
একটা উপন্যাস কতটা প্রভাবশালী হলে সেটাকে বইয়ের দোকান থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে হয় খোদ রাষ্ট্রকেই? কিছু চরিত্র, কিছু সংলাপ আর স্বাধীনতার স্বপ্ন—এগুলো কতটা ভয় ধরাতে পারে, যার কারণে একটা সাহিত্যকর্মকেই ‘বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিতে হয়? শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, একসময় ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে ঠিক এমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল একটা বাংলা উপন্যাসকে কেন্দ্র করে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ ছিল সেই উপন্যাস। ১৯২৬ সালে প্রকাশের পর এটি শুধু পাঠকের হাতে হাতে ঘোরা একটি জনপ্রিয় বই হয়ে থাকেনি, খুব দ্রুতই তা ঔপনিবেশিক সরকারের নজরে আসে। কারণ বইটির পাতায় ছিল এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা শুধু রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে নয়, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তা ও সাহিত্যের মধ্যেও জায়গা করে নিচ্ছিল। উপন্যাসের চরিত্র, কথোপকথন ও বিপ্লবী চেতনা পাঠককে শুধু গল্পেই আকৃষ্ট করেনি; শাসনব্যবস্থা, স্বাধীনতা এবং প্রতিরোধ নিয়ে ভাবতেও বাধ্য করেছিল।
প্রেম, আবেগ কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের বাইরে গিয়ে ‘পথের দাবী’ হয়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক সাহিত্যিক ভাষা। আর সে কারণেই প্রকাশের পরপরই উপন্যাসটি ঘিরে তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক। ফলে ব্রিটিশ সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত করতে বাধ্য হয়।
উপন্যাসের গল্পে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা
‘পথের দাবী’ শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে রাজনৈতিক উপন্যাসগুলোর একটি। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচী একজন রহস্যময়, বুদ্ধিমান ও বিপ্লবী নেতা। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে গোপন বিপ্লবী সংগঠন পথের দাবী। সংগঠনের লক্ষ্য শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসান নয়, মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকেও সামনে আনা।
উপন্যাসে অপূর্ব, ভারতী, সুমিত্রাসহ বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজের নানা দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। কোথাও জাতীয়তাবাদ, কোথাও বিপ্লব, কোথাও ব্যক্তিগত ভালোবাসা সব মিলিয়ে উপন্যাসটি ঔপনিবেশিক ভারতের এক অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেছিল। তবে পথের দাবীকে শুধু বিপ্লবী উপন্যাস বললেই এর গুরুত্ব পুরোপুরি প্রকাশ পায় না। শরৎচন্দ্র প্রশ্ন তুলেছিলেন, একটি পরাধীন সমাজে মানুষের স্বাধীনতার অর্থ কী? শুধু বিদেশি শাসকের বিদায়, নাকি সমাজের ভেতরের বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধেও লড়াই?
উপন্যাসটি প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার এর দিকে নজর দেয়। কারণ, এতে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা ছিল এবং বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি সহানুভূতির প্রকাশও দেখা যায়। সরকারের আশঙ্কা ছিল, এমন একটি জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম পাঠকের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব আরও উসকে দিতে পারে। ফলে ১৯২৭ সালে ‘পথের দাবী’ নিষিদ্ধ করা হয়। বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং এর প্রচার-প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই নিষেধাজ্ঞাই উপন্যাসটিকে আরও আলোচিত করে তোলে। যে বই সরকার ভয় পেয়ে নিষিদ্ধ করেছে, সেটি পড়ার আগ্রহ মানুষের মধ্যে আরও বেড়ে যায়। ফলে ‘পথের দাবী’ শুধু একটি উপন্যাস হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক।
‘পথের দাবী’ নিয়ে বিতর্ক কোথায়
‘পথের দাবী’ নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে বড় জায়গা হলো সহিংস বিপ্লবের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। উপন্যাসে বিপ্লবী সংগঠন ও তার কর্মকাণ্ডকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল সাহিত্য কি রাজনৈতিক সহিংসতাকে সমর্থন করতে পারে? শরৎচন্দ্র নিজে শুধু রাজনৈতিক প্রচারপত্র লেখেননি, তিনি ছিলেন কথাসাহিত্যিক। ফলে তাঁর লেখায় বিপ্লবী চরিত্রগুলোও মানুষের আবেগ, দ্বিধা, ভালোবাসা ও দুর্বলতা নিয়ে হাজির হয়েছে। এই মানবিক উপস্থাপনাই উপন্যাসটিকে নিছক রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে নিয়ে যায়।
বিতর্কের আরেকটি দিক হল সব্যসাচী চরিত্রকে ঘিরে। তাঁর চিন্তা, সংগঠন পরিচালনার পদ্ধতি এবং সমাজ পরিবর্তনের ধারণা নিয়ে পাঠকের ব্যাখ্যা এক নয়। ফলে পথের দাবীকে কেউ দেখেছেন বিপ্লবের রোমান্টিক উপস্থাপন হিসেবে, কেউ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সাহসী সাহিত্যিক প্রতিবাদ হিসেবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, উপন্যাসটির রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে এর সাহিত্যিক শক্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শরৎচন্দ্রের সময়ের সাহিত্য ও রাজনীতি আলাদা ছিল না। স্বাধীনতার আন্দোলন, বিপ্লবী রাজনীতি, অহিংস আন্দোলন সবই তখন সাহিত্যিকদের আলোচনার বিষয়। পথের দাবীর বিপ্লবী বক্তব্য নিয়ে সাহিত্যিক মহলেও সেসময় আলোচনা তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিপ্লবের পথ নিয়ে মতপার্থক্যের প্রসঙ্গও আলোচিত হয়েছে। দুজনের লক্ষ্য ছিল দেশের মুক্তি, কিন্তু সেই মুক্তির পথ ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে তাঁদের ভাবনা ছিল আলাদা।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রকাশের ১০০ বছর পরও ‘পথের দাবী’ আজও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সাহিত্য যে শুধু বিনোদনই দেয় তা নয়, কখনো কখনো তা রাষ্ট্রের জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে, শরৎচন্দ্রের এই উপন্যাস তা দেখিয়েছে। একটি বই যখন শাসকের চোখে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তখন তার গল্পের গণ্ডি পেরিয়ে প্রশ্ন আসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও মানুষের অধিকার নিয়ে।
আরেকটি দিক হলো, নিষেধাজ্ঞা সবসময় বইকে থামাতে পারে না। অনেক সময় নিষেধাজ্ঞাই তাকে আরও আলোচিত করে তোলে। ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছিল। বইটি শুধু বিপ্লবের গল্প হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল একটি সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঔপনিবেশিক শাসনের ভয় এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সাহিত্যিক দলিল।
তবে আজকের পাঠকের কাছে উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো আরও গভীর—স্বাধীনতা আসলে কার? এটি কি শুধু একটি ভূখণ্ডের, নাকি প্রতিটি মানুষের? রাষ্ট্র স্বাধীন হলেই কি মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়? ব্যক্তির মর্যাদা, অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জায়গাটি কোথায়? শরৎচন্দ্র গল্প, চরিত্র আর সংঘাতের ভেতর দিয়ে এই প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দিয়েছেন পাঠকের দিকে। আর সেখানেই ‘পথের দাবী’ আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ সময় বদলেছে, শাসক বদলেছে, রাজনীতির ভাষাও বদলেছে কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ, মানুষের অধিকার আর মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে এখনো প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
.png)

-7c29dd-256x144.webp)






