৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর শঙ্কা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

এল নিনোর কারণে কেবল বৃষ্টি কম হয় তা নয়, বরং অকাল বন্যা বা অসময়ে ঝড়-বৃষ্টির মতো ঘটনাও মাঝেমধ্যে ঘটতে পারে। এআই ছবি
এল নিনোর কারণে কেবল বৃষ্টি কম হয় তা নয়, বরং অকাল বন্যা বা অসময়ে ঝড়-বৃষ্টির মতো ঘটনাও মাঝেমধ্যে ঘটতে পারে। এআই ছবি

এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, চলমান এল নিনো এল নিনো ৭০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাব ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকতে পারে। খবর বিবিসির।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। গত কয়েক সপ্তাহে এসব এলাকার পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল। আগামী কয়েক মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘এল নিনো আমাদের চোখের সামনে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। পৃথিবী এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যা আগে দেখা যায়নি।’

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেন, ‘এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।’

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বাতাসের গতিপথে পরিবর্তন আসে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার ধরন বদলে যায়। কোথাও খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় দেখা দিতে পারে।

ডব্লিউএমও বলছে, আগামী কয়েক মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের বড় এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে এসব এলাকায় খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে।

কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কায় পানামা খাল দিয়ে জাহাজ চলাচলও কমানো হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকে খালটিতে জাহাজ চলাচল ১০ শতাংশের বেশি কমানো হবে। বছরে প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ এই কৃত্রিম জলপথ ব্যবহার করে। বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই পথটি পানামার অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে। ইন্দোনেশিয়ায় চলতি শুষ্ক মৌসুমে এরই মধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকায় আগুন ছড়িয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বৃষ্টির জন্য বিমান মোতায়েন করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

মধ্য কালিমানতানের বাসিন্দা ডারউইন রমি বিবিসির বরাতে বলেন, ‘এক মাসের বেশি সময় ধরে আমরা দাবানলের মধ্যে আছি। ধোঁয়া এত ঘন হয়ে গেছে যে বাইরে বের হলে চোখ জ্বালা করে। ধোঁয়ার গন্ধও অনেক তীব্র।’

অন্যদিকে চীন এ বছর সাতটি টাইফুন আঘাত হানার আশঙ্কা করছে। দেশটির বিশেষজ্ঞরা এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর সম্পর্ক দেখছেন। জুলাইয়ে চীনে তিনটি টাইফুন আঘাত হানে। আগস্টে টাইফুন ডলফিনের কারণে ১০ লাখের বেশি মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়।

তবে সব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমবে না। পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা ।

সেলেস্তে সাওলো বলেন, ‘খরা ও বন্যার কারণে আমরা ইতিমধ্যে বিপর্যয় ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পাচ্ছি। এল নিনো শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রভাব আরও বাড়তে পারে।’

এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়াতেও উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক আলিস্টেয়ার হবডে জানান, এল নিনোর কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত তাপ সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

ইতোমধ্যেই দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। এর আগে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও তাসমানিয়ায় সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের সময় মাছের ব্যাপক মৃত্যু, শৈবালের বিস্তার ও জেলিফিশের আধিক্য দেখা গিয়েছিল। ক্ষুধার্ত পেঙ্গুইনও দেখা যায় তখন। এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি পেরু। পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত হওয়ায় এল নিনোর সময় দেশটিতে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই ধরনের পরিস্থিতি ইকুয়েডর ও ব্রাজিলের কিছু এলাকাতেও দেখা দিতে পারে।

প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক কর্মকর্তা মিগেল আরেস্তেগুই বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তবে এই উদ্বেগকে আতঙ্কে পরিণত না করে প্রস্তুতির কাজে লাগাতে হবে। এল নিনো একা কোনো দুর্যোগ তৈরি করে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসবাস, দুর্বল পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মতো সমস্যার কারণে এল নিনোর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়ে যেতে পারে বলে জানান তিনি।

এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। সম্ভাব্য চরম আবহাওয়ার খবর দ্রুত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ডব্লিউএমও। তবে এবারের এল নিনো কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত