ডলারের বিকল্পে রুপি-রুবল: রাশিয়ার প্রস্তাবে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ নাকি ঝুঁকি

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৩: ২৪
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভূরাজনৈতিক অভিঘাত আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের প্রচলিত কাঠামোকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। রাশিয়াসহ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলো এবং তাদের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ডলারের বিকল্পে অর্থ পরিশোধের পথ খুঁজতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো—রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও ঋণের দায় ভারতীয় রুপিতে নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে।

দীর্ঘদিনের একটি আর্থিক অচলাবস্থা থেকেই এই ত্রিপক্ষীয় প্রস্তাবের উদ্ভব। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ ব্যাংকগুলো সুইফট মেসেজিং নেটওয়ার্ক থেকে বাদ পড়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি জটিল সিদ্ধান্তের বিষয়। এর আগে ২০২৩ সালে ভারতের সঙ্গে আংশিকভাবে রুপিতে লেনদেন শুরু করে বাংলাদেশ।

একদিকে, প্রস্তাবটি আটকে থাকা ঋণের অর্থ পরিশোধের পথ খুলে দেওয়া ও কম দামে কৃষি উপকরণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং ডলারের রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে পারে। অন্যদিকে, এটি বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তৈরি হতে পারে মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জটিলতা এবং রুপির দামের ওঠানামার কারণে বাড়তি অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

সামষ্টিক অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: রূপপুর নিয়ে অচলাবস্থা

মস্কোর এই প্রস্তাবের পটভূমি হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া কাঠামোগত আর্থিক জটিলতা। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারই রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণ। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে ২০২২ সালে রাশিয়ার বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ঢাকা ও মস্কোর মধ্যে সরাসরি রাষ্ট্রীয় ঋণের কিস্তি পরিশোধ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন না করে ঋণ পরিশোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা চালু করে। এর আওতায় বাংলাদেশ সরকার রূপপুর ঋণের জমা হওয়া কিস্তিগুলো ঢাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার নামে খোলা একটি বিশেষ এসক্রো হিসাবে জমা করছে। রাশিয়ার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার এখনো ঢাকায় আটকে আছে। সোনালী ব্যাংক রুশ ব্যাংকে অর্থ পাঠাতে গেলে সুইফট-এর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থায় সতর্কসংকেত এবং সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রাশিয়াও ঢাকায় জমা থাকা এসব অর্থ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো প্রকল্পে পুনর্বিনিয়োগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পরিবর্তে তারা বাংলাদেশের বাইরে অর্থ নিষ্পত্তির একটি ব্যবস্থা চেয়েছে।

কিন্তু ডলারের প্রচলিত ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর আগের উদ্যোগগুলোও ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৩ সালে মস্কো ও ঢাকা চীনা ইউয়ান বা রেনমিনবিতেও রূপপুরের ঋণ পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। তবে চীন ও বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তাপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলো লেনদেনটি সম্পন্ন করতে রাজি হয়নি। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে এবং বৈশ্বিক ডলার নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় তাদের প্রবেশাধিকার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। পরে রুশ রুবল ব্যবহার কিংবা বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে রাশিয়ার সিস্টেম ফর ট্রান্সফার অব ফিনান্সিয়াল মেসেজের (এসপিএফএস) সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাবও এগোয়নি।

রাশিয়ার প্রস্তাবের বিশ্লেষণ: কাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা

রাশিয়া যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার মূল ভিত্তি তিনটি। প্রথমত, তারা বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ ভারতীয় রুপিতে পরিশোধের পক্ষে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বাইরে আর্থিক যোগাযোগের জন্য একটি পৃথক পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তুলতে চায়। তৃতীয়ত, ঢাকায় একটি বড় রুশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনাকারী শাখা খোলার অনুমোদনের পুরোনো অনুরোধটি আবার সামনে এনেছে।

এই প্রস্তাবের কার্যপদ্ধতি সরাসরি ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিমা দেশগুলোর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞার পর ভারত কম দামে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনার পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এসব লেনদেনের অর্থ পরিশোধ করা হয় মূলত রুপিতে। ফলে রুশ জ্বালানি রপ্তানিকারকদের হাতে ভারতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে স্পেশাল রুপি ভসট্রো অ্যাকাউন্টসে (এসআরভিএ) বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ রুপি জমা হয়েছে। কিন্তু এসব রুপি ডলারে রূপান্তর করে মস্কোয় ফেরত পাঠানো যায় না। এগুলো কেবল ভারতীয় সরকারি সিকিউরিটিজে পুনর্বিনিয়োগ করা যায় অথবা ভারত কিংবা রুপি গ্রহণে রাজি তৃতীয় কোনো দেশ থেকে পণ্য ও সেবা কেনার কাজে ব্যবহার করা যায়।

বাংলাদেশকে রুপিতে লেনদেনের ব্যবস্থায় যুক্ত করে রাশিয়া ভারতে জমে থাকা তার অব্যবহৃত রুপিও কাজে লাগাতে চায়। প্রস্তাবিত এই ত্রিপাক্ষিক আর্থিক ব্যবস্থায় রাশিয়া ভারতীয় ব্যাংকে থাকা তার রুপি ব্যবহার করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধের মতো পণ্য কিনতে পারে। অথবা বাংলাদেশ রাশিয়ার পারমাণবিক ঋণ, সার ও গমের মূল্য পরিশোধের সময় মস্কো রুপি গ্রহণ করতে পারে।

ঢাকাকে আগ্রহী করতে রাশিয়া বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে প্রতি টনে ১০ ডলার কম দামে এই সার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। মস্কো সূর্যমুখী তেল, হলুদ মটর, ছোলা ও মসুর ডাল সরবরাহের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার খুচরা বাজার থেকে পশ্চিমা পোশাক ব্র্যান্ডগুলো সরে যাওয়ার পর তাদের জায়গা পূরণ করতে নির্ভরযোগ্য বাংলাদেশি বস্ত্র সরবরাহকারীদের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য কৌশলগত সুযোগ

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাণিজ্য চালু রাখার দৃষ্টিকোণ থেকে রাশিয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি তাৎক্ষণিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক সুবিধাও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধের পথ খুলে দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। রুপি বা অন্য কোনো আঞ্চলিক ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ জমে থাকা প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে পারবে। এতে রাষ্ট্রীয় ঋণ পরিশোধে কারিগরি খেলাপির ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ ও চালু করার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হবে না। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্রগতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রুপিতে লেনদেন গ্রহণ করলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষিপণ্যের মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য স্বস্তি আসতে পারে। বাংলাদেশ গম এবং মিউরিয়েট অব পটাশ (এমওপি) সারের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়ার কম দামে ইউরিয়া দেওয়ার প্রস্তাবের পাশাপাশি কৃষি উপকরণের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে কৃষিতে সরকারি ভর্তুকির ব্যয় কমে জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। ডলার ছাড়াই প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য আমদানি করতে পারলে বৈশ্বিক ডলারের তারল্য সংকটের প্রভাব থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যমূল্যও কিছুটা সুরক্ষিত থাকবে।

এই ব্যবস্থা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা তথা ডলারের রিজার্ভ সংরক্ষণেও সহায়ক হতে পারে। ডলারের পরিবর্তে রুপিতে রাশিয়া থেকে আমদানির মূল্য পরিশোধ করা গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলারের রিজার্ভ বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক মুদ্রায় ক্লিয়ারিং ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া বৈদেশিক বাণিজ্যের পথ বহুমুখী করা এবং একক মুদ্রার ধাক্কার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে গ্লোবাল সাউথের বৃহত্তর প্রচেষ্টার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এতে ঝুঁকিও রয়েছে।

ঝুঁকির চিত্র: সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা ও কাঠামোগত অসমতা

স্বল্পমেয়াদে এসব কার্যকর সুবিধা থাকলেও বাণিজ্যের অন্তর্নিহিত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের জন্য গুরুতর আইনগত, সামষ্টিক অর্থনীতি এবং কাঠামোগত ঝুঁকি দেখা যায়। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের প্রস্তাব নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে। তাঁদের মতে, রাশিয়ার প্রস্তাব বাণিজ্যের বিকল্প একটি পথ তৈরি করতে পারে। তবে সুবিধার চেয়ে সীমাবদ্ধতাই বেশি।

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির বলেন, “সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো পশ্চিমা দেশগুলোর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি। বাংলাদেশ যদি কোনো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ ব্যাংককে ঢাকায় কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয় অথবা তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা রাশিয়ার বিকল্প আর্থিক মেসেজিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অফিস অব ফরেন অ্যাসেট কন্ট্রোলের (ওএফএসি) সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। এর ফলে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা ক্রেতাদের সঙ্গে লেটার অব ক্রেডিট নিষ্পত্তির সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং দেশের পোশাক খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।”

আরেকটি বড় বাধা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিদ্যমান কাঠামোগত বাণিজ্য ঘাটতি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে প্রায় ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে আমদানি করেছে ১০ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। তার মানে বাংলাদেশ প্রতি বছর ভারতে রপ্তানি থেকে মাত্র দেড় থেকে পৌনে ২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ রুপি আয় করতে পারে। ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে রুপির একটি স্থায়ী কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কোনো দেশের স্থানীয় মুদ্রায় কার্যকর বাণিজ্য ব্যবস্থা চালাতে হলে সেদেশের সরাসরি রপ্তানি থেকে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে হয়। বাংলাদেশ যদি রুপিতে রাশিয়ার ঋণ, গম ও সার আমদানির মূল্য পরিশোধ করতে চায়, তাহলে শুধু বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রুপি জোগাড় করা সম্ভব হবে না। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংককে খোলা বাজারে তার সীমিত মার্কিন ডলার বিক্রি করে ভারতীয় রুপি কিনতে হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্যই কার্যত ব্যর্থ হবে।”

সব মিলিয়ে, রাশিয়ার প্রস্তাবকে বাংলাদেশের জন্য নিছক সুযোগ বা ঝুঁকি—কোনোটিই এককভাবে বলা যায় না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আটকে থাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধ, কম দামে সার ও খাদ্যপণ্য আমদানি এবং রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি একটি কার্যকর বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। তবে এই সুবিধার বিপরীতে ঝুঁকিও যথেষ্ট বড়। কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারনির্ভর। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে এমন কোনো আর্থিক ব্যবস্থা, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি করবে।

তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে এ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো। রাশিয়ার ভারতে থাকা রুপি দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মূল্য পরিশোধ বা রূপপুরের ঋণ সমন্বয়ের সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু দেশের নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে রুপি সংগ্রহ কিংবা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে থাকা রুশ ব্যাংককে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় সরাসরি যুক্ত করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সুতরাং সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে—রাশিয়ার সঙ্গে প্রয়োজনীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেও যেন পশ্চিমা বাজার ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় দেশের প্রবেশাধিকার কোনোভাবেই ঝুঁকিতে না পড়ে তা নিশ্চিত করা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

ডলারের বিকল্পে রুপি-রুবল: রাশিয়ার প্রস্তাবে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ নাকি ঝুঁকি