leadT1ad

একাত্তর নাকি চব্বিশ

ইতিহাসকে বাইনারি করার বিপজ্জনক শর্টকাট

ইউসুফ আলী শিমুল
ইউসুফ আলী শিমুল

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮: ২১
ছবি: সংগৃহীত

কোনো এক বোটানিক্যাল গার্ডেন। সকালের সোনারোদ পড়ছে গাছের পাতার ফাঁক গলে। বেঞ্চে বসা এক তরুণ। পাশে এসে বসলেন বয়োবৃদ্ধ একজন। তরুণটি বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ওনার একটা হাত নেই। জিজ্ঞেস করলেন, কী করে হলো? ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠল গুলির শব্দ। বৃদ্ধ স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘একাত্তর’। তারপরই বৃদ্ধ খেয়াল করলেন, ওই তরুণেরও একটি পা নেই। তিনিও জিজ্ঞেস করেন, তোমারটা? তৃপ্তির হাসি হেসে তরুণের উত্তর, চব্বিশ। এরপর সেখান থেকে ওঠার সময় বৃদ্ধ হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘চলো উঠি। অনেক কাজ পড়ে আছে।’ ক্রাচটা হাতে নিতে নিতে তরুণের জবাব, ‘হ্যাঁ, আমারও অনেক কাজ আছে।’ মূলত এটি ছিল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশ করা একটি নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের ভিডিও। যে ভিডিওতে একাত্তর ও চব্বিশকে তুলে ধরা হয়েছে অসাধারণভাবে। এই ভিডিওটি কেবল একটি প্রচারণামূলক কাজ নয়, বরং এটি দুই প্রজন্মের ক্ষতের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরির প্রতীকী প্রচেষ্টা। এটি দেখায় যে, একাত্তরের মুক্তি আর চব্বিশের আকাঙ্ক্ষা একই সূত্রে গাঁথা—যার নাম অধিকার আদায়ের লড়াই।

দলীয় প্রচারণা হলেও ভিডিওটির বক্তব্যই যেন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের জন-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। তবে সংকটও সেখানেই; গত বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কেউ কেউ দুই ঐতিহাসিক মাইলফলককে বাইনারিতে ফেলতে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। একদিকে মুক্তিযুদ্ধ, অন্যদিকে গত বছরের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন। এই দুই সময়কে এমনভাবে হাজির করা হচ্ছে যেন একটি আরেকটির বিপরীত। যেন একটিকে স্বীকার করলে অন্যটিকে অস্বীকার করতেই হবে। ইতিহাসকে এভাবে ‘হ্যাঁ-না’, ‘পক্ষে–বিপক্ষে’ ভাগ করার প্রবণতাই আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক শর্টকাট। ইতিহাস আসলে বাইনারিতে চলে না, কিন্তু রাজনীতি চলে। রাজনীতি যখন ইতিহাসকে অপহরণ করে, তখন সত্যের চেয়ে সুবিধাজনক বয়ান বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই বয়ান বিভাজন তৈরি করে ফায়দা লোটে, কিন্তু জাতির সামগ্রিক পরিচয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।

সম্প্রতি কুমিল্লার দেবীদ্বারে এক নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া বক্তব্যে গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে জন্ম দিয়েছে একাত্তর। এটা বিতর্কের ঊর্ধ্বে। একইসঙ্গে একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। দুইটাই স্বতন্ত্র।’

গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান আরেকটু খোলাখুলিভাবেই বলেছেন, ‘এখন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে আমাদের জাতীয় পরিচায়ক ঘটনাগুলো—১৯৫২ থেকে ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪; এই ঘটনাগুলোকে আমরা পরস্পরকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। এটি একান্তই হীন একটি রাজনৈতিক স্বার্থে করা হচ্ছে।’

বাইনারি তৈরির রাজনৈতিক সুবিধা উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খানের এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন আসতে পারে, কী সেই রাজনৈতিক স্বার্থ? একাত্তর ও চব্বিশকে বাইনারির ফাঁদে ফেলতে পারলে লাভ কার? এর উত্তর পেতে গবেষণার প্রয়োজন নেই। এর প্রথম কারণ হতে পারে, একাত্তর ও চব্বিশকে বাইনারি করাটা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। ক্ষমতাসীন রাষ্ট্র বা ক্ষমতার আশপাশে থাকা গোষ্ঠীর জন্য একাত্তর একটি পরীক্ষিত নৈতিক ঢাল। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নিজেকে একাকার করে ফেলতে পারলে বর্তমানের সব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সহজ হবে। তখন চব্বিশের দাবি আর নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন থাকে না; তা হয়ে ওঠে ‘অস্থিতিশীলতা’, ‘বিশৃঙ্খলা’ বা ‘ইতিহাসবিরোধী ষড়যন্ত্র’। মুক্তিযুদ্ধকে যখন শাসনের লাইসেন্স বা দুর্নীতির ইনডেমনিটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ইতিহাসের চেয়ে অপশাসনই বেশি মহিমান্বিত হওয়ার সুযোগ পায়।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের দমনমূলক চর্চার প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্র কিংবা সমগ্র ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থার’ ওপর ক্ষুব্ধ একটি অংশ আবার একাত্তরকে পুরোপুরি ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বা ‘ব্যবহৃত ইতিহাস’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়। তারাও শর্টকাট নেয়। জটিল ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা না বুঝে তারা ধরে নেয়—একাত্তর মানেই রাষ্ট্র, আর রাষ্ট্র মানেই দমন। এই দুই শর্টকাটই পরস্পরের প্রতিচ্ছবি। এই উগ্র প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রকারান্তরে একাত্তরের সেইসব আত্মদানকে অপমান করে, যা ছিল মূলত বৈষম্যহীন ও মানবিক একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন। একাত্তরকে অস্বীকার করা মানে হলো নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিমূলকেই উপড়ে ফেলা।

একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোরে ব্যাপারটি কোনোভাবেই ইতিহাস বোঝার প্রয়াস নয়; এটি ইতিহাস এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। এই বাইনারি একাত্তরের মর্যাদা রক্ষা করে না, বরং তাকে রাজনৈতিক ঢালে পরিণত করে।

এখানে ইতিহাস আর স্মৃতির পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বিশ্লেষণ চায়, প্রশ্ন চায়। স্মৃতি রাজনৈতিক আনুগত্য চায়। রাষ্ট্র একাত্তরকে যখন প্রশ্নাতীত স্মৃতিতে পরিণত করে, তখন তা ইতিহাস থাকে না; হয়ে ওঠে শাসনের ভাষা। এই ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করতেই ইতিহাসকে বাইনারি করা হয় অনেক সময়। কারণ ধারাবাহিকতা মানলে প্রশ্ন আসে—একাত্তরের রাষ্ট্র আদর্শ কোথায় ভেঙে পড়ল? কেন নাগরিকদের আবার রাস্তায় নামতে হলো? এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। তাই ইতিহাসকে টুকরো টুকরো করে দেখানোর প্রচেষ্টা চলে সমান তালে। টুকরো ইতিহাস সবসময়ই শাসকের স্বার্থ রক্ষা করে, কারণ পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সবসময়ই শাসকের বিচার করে।

একাত্তর প্রশ্নহীন গৌরব, চব্বিশ ধারাবাহিকতার ফল একাত্তর কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটি ছিল দীর্ঘদিনের সংগ্রাম—ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফল। একইভাবে চব্বিশও হঠাৎ জন্ম নেয়নি। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বঞ্চনা, মতপ্রকাশের সংকোচন, বিচারহীনতা ও প্রতিনিধিত্বের সংকট থেকে তার উত্থান।

এ নিয়ে দ্বিমত নেই যে একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ ছিল ন্যায়সংগত ও ঐতিহাসিকভাবে অপরিহার্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান তাঁর ‘পাকিস্তান: ফেইলর ইন ন্যাশনাল ইনটিগ্রেশন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘দ্যা ক্রাইসিস অব পাকিস্তান ওয়াজ রুটেড ইন দ্য সিস্টেমেটিক ডিনায়াল অব পোলিটিক্যাল রাইটস টু ইস্ট পাকিস্তান।’ অর্থাৎ একাত্তর ছিল অধিকারহীনতার সরাসরি ফল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রের জন্ম, সেই রাষ্ট্র কি সব সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ থেকেছে—এই প্রশ্ন তোলা কি একাত্তরকে অস্বীকার করা? বরং একাত্তর যে অধিকারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, চব্বিশ হলো সেই হরণকৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের এক নতুন প্রতিশ্রুতি। চব্বিশ একাত্তরের উত্তরসূরি, প্রতিপক্ষ নয়।

ইতিহাস বলে, তা নয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে যে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছিল; বাস্তব রাষ্ট্রচর্চা অনেক সময়ই তা থেকে সরে গেছে। এই বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা নয়; বরং তার অসম্পূর্ণতার দিকেই ইঙ্গিত। অন্যদিকে চব্বিশও কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক জমাটবাঁধা চাপের বহিঃপ্রকাশ। মতপ্রকাশের সংকোচন, নির্বাচনী অনিশ্চয়তা, বিচারহীনতা এবং তরুণদের প্রতিনিধিত্ব সংকট—এসব বিষয় নিয়ে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে অসংখ্য গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রশ্ন তোলা ইতিহাসবিরোধী নয়। বরং এটি সেই একই প্রশ্নের নতুন সংস্করণ—রাষ্ট্র কি নাগরিকের কথা শুনছে?

‘শ্রদ্ধা’ ও ‘প্রশ্ন’ চলতে পারে একসঙ্গে। একাত্তরের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর প্রধান উপায় হলো মহান ঘটনাপ্রবাহকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার না করে ঐতিহাসিকভাবে বোঝা। অর্থাৎ তার আলোকে বর্তমানকে বিচার করা। যদি মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য হয়ে থাকে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার, তবে আজ সেই অধিকার সংকুচিত হলে প্রশ্ন তোলাই একাত্তরের প্রতি প্রকৃত সম্মান। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা একটি নিখুঁত রাষ্ট্রের জন্য লড়েননি; তারা লড়েছিলেন সম্ভাবনার জন্য। সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, নাগরিকের প্রশ্ন নয়। একইভাবে চব্বিশের ছাত্র-জনতা ঢাল হয়ে উঠেছিলেন সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে; যা ছিল বৈষম্যের, স্বাধীন মতপ্রকাশের বাধার। একাত্তর আমাদের একটি মানচিত্র দিয়েছে, আর চব্বিশ সেই মানচিত্রের ভেতরে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে। মানচিত্র আর মানুষ—এই দুটোর একটিকে বাদ দিয়ে কি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র সম্ভব?

একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোরে ব্যাপারটি কোনোভাবেই ইতিহাস বোঝার প্রয়াস নয়; এটি ইতিহাস এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। এই বাইনারি একাত্তরের মর্যাদা রক্ষা করে না, বরং তাকে রাজনৈতিক ঢালে পরিণত করে। বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি ধারাবাহিক পাঠ—যেখানে একাত্তর গৌরবের উৎস, আর চব্বিশ আত্মসমালোচনার উপলক্ষ। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে বোঝা যাবে না। তাই একাত্তরের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই অবারিত রাখতে হবে প্রশ্ন করার সুযোগ। ইতিহাসের কোনো 'ফুল স্টপ' নেই, আছে কেবল কমা এবং ধারাবাহিক অগ্রগমন। একাত্তর ও চব্বিশের সেই মেলবন্ধনেই নিহিত আছে আগামীর প্রকৃত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত