ভেনেজুয়েলাসহ বেশ কয়েকটি দেশের জ্বালানি তেলের পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই বলে কি ব্যবসা বন্ধ থাকবে? নিশ্চয় না। ব্যবসায়ীরা এক অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। তারা একটি বিশাল জাহাজের বহরের সঙ্গে তেলবাহী জাহাজ যুক্ত করে দেয়, যেন বোঝা না যায়, কোন জাহাজে করে তেল পরিবহন করা হচ্ছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তারা জাহাজের পতাকাও পরিবর্তন করে থাকে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, গত বছর এ রকম অন্তত ৪০টি জাহাজ পতাকা পরিবর্তন করে রাশিয়ার পতাকা নিয়েছিল এবং ‘ছায়া বহরে’ যুক্ত ছিল।
পতাকা পরিবর্তনের এই বিষয়টিকে বলা হচ্ছে ‘রিফ্ল্যাগিং’ এবং এটি প্রকাশ্যেই করা হয় মূলত মার্কিন আটকের হাত থেকে রুশ জাহাজগুলোকে বাঁচানোর জন্য। আর ‘ছায়া বহর’ হচ্ছে সেইসব জাহাজ, যেগুলো নিষেধাজ্ঞা ও তেলের মূল্যসীমা লঙ্ঘন করে তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের জন্য নানা ধরনের প্রতারণামূলক কৌশল অবলম্বন করে।
শিপিং বিষয়ক গোয়েন্দা প্রকাশনা ‘লয়েডস লিস্ট’ এক বিশ্লেষণে বলেছে, গত মাসে অন্তত ১৭টি সন্দেহভাজন জাহাজ রুশ রেজিস্ট্রিতে যোগ দিয়েছে। গত বছর ছায়া বহরে যোগ দিয়েছিল ১৫টি জাহাজ।
হঠাৎ এ বছর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া এক ঘোষণা। তিনি বলেছেন ভেনেজুয়েলায় আসা-যাওয়া করা তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর ওপর মার্কিন ‘অবরোধ’ আরোপ করা হবে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাশিয়ার অবৈধ তেল বিতরণে জড়িত থাকার অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা একটি জাহাজকে ভুয়া নাম এবং ক্যামেরুনের পতাকা টানিয়ে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে দেখা গেছে। ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ ডিসেম্বর তুরস্কের ইজমিরের কাছে স্টার রিফাইনারি শোধনাগার থেকে রওনা হওয়ার পর এটি রাশিয়ার দিকে যাচ্ছিল।
২০২৪ সালে ছায়া বহরের তালিকায় থাকা ১৮টি জাহাজে রুশ পতাকা টানানো ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কারণে এখন আরও অনেক জাহাজ একই পথে হাঁটছে।
গত সোমবার মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হাতে নাটকীয়ভাবে আটক হয় ‘মেরিনেরা’ নামের একটি ট্যাংকার। এটি ভেনেজুয়েলার তেল বহন করছিল এবং এটি ‘বেলা ১’ নামে পরিচিত ছিল। মার্কিন বাহিনী যেন আটক করতে না পারে, সেজন্য জাহাজটি গায়ানার ভুয়া একটি পতাকা পরিবর্তন করে রাশিয়ার পতাকা ব্যবহার করেছিল। এমনকি জাহাজের গায়ে একটি রাশিয়ার পতাকার ছবিও অদক্ষ হাতে এঁকে দেওয়া হয়েছিল।
তবে এই কৌশল ‘মেরিনেরা’ বা ‘এম/টি সোফিয়া’ কোনোটিকেই রক্ষা করতে পারেনি। এম/টি সোফিয়াকে ‘অবৈধ কার্যক্রম’ পরিচালনার অভিযোগে ক্যারিবীয় অঞ্চলে আটক করে মার্কিন কোস্টগার্ডের প্রহরায় যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড জানিয়েছে, গত বুধবার ক্যারিবীয় সাগরে জাহাজটিকে আটক করা হয়।
এর আগে ডিসেম্বরের শুরুতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলা উপকূলে ‘স্কিপার’ নামের একটি ট্যাংকার আটক করে। ২০২২ সালে ইরানীয় রেভল্যুশনারি গার্ডস এবং হিজবুল্লাহর হয়ে তেল পাচারের অভিযোগে মার্কিন ট্রেজারি এই জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের জ্যেষ্ঠ ঝুঁকি ও কমপ্লায়েন্স বিশ্লেষক ব্রিজেট ডায়াকুন বলেন, ‘অক্টোবর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী রাশিয়া, ইরান এবং ভেনেজুয়েলার হয়ে নিষিদ্ধ পণ্য পরিবহনকারী ১ হাজার ৪২৩টি জাহাজ এই ছায়া বহরে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ভেনেজুয়েলার উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা তেলবাহী জাহাজ ‘দ্য স্কিপার’-এর স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: রয়টার্সব্রিজেট ডায়াকুন বলছেন, ‘এই ছায়া বহরে প্রতি মাসে প্রায় ১০টি করে জাহাজ যুক্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই জাহাজগুলোর রুশ নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার একটি হঠাৎ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, ‘মেরিনেরা’ জাহাজটি আটকের কয়েক দিন আগে রাশিয়া সেটিকে পাহারা দেওয়ার জন্য একটি সাবমেরিন পাঠিয়েছিল এবং ক্রেমলিন এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার জন্য হোয়াইট হাউসকে সতর্কও করেছিল।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ বলছে, রাশিয়ার এই ছায়া বহর প্রতিদিন প্রায় ৩৭ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করে, যা রাশিয়ার সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের ৬৫ শতাংশ। এই বাণিজ্য থেকে রাশিয়ার বার্ষিক আয় হয় প্রায় ৮৭ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার।
বৃহস্পতিবার স্কটল্যান্ডের সেক্রেটারি অব স্টেট ডগলাস আলেকজান্ডার মেরিনেরা জাহাজটি আটকের ঘটনায় যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততাকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, ‘এই জাহাজটি সেই ছায়া বহরের অংশ যা ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ যোগান দিচ্ছে। যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আমি মনে করি, ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য যেকোনো জায়গায় সন্ত্রাসবাদ, সংঘাত ও দুর্দশায় অবৈধভাবে জ্বালানি যোগান বন্ধ করা আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যখন আকাশপথের নজরদারিসহ অপারেশনাল সহায়তা চেয়েছিল, আমরা তাতে সাড়া দিয়েছি।’
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মারুফ ইসলাম