সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কে দাঁড়াবে, পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু ও ওয়েজ বোর্ডের বাস্তবতা

শাহরিয়ার ইসলাম শোভন
শাহরিয়ার ইসলাম শোভন

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

চাকরি হারালে, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা উপার্জন বন্ধ হলে সাংবাদিকেরা কার কাছে যাবেন? দৈনিক সমকালের বরিশালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।

তিন বছরেরও বেশি সময় আগে চাকরি হারিয়েছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। স্থানীয় সমকাল কার্যালয়ে তার ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়ার সময় পকেটে থাকা একটি চিঠিতে তিনি তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীকে অনুরোধ করেছিলেন, সমকালের কাছে তার কোনো বকেয়া পাওনা থাকলে তা যেন আদায় করে তার স্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

বর্তমান ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরী স্ট্রিমকে বলেন, ২০২৩ সালের মে মাসে সমকালের চাকরি হারান পুলক। তার নিয়মিত বেতন পরিশোধ করা হলেও গ্র্যাচুইটি বকেয়া ছিল। তবে তিনি কর্মী হিসেবে ওয়েজবোর্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

পুলক অবশ্য তার মৃত্যুর জন্য সাবেক কর্মস্থলকে দায়ী করেননি। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ ১৩ বছর সেখানে কাজ করার পর চাকরিচ্যুত হলেও তিনি প্রায়ই সমকাল কার্যালয়ে যেতেন। পুলিশ এটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে এবং তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন তিনি মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত ছিলেন।

প্রশাসনের উদ্দেশে লেখা পৃথক একটি চিঠিতে পুলক লিখেছিলেন, ‘সুস্থ থাকার জন্য আমি অনেক চেষ্টা করেছি। এমনকি ভারতের ভেলোরেও ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু সুস্থ হতে পারিনি। অসুস্থতা আমাকে সামাজিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছিল। শারীরিক যন্ত্রণার কারণে আমি কোথাও যেতে পারতাম না।’

সাহায্য চাওয়ার মধ্য দিয়েই একজন পেশাদার সাংবাদিকের জীবনের ইতি ঘটল। তার মৃত্যুর পেছনে চূড়ান্ত কারণ যা-ই থাকুক না কেন, রেখে যাওয়া চিঠিগুলো এক যন্ত্রণাবিদ্ধ মনের কথা বলে, যেখানে নিজের পরিবারের দেখাশোনার জন্য তিনি পেশার কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন।

প্রশ্নটি কেবল পুলকের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, কর্মজীবনজুড়ে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার—এবং সেই সুরক্ষা যখন ব্যর্থ হয়, তখন কী ঘটে?

সংবাদপত্রের কর্মীদের মজুরির জন্য ওয়েজবোর্ডের কাঠামো রয়েছে। শ্রম আইনে কর্মসংস্থান ও চাকরিচ্যুতি নিয়ে সুরক্ষার বিধান রয়েছে। এছাড়া অসুস্থতা, আঘাত ও আর্থিক সংকটে পড়া সাংবাদিকদের সহায়তায় সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট রয়েছে। তবুও ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান বিরোধ দেখায়—কাগজের অধিকারের সঙ্গে বাস্তব আর্থিক নিরাপত্তার বড় ফারাক রয়েছে। এই ব্যবধান সাংবাদিকদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। সাংবাদিকরা প্রায়ই শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে প্রতিবেদন করেন, অথচ নিজেদের মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েই অনিশ্চয়তায় থাকেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়েজবোর্ডের বিধান সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে কি না, তা তদারকির দায়িত্ব আমাদের। তবে এই দায়িত্ব পালনে আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো জনবল ঘাটতি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং সে অনুযায়ী প্রতিবেদন করা জরুরি।’

বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল বাছির স্ট্রিমকে বলেন, পুলক আর্থিক সহায়তার জন্য ট্রাস্টে আবেদন করেছিলেন কি না, তা তার জানা নেই।

সহায়তা চাওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘প্রথমে একজন সাংবাদিককে আবেদন করতে হয়। এরপর আমরা আবেদনটি যাচাই-বাছাই করি। ঢাকা এবং অন্যান্য জেলার সাংবাদিকদের জন্য আমাদের আলাদা কমিটি রয়েছে।’

তিনি জানান, আবেদনকারীকে কোনো প্রেস ক্লাব বা সাংবাদিক সংগঠনের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে সংশ্লিষ্ট প্রেস ক্লাব বা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সুপারিশ থাকতে হয়। ঢাকার বাইরের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদকের সুপারিশ প্রয়োজন হয়।

আবদুল বাছির আরও বলেন, ‘কোনো সাংবাদিক আবেদন না করলেও আমরা অনেক সময় নিজ উদ্যোগে অসচ্ছল সাংবাদিকদের সহায়তা দিই। প্রতিবছর আমরা চার ধাপে সাংবাদিকদের জন্য বাজেট বরাদ্দ করি। চলতি বছর চার ধাপে সহায়তার জন্য আমাদের ৭ কোটি টাকার বেশি বাজেট ছিল। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এবং ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ইয়াসের খান চৌধুরী এই অনুদান ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছেন।’

সাহায্য চাওয়ার মধ্য দিয়েই একজন পেশাদার সাংবাদিকের জীবনের ইতি ঘটল। তার মৃত্যুর পেছনে চূড়ান্ত কারণ যা-ই থাকুক না কেন, রেখে যাওয়া চিঠিগুলো এক যন্ত্রণাবিদ্ধ মনের কথা বলে, যেখানে নিজের পরিবারের দেখাশোনার জন্য তিনি পেশার কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন।

কর্মক্ষমতাহীন, শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতায় ভোগা কিংবা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অক্ষম সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তা দেয় ট্রাস্ট। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ট্রাস্ট অসুস্থ, অসচ্ছল ও আহত ১ হাজার ১১০ জন সাংবাদিক এবং প্রয়াত সাংবাদিকদের পরিবারকে সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া প্রয়াত ৪০২ জন সাংবাদিকের সন্তানদের ৭৩ লাখ ২৬ হাজার টাকার বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের রমজানে ট্রাস্ট ২ হাজার সাংবাদিক পরিবারের মাঝে ১ কোটি ১২ লাখ টাকার ইফতার ও ঈদ উপহার বিতরণ করেছে।

তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন (যিনি ২১ আগস্ট থেকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন) এ বছরের ১৯ এপ্রিল জানিয়েছিলেন, ২০১৯ সালে নবম সংবাদপত্র ওয়েজবোর্ড রোয়েদাদ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে আয়কর প্রদান নিয়ে সাংবাদিক ও সংবাদপত্র মালিকদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে এর বাস্তবায়ন সংক্রান্ত ছয়টি রিট ও লিভ টু আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

তথ্য অধিদফতরের (পিআইডি) তথ্য কর্মকর্তা (সমন্বয়, বিতরণ ও প্রশিক্ষণ) রকিবুল হাসান স্ট্রিমকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছিল সরকার। ‘একটি খসড়া প্রস্তাবও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা বৈঠকে নানা উদ্বেগ তুলে ধরে এর ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করেন। তবে প্রস্তাবিত আইনটি আর এগোয়নি এবং এখনো পাস হয়নি,’ বলেন তিনি।

২০২৫ সালের ২৩ মার্চ কামাল আহমেদের নেতৃত্বাধীন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে খসড়া জমা দেয়। কমিশনের সুপারিশে ছিল— সব সাংবাদিকের জন্য বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও নিয়মিত বেতন; শিক্ষানবিসকালে সম্মানজনক ভাতা; তিন বছর পর জেলা প্রতিনিধিদের স্টাফ রিপোর্টার পদে পদোন্নতি; আবাসন, যাতায়াত, চিকিৎসা, উৎসব, ঝুঁকি, ফোন ও ইন্টারনেট ভাতা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি সুবিধা। এছাড়া মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন এবং সাংবাদিকতার দায়িত্বের সঙ্গে বিজ্ঞাপন বা সার্কুলেশন সংগ্রহের মতো বাণিজ্যিক কাজের সুস্পষ্ট বিভাজনের প্রস্তাব করা হয়।

শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বাস্তবে প্রয়োগ না করেই কাগজে-কলমে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন দেখায়। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা তৈরি হয়, কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে প্রতিষ্ঠানটি শ্রম আইন ও চাকরির শর্তাবলি অনুসরণ করেছে কি না। ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকরা বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর আওতায় শ্রম আদালতে মামলাসহ প্রতিকার চাইতে পারেন।’

সাঈদ আহমেদ জানান, শ্রম আইনের ধারা ১৪২ থেকে ১৪৭-এ সংবাদপত্রের ওয়েজবোর্ডের রূপরেখা রয়েছে। ধারা ১৪৫(২) ওয়েজবোর্ডের সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করে এবং ধারা ১৪৭ শ্রম আদালতে যাওয়ার সুযোগ দেয়। বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ২৬ ধারা অনুযায়ী স্থায়ী কর্মীকে ছাঁটাই করতে হলে নোটিশ বা নোটিশের পরিবর্তে বেতন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ওয়েজবোর্ড: বাস্তবায়নের ঘাটতি

২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নেতারা অবিলম্বে দশম ওয়েজবোর্ড গঠন এবং অন্তর্বর্তীকালীন মহার্ঘ ভাতার দাবি জানান।

২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সরকার নবম ওয়েজবোর্ড রোয়েদাদের গেজেট প্রকাশ করে। তবে গেজেট প্রকাশের এক বছরেরও বেশি সময় পর ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর হাইকোর্ট সাংবাদিকদের আয়কর ও গ্র্যাচুইটি সংক্রান্ত দুটি বিধানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বেতন ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে অষ্টম ওয়েজবোর্ডের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। ২০ দিন পর তৎকালীন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়।

২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) জানায়, নবম ওয়েজবোর্ডের নতুন বেতন স্কেল ও সুপারিশ অবাস্তব এবং অগ্রহণযোগ্য, কারণ দেশের কোনো সংবাদপত্রেরই তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই।

নোয়াব জানায়, ২০০৮ সালের সপ্তম ওয়েজবোর্ডে মূল বেতন ৮৯.৬ শতাংশ এবং ২০১৩ সালের অষ্টম ওয়েজবোর্ডে ৭৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া বেশিরভাগ সংবাদপত্রের পক্ষেই অষ্টম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে নবম ওয়েজবোর্ড কমিটি ৮৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নোয়াবের মতে বাস্তবসম্মত নয়।

বাস্তবে স্থায়ী সাংবাদিকেরা এখনো ১৩ বছর আগে প্রকাশিত অষ্টম ওয়েজবোর্ডের আওতায় রয়েছেন। এই ঘাটতি সাংবাদিকদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত শ্রমিক অধিকার নিয়ে লেখেন, অথচ নিজেদের বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা ও প্রাপ্য সুবিধার প্রশ্নে নিজেরেই ঘোর অনিশ্চয়তায় থাকেন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত