পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করেছে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও তারা ভারতের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ম্যাচ বয়কট করবে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সেই ম্যাচ এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। পাকিস্তান ম্যাচ বয়কটের কোনো নির্দিষ্ট কারণ এখনো জানায়নি। তবে পরিস্থিতির আড়ালে বড় এক রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি সরাসরি ভারতের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) বেলুচিস্তানে এক ভয়াবহ হামলায় অন্তত ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১৭ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে ১৪৫ জন ‘জঙ্গি’ও মারা গেছে। নাকভির দাবি এই হামলার পেছনে ভারতের হাত আছে।
প্রতিবেশি দুই দেশের এই টানাপোড়েনের আঁচ পড়েছে ক্রিকেটেও। এর আগেই বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দিল পাকিস্তান।
বেলুচিস্তানে কী ঘটেছে
স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, শনিবার ভোরে পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশের রাজধানী কোয়েটা ও অন্যান্য স্থানে সমন্বিত হামলা হয়েছে। বন্দুকধারীরা একযোগে থানা এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র লক্ষ্য করে এই হামলা চালায়। কয়েক দশকের মধ্যে বেলুচিস্তানে এটিই সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা। এতে প্রায় ২০০ জন নিহত হয়েছেন যাদের অধিকাংশই জঙ্গি। আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তবর্তী এই খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ প্রদেশটিতে পাকিস্তান দীর্ঘ দিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে লড়ছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বারবার নিরাপত্তা বাহিনী ও বহিরাগতদের লক্ষ্য করে হামলা করছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। বিএলএ জানিয়েছে, তারা বেলুচিস্তানের নয়টি জেলায় পুলিশ ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা এবং আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। হামলার দিনই নাকভি স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এগুলো কোনো সাধারণ সন্ত্রাসী কাজ নয়। ভারত এই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মিলে হামলার পরিকল্পনা করেছে। যদিও তার বক্তব্যের সপক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ হাজির করেননি।
বিশ্বকাপ ঘিরে উত্তাপ
গত ২৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানালে আইসিসি এই সিদ্ধান্ত নেয়। ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক উত্তেজনার জেরে বিসিবি ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ খেলার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু আইসিসি তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ দলের জন্য কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য হুমকি’ নেই। ফলে ছেলেদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম বাংলাদেশ থাকছে না।
আগামী শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হতে যাওয়া টুর্নামেন্টের আগেই বিতর্ক চরমে পৌঁছেছে। বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কায় খেলার অনুমতি না দেওয়ায় মহসিন নাকভি আইসিসির কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি আইসিসির বিরুদ্ধে ‘দ্বিচারিতার’ অভিযোগ তুলেছেন। অতীতে পাকিস্তান আয়োজক হলে ভারত সেখানে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তখন আইসিসি ভারতকে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার সুযোগ দিয়েছে। এমনকি এবারের বিশ্বকাপেও ভারত আয়োজক হলেও পাকিস্তানের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ দেশ শ্রীলঙ্কায় ফেলা হয়েছে।
নাকভি বলেছেন, আপনারা এক দেশের জন্য এক নিয়ম আর অন্যদের জন্য উল্টো নিয়ম করতে পারেন না। এটি অবিচার। বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি প্রধান অংশীদার। তাদের বিশ্বকাপে খেলা উচিত। এরই প্রতিবাদে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে তাদের ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশির মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছে অনেক দিন ধরেই। গত এপ্রিল মাসে ভারতশাসিত কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হামলার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করেছিল। মে মাসে দুই দেশ আকাশযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। একে অপরের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে। অবশেষে ১০ মে যুদ্ধবিরতি হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকেই বাংলাদেশে ভারতের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস বেড়েছে। ৩ জানুয়ারি বিসিসিআই নির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়।
বিশ্বকাপে কী প্রভাব পড়বে
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণ ও দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়। এখন এই ম্যাচ না হওয়ায় কয়েক কোটি দর্শক বঞ্চিত হবেন। ভারতের স্টার স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই দুই দলের ম্যাচ রেকর্ড ১৬ কোটি ৭০ লাখ দর্শক দেখেছিল। যা ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দেখা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছেও এই ম্যাচের আলাদা কদর। ম্যাচ বাতিল হলে সম্প্রচারকারীরা বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাবে। একইভাবে কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামও টিকিট বিক্রি থেকে বড় আয় হারাবে।
পাকিস্তানের জন্য এর মানে কী
গ্রুপ পর্বে এই বয়কটের কারণে পাকিস্তান দুই পয়েন্ট হারাবে। না খেলেই সেই পয়েন্ট পেয়ে যাবে ভারত। বিশ্বকাপের ফরম্যাটে প্রতিটি জয়ের জন্য দুই পয়েন্ট বরাদ্দ থাকে। ফলে টুর্নামেন্টের পরবর্তী রাউন্ডে ওঠার লড়াইয়ে পাকিস্তান চাপে পড়ে যাবে। ভুল করার আর কোনো সুযোগ তাদের হাতে নেই। বাকি ম্যাচগুলো তাদের জিততেই হবে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে
২০১২ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হয়নি। কেবল বহুজাতিক টুর্নামেন্টেই তাদের দেখা হয়। গত বছর দুই দেশ একটি চুক্তিতে সই করেছিল। সেই অনুযায়ী কোনো দেশ আইসিসি ইভেন্ট আয়োজন করলে অপর দেশ সেখানে যাবে না। নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলা হবে। এবার নিরপেক্ষ ভেন্যুতেই ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের এই বয়কট এক নতুন নজির তৈরি করল। ভবিষ্যতে হয়তো ভারতও এই পথ অনুসরণ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নিতে পারে।