ড. মো. আবু সালেহ

ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিতে যে কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য তার নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন ইতিহাস, সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং ভূ-কৌশলগত স্বার্থের নিরিখে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ অভিন্ন স্থলসীমান্ত পরিবেষ্টিত এই অঞ্চলে উভয় দেশের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকটাই একে অপরের নীতি ও পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা পরিবর্তনের ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে এক ধরনের গুণগত ও কৌশলগত রূপান্তর বা 'প্যারাডাইম শিফট' লক্ষ্য করা যায়। ক্ষমতার পরিবর্তন, জনগণের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং নতুন পররাষ্ট্রনীতির আগমন এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে এক জটিল ও সংবেদনশীল মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে বাণিজ্য, ট্রানজিট ও অর্থনৈতিক সংযোগের অসীম সম্ভাবনা, অন্যদিকে সার্বভৌম মর্যাদা, সীমান্ত ইস্যু, নদীর পানি বণ্টনের মতো দ্বিপাক্ষিক অমীমাংসিত বিষয়গুলো এই সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে ভারতের কূটনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা এই সম্পর্কের ঐতিহাসিক সূচনা করে। প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরালো বিশ্বজনমত গঠন এবং পরিশেষে যৌথ বাহিনীর প্রত্যক্ষ সামরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে তৎকালীন ভারতীয় নেতৃত্ব ও জনগণ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ঐতিহাসিক অবদান রাখে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়কালে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি 'ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, শান্তি ও সহযোগিতা চুক্তি' ছিল স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দুই দেশের নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
তবে প্রারম্ভিক এই উষ্ণতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর মুখোমুখি হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সীমান্তে ছিটমহল ও অপদখলীয় জমির আইনি সমস্যা এবং সীমান্ত চিহ্নিতকরণ দশক ধরে ঝুলে থাকে। তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে ভারতের আঞ্চলিক ভূমিকার কারণে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। একইসঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন ইস্যুটি দীর্ঘকাল ধরে উভয় দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর গঙ্গার পানি বণ্টন কেন্দ্রিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও নদী অববাহিকায় গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার এক নতুন ধারা সূচিত হলেও তিস্তাসহ অন্যান্য ৫৪টি অভিন্ন নদীর ন্যায্য পানি বণ্টনের বিষয়টি অধরাই থেকে যায়।
তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিকভাবে কাঠামোগত বৈষম্য ও অসন্তোষের উপস্থিতি ছিল। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ট্রানজিট সুবিধার দাবি এবং অন্যদিকে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধার কারণে সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের ভারসাম্যহীনতার অনুভূতি। সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও বিএসএফ কর্তৃক বেসামরিক নাগরিক হত্যা উভয় দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘকাল ধরেই একটি অন্যতম নেতিবাচক প্রভাবক হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল। ফলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক সুসম্পর্কের আবেগীয় ভিত্তির পাশাপাশি সীমান্ত, বাণিজ্য ও নদীর পানি বণ্টনের মতো ইস্যুগুলো শুরু থেকেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক নীতির প্রধান পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব গতিশীলতার সূচনা হয়। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক বোঝাপড়া ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব এই সম্পর্ককে একটি বিশেষ মাত্রায় উন্নীত করে।
শেখ হাসিনা সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বড় সাফল্য ছিল। দীর্ঘ চার দশকের অচলাবস্থা অবসান ঘটিয়ে ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থিত হয়। এর মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময় ঘটে এবং কয়েক হাজার মানুষ তাদের নাগরিক পরিচয় ফিরে পান। বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে প্রবেশের জন্য চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা, নৌ-ট্রানজিট, রেল সংযোগ পুনরুজ্জীবিত করা এবং সড়ক পথের ব্যবহার অনুমোদন করে। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিবহণ ব্যয় ও সময় বহুলাংশে কমে আসে। ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সুবিধাসহ উভয় দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
তবে এই বহুমাত্রিক সহযোগিতার আড়ালে বাংলাদেশে ভারতের নীতি ও ভূমিকা নিয়ে তীব্র জনঅসন্তোষ ও ক্ষোভ জমা হতে থাকে। এই সম্পর্ক ছিল অনেকটাই একপাক্ষিক ও সরকার-কেন্দ্রিক, যা রাষ্ট্রীয় বা জনবান্ধব রূপ নিতে ব্যর্থ হয়। নিরাপত্তা ও সংযোগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতকে ব্যাপক সুবিধা দিলেও দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকে তিস্তা নদী পানি বণ্টন চুক্তি। গঙ্গার পর আর কোনো বড় নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক ও পরিবেশগত অসন্তোষ তৈরি হয়।
ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের সীমান্তে বেসামরিক নাগরিক হত্যা অব্যাহত থাকা সম্পর্কটির ওপর নেতিবাচক ছায়া ফেলে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়কালে বহু নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে প্রাণ হারান, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাণিজ্য পরিধি বাড়লেও ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর বিদ্যমান অ-শুল্ক ও আধা-শুল্ক বাধাগুলো দূরীকরণে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলের ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনগুলোতে ভারত সরকারের অন্ধ কূটনৈতিক সমর্থন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার নীতি সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দেয়। ফলে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের সম্পর্কের কাঠামোগত দুর্বলতা ফুটিয়ে তোলে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক অভূতপূর্ব ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও একমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য এই আকস্মিক পরিবর্তন ছিল একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ধাক্কা। শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং ভারতে আশ্রয় গ্রহণের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের ইতি ঘটে এবং একইসঙ্গে উভয় রাষ্ট্রের সম্পর্ক এক চরম অনিশ্চয়তা ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের মুখে পড়ে।
এই গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে দৃশ্যমান স্থবিরতা ও গভীর টানাপোড়েন তৈরি হয়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনকে ভারতের মিডিয়া ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারতের অতীত ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে উভয় দেশের সরকার পর্যায়ে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগে অস্বস্তি ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সাময়িকভাবে থমকে যায়।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান এবং পরবর্তীতে ভারতের মাটিতে অবস্থানকালে বিভিন্ন মাধ্যমে তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও অডিও বার্তা প্রকাশ পাওয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় যে, ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক অপপ্রচার বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ অতিপ্রাকৃতিক ও একপেশেভাবে তুলে ধরার অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগের জবাবে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয় যে, সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকার এবং এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক চাপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিকাশের পরিপন্থী।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলের 'ভারত-কেন্দ্রিক' একক নীতির বিপরীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশকে অন্যান্য পরাশক্তি ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের (যেমন- চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলো) সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার পথে নিয়ে যায়। এর ফলে ভারত উপলব্ধি করতে বাধ্য হয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের ওপর নির্ভর করার পুরোনো নীতি আর কার্যকর নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের রাষ্ট্রীয় ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোগুলোকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে। পারস্পরিক নির্ভরতার গুরুত্ব স্বীকার করলেও, বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দেয় যে যেকোনো ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হতে হবে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, সমতা এবং জনআকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করে। নির্বাচনি ফলাফলের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিজয়ী নেতৃত্বকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। এই আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে ভারত স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং কোনো নির্দিষ্ট দলের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরটি দুই দেশের মধ্যকার স্থবিরতা দূর করা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এই বহুল প্রতীক্ষিত সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক স্তরে নতুন শর্ত ও জটিলতার সৃষ্টি হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ১৬ আগস্ট ২০২৬ এর সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেন। মুখপাত্র জানান যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লি কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। তবে বাংলাদেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, একটি ফলপ্রসূ ও সম্মানজনক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের জন্য আগে সফরের উপযুক্ত এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট জানায় যে, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করার ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশ ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে শেখ হাসিনা এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া অন্যান্য পলাতক আসামিদের দ্রুত হস্তান্তরের জোর দাবি জানিয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আলোকেই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের অবিলম্বে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারতের প্রতি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি তুলে ধরা হয়। স্পষ্ট করা হয় যে, প্রতিবেশী ভারত সহ যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সার্বভৌমত্ব, সমতা, জাতীয় মর্যাদা এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে 'ব্যালেন্স ফার্স্ট' বা ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটে এটি পরিষ্কার হয় যে, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক দ্বিপাক্ষিক সফরটি আপাততঃ বিলম্বিত হচ্ছে বা থমকে গিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থান ও প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইনি এবং কৌশলগত অনীহা নয়াদিল্লির জন্য যেমন কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তেমনি বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য জাতীয় সম্মান ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কঠোর অবস্থান মেনে চলা ব্যতিরেখে আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরটি কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক আদান-প্রদান নয়, বরং উভয় দেশের জন্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক কৌশলগত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
এই সফর বিলম্বিত হওয়ায় এবং উচ্চপর্যায়ের আলোচনা স্থগিত থাকলে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনার মতো বহুল প্রতীক্ষিত ও জটিল বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি দীর্ঘায়িত হতে পারে। তবে ঢাকা থেকে একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব সমতা, সার্বভৌম মর্যাদা এবং অভ্যন্তরীণ জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে এটি প্রমাণ করে যে, কেবল সৌজন্যমূলক বৈঠকের চেয়ে দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোর সমাধান এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন নিরসনে উভয় দেশকেই কৌশলগত বাস্তববাদ ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিতে হবে। ঐতিহাসিক সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং দ্বিপাক্ষিক মৈত্রীকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে:
যেকোনো টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে ভারতের উচিত সকল পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা। একইসঙ্গে বাংলাদেশেরও উচিত প্রতিবেশী দেশের কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ভারত অতীতে যেভাবে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতো, সেই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে 'সরকার-থেকে-সরকার' বা 'দল-থেকে-দল' কাঠামোর পরিবর্তে 'রাষ্ট্র-থেকে-রাষ্ট্র' এবং 'জনগণ-থেকে-জনগণ' পর্যায়ে রূপান্তরিত করতে হবে। সহজ ভিসা প্রক্রিয়া, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করা সম্ভব।
কেবল নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পর্ক পরিচালনা না করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অ-শুল্ক বাধা দূর করা, সীমান্ত বাণিজ্য বাড়ানো এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনে ন্যায়সঙ্গত ও বৈজ্ঞানিক সমাধান (যেমন- অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা) নিশ্চিত করার মাধ্যমে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে আবেগীয় অবস্থান না নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কাঠামোর মধ্যে থেকে স্বচ্ছ সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। এতে করে বিচারিক ন্যায়বিচার যেমন সুনিশ্চিত হবে, তেমনই পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতাও দূর হবে।
বাংলাদেশের 'ব্যালেন্স ফার্স্ট' পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতের 'নেইবারহুড ফার্স্ট' নীতির বাস্তবমুখী প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই ভূ-রাজনৈতিক বাধাগুলো দূর করা সম্ভব, যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন পথ উন্মোচন করবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ঐতিহাসিক গতিপথ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি এক বৈচিত্র্যময় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পারস্পরিক সংহতি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ভৌগোলিক, নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ প্রতিটি অধ্যায়ই এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা ও সংবেদনশীলতাকে প্রতিফলিত করে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক রূপান্তর এই সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক মোড় বা 'প্যারাডাইম শিফট' ঘটিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের প্রচলিত একমুখী নীতিকে ভেঙে দিয়ে একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে 'ব্যালেন্স ফার্স্ট' পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌম মর্যাদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ যেভাবে নিজের অবস্থান পুনঃনির্ধারণ করতে চাচ্ছে, একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের উচিত তাকে স্বাগত জানানো।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার স্থায়ী শান্তি, ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে উভয় দেশের জন্যই বিচ্ছিন্ন থাকা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এক টেবিলে আলোচনায় বসলে বিবাদমান অনেক সমস্যারই ইতিবাচক সমাধান সম্ভব। ভারত ও বাংলাদেশকে উপলব্ধি করতে হবে যে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরতা নয় বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্রে রেখে গঠিত রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের মাধ্যমেই কেবল বিদ্যমান অচলাবস্থা দূর করা সম্ভব। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে উভয় দেশ যদি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও 'উইন-উইন' মডেল গ্রহণ করে, তবেই বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন ও টেকসই গতিপথে এগিয়ে যাবে।

ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিতে যে কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য তার নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন ইতিহাস, সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং ভূ-কৌশলগত স্বার্থের নিরিখে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ অভিন্ন স্থলসীমান্ত পরিবেষ্টিত এই অঞ্চলে উভয় দেশের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকটাই একে অপরের নীতি ও পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা পরিবর্তনের ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে এক ধরনের গুণগত ও কৌশলগত রূপান্তর বা 'প্যারাডাইম শিফট' লক্ষ্য করা যায়। ক্ষমতার পরিবর্তন, জনগণের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং নতুন পররাষ্ট্রনীতির আগমন এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে এক জটিল ও সংবেদনশীল মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে বাণিজ্য, ট্রানজিট ও অর্থনৈতিক সংযোগের অসীম সম্ভাবনা, অন্যদিকে সার্বভৌম মর্যাদা, সীমান্ত ইস্যু, নদীর পানি বণ্টনের মতো দ্বিপাক্ষিক অমীমাংসিত বিষয়গুলো এই সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে ভারতের কূটনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা এই সম্পর্কের ঐতিহাসিক সূচনা করে। প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরালো বিশ্বজনমত গঠন এবং পরিশেষে যৌথ বাহিনীর প্রত্যক্ষ সামরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে তৎকালীন ভারতীয় নেতৃত্ব ও জনগণ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ঐতিহাসিক অবদান রাখে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়কালে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি 'ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, শান্তি ও সহযোগিতা চুক্তি' ছিল স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দুই দেশের নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
তবে প্রারম্ভিক এই উষ্ণতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর মুখোমুখি হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সীমান্তে ছিটমহল ও অপদখলীয় জমির আইনি সমস্যা এবং সীমান্ত চিহ্নিতকরণ দশক ধরে ঝুলে থাকে। তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে ভারতের আঞ্চলিক ভূমিকার কারণে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। একইসঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন ইস্যুটি দীর্ঘকাল ধরে উভয় দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর গঙ্গার পানি বণ্টন কেন্দ্রিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও নদী অববাহিকায় গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার এক নতুন ধারা সূচিত হলেও তিস্তাসহ অন্যান্য ৫৪টি অভিন্ন নদীর ন্যায্য পানি বণ্টনের বিষয়টি অধরাই থেকে যায়।
তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিকভাবে কাঠামোগত বৈষম্য ও অসন্তোষের উপস্থিতি ছিল। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ট্রানজিট সুবিধার দাবি এবং অন্যদিকে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধার কারণে সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের ভারসাম্যহীনতার অনুভূতি। সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও বিএসএফ কর্তৃক বেসামরিক নাগরিক হত্যা উভয় দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘকাল ধরেই একটি অন্যতম নেতিবাচক প্রভাবক হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল। ফলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক সুসম্পর্কের আবেগীয় ভিত্তির পাশাপাশি সীমান্ত, বাণিজ্য ও নদীর পানি বণ্টনের মতো ইস্যুগুলো শুরু থেকেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক নীতির প্রধান পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব গতিশীলতার সূচনা হয়। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক বোঝাপড়া ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব এই সম্পর্ককে একটি বিশেষ মাত্রায় উন্নীত করে।
শেখ হাসিনা সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বড় সাফল্য ছিল। দীর্ঘ চার দশকের অচলাবস্থা অবসান ঘটিয়ে ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থিত হয়। এর মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময় ঘটে এবং কয়েক হাজার মানুষ তাদের নাগরিক পরিচয় ফিরে পান। বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে প্রবেশের জন্য চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা, নৌ-ট্রানজিট, রেল সংযোগ পুনরুজ্জীবিত করা এবং সড়ক পথের ব্যবহার অনুমোদন করে। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিবহণ ব্যয় ও সময় বহুলাংশে কমে আসে। ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সুবিধাসহ উভয় দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
তবে এই বহুমাত্রিক সহযোগিতার আড়ালে বাংলাদেশে ভারতের নীতি ও ভূমিকা নিয়ে তীব্র জনঅসন্তোষ ও ক্ষোভ জমা হতে থাকে। এই সম্পর্ক ছিল অনেকটাই একপাক্ষিক ও সরকার-কেন্দ্রিক, যা রাষ্ট্রীয় বা জনবান্ধব রূপ নিতে ব্যর্থ হয়। নিরাপত্তা ও সংযোগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতকে ব্যাপক সুবিধা দিলেও দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকে তিস্তা নদী পানি বণ্টন চুক্তি। গঙ্গার পর আর কোনো বড় নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক ও পরিবেশগত অসন্তোষ তৈরি হয়।
ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের সীমান্তে বেসামরিক নাগরিক হত্যা অব্যাহত থাকা সম্পর্কটির ওপর নেতিবাচক ছায়া ফেলে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়কালে বহু নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে প্রাণ হারান, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাণিজ্য পরিধি বাড়লেও ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর বিদ্যমান অ-শুল্ক ও আধা-শুল্ক বাধাগুলো দূরীকরণে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলের ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনগুলোতে ভারত সরকারের অন্ধ কূটনৈতিক সমর্থন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার নীতি সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দেয়। ফলে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের সম্পর্কের কাঠামোগত দুর্বলতা ফুটিয়ে তোলে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক অভূতপূর্ব ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও একমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য এই আকস্মিক পরিবর্তন ছিল একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ধাক্কা। শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং ভারতে আশ্রয় গ্রহণের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের ইতি ঘটে এবং একইসঙ্গে উভয় রাষ্ট্রের সম্পর্ক এক চরম অনিশ্চয়তা ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের মুখে পড়ে।
এই গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে দৃশ্যমান স্থবিরতা ও গভীর টানাপোড়েন তৈরি হয়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনকে ভারতের মিডিয়া ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারতের অতীত ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে উভয় দেশের সরকার পর্যায়ে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগে অস্বস্তি ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সাময়িকভাবে থমকে যায়।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান এবং পরবর্তীতে ভারতের মাটিতে অবস্থানকালে বিভিন্ন মাধ্যমে তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও অডিও বার্তা প্রকাশ পাওয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় যে, ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক অপপ্রচার বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ অতিপ্রাকৃতিক ও একপেশেভাবে তুলে ধরার অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগের জবাবে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয় যে, সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকার এবং এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক চাপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিকাশের পরিপন্থী।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলের 'ভারত-কেন্দ্রিক' একক নীতির বিপরীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশকে অন্যান্য পরাশক্তি ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের (যেমন- চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলো) সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার পথে নিয়ে যায়। এর ফলে ভারত উপলব্ধি করতে বাধ্য হয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের ওপর নির্ভর করার পুরোনো নীতি আর কার্যকর নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের রাষ্ট্রীয় ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোগুলোকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে। পারস্পরিক নির্ভরতার গুরুত্ব স্বীকার করলেও, বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দেয় যে যেকোনো ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হতে হবে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, সমতা এবং জনআকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করে। নির্বাচনি ফলাফলের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিজয়ী নেতৃত্বকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। এই আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে ভারত স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং কোনো নির্দিষ্ট দলের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরটি দুই দেশের মধ্যকার স্থবিরতা দূর করা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এই বহুল প্রতীক্ষিত সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক স্তরে নতুন শর্ত ও জটিলতার সৃষ্টি হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ১৬ আগস্ট ২০২৬ এর সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেন। মুখপাত্র জানান যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লি কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। তবে বাংলাদেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, একটি ফলপ্রসূ ও সম্মানজনক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের জন্য আগে সফরের উপযুক্ত এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট জানায় যে, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করার ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশ ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে শেখ হাসিনা এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া অন্যান্য পলাতক আসামিদের দ্রুত হস্তান্তরের জোর দাবি জানিয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আলোকেই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের অবিলম্বে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারতের প্রতি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি তুলে ধরা হয়। স্পষ্ট করা হয় যে, প্রতিবেশী ভারত সহ যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সার্বভৌমত্ব, সমতা, জাতীয় মর্যাদা এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে 'ব্যালেন্স ফার্স্ট' বা ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটে এটি পরিষ্কার হয় যে, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক দ্বিপাক্ষিক সফরটি আপাততঃ বিলম্বিত হচ্ছে বা থমকে গিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থান ও প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইনি এবং কৌশলগত অনীহা নয়াদিল্লির জন্য যেমন কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তেমনি বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য জাতীয় সম্মান ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কঠোর অবস্থান মেনে চলা ব্যতিরেখে আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরটি কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক আদান-প্রদান নয়, বরং উভয় দেশের জন্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক কৌশলগত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
এই সফর বিলম্বিত হওয়ায় এবং উচ্চপর্যায়ের আলোচনা স্থগিত থাকলে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনার মতো বহুল প্রতীক্ষিত ও জটিল বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি দীর্ঘায়িত হতে পারে। তবে ঢাকা থেকে একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব সমতা, সার্বভৌম মর্যাদা এবং অভ্যন্তরীণ জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে এটি প্রমাণ করে যে, কেবল সৌজন্যমূলক বৈঠকের চেয়ে দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোর সমাধান এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন নিরসনে উভয় দেশকেই কৌশলগত বাস্তববাদ ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিতে হবে। ঐতিহাসিক সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং দ্বিপাক্ষিক মৈত্রীকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে:
যেকোনো টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে ভারতের উচিত সকল পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা। একইসঙ্গে বাংলাদেশেরও উচিত প্রতিবেশী দেশের কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ভারত অতীতে যেভাবে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতো, সেই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে 'সরকার-থেকে-সরকার' বা 'দল-থেকে-দল' কাঠামোর পরিবর্তে 'রাষ্ট্র-থেকে-রাষ্ট্র' এবং 'জনগণ-থেকে-জনগণ' পর্যায়ে রূপান্তরিত করতে হবে। সহজ ভিসা প্রক্রিয়া, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করা সম্ভব।
কেবল নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পর্ক পরিচালনা না করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অ-শুল্ক বাধা দূর করা, সীমান্ত বাণিজ্য বাড়ানো এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনে ন্যায়সঙ্গত ও বৈজ্ঞানিক সমাধান (যেমন- অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা) নিশ্চিত করার মাধ্যমে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে আবেগীয় অবস্থান না নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কাঠামোর মধ্যে থেকে স্বচ্ছ সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। এতে করে বিচারিক ন্যায়বিচার যেমন সুনিশ্চিত হবে, তেমনই পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতাও দূর হবে।
বাংলাদেশের 'ব্যালেন্স ফার্স্ট' পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতের 'নেইবারহুড ফার্স্ট' নীতির বাস্তবমুখী প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই ভূ-রাজনৈতিক বাধাগুলো দূর করা সম্ভব, যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন পথ উন্মোচন করবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ঐতিহাসিক গতিপথ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি এক বৈচিত্র্যময় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পারস্পরিক সংহতি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ভৌগোলিক, নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ প্রতিটি অধ্যায়ই এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা ও সংবেদনশীলতাকে প্রতিফলিত করে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক রূপান্তর এই সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক মোড় বা 'প্যারাডাইম শিফট' ঘটিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের প্রচলিত একমুখী নীতিকে ভেঙে দিয়ে একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে 'ব্যালেন্স ফার্স্ট' পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌম মর্যাদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ যেভাবে নিজের অবস্থান পুনঃনির্ধারণ করতে চাচ্ছে, একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের উচিত তাকে স্বাগত জানানো।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার স্থায়ী শান্তি, ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে উভয় দেশের জন্যই বিচ্ছিন্ন থাকা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এক টেবিলে আলোচনায় বসলে বিবাদমান অনেক সমস্যারই ইতিবাচক সমাধান সম্ভব। ভারত ও বাংলাদেশকে উপলব্ধি করতে হবে যে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরতা নয় বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্রে রেখে গঠিত রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের মাধ্যমেই কেবল বিদ্যমান অচলাবস্থা দূর করা সম্ভব। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে উভয় দেশ যদি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও 'উইন-উইন' মডেল গ্রহণ করে, তবেই বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন ও টেকসই গতিপথে এগিয়ে যাবে।
.png)

সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও একটি ছোট রাষ্ট্র তার ভূ-কৌশলগত অবস্থান, অর্থনীতি, মানবসম্পদ ও বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর, ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশাল বাজার হলো প্রধান কৌশলগত সম্পদ।
৪ ঘণ্টা আগে
জনাব মির্জা ফখরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত ছবি আছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, পুলিশ তাকে প্রিজন ভ্যানে উঠাচ্ছে আর তিনি হাত উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য। বর্তমানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে, বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে । আরো আশার বাণী, জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশে