পরিবেশ/গরম বাড়লে কি বাতাস বিষাক্ত হয়, যা বলছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

রোদে শরীর পুড়ছে, গাড়ির ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে, নাক-মুখে ধুলা ঢুকছে। আকাশে মেঘ থাকলেও ঘেমে-লেপ্টে যাচ্ছে শরীর। ঢাকার রাস্তায় গরমে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির কাছে এসব ঘটনা আলাদা সমস্যা মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতিতে এসব সংকটের মধ্যে তেমন দূরত্ব নেই।

পৃথিবী যত গরম হচ্ছে, কিছু পরিস্থিতিতে বাতাসও তত বেশি দূষিত হয়ে উঠতে পারে। তীব্র তাপপ্রবাহ, বাতাসের স্থবিরতা এবং দাবানল—সবই বায়ুর মান খারাপ করার নতুন চাপ তৈরি করছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বা ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, আমরা যে বাতাসে প্রতিদিন শ্বাস নিচ্ছি, তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘটা এসব দুর্যোগ সরাসরি তার প্রভাব ফেলছে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট বুলেটিন নম্বর ৬-এ এই সম্পর্কটিই সামনে আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের তথ্য ও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি বলছে, তাপপ্রবাহ ও দাবানলজনিত দূষণ ইতিমধ্যে বায়ুর মান উন্নত করার বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন আর বায়ুদূষণকে তাই আলাদা দুটি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।

গরমে বাতাসের ভেতর কী পরিবর্তন ঘটে

শুধু গরম বাড়লেই বাতাস বিষাক্ত হয়ে যায়—কারণটি এমন নয়। তাপমাত্রা, সূর্যের আলো, বাতাসের গতি এবং বাতাসে আগে থেকে থাকা দূষকের মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক কাজ করে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ভূমিস্তরের ওজোন। আকাশের অনেক ওপরে থাকা ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। কিন্তু মাটির কাছাকাছি থাকা ওজোন একটি ক্ষতিকর বায়ুদূষক।

গাড়ি, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য উৎস থেকে বের হওয়া নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং উদ্বায়ী জৈব যৌগ সূর্যের আলোতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই ওজোন তৈরি করতে পারে। প্রচণ্ড গরমের সময় তীব্র সূর্যালোক এবং স্থির বাতাস এই রাসায়নিক বিক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। বাতাস খুব বেশি না চললে দূষকও সহজে ছড়িয়ে যেতে পারে না।

ডব্লিউএমও বলছে, উচ্চ তাপমাত্রা, স্থির বায়ুমণ্ডল ও তীব্র সৌর বিকিরণ একসঙ্গে থাকলে ভূমিস্তরের ওজোন তৈরির পরিবেশ আরও অনুকূল হয়। তাপপ্রবাহের সঙ্গে ওজোনের মাত্রা বাড়ার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় ওজোনের সংস্পর্শে থাকা শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আরেক বিপদ ‘আগুন’

তাপমাত্রা ও বায়ুদূষণের সম্পর্কের আরও ভয়ংকর উদাহরণ দাবানল। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম দাবানলের ঘটনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের ধোঁয়া থেকেও বিপুল পরিমাণ সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। ডব্লিউএমওর নতুন প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বে চরম দাবানল-ধোঁয়ার ঘটনা প্রায় তিন গুণ হয়েছে।

২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দাবানলের ধোঁয়ার সংস্পর্শের কারণে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ অতিরিক্ত মৃত্যুর সঙ্গে এই দূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে বলে ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হিসাবও কম হতে পারে বলে ডব্লিউএমও সতর্ক করেছে।

এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে পিএম২.৫—২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটারের চেয়েও ছোট সূক্ষ্ম কণা। তুলনা করলে, মানুষের একটি চুলের ব্যাস সাধারণত এর চেয়ে বহু গুণ বেশি। এত ছোট হওয়ার কারণে পিএম২.৫ শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের গভীরে যেতে পারে এবং কিছু কণা রক্তপ্রবাহেও পৌঁছাতে পারে।

ডব্লিউএমও বলছে, দাবানলের ধোঁয়া থেকে তৈরি পিএম২.৫-এর বিষাক্ততা সাধারণ দূষণের কণার মতো নয়। এ কারণে শুধু বাতাসে মোট পিএম২.৫ কত আছে, সেই হিসাব দিয়ে দাবানলের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝা নাও যেতে পারে। সংস্থাটি বলেছে, প্রচলিত ঝুঁকি নিরূপণ পদ্ধতি দাবানলজনিত মৃত্যুর হিসাব ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত কম দেখাতে পারে।

বাংলাদেশে দাবানল কম, কিন্তু ঝুঁকি কম নয়

বাংলাদেশে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের মতো দাবানল হয় না। তাহলে এই নতুন সতর্কতা আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ? খুবই গুরুত্বপূর্ণ—কারণ বাংলাদেশের সমস্যা শুরুই হয় অনেক বেশি দূষিত বাতাস দিয়ে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু হয়েছিল। বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্য ব্যয়ের পরিমাণ ছিল দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় বার্ষিক পিএম২.৫-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুর মানের নির্দেশিকার চেয়ে প্রায় ১৮ গুণ বেশি।

অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের জন্য বায়ুদূষণ কোনো ভবিষ্যতের সমস্যা নয়। এটি এখনই প্রতিদিনের বাস্তবতা।

জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে বায়ুদূষণকে আরও কঠিন করছে

ডব্লিউএমওর নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উষ্ণ পৃথিবীতে কিছু অঞ্চলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়ছে, কিছু অঞ্চলে শুষ্কতা ও দাবানলের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আবার এসব চরম পরিস্থিতি বাতাসে নতুন দূষক যোগ করতে পারে বা পুরোনো দূষকের প্রভাব বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে বায়ুদূষণের কিছু উপাদান আবার জলবায়ুকেও প্রভাবিত করে। যেমন কালো কার্বন, অর্থাৎ কালো ধোঁয়ার সূক্ষ্ম কণা। এটি বাতাসে থাকার পাশাপাশি তুষার ও বরফের ওপর জমে গেলে সেগুলোর সূর্যের আলো প্রতিফলিত করার ক্ষমতা কমাতে পারে। ফলে বরফ ও তুষার দ্রুত গলতে পারে। ডব্লিউএমওর প্রতিবেদনে কালো কার্বনের এই জলবায়ুগত প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এই সম্পর্কটি একমুখী নয়।

জলবায়ু পরিবর্তন বায়ুর মানকে প্রভাবিত করতে পারে, আবার বায়ুদূষণের কিছু উপাদান জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। তাই একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির সমাধান করাও কঠিন।

সমাধান কোথায়

জীবাশ্ম জ্বালানি কমানো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বাড়ানো, পুরোনো ও অতিরিক্ত দূষণকারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানার নির্গমন পর্যবেক্ষণ, নির্মাণকাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপ একদিকে বায়ুর মান উন্নত করতে পারে, অন্যদিকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণও কমাতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুধু শীতকালে ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরমকাল হোক বা শীতকাল—বায়ুদূষণ বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের বর্ষাকালেও এর তেমন উন্নতি হয়নি। তাই, কোন উৎস থেকে কত দূষণ আসছে, গরম ও বৃষ্টির পরিবর্তন তার ওপর কী প্রভাব ফেলছে, কোথায় দূষণের মাত্রা বেশি এবং কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে—এসব তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। ডব্লিউএমওও পিএম২.৫, ভূমিস্তরের ওজোন, কালো কার্বনসহ বিভিন্ন দূষকের পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। কারণ বায়ুর মান এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে আলাদা করে দেখলে বাস্তব ঝুঁকির পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত