিকায় নতুন সংযোজন। চলতি বছরের শুরুতেই তিনি নির্বাচনকে ‘দখল’ ও জাতীয়করণের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। ওই সময় সুপ্রিম কোর্টের আদেশের আগেই নিম্ন আদালতের দুজন বিচারক রায় দেন। তাঁরা বলেছিলেন, মেইল ব্যালটে ট্রাম্পের আনা পরিবর্তনগুলো বেআইনি এবং নভেম্বরের নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে তা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টকে এই প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, রাজ্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের জমা দেওয়া ব্যালট খামগুলো ডাক বিভাগের মাধ্যমে যাচাই করানো। বিচার বিভাগ ইতিমধ্যে ৩০ রাজ্যের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এতে চালকের লাইসেন্স নম্বর ও আংশিক সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরসহ ভোটারদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কেন্দ্রীয় সরকারকে দিতে বলা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৩ মামলায় সরকার হেরে গেছে এবং বাকিগুলোর রায় অপেক্ষমাণ।

এই মাসে সাতটি রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত রাজ্যের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবরণী জমা দেন। তাঁরা যুক্তি দেন, নির্বাচনের দুই মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বড় কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের তথ্যসহ নাগরিকত্বের তালিকা তৈরির চেষ্টাও নিম্ন আদালত আটকে দিয়েছে।

গত জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কওয়েইন মুলিন এক ভাষণে নির্বাচন কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি মেনে না চললে তাঁদের কারাদণ্ড হতে পারে। এছাড়া বিচার বিভাগ স্থানীয় কর্মকর্তারা কম্পিউটার সিস্টেম সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে।

এর পাশাপাশি, হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অধীনে থাকা ‘ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’ রাজ্যগুলোকে হুমকি দিয়েছে। তারা নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি পরিবর্তন না করলে সন্ত্রাসবাদ-প্রতিরোধ তহবিল বাতিল করার কথা জানিয়েছে।

‘ইলেকশন ডেটা সার্ভিসেস’-এর প্রেসিডেন্ট কিম্বল ডব্লিউ. ব্রেস বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগ ও বৃহত্তর প্রচেষ্টাকে থামাতে পারবে বলে মনে হয় না। ব্রেস আরও বলেন, ‘এসব নির্বাহী আদেশ স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।’ বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের এই লাগামহীন চাপ নিয়ে নির্বাচন প্রশাসন ও স্থানীয় কর্মকর্তারা আর কাজ করতে চাইছেন না।

নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ভোটারদের মধ্যে পুরো ব্যবস্থা নিয়ে অবিশ্বাস বেড়েই চলেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, এনওআরসি সেন্টার এবং ইউএসএ ফ্যাক্টস-এর জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৪ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সরকারের নির্বাচন ফলাফলের সনদের ওপর ‘অনেক বেশি’ বা ‘যথেষ্ট’ আস্থা রাখেন। এই সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ৪০ শতাংশ।

তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত