leadT1ad

গণমাধ্যম কমিশন ২০২৬-এ কী আছে, আপত্তি কোথায়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

কী আছে গণমাধ্যম কমিশন খসড়ায়, কেন বিতর্ক। স্ট্রিম গ্রাফিক

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষে এসে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও তথ্য প্রবাহের জগতে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া জনসম্মক্ষে প্রকাশ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন, সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশের লক্ষ্যেই এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হচ্ছে। কিন্তু সময়, প্রক্রিয়া এবং খসড়ার বিষয়বস্তু নিয়ে সাংবাদিক সমাজ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং সম্পাদক পরিষদ চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে খসড়া প্রকাশ করে মাত্র তিন দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারির মধ্যে মতামত জানানোর নির্দেশ দিয়েছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনি কাঠামোর জন্য এত সংক্ষিপ্ত সময় দেওয়া এবং নির্বাচনের ঠিক আগে এমন পদক্ষেপ নেওয়াই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

খসড়ার ভেতরে কী আছে?

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬ (খসড়া)’-তে গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের জন্য আইনি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়ার বিভিন্ন অধ্যায় ও ধারায় কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া, সদস্য নির্বাচনের যোগ্যতা এবং কমিশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।

১. কমিশনের গঠন ও কাঠামো

খসড়ার ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এই কমিশন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হবে। একজন চেয়ারম্যান এবং ৮ জন সদস্যসহ মোট ৯ সদস্যের সমন্বয়ে এই কমিশন গঠিত হবে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে বলা হয়েছে, সদস্যদের মধ্যে ন্যূনতম একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থাকতে হবে। চেয়ারম্যান কমিশনের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিশনের সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

২. নিয়োগ প্রক্রিয়া ও বাছাই কমিটি

কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগের জন্য ‘বাছাই কমিটি’ (সার্চ কমিটি) গঠনের কথা বলা হয়েছে (ধারা ৭)। প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি এই কমিটির সভাপতিত্ব করবেন। কমিটিতে আরও থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইউজিসি মনোনীত কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন অধ্যাপক এবং ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বা সম্পাদক (যারা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এবং গণমাধ্যমের মালিকানায় নেই)।

৩. কমিশনের কার্যপরিধি ও ক্ষমতা

খসড়ার ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ সমুন্নত রেখে কমিশনের কাজ হবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অনলাইন ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের জন্য স্বচ্ছতা, নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করা। ‘সাংবাদিক’ কারা হবেন, তার ন্যূনতম যোগ্যতা ও সুরক্ষা বিষয়ে প্রবিধান প্রণয়ন করা। পেশাগত প্রয়োজনে সাংবাদিকদের তথ্যের উৎস গোপন রাখার অধিকার নিশ্চিত করা (আদালতের নির্দেশ ছাড়া জোর করা যাবে না)। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জন্য যৌক্তিক নিয়োগ শর্ত, যথাযথ সম্মানী এবং কর্মক্ষেত্রে ফেয়ার ট্রিটমেন্ট বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, বিশেষ করে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা রোধে পদক্ষেপ নেওয়া। এমনকি বেআইনিভাবে সাংবাদিকদের যোগাযোগ প্রযুক্তি (মোবাইল, ইমেইল) নজরদারি বা হ্যাক করার বিরুদ্ধেও সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।

৪. বিরোধ নিষ্পত্তি ও শাস্তির বিধান

অধ্যাদেশের ১৩ নম্বর ধারায় বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কমিশনকে। খসড়া অনুযায়ী, কমিশন আচরণবিধি লঙ্ঘন বা বিরোধের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। তবে কমিশনের কোনো নির্দেশনার বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন।

৫. আর্থিক ব্যবস্থাপনা

কমিশনের নিজস্ব তহবিল থাকবে, যা সরকার প্রদত্ত অনুদান এবং নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কমিশন প্রতি বছর সরকারের কাছে বাজেট বিবরণী পেশ করবে এবং অডিট বা নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।

সারসংক্ষেপে, খসড়াটি আপাতদৃষ্টিতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা, ওয়েজবোর্ড বা বেতন এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নের কথা বললেও, কমিশন গঠনে সরকারি আমলাতন্ত্রের প্রভাব এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থাকার বিষয়টি এই আইনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রকাশিত খসড়ায় একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন কমিশনের রূপরেখা দেওয়ার কথা বলা হলেও, এর ভেতরের গঠন এবং কার্যপরিধি নিয়ে অনেক ‘কিন্তু’ রয়ে গেছে।

দ্বিখণ্ডিত কমিশন বিতর্ক: একটি নাকি দুটি?

এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো—গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের মূল সুপারিশকে পাশ কাটিয়ে দুটি আলাদা কমিশন গঠনের উদ্যোগ। সংস্কার কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, সংবাদপত্র ও অনলাইন মাধ্যমের জন্য বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল এবং প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনকে একীভূত করে একটি ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠন করা উচিত, যা হবে পুরোপুরি স্বাধীন। কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয় সেই পথে হাঁটেনি। তারা ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ এবং ‘সম্প্রচার কমিশন’ নামে দুটি পৃথক সত্তা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়বে এবং নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হবে।

টিআইবি ও সম্পাদক পরিষদের প্রতিক্রিয়া

সরকারের এই শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে টিআইবি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা একে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ী পরিহাস’ বলে অভিহিত করেছে। টিআইবি বলছে, ১০ মাস ধরে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন পড়ে ছিল, সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এখন বিদায়বেলায় তাড়াহুড়ো করে আমলাতন্ত্র-নির্ভর কমিশন গঠনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে।

একই সুর শোনা গেছে সম্পাদক পরিষদের কণ্ঠেও। তারা বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এবং মাত্র তিন দিনের নোটিশে মতামত নিয়ে এমন সুদূরপ্রসারী আইন পাস করা অনভিপ্রেত ও অযৌক্তিক। তাদের আশঙ্কা, খসড়ার বিধানগুলোতে সুরক্ষার চেয়ে নিয়ন্ত্রণের সুযোগই বেশি রাখা হয়েছে। তারা দাবি করেছে, নির্বাচিত সংসদ গঠনের পর সব অংশীজনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করা উচিত।

আতঙ্ক ও আস্থার সংকট

সম্প্রতি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন এক ‘সর্বগ্রাসী আতঙ্কের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদিও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দৃশ্যমান, কিন্তু ভিন্নমতের কারণে হামলার ঝুঁকি সাংবাদিকতাকে এক ধরনের সেলফ-সেন্সরশিপের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শব্দ চয়নের ক্ষেত্রেও এখন সাংবাদিকদের ভাবতে হয়। ডেইলি স্টার বা প্রথম আলোতে হামলার ঘটনাগুলোকে তিনি গণতন্ত্র ও ভিন্নমতের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক অপব্যবহার এবং গুজব পরিস্থিতিকে আরও বিষিয়ে তুলছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাণভোমরা। কিন্তু ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৬’-এর খসড়া এবং তা পাসের প্রক্রিয়া নিয়ে যে সংশয় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এই স্বাধীনতার প্রশ্নেই বড়সড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী এটি সুরক্ষার কবচ হতে পারে, কিন্তু অংশীজনরা একে দেখছেন নিয়ন্ত্রণের নতুন হাতিয়ার হিসেবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার এবং সংসদ এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, এবং সাংবাদিক সমাজের দাবি কতটা পূরণ হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত