স্ট্রিম ডেস্ক

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঢাকা হয়তো সরাসরি এই জোটে যোগ দেবে না। তবে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আঙ্কারা-ইসলামাবাদের প্রভাব আরও গভীর করতে পারে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে চূড়ান্ত হওয়া এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে ন্যাটোর উত্তর আটলান্টিক চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আদলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা কাঠামো রাখা হয়েছে।
চুক্তির মূল ধারায় বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে পরিচিত এই ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা জোটে সৌদি আরবের বিপুল আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র—এই তিন শক্তিকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরের দুই সপ্তাহে এর প্রভাব পারস্য উপসাগর ও লেভান্ত অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ এই নিরাপত্তা জোটে যোগ দিতে পারে কিংবা এর সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত হতে পারে—এমন জল্পনা দিল্লিতে স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে। কারণ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এখন যদি ঢাকা আঙ্কারা-রিয়াদ-ইসলামাবাদভিত্তিক সামরিক বলয়ের কাছাকাছি চলে যায়, তাহলে ভারতের জন্য তার কৌশলগত অর্থ কী হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা এসএমডিএ দিয়ে।
ওই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর পাকিস্তান সৌদি আরবে ৮ হাজারের বেশি সেনা, জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন এবং চীনে তৈরি এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছিল। এসবের অর্থায়ন পুরোপুরি সৌদি আরব করেছিল।
এবার তুরস্ককে যুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় কাঠামোটি আরও বড় একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা জোটে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে তিন দেশকে মূলত ভিন্ন ভিন্ন সামরিক ও শিল্প সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।
সৌদি আরব হচ্ছে এই কাঠামোর আর্থিক শক্তি। যৌথ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা, গবেষণা এবং অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থ দেবে রিয়াদ। এর বিনিময়ে সৌদি আরব দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে থাকা প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পাবে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অবস্থানের অনিশ্চয়তার সময়ে এটি রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তুরস্ক দিচ্ছে তার উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা। বায়কার আকিঞ্চি চালকবিহীন যুদ্ধবিমান যৌথভাবে তৈরি করার মতো বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং তুরস্কের কেএএএন পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে সৌদি আরবের যুক্ত হওয়ার আলোচনা—এসবের ওপর ভিত্তি করে আঙ্কারা নিয়ে আসছে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, নৌযান নির্মাণের দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের ন্যাটো সদস্য হিসেবে অর্জিত সামরিক অভিজ্ঞতা।
পাকিস্তান দিচ্ছে সামরিক জনবল এবং যুদ্ধক্ষেত্রের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি সামরিক কৌশল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের পারমাণবিক ব্যবস্থার আওতায় সৌদি আরব বা তুরস্ক চলে আসবে—এমন সম্ভাবনা নেই। তবে ইসলামাবাদের প্রচলিত সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে মাঠপর্যায়ে সামরিক উপস্থিতি দিতে পারে।
এর বিনিময়ে পাকিস্তান পাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন রয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামি বিশ্বের রাজনীতিতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে।
এই জোটকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, এর জন্য একটি আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামো থাকবে। এর মধ্যে থাকবে মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি, বিশেষায়িত রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটি এবং সৌদি আরবে স্থায়ী সদর দপ্তরসহ একটি স্থায়ী সাধারণ সচিবালয়।
বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়াও একরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এবং আব্রাহাম চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করেন। রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ দ্রুতই সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
অন্যদিকে ইরান সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, বাইরের কোনো প্রতিরক্ষা জোট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। একই সঙ্গে দেশটি নিজেদের জাতীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও তুলে ধরেছে।
ঢাকায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকারের শাসন সুসংহত হওয়ার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় ঢাকা তার কৌশলগত ও নিরাপত্তা অংশীদারত্বকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক মহলের ভাষায়, আগের বছরগুলোতে ভারতের ওপর যে অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।
একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও উষ্ণতা ফিরেছে। দুই দেশ বাণিজ্য আলোচনা বাড়িয়েছে এবং সরাসরি সমুদ্রপথ ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা (বর্তমানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) হুমায়ুন কবির প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে ঢাকার ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে। তবে সেটি অবশ্যই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
এর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সরকারি সফরে রিয়াদে যাওয়ার জন্য সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ নিয়ে ঢাকায় এসেছেন সৌদি রাষ্ট্রদূত।
সৌদি নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার আগ্রহও বাংলাদেশ দেখিয়েছে। চলতি মাসে সৌদি আরবে গঠিত ১৪ দেশের বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ।
এদিকে তুরস্কের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন একে পার্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইয়েনি শাফাকের মতো প্রকাশনা, মক্কা নিরাপত্তা কাঠামোকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত করার ধারণা সামনে এনেছে।
বাংলাদেশের বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থান এবং সামরিক আধুনিকায়নের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনের কারণে আঙ্কারা বাংলাদেশকে তুরস্কের সামরিক পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং ভারত মহাসাগরে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখছে।
ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর আওতায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনাকে সামনে রেখে তুরস্ক বায়রাকতার ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর করভেটসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক আগ্রহ থাকলেও মক্কা চুক্তির মতো নিঃশর্ত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ সই করবে—এমনটা ধরে নেওয়ার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর পূর্ণ সদস্য হওয়া ঢাকার জন্য বেশ কিছু ঝুঁকি ও কাঠামোগত বাধা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যগত ভিত্তি হলো—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’।
এমন একটি স্পষ্ট সামরিক জোটে যোগ দেওয়া, যেখানে সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে বাংলাদেশকেও যুদ্ধে যেতে হবে। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক টিকে থাকাও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও ট্রানজিট যোগাযোগের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কিংবা ভারতের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক জোটের অংশ হয়ে যাওয়া ঢাকার জন্য অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা বা বাণিজ্যিক বিঘ্ন তৈরি করতে পারে, যা বাংলাদেশ সহজে সামাল দিতে পারবে না।
মিশরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিষয় দেখা গেছে। তুরস্ক দেশটিকে সম্ভাব্য চতুর্দেশীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মিশরের বিদ্যমান নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি এবং নিঃশর্ত যুদ্ধের নিশ্চয়তায় যুক্ত হতে অনাগ্রহের কারণে কায়রো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই পূর্ণাঙ্গ জোটের বদলে বেছে বেছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনাই বেশি।
অর্থাৎ, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণ সদস্য হয়ে যাবে—এমন সম্ভাবনা কম। তবে ত্রিপক্ষীয় জোটটির সঙ্গে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের দিকে ঢাকা এগোতে পারে।
এর মধ্যে থাকতে পারে পর্যবেক্ষক মর্যাদা, যৌথ নৌ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে বড় আকারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা, যার অর্থায়ন বা অর্থনৈতিক সহায়তা সৌদি আরব দিতে পারে।
বাংলাদেশ যদি সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান ত্রয়ীর সঙ্গে আংশিকভাবেও কৌশলগতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়, তাতেও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে বিবেচনা করা হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রধান কৌশলগত মনোযোগ পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণরেখা এবং চীনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার দিকে রাখতে পেরেছে। ঢাকার নিরাপত্তা অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তন হলে এই ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল ভৌগোলিক জায়গাগুলোর একটি হলো শিলিগুড়ি করিডোর। সবচেয়ে সরু অংশে প্রায় ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই ভূখণ্ড মূল ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের যোগাযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হয়, তাহলে ভারতের পূর্ব সীমান্তের কাছে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতার সম্ভাবনা নিয়ে দিল্লিকে নতুন করে ভাবতে হবে।
অতীতে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। এসব গোষ্ঠী বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে আশ্রয় ও রসদ সহায়তা পেয়েছিল।
ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা সহযোগিতা আবার সক্রিয় হলে শিলিগুড়ি করিডোর এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সীমান্তে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
বঙ্গোপসাগর ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নীতি এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অঞ্চলে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নৌ অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে বিশাখাপত্তনমের ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত সামরিক স্থাপনা।
বাংলাদেশ যদি তুরস্কের নৌবাহিনীর জাহাজকে পরিচালনাগত প্রবেশাধিকার, নোঙর করার সুযোগ কিংবা যৌথ প্রশিক্ষণ সুবিধা দেয়, অথবা পাকিস্তানের সামরিক সদস্যদের এ ধরনের সুযোগ দেয়, তাহলে বঙ্গোপসাগর আর ভারতের জন্য তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক পরিসর থাকবে না।
বঙ্গোপসাগরে তুরস্কের উন্নত নৌ প্রযুক্তি, নজরদারি ব্যবস্থা কিংবা ত্রিপক্ষীয় যৌথ নৌ মহড়ার উপস্থিতি ভারতকে তার সামুদ্রিক গোয়েন্দা ও নৌ নজরদারি সক্ষমতার একটি বড় অংশ পূর্ব উপকূলে পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করতে পারে।
মক্কা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে ভাবছেন, কারণ পাকিস্তান তার সঙ্গে ভারতের চলমান নিরাপত্তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ধারাকে কীভাবে ব্যবহার করতে পারে, সেটি একটি প্রশ্ন।
ভারতের ভেতরে যদি পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত কোনো বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী হামলা ঘটে এবং তার জবাবে ভারত পাকিস্তানের ভেতরে কোনো সন্ত্রাসী ঘাঁটি বা হামলার প্রস্তুতিকেন্দ্রে আন্তঃসীমান্ত পাল্টা হামলা চালায়, তাহলে ইসলামাবাদ তাত্ত্বিকভাবে সেটিকে মক্কা চুক্তির আওতায় ‘সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই আশঙ্কা এখনো অনেকটাই অনুমাননির্ভর। সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
রিয়াদ ধারাবাহিকভাবে জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে তার নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করবে না।
৭ আগস্ট চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নয়াদিল্লি গুরুত্ব দেয় এবং রিয়াদ ভারতের ‘স্বার্থ ও সংবেদনশীলতা’ বিবেচনায় রাখবে বলে প্রত্যাশা করে।
পাকিস্তানকে রক্ষা করতে গিয়ে সৌদি আরব ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে—এমনটা অত্যন্ত অসম্ভাব্য। তবে চুক্তির এই ধারা কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এবং ভারতের কৌশলগত হিসাব আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে রাজনৈতিক ইসলাম এবং বৈশ্বিক মুসলিম সম্প্রদায় বা উম্মাহর নেতৃত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আঙ্কারা সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে।
তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে যদি একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ত্রিভুজ তৈরি হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় আঙ্কারার নরম শক্তি ও সামরিক প্রভাব—দুই-ই বাড়তে পারে।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পণ্য এরই মধ্যে এ অঞ্চলে জনপ্রিয়। এর সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ যুক্ত হলে তুরস্কের বাড়তে থাকা উপস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উগ্রতা বাড়াতে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে এবং যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেও পড়তে পারে।
মক্কা চুক্তি এবং সম্ভাব্যভাবে বাংলাদেশকে এর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে চীনের অবস্থান বেশ জটিল।
একদিকে, চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক বিনিয়োগকারী। ঢাকায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উপস্থিতি বাড়লে তা চীনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা সামরিক জোটের প্রভাব কমিয়ে দেয় কিংবা ভারতের কৌশলগত মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়—এমন যেকোনো কাঠামোগত পরিবর্তন বেইজিংয়ের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
পাকিস্তান চীনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার এবং তুরস্কও চীনের শিল্প উপাদানের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে বেইজিং পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে এই ত্রিপক্ষীয় জোটকে কাজে লাগানোর সুযোগ দেখতে পারে।
‘ইসলামিক ন্যাটো’ শব্দটি শিরোনামে যতটা জোরালো, বাস্তব ক্ষেত্রে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে ততটাই প্রশ্ন রয়েছে। কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জোটের ভেতরেই বেশ কিছু বড় ধরনের স্বার্থগত বিরোধ রয়েছে, যা এর কার্যকারিতা সীমিত করতে পারে।
প্রথমত, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়।
সৌদি আরব ও তুরস্ক পশ্চিম এশিয়ায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতায় রয়েছে। সিরিয়া, লিবিয়া এবং রাজনৈতিক ইসলামপন্থী আন্দোলনের ভূমিকা নিয়েও তাদের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। সৌদি আরব তার ভিশন ২০৩০-এর অর্থনৈতিক রূপান্তর বাস্তবায়নের জন্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়। অন্যদিকে এরদোয়ানের তুরস্ক প্রায়ই বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়ানোর কৌশল অনুসরণ করে। আর পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঋণের চাপে থাকা একটি দেশ, যে মূলত আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগের বিনিময়ে সামরিক সক্ষমতা দেওয়ার অবস্থানে রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ন্যাটোর মতো মক্কা চুক্তির কোনো সমন্বিত একক কমান্ড কাঠামো, স্থায়ী যৌথ বাহিনী বা স্বয়ংক্রিয় সমন্বিত প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নেই। ফলে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে দ্রুত ও সমন্বিত সামরিক প্রতিক্রিয়া বাস্তবায়ন করা বাস্তবে কঠিন হবে।
বাংলাদেশের জন্যও তিনটি দূরবর্তী দেশের সঙ্গে একটি কঠোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হওয়া বাস্তব প্রতিরক্ষা চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে খুব বেশি সুবিধা দেবে না। বরং এর মাধ্যমে নতুন ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই ঢাকার জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে একটি বাস্তববাদী কৌশল—সৌদি আরবের আমন্ত্রণ ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সশস্ত্র বাহিনী আধুনিক করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনো বাধ্যতামূলক ত্রিপক্ষীয় সামরিক জোটে সরাসরি যোগ না দেওয়া, যেখানে অন্য দেশের যুদ্ধে বাংলাদেশকেও অংশ নিতে হতে পারে।
(ফার্স্ট পোস্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঢাকা হয়তো সরাসরি এই জোটে যোগ দেবে না। তবে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আঙ্কারা-ইসলামাবাদের প্রভাব আরও গভীর করতে পারে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে চূড়ান্ত হওয়া এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে ন্যাটোর উত্তর আটলান্টিক চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আদলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা কাঠামো রাখা হয়েছে।
চুক্তির মূল ধারায় বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে পরিচিত এই ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা জোটে সৌদি আরবের বিপুল আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র—এই তিন শক্তিকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরের দুই সপ্তাহে এর প্রভাব পারস্য উপসাগর ও লেভান্ত অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ এই নিরাপত্তা জোটে যোগ দিতে পারে কিংবা এর সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত হতে পারে—এমন জল্পনা দিল্লিতে স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে। কারণ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এখন যদি ঢাকা আঙ্কারা-রিয়াদ-ইসলামাবাদভিত্তিক সামরিক বলয়ের কাছাকাছি চলে যায়, তাহলে ভারতের জন্য তার কৌশলগত অর্থ কী হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা এসএমডিএ দিয়ে।
ওই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর পাকিস্তান সৌদি আরবে ৮ হাজারের বেশি সেনা, জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন এবং চীনে তৈরি এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছিল। এসবের অর্থায়ন পুরোপুরি সৌদি আরব করেছিল।
এবার তুরস্ককে যুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় কাঠামোটি আরও বড় একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা জোটে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে তিন দেশকে মূলত ভিন্ন ভিন্ন সামরিক ও শিল্প সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।
সৌদি আরব হচ্ছে এই কাঠামোর আর্থিক শক্তি। যৌথ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা, গবেষণা এবং অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থ দেবে রিয়াদ। এর বিনিময়ে সৌদি আরব দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে থাকা প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পাবে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অবস্থানের অনিশ্চয়তার সময়ে এটি রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তুরস্ক দিচ্ছে তার উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা। বায়কার আকিঞ্চি চালকবিহীন যুদ্ধবিমান যৌথভাবে তৈরি করার মতো বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং তুরস্কের কেএএএন পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে সৌদি আরবের যুক্ত হওয়ার আলোচনা—এসবের ওপর ভিত্তি করে আঙ্কারা নিয়ে আসছে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, নৌযান নির্মাণের দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের ন্যাটো সদস্য হিসেবে অর্জিত সামরিক অভিজ্ঞতা।
পাকিস্তান দিচ্ছে সামরিক জনবল এবং যুদ্ধক্ষেত্রের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি সামরিক কৌশল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের পারমাণবিক ব্যবস্থার আওতায় সৌদি আরব বা তুরস্ক চলে আসবে—এমন সম্ভাবনা নেই। তবে ইসলামাবাদের প্রচলিত সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে মাঠপর্যায়ে সামরিক উপস্থিতি দিতে পারে।
এর বিনিময়ে পাকিস্তান পাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন রয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামি বিশ্বের রাজনীতিতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে।
এই জোটকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, এর জন্য একটি আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামো থাকবে। এর মধ্যে থাকবে মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি, বিশেষায়িত রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটি এবং সৌদি আরবে স্থায়ী সদর দপ্তরসহ একটি স্থায়ী সাধারণ সচিবালয়।
বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়াও একরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এবং আব্রাহাম চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করেন। রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ দ্রুতই সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
অন্যদিকে ইরান সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, বাইরের কোনো প্রতিরক্ষা জোট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। একই সঙ্গে দেশটি নিজেদের জাতীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও তুলে ধরেছে।
ঢাকায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকারের শাসন সুসংহত হওয়ার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় ঢাকা তার কৌশলগত ও নিরাপত্তা অংশীদারত্বকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক মহলের ভাষায়, আগের বছরগুলোতে ভারতের ওপর যে অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।
একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও উষ্ণতা ফিরেছে। দুই দেশ বাণিজ্য আলোচনা বাড়িয়েছে এবং সরাসরি সমুদ্রপথ ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা (বর্তমানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) হুমায়ুন কবির প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে ঢাকার ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে। তবে সেটি অবশ্যই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
এর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সরকারি সফরে রিয়াদে যাওয়ার জন্য সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ নিয়ে ঢাকায় এসেছেন সৌদি রাষ্ট্রদূত।
সৌদি নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার আগ্রহও বাংলাদেশ দেখিয়েছে। চলতি মাসে সৌদি আরবে গঠিত ১৪ দেশের বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ।
এদিকে তুরস্কের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন একে পার্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইয়েনি শাফাকের মতো প্রকাশনা, মক্কা নিরাপত্তা কাঠামোকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত করার ধারণা সামনে এনেছে।
বাংলাদেশের বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থান এবং সামরিক আধুনিকায়নের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনের কারণে আঙ্কারা বাংলাদেশকে তুরস্কের সামরিক পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং ভারত মহাসাগরে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখছে।
ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর আওতায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনাকে সামনে রেখে তুরস্ক বায়রাকতার ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর করভেটসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক আগ্রহ থাকলেও মক্কা চুক্তির মতো নিঃশর্ত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ সই করবে—এমনটা ধরে নেওয়ার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর পূর্ণ সদস্য হওয়া ঢাকার জন্য বেশ কিছু ঝুঁকি ও কাঠামোগত বাধা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যগত ভিত্তি হলো—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’।
এমন একটি স্পষ্ট সামরিক জোটে যোগ দেওয়া, যেখানে সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে বাংলাদেশকেও যুদ্ধে যেতে হবে। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক টিকে থাকাও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও ট্রানজিট যোগাযোগের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কিংবা ভারতের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক জোটের অংশ হয়ে যাওয়া ঢাকার জন্য অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা বা বাণিজ্যিক বিঘ্ন তৈরি করতে পারে, যা বাংলাদেশ সহজে সামাল দিতে পারবে না।
মিশরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিষয় দেখা গেছে। তুরস্ক দেশটিকে সম্ভাব্য চতুর্দেশীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মিশরের বিদ্যমান নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি এবং নিঃশর্ত যুদ্ধের নিশ্চয়তায় যুক্ত হতে অনাগ্রহের কারণে কায়রো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই পূর্ণাঙ্গ জোটের বদলে বেছে বেছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনাই বেশি।
অর্থাৎ, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণ সদস্য হয়ে যাবে—এমন সম্ভাবনা কম। তবে ত্রিপক্ষীয় জোটটির সঙ্গে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের দিকে ঢাকা এগোতে পারে।
এর মধ্যে থাকতে পারে পর্যবেক্ষক মর্যাদা, যৌথ নৌ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে বড় আকারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা, যার অর্থায়ন বা অর্থনৈতিক সহায়তা সৌদি আরব দিতে পারে।
বাংলাদেশ যদি সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান ত্রয়ীর সঙ্গে আংশিকভাবেও কৌশলগতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়, তাতেও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে বিবেচনা করা হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রধান কৌশলগত মনোযোগ পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণরেখা এবং চীনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার দিকে রাখতে পেরেছে। ঢাকার নিরাপত্তা অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তন হলে এই ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল ভৌগোলিক জায়গাগুলোর একটি হলো শিলিগুড়ি করিডোর। সবচেয়ে সরু অংশে প্রায় ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই ভূখণ্ড মূল ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের যোগাযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হয়, তাহলে ভারতের পূর্ব সীমান্তের কাছে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতার সম্ভাবনা নিয়ে দিল্লিকে নতুন করে ভাবতে হবে।
অতীতে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। এসব গোষ্ঠী বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে আশ্রয় ও রসদ সহায়তা পেয়েছিল।
ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা সহযোগিতা আবার সক্রিয় হলে শিলিগুড়ি করিডোর এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সীমান্তে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
বঙ্গোপসাগর ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নীতি এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অঞ্চলে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নৌ অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে বিশাখাপত্তনমের ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত সামরিক স্থাপনা।
বাংলাদেশ যদি তুরস্কের নৌবাহিনীর জাহাজকে পরিচালনাগত প্রবেশাধিকার, নোঙর করার সুযোগ কিংবা যৌথ প্রশিক্ষণ সুবিধা দেয়, অথবা পাকিস্তানের সামরিক সদস্যদের এ ধরনের সুযোগ দেয়, তাহলে বঙ্গোপসাগর আর ভারতের জন্য তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক পরিসর থাকবে না।
বঙ্গোপসাগরে তুরস্কের উন্নত নৌ প্রযুক্তি, নজরদারি ব্যবস্থা কিংবা ত্রিপক্ষীয় যৌথ নৌ মহড়ার উপস্থিতি ভারতকে তার সামুদ্রিক গোয়েন্দা ও নৌ নজরদারি সক্ষমতার একটি বড় অংশ পূর্ব উপকূলে পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করতে পারে।
মক্কা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে ভাবছেন, কারণ পাকিস্তান তার সঙ্গে ভারতের চলমান নিরাপত্তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ধারাকে কীভাবে ব্যবহার করতে পারে, সেটি একটি প্রশ্ন।
ভারতের ভেতরে যদি পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত কোনো বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী হামলা ঘটে এবং তার জবাবে ভারত পাকিস্তানের ভেতরে কোনো সন্ত্রাসী ঘাঁটি বা হামলার প্রস্তুতিকেন্দ্রে আন্তঃসীমান্ত পাল্টা হামলা চালায়, তাহলে ইসলামাবাদ তাত্ত্বিকভাবে সেটিকে মক্কা চুক্তির আওতায় ‘সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই আশঙ্কা এখনো অনেকটাই অনুমাননির্ভর। সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
রিয়াদ ধারাবাহিকভাবে জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে তার নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করবে না।
৭ আগস্ট চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নয়াদিল্লি গুরুত্ব দেয় এবং রিয়াদ ভারতের ‘স্বার্থ ও সংবেদনশীলতা’ বিবেচনায় রাখবে বলে প্রত্যাশা করে।
পাকিস্তানকে রক্ষা করতে গিয়ে সৌদি আরব ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে—এমনটা অত্যন্ত অসম্ভাব্য। তবে চুক্তির এই ধারা কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এবং ভারতের কৌশলগত হিসাব আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে রাজনৈতিক ইসলাম এবং বৈশ্বিক মুসলিম সম্প্রদায় বা উম্মাহর নেতৃত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আঙ্কারা সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে।
তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে যদি একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ত্রিভুজ তৈরি হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় আঙ্কারার নরম শক্তি ও সামরিক প্রভাব—দুই-ই বাড়তে পারে।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পণ্য এরই মধ্যে এ অঞ্চলে জনপ্রিয়। এর সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ যুক্ত হলে তুরস্কের বাড়তে থাকা উপস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উগ্রতা বাড়াতে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে এবং যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেও পড়তে পারে।
মক্কা চুক্তি এবং সম্ভাব্যভাবে বাংলাদেশকে এর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে চীনের অবস্থান বেশ জটিল।
একদিকে, চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক বিনিয়োগকারী। ঢাকায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উপস্থিতি বাড়লে তা চীনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা সামরিক জোটের প্রভাব কমিয়ে দেয় কিংবা ভারতের কৌশলগত মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়—এমন যেকোনো কাঠামোগত পরিবর্তন বেইজিংয়ের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
পাকিস্তান চীনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার এবং তুরস্কও চীনের শিল্প উপাদানের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে বেইজিং পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে এই ত্রিপক্ষীয় জোটকে কাজে লাগানোর সুযোগ দেখতে পারে।
‘ইসলামিক ন্যাটো’ শব্দটি শিরোনামে যতটা জোরালো, বাস্তব ক্ষেত্রে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে ততটাই প্রশ্ন রয়েছে। কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জোটের ভেতরেই বেশ কিছু বড় ধরনের স্বার্থগত বিরোধ রয়েছে, যা এর কার্যকারিতা সীমিত করতে পারে।
প্রথমত, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়।
সৌদি আরব ও তুরস্ক পশ্চিম এশিয়ায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতায় রয়েছে। সিরিয়া, লিবিয়া এবং রাজনৈতিক ইসলামপন্থী আন্দোলনের ভূমিকা নিয়েও তাদের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। সৌদি আরব তার ভিশন ২০৩০-এর অর্থনৈতিক রূপান্তর বাস্তবায়নের জন্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়। অন্যদিকে এরদোয়ানের তুরস্ক প্রায়ই বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়ানোর কৌশল অনুসরণ করে। আর পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঋণের চাপে থাকা একটি দেশ, যে মূলত আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগের বিনিময়ে সামরিক সক্ষমতা দেওয়ার অবস্থানে রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ন্যাটোর মতো মক্কা চুক্তির কোনো সমন্বিত একক কমান্ড কাঠামো, স্থায়ী যৌথ বাহিনী বা স্বয়ংক্রিয় সমন্বিত প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নেই। ফলে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে দ্রুত ও সমন্বিত সামরিক প্রতিক্রিয়া বাস্তবায়ন করা বাস্তবে কঠিন হবে।
বাংলাদেশের জন্যও তিনটি দূরবর্তী দেশের সঙ্গে একটি কঠোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হওয়া বাস্তব প্রতিরক্ষা চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে খুব বেশি সুবিধা দেবে না। বরং এর মাধ্যমে নতুন ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই ঢাকার জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে একটি বাস্তববাদী কৌশল—সৌদি আরবের আমন্ত্রণ ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সশস্ত্র বাহিনী আধুনিক করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনো বাধ্যতামূলক ত্রিপক্ষীয় সামরিক জোটে সরাসরি যোগ না দেওয়া, যেখানে অন্য দেশের যুদ্ধে বাংলাদেশকেও অংশ নিতে হতে পারে।
(ফার্স্ট পোস্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)
.png)

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত নতুন সামরিক চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ। চুক্তিটিকে অনেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত এই সামরিক চুক্তিটি গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের
৪ ঘণ্টা আগে
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা যেকোনো দেশকে কঠোর শাস্তির হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিন (ইকোনমিক ডি-ডে) ঘোষণা করেছেন তিনি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের দুই বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টিতে ট্রাম্পের ক্ষমতা সী
২১ আগস্ট ২০২৬
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকেন রাষ্ট্রপতি। সংবিধান অনুযায়ী তিনিই রাষ্ট্রের প্রধান। অনেকেই মনে করেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বড় একটি অংশই রাষ্ট্রপতির হাতে। কিন্তু সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় চিত্রটি ভিন্ন। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। ফলে
২০ আগস্ট ২০২৬
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভূরাজনৈতিক অভিঘাত আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের প্রচলিত কাঠামোকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। রাশিয়াসহ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলো এবং তাদের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ডলারের বিকল্পে অর্থ পরিশোধের পথ খুঁজতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো
২০ আগস্ট ২০২৬