জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিদেশে কর্মসংস্থান

সৌদি আরবে আটকে শ্রমবাজার, সুখবর নেই কোথাও

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৮: ৩১
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশ থেকে গত কয়েক বছরে বিদেশ পাড়ি দেওয়া শ্রমিকের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশই গেছে সৌদি আরব। চলতি বছরের আড়াই মাসেও দেখা গেছে একই ধারা। এই সময়ে কর্মীদের ৬৫ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে।

অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়া, ওমানসহ গুরুত্বপূর্ণ ৭টি শ্রমবাজার ২০১৮ সালের পর থেকে কার্যত বন্ধ। এতে সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প শ্রমবাজারের সন্ধান করতে হবে সরকারকে। নাহলে জনশক্তি রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স উভয় খাতেই ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প বাজার নিয়ে কাজ শুরু করেছে তারা। দ্রুতই থাইল্যান্ডসহ নতুন বাজারে শ্রমিক পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও বললেন একই কথা। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা বন্ধ হয়ে যাওয়া ও নতুন শ্রমবাজার নিয়ে চিন্তা করছি। তবে আমাদেরকে একটু বুঝতে দেওয়া উচিত। কারণ আমি মাত্র এখানে আসছি।’

কার্যত বন্ধ সাত শ্রমবাজার

বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমানসহ ৭টি দেশের শ্রমবাজার প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ওমান ও ২০২৪ সালের মে থেকে মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি কর্মীরা। আর ৫ আগস্টের পর অনানুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দরজা। কিছু কর্মী গেলেও তা নামসর্বস্ব, এটিও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর এখন পুরোপুরি বন্ধ। এ ছাড়া ইতালি, বাহরাইন, মিশর ও লিবিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

৭ দেশের শ্রমবাজার বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১৪২ দেশে শ্রমিক যায়।

তবে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিবেদন বলছে, ১৪২ দেশের মধ্যে সৌদি আরবসহ মাত্র পাঁচটি দেশেই ৯০ শতাংশ বাংলাদেশি কর্মী যান। এর বাইরে ১৪টি দেশে ৮ শতাংশ এবং বাকি ১২৩টি দেশে যান ১ থেকে ২ শতাংশ কর্মী।

এদিকে ২০১৮ সালে ঢাকঢোল পিটিয়ে নতুন ৫৩টি দেশে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ শ্রমবাজার গবেষণা সেল গঠন করা হয়। যদিও এই সেল এখন পর্যন্ত নিষ্ক্রিয়। অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি মিশনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ আর সমন্বয়ের অভাবই এজন্য দায়ী।

শ্রমিকদের প্রধান ভরসা সৌদি আরব

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত ৯২টি দেশে গেছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৮৬ বাংলাদেশি। এর মধ্যে ১ লাখ ২৩ হাজার ১৫৭ কর্মীই (৬৫ দশমিক ৬২ শতাংশ) পাড়ি জমিয়েছেন সৌদি আরবে। আর ৬৪ হাজার ৫২৯ জন গেছেন বাকি ৯১ দেশে।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে বিদেশ যাওয়া কর্মীর হিসাব বিশ্লেষণেও একই চিত্র দেখা যায়। এই সময়ের ৪ বছরই অর্ধেকের বেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরব। ২০২১ সালে ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২২ সালে ৫৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৬২ দশমিক ১১ শতাংশ ও ২০২৫ সালে ৬৬ দশমিক ৭২ শতাংশ কর্মী দেশটিতে যান। শুধু ২০২৩ সালে ৩৮ দশমিক ১২ শতাংশ কর্মী সৌদি গিয়েছিলেন।

সৌদিতেও চলছে নানা জটিলতা

পুরো জনশক্তি খাত সৌদি আরবের উপর ভর করে চললেও সেখানে রয়েছে নানা জটিলতা। জনশক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সৌদিতে প্রায় ৭০টি খাতে কাজ পেতে ‘তাকামুল’ সনদ নিতে হয় কর্মীদের। তবে এই সনদ নিতে নানা ভোগান্তির শিকার হন তারা।

তাকামুল সনদের বিষয়ে জানা গেছে, এটি কর্মীর দক্ষতার সনদ। সৌদির শ্রমবাজারে এটি থাকলে তাকে দক্ষ কর্মী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আগে মাত্র ১০টি সেক্টরে এই পরীক্ষা ছিল। এখন ৭০টি সেক্টরে নেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এই পরীক্ষার জন্য কর্মীকে ৫০ ডলার (বর্তমানে ৬ হাজার ২৫০ টাকা) ব্যয় করতে হয়। এ ছাড়া পরীক্ষা দিতে কর্মীদের অ্যাপয়েন্টমেন্টসহ দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। আর তাকামুল সনদের পরীক্ষা ছাড়া দেশটিতে গেলে আকামা, চাকরি, বেতন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় কর্মীদের।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের এই মুহূর্তে ভালো কোনো বিকল্প বাজার নেই। মধ্যপ্রাচ্য তো দীর্ঘদিন ধরে চলছে; এখন বিকল্প বাজারের দিকে মনোযোগ বেশি দিতে হবে। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলোতে (সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ভিয়েতনামে) শ্রমিক যাওয়ার সুযোগ আছে। কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এই বাজারগুলো উন্মুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে। ইউরোপের কিছু বাজার নিয়েও কাজ করতে হবে। অর্থাৎ ট্র্যাডিশনাল বাজারের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হবে।’

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর স্ট্রিমকে বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই। অনেক আগে একটা সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। আর গত বছর দক্ষ কর্মীর বিষয়ে একটা চুক্তি হয়েছে। শুধু সৌদি আরব নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও কোনো চুক্তি নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তি থাকলে যে সুবিধাটা হয়, প্রমোট করা যায়। এখন যেটা হয় ব্যক্তি নিজে প্রমোট করে অথবা রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা নিয়ে আসে। এ ছাড়া যেসব বাংলাদেশি ওইখানে থাকে তারা কাজের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু সরকার বলতে পারে না, কোন দেশের কোন কোম্পানি তার কর্মী নেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চুক্তিভিত্তিক জায়গাগুলো তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি। তবে সবকিছুর উপর দক্ষ অভিবাসনে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দক্ষতা বাড়াতে পারলে বিভিন্ন দেশে কর্মীর যাওয়ার হার বাড়বে। সবমিলিয়ে বহুমুখী উদ্যোগ নিলে শ্রমবাজার বাড়বে। নাহলে ভবিষ্যতে দুর্দিন আসবে।’

সম্পর্কিত