একেএম শামসুদ্দিন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের অবস্থান জানানোর পর দুই দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।
দিল্লি সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে–প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করার অনুমোদন দিয়ে ভারত সফরের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে জানিয়ে বাংলাদেশ মূলত দুটি বিষয় সামনে এনেছে। হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ বিষয়ে অগ্রগতি এবং ঢাকার দাবি অনুযায়ী ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট পলাতক আসামিদের হস্তান্তর।
এখানে বিষয়টি নিছক দ্বিপক্ষীয় সফর বা কূটনৈতিক সৌজন্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কৌশলগত স্বার্থ এবং একই সঙ্গে তার আইনগত কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ঢাকার দৃষ্টিতে হাসিনার প্রত্যর্পণ শুধু আইনি বিষয় নয়; এটি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে নয়াদিল্লি গত দুই বছর যাবৎ বলে আসছে, হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্যও এটি কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণ। তারেক রহমানের সফর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠন, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ভারত কি হাসিনার বিষয়টিকে প্রধানত আইনি সমস্যা হিসেবে দেখছে, নাকি এর আড়ালে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব? একইভাবে ঢাকা যে প্রত্যর্পণকে তারেক রহমানের ভারত সফরের অনুকূল পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তা কি কূটনৈতিক চাপ, নাকি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বাভাবিক প্রতিফলন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ভারতের রাজনৈতিক ইচ্ছা, প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা–সব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। অপরদিকে ভারত বলেছে, অনুরোধটি তাদের আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ কথা ঠিক, বাংলাদেশ অনুরোধ করলেই ভারত নিঃশর্তভাবে হাসিনাকে ফেরত দিতে বাধ্য নয়। চুক্তি ভারতকে প্রত্যর্পণের একটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা দেয়, কিন্তু একই চুক্তিতে কিছু ব্যতিক্রম ও প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি রয়েছে। হাসিনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ ৬ (রাজনৈতিক অপরাধ), অনুচ্ছেদ ৮ (প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের অন্যান্য কারণ) এবং বর্তমানে তিনি দণ্ডিত হওয়ায় অনুচ্ছেদ ১০(৪)-এর প্রাসঙ্গিকতা।
প্রত্যর্পণ চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬(১)-এর মূল বক্তব্য হলো, অপরাধটি যদি রাজনৈতিক চরিত্রের হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আছে। কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ বলা যাবে না। অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ দীর্ঘ তালিকার কয়েকটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড; যেমন হত্যা, দোষযোগ্য নরহত্যা/দোষসাপেক্ষ হত্যাকাণ্ড অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত গুরুতর হত্যা বা আইনগতভাবে দায়যোগ্য নরহত্যা, অপহরণ বা জিম্মি কিংবা হত্যা করতে প্ররোচনা ইত্যাদিতে এটি প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে” বললেই হত্যা বা অপহরণের মতো অপরাধ রাজনৈতিক অপরাধ হয়ে যাবে না। কোনো অপরাধ যদি রাজনৈতিক চরিত্রের হয়, তাহলে “Extradition may be refused” বা প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে বলা আছে। এখানে “may be refused” কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ভারত অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে, এমন নয়; বরং এটি ভারতের বিবেচনার সুযোগ তৈরি করে। অতএব ‘অভিযোগটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ এবং ‘অপরাধটি প্রত্যর্পণ চুক্তির অর্থে রাজনৈতিক অপরাধ’– দুটি এক নয়। অর্থাৎ ভারত চাইলে রাজনৈতিক বিবেচনায় হাসিনাকে প্রত্যর্পণ বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ রক্ষা করতে পারে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর ঘিরে ভারতের গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে যে তোলপাড় চলছে; সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন কটাক্ষমূলক বক্তব্যেও তা প্রকাশ পাচ্ছে। ভারতের কিছু গণমাধ্যম, বিশ্লেষক, সাবেক আমলা ও কূটনীতিকের বক্তব্যে তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থানকে তাচ্ছিল্য কিংবা অবমাননাকর বিশেষণে উপস্থাপন করা হচ্ছে; যাতে দু’দেশের পারস্পরিক মর্যাদা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বীণা সিক্রির মন্তব্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারেক রহমানের ভারত সফরের পরিবেশ তৈরিতে হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত করাকে তিনি ‘অত্যন্ত রূঢ়’ ও ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। একজন সাবেক কূটনীতিকের কাছ থেকে এমন শব্দ চয়ন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার ক্ষেত্রে কতটা উপযোগী, সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। ওদিকে, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “তারেক রহমান এমন এক গর্ত খুঁড়ছেন, যেখান থেকে আর বের হতে পারবেন না।” তিনি যোগ করেন, “তারেক রহমানের ভারত সফরকে হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করাটা কঠোর অবস্থান। এটি কূটনীতি নয়, এটি খামখেয়ালিপনা।”
এমন বক্তব্যের কেমন জবাব হওয়া উচিত? ভদ্রতা বজায় রেখে শুধু এটুকু বলা যায়, বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ এবং সেই দেশ ও সরকার প্রধানকে নিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকদের এ ধরনের মন্তব্য কেবল তাদের ব্যক্তিগত রুচির পরিচয় বহন করে। প্রত্যর্পণের বিষয় উত্থাপন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আইনগত ও কূটনৈতিক অবস্থান। সেটি পছন্দ না হলে যুক্তি দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে; কিন্তু এটাকে অপমানসূচক ভাষায় চিহ্নিত করা পারস্পরিক মর্যাদা রক্ষার সংস্কৃতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
ভারত-সংক্রান্ত বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যম ও ব্যক্তিগত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দু-একজন ভারতীয় সাংবাদিক বাংলাদেশ ও এদেশের রাজনীতিকদের নিয়ে এমন সব বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, যা শুনতেও রুচিতে বাধে। এদের একজন দিল্লি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং অপরজন রয়টার্স ও বিবিসি বাংলায় ছিলেন।
তাদের বক্তব্য তুলে ধরলে নিবন্ধ দীর্ঘ হয়ে যাবে। সেটা না করে এটুকুই শুধু বলব, এই দু’জন সাংবাদিক সমালোচনার সীমা অতিক্রম করেছেন। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কারো বক্তব্য অযৌক্তিক বা কূটনৈতিকভাবে ক্ষতিকর মনে হলে তার কঠোর সমালোচনাও করা যায়; কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অপমান বা হেয় করার ভাষা কোনোভাবেই সাংবাদিকতা হতে পারে না। ভারতীয় সাংবাদিকদের সমালোচনার অধিকার অবশ্যই আছে। তারা বাংলাদেশের সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা বিরোধী নেতাদের সমালোচনা করতেই পারেন। তাই বলে সস্তা রাজনৈতিক নেতাদের মতো বাগাড়ম্বর করতে পারেন না।
বিশেষত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন খুবই সংবেদনশীল পর্যায়ে, তখন দুই দেশের সাংবাদিকদের ব্যবহৃত ভাষা জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে। কিছু ভারতীয় সাংবাদিক যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের ধারাবাহিকভাবে ভারতের নিরাপত্তা-ঝুঁকি, ষড়যন্ত্র বা নেতিবাচক রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত করতে থাকেন, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রশ্ন উঠবে– তিনি কি সাংবাদিক হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন, নাকি ভারতের কৌশলগত অবস্থানের পক্ষে ভাষ্য নির্মাণ করছেন?
ভারতীয় এসব সাংবাদিকের অনেকেই বাংলাদেশ-বিষয়ক পর্যবেক্ষক। তাই তাদের বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। তাদের বিশ্লেষণকে অগ্রাহ্য না করে বরং প্রশ্ন করা উচিত, তারা যে তথ্য ব্যবহার করছেন, তা কতটা যাচাইকৃত? তাদের বিশ্লেষণ কতটা ভারসাম্যপূর্ণ এবং কোথায় তথ্য শেষ হয়ে ব্যক্তিগত মতামত শুরু হচ্ছে। এখানেই সাংবাদিকতার মূল পরীক্ষা। আমি সাংবাদিকতার ছাত্র নই; তবে পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে এটুকু বুঝি– সাংবাদিকদের ভাষা হবে মার্জিত ও বক্তব্য ভারসাম্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বক্তব্য নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমে কঠোর প্রশ্ন উঠতেই পারে। শেখ হাসিনা, তারেক রহমান, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত কিংবা বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সমালোচনা হওয়া উচিত নীতি, সিদ্ধান্ত, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে। ব্যক্তিকে অপমান করা সাংবাদিকতা নয়।
আসলে ভারত বাংলাদেশকে ‘করদ রাজ্য’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করে এসেছে। তারা চেয়েছে, বাংলাদেশ যেন সব সময়েই তাদের জমাখরচ দিয়ে চলে। হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ নিয়ে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে ভারত এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। তারা বাংলাদেশ থেকে সব সময়েই ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। যখন কোনো উপায় থাকে না, তখন আবার তাদের আদালতকে ব্যবহার করে।
বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগেও তারা আদালতের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। এটা ভারতের পুরনো কৌশল এবং তা কার্যকর বটে। হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়েও তারা সেই পথেই এগোবে মনে হচ্ছে। আদালতের আশ্রয় নিয়ে প্রত্যর্পণটি হয়তো অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখবে। যেমন, ১৯৭৪ সালে ঝুলিয়ে রেখেছিল মুজিব-ইন্দিরা ‘স্থলসীমা’ চুক্তির অংশ হিসেবে ‘তিন বিঘা করিডোর’ হস্তান্তর প্রক্রিয়া।
স্থলসীমা চুক্তির আওতায় দক্ষিণ বেরুবাড়ী ও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সঙ্গে সম্পর্কিত ভূমি বিনিময় এবং তিন বিঘা করিডোর ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। চুক্তির পর বাংলাদেশ দ্রুত প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও সংসদীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে একই বছরের নভেম্বরে দক্ষিণ বেরুবাড়ীর নির্ধারিত অংশ হস্তান্তর করলেও তিন বিঘা করিডোর কার্যকরের বিষয়টি ভারত ঝুলিয়ে রাখে। করিডোরের জমি হস্তান্তর যাতে দীর্ঘায়িত হয়, সেজন্য তারা একটি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে স্থানীয় জনগণকে তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। ওই অঞ্চলের মানুষদের সংগঠিত করে ‘ভারতীয় কুচলীবাড়ী সংগ্রাম সমিতি’ এবং ‘তিন বিঘা সংগ্রাম সমিতি’ নামে সংগঠন দাঁড় করিয়ে চুক্তিবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। সংগ্রাম সমিতির নেতাদের দিয়ে আদালতে চুক্তির বিরুদ্ধে মামলা করায়। শুনানি শেষে আদালতও তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তরে স্থায়ী স্থগিতাদেশ জারি করে। চুক্তির বিরুদ্ধে মামলা ও আন্দোলনের ফলে বিষয়টি শুধু দুই দেশের সরকারের কূটনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ভারতীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায়ও যুক্ত হয়ে পড়ে। এই কুটচালের কথা বাংলাদেশের অনেকেরই হয়তো স্মরণে নেই।
তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তরে বাংলাদেশ যতবারই ভারতকে অনুরোধ করেছে, ভারত ততবারই আদালতের দোহাই দিয়ে সরকারের কিছুই করার নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে করিডোর বাস্তবায়ন দীর্ঘ সময় ধরে জটিল ও স্পর্শকাতর সীমান্ত ইস্যুতে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক উদ্যোগে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানুষের যোগাযোগের সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি হয়। ৩৮ বছর পর ২০১১ সালে ভারত তিনবিঘা করিডোর সম্পূর্ণ খুলে দেয়।
তিস্তা চুক্তির কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। এটা নিয়েও একই অবস্থা, তবে ভিন্ন রূপে। ভারতীয় সংবিধানের দোহাই দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গের সম্মতি ছাড়া চুক্তি সম্ভব নয়’ বলে বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি।
অতএব হাসিনার প্রত্যর্পণ যদি ভারতের আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে, সহজেই অনুমেয়। তবে ভারত সরকার যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সবই সম্ভব। হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দরকষাকষি করলেও ভারত চাইলেই তাদের আশ্রয়ে থাকা হাদি হত্যায় অভিযুক্তদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে পারে। সাঈদী মামলার অন্যতম স্বাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে যদি বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে পারে, তাহলে হাদি হত্যায় অভিযুক্তদের ফেরত পাঠাতে পারবে না কেন?
ভারত সে পথে হাঁটবে না। কারণ হাদি হত্যায় আওয়ামী লীগের পলাতক কতিপয় নেতা ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার কথা শোনা গিয়েছিল। এ নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও প্রচুর লেখালেখি হয়। কাজেই এ ক্ষেত্রেও ভারত কোনো ঝুঁকি নেবে বলে মনে হয় না। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ থেকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় আদালতের কার্যক্রম চলাকালেই অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভারতীয় জাতীয় তদন্ত সংস্থা অভিযুক্তদের কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে আটক করে; যাতে তাদের মুখ দিয়ে গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে না যায়।
অভিযুক্ত ফয়সল ও আলমগীর ভারত সরকারের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, তারা কলকাতা পুলিশকেও আস্থায় নিতে পারেনি। বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিস থেকে অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও ভারত অনুমতি দেয়নি। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, বাংলাদেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে যখন শিলং-এ আটক করা হয়েছিল, তখন কিন্তু তাকে দিল্লি নিয়ে যাওয়া হয়নি। বরং শিলং-এ রেখেই সব আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক নেতার চেয়েও ওই দুই জনের ব্যাপারে ভারত কেন এত সতর্ক, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। জিজ্ঞাসাবাদের নামে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে অভিযুক্ত দুই জনের মুখ কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তা বুঝতে গোয়েন্দা প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন হয় না।
হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ধারাবাহিক নেতিবাচক আচরণ থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, তারেক রহমানের এ মুহূর্তে ভারত সফর না করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কোনো দেশের প্রতি বৈরিতা নয়; বরং বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক বার্তা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে ভারত সফরের ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরির যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তিসঙ্গত।
ভারতের এখন বাস্তবতা উপলব্ধির সময় এসেছে। বাংলাদেশের একক কোনো নেতা বা দলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখানোর পরিবর্তে ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণের মনোভাবকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কেবল সরকারের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে না; জনগণের আস্থা, পারস্পরিক সম্মান এবং জাতীয় মর্যাদার বিষয়টিও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক, বাংলাদেশ যদি ভারতের জনগণের ওপর হত্যাকাণ্ড চালানো এবং আদালত কর্তৃক দণ্ডিত কোনো রাজনৈতিক নেতা বা অভিযুক্তকে একইভাবে আশ্রয় দিত; ভারত ও তার জনগণ কি সেটা সহজভাবে নিতে পারতো? ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকেই বর্তমান অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে। তার অবসান ঘটানোর উদ্যোগও নিতে হবে ভারতকেই। ভারত যেটা শুরু করেছে, তার শেষও তাকেই করতে হবে। হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ দু’বছর আগেই চিঠি দিয়েছে। ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত জবাব দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখায়নি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বর্তমান টানাপোড়েন কোনো পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর নয়। কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়। বাংলাদেশের অনুরোধের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, বাংলাদেশবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিষয়ে দ্রুত আইনি ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু এবং বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন– এসব পদক্ষেপই হতে পারে আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ।
প্রতিবেশী দু’দেশের সম্পর্ক টেকসই করতে হলে আধিপত্য বা বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়; পারস্পরিক সম্মান, সমতা, ন্যায়বিচার ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাই হতে হবে ভিত্তি। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব তাই ভারতেরই। আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপটি তাদের কাছ থেকেই আসতে হবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের অবস্থান জানানোর পর দুই দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।
দিল্লি সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে–প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করার অনুমোদন দিয়ে ভারত সফরের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে জানিয়ে বাংলাদেশ মূলত দুটি বিষয় সামনে এনেছে। হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ বিষয়ে অগ্রগতি এবং ঢাকার দাবি অনুযায়ী ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট পলাতক আসামিদের হস্তান্তর।
এখানে বিষয়টি নিছক দ্বিপক্ষীয় সফর বা কূটনৈতিক সৌজন্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কৌশলগত স্বার্থ এবং একই সঙ্গে তার আইনগত কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ঢাকার দৃষ্টিতে হাসিনার প্রত্যর্পণ শুধু আইনি বিষয় নয়; এটি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে নয়াদিল্লি গত দুই বছর যাবৎ বলে আসছে, হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্যও এটি কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণ। তারেক রহমানের সফর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠন, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ভারত কি হাসিনার বিষয়টিকে প্রধানত আইনি সমস্যা হিসেবে দেখছে, নাকি এর আড়ালে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব? একইভাবে ঢাকা যে প্রত্যর্পণকে তারেক রহমানের ভারত সফরের অনুকূল পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তা কি কূটনৈতিক চাপ, নাকি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বাভাবিক প্রতিফলন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ভারতের রাজনৈতিক ইচ্ছা, প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা–সব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। অপরদিকে ভারত বলেছে, অনুরোধটি তাদের আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ কথা ঠিক, বাংলাদেশ অনুরোধ করলেই ভারত নিঃশর্তভাবে হাসিনাকে ফেরত দিতে বাধ্য নয়। চুক্তি ভারতকে প্রত্যর্পণের একটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা দেয়, কিন্তু একই চুক্তিতে কিছু ব্যতিক্রম ও প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি রয়েছে। হাসিনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ ৬ (রাজনৈতিক অপরাধ), অনুচ্ছেদ ৮ (প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের অন্যান্য কারণ) এবং বর্তমানে তিনি দণ্ডিত হওয়ায় অনুচ্ছেদ ১০(৪)-এর প্রাসঙ্গিকতা।
প্রত্যর্পণ চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬(১)-এর মূল বক্তব্য হলো, অপরাধটি যদি রাজনৈতিক চরিত্রের হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আছে। কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ বলা যাবে না। অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ দীর্ঘ তালিকার কয়েকটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড; যেমন হত্যা, দোষযোগ্য নরহত্যা/দোষসাপেক্ষ হত্যাকাণ্ড অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত গুরুতর হত্যা বা আইনগতভাবে দায়যোগ্য নরহত্যা, অপহরণ বা জিম্মি কিংবা হত্যা করতে প্ররোচনা ইত্যাদিতে এটি প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে” বললেই হত্যা বা অপহরণের মতো অপরাধ রাজনৈতিক অপরাধ হয়ে যাবে না। কোনো অপরাধ যদি রাজনৈতিক চরিত্রের হয়, তাহলে “Extradition may be refused” বা প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে বলা আছে। এখানে “may be refused” কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ভারত অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে, এমন নয়; বরং এটি ভারতের বিবেচনার সুযোগ তৈরি করে। অতএব ‘অভিযোগটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ এবং ‘অপরাধটি প্রত্যর্পণ চুক্তির অর্থে রাজনৈতিক অপরাধ’– দুটি এক নয়। অর্থাৎ ভারত চাইলে রাজনৈতিক বিবেচনায় হাসিনাকে প্রত্যর্পণ বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ রক্ষা করতে পারে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর ঘিরে ভারতের গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে যে তোলপাড় চলছে; সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন কটাক্ষমূলক বক্তব্যেও তা প্রকাশ পাচ্ছে। ভারতের কিছু গণমাধ্যম, বিশ্লেষক, সাবেক আমলা ও কূটনীতিকের বক্তব্যে তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থানকে তাচ্ছিল্য কিংবা অবমাননাকর বিশেষণে উপস্থাপন করা হচ্ছে; যাতে দু’দেশের পারস্পরিক মর্যাদা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বীণা সিক্রির মন্তব্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারেক রহমানের ভারত সফরের পরিবেশ তৈরিতে হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত করাকে তিনি ‘অত্যন্ত রূঢ়’ ও ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। একজন সাবেক কূটনীতিকের কাছ থেকে এমন শব্দ চয়ন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার ক্ষেত্রে কতটা উপযোগী, সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। ওদিকে, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “তারেক রহমান এমন এক গর্ত খুঁড়ছেন, যেখান থেকে আর বের হতে পারবেন না।” তিনি যোগ করেন, “তারেক রহমানের ভারত সফরকে হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করাটা কঠোর অবস্থান। এটি কূটনীতি নয়, এটি খামখেয়ালিপনা।”
এমন বক্তব্যের কেমন জবাব হওয়া উচিত? ভদ্রতা বজায় রেখে শুধু এটুকু বলা যায়, বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ এবং সেই দেশ ও সরকার প্রধানকে নিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকদের এ ধরনের মন্তব্য কেবল তাদের ব্যক্তিগত রুচির পরিচয় বহন করে। প্রত্যর্পণের বিষয় উত্থাপন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আইনগত ও কূটনৈতিক অবস্থান। সেটি পছন্দ না হলে যুক্তি দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে; কিন্তু এটাকে অপমানসূচক ভাষায় চিহ্নিত করা পারস্পরিক মর্যাদা রক্ষার সংস্কৃতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
ভারত-সংক্রান্ত বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যম ও ব্যক্তিগত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দু-একজন ভারতীয় সাংবাদিক বাংলাদেশ ও এদেশের রাজনীতিকদের নিয়ে এমন সব বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, যা শুনতেও রুচিতে বাধে। এদের একজন দিল্লি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং অপরজন রয়টার্স ও বিবিসি বাংলায় ছিলেন।
তাদের বক্তব্য তুলে ধরলে নিবন্ধ দীর্ঘ হয়ে যাবে। সেটা না করে এটুকুই শুধু বলব, এই দু’জন সাংবাদিক সমালোচনার সীমা অতিক্রম করেছেন। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কারো বক্তব্য অযৌক্তিক বা কূটনৈতিকভাবে ক্ষতিকর মনে হলে তার কঠোর সমালোচনাও করা যায়; কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অপমান বা হেয় করার ভাষা কোনোভাবেই সাংবাদিকতা হতে পারে না। ভারতীয় সাংবাদিকদের সমালোচনার অধিকার অবশ্যই আছে। তারা বাংলাদেশের সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা বিরোধী নেতাদের সমালোচনা করতেই পারেন। তাই বলে সস্তা রাজনৈতিক নেতাদের মতো বাগাড়ম্বর করতে পারেন না।
বিশেষত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন খুবই সংবেদনশীল পর্যায়ে, তখন দুই দেশের সাংবাদিকদের ব্যবহৃত ভাষা জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে। কিছু ভারতীয় সাংবাদিক যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের ধারাবাহিকভাবে ভারতের নিরাপত্তা-ঝুঁকি, ষড়যন্ত্র বা নেতিবাচক রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত করতে থাকেন, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রশ্ন উঠবে– তিনি কি সাংবাদিক হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন, নাকি ভারতের কৌশলগত অবস্থানের পক্ষে ভাষ্য নির্মাণ করছেন?
ভারতীয় এসব সাংবাদিকের অনেকেই বাংলাদেশ-বিষয়ক পর্যবেক্ষক। তাই তাদের বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। তাদের বিশ্লেষণকে অগ্রাহ্য না করে বরং প্রশ্ন করা উচিত, তারা যে তথ্য ব্যবহার করছেন, তা কতটা যাচাইকৃত? তাদের বিশ্লেষণ কতটা ভারসাম্যপূর্ণ এবং কোথায় তথ্য শেষ হয়ে ব্যক্তিগত মতামত শুরু হচ্ছে। এখানেই সাংবাদিকতার মূল পরীক্ষা। আমি সাংবাদিকতার ছাত্র নই; তবে পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে এটুকু বুঝি– সাংবাদিকদের ভাষা হবে মার্জিত ও বক্তব্য ভারসাম্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বক্তব্য নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমে কঠোর প্রশ্ন উঠতেই পারে। শেখ হাসিনা, তারেক রহমান, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত কিংবা বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সমালোচনা হওয়া উচিত নীতি, সিদ্ধান্ত, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে। ব্যক্তিকে অপমান করা সাংবাদিকতা নয়।
আসলে ভারত বাংলাদেশকে ‘করদ রাজ্য’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করে এসেছে। তারা চেয়েছে, বাংলাদেশ যেন সব সময়েই তাদের জমাখরচ দিয়ে চলে। হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ নিয়ে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে ভারত এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। তারা বাংলাদেশ থেকে সব সময়েই ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। যখন কোনো উপায় থাকে না, তখন আবার তাদের আদালতকে ব্যবহার করে।
বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগেও তারা আদালতের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। এটা ভারতের পুরনো কৌশল এবং তা কার্যকর বটে। হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়েও তারা সেই পথেই এগোবে মনে হচ্ছে। আদালতের আশ্রয় নিয়ে প্রত্যর্পণটি হয়তো অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখবে। যেমন, ১৯৭৪ সালে ঝুলিয়ে রেখেছিল মুজিব-ইন্দিরা ‘স্থলসীমা’ চুক্তির অংশ হিসেবে ‘তিন বিঘা করিডোর’ হস্তান্তর প্রক্রিয়া।
স্থলসীমা চুক্তির আওতায় দক্ষিণ বেরুবাড়ী ও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সঙ্গে সম্পর্কিত ভূমি বিনিময় এবং তিন বিঘা করিডোর ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। চুক্তির পর বাংলাদেশ দ্রুত প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও সংসদীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে একই বছরের নভেম্বরে দক্ষিণ বেরুবাড়ীর নির্ধারিত অংশ হস্তান্তর করলেও তিন বিঘা করিডোর কার্যকরের বিষয়টি ভারত ঝুলিয়ে রাখে। করিডোরের জমি হস্তান্তর যাতে দীর্ঘায়িত হয়, সেজন্য তারা একটি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে স্থানীয় জনগণকে তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। ওই অঞ্চলের মানুষদের সংগঠিত করে ‘ভারতীয় কুচলীবাড়ী সংগ্রাম সমিতি’ এবং ‘তিন বিঘা সংগ্রাম সমিতি’ নামে সংগঠন দাঁড় করিয়ে চুক্তিবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। সংগ্রাম সমিতির নেতাদের দিয়ে আদালতে চুক্তির বিরুদ্ধে মামলা করায়। শুনানি শেষে আদালতও তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তরে স্থায়ী স্থগিতাদেশ জারি করে। চুক্তির বিরুদ্ধে মামলা ও আন্দোলনের ফলে বিষয়টি শুধু দুই দেশের সরকারের কূটনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ভারতীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায়ও যুক্ত হয়ে পড়ে। এই কুটচালের কথা বাংলাদেশের অনেকেরই হয়তো স্মরণে নেই।
তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তরে বাংলাদেশ যতবারই ভারতকে অনুরোধ করেছে, ভারত ততবারই আদালতের দোহাই দিয়ে সরকারের কিছুই করার নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে করিডোর বাস্তবায়ন দীর্ঘ সময় ধরে জটিল ও স্পর্শকাতর সীমান্ত ইস্যুতে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক উদ্যোগে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানুষের যোগাযোগের সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি হয়। ৩৮ বছর পর ২০১১ সালে ভারত তিনবিঘা করিডোর সম্পূর্ণ খুলে দেয়।
তিস্তা চুক্তির কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। এটা নিয়েও একই অবস্থা, তবে ভিন্ন রূপে। ভারতীয় সংবিধানের দোহাই দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গের সম্মতি ছাড়া চুক্তি সম্ভব নয়’ বলে বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি।
অতএব হাসিনার প্রত্যর্পণ যদি ভারতের আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে, সহজেই অনুমেয়। তবে ভারত সরকার যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সবই সম্ভব। হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দরকষাকষি করলেও ভারত চাইলেই তাদের আশ্রয়ে থাকা হাদি হত্যায় অভিযুক্তদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে পারে। সাঈদী মামলার অন্যতম স্বাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে যদি বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে পারে, তাহলে হাদি হত্যায় অভিযুক্তদের ফেরত পাঠাতে পারবে না কেন?
ভারত সে পথে হাঁটবে না। কারণ হাদি হত্যায় আওয়ামী লীগের পলাতক কতিপয় নেতা ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার কথা শোনা গিয়েছিল। এ নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও প্রচুর লেখালেখি হয়। কাজেই এ ক্ষেত্রেও ভারত কোনো ঝুঁকি নেবে বলে মনে হয় না। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ থেকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় আদালতের কার্যক্রম চলাকালেই অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভারতীয় জাতীয় তদন্ত সংস্থা অভিযুক্তদের কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে আটক করে; যাতে তাদের মুখ দিয়ে গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে না যায়।
অভিযুক্ত ফয়সল ও আলমগীর ভারত সরকারের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, তারা কলকাতা পুলিশকেও আস্থায় নিতে পারেনি। বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিস থেকে অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও ভারত অনুমতি দেয়নি। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, বাংলাদেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে যখন শিলং-এ আটক করা হয়েছিল, তখন কিন্তু তাকে দিল্লি নিয়ে যাওয়া হয়নি। বরং শিলং-এ রেখেই সব আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক নেতার চেয়েও ওই দুই জনের ব্যাপারে ভারত কেন এত সতর্ক, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। জিজ্ঞাসাবাদের নামে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে অভিযুক্ত দুই জনের মুখ কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তা বুঝতে গোয়েন্দা প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন হয় না।
হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ধারাবাহিক নেতিবাচক আচরণ থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, তারেক রহমানের এ মুহূর্তে ভারত সফর না করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কোনো দেশের প্রতি বৈরিতা নয়; বরং বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক বার্তা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে ভারত সফরের ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরির যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তিসঙ্গত।
ভারতের এখন বাস্তবতা উপলব্ধির সময় এসেছে। বাংলাদেশের একক কোনো নেতা বা দলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখানোর পরিবর্তে ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণের মনোভাবকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কেবল সরকারের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে না; জনগণের আস্থা, পারস্পরিক সম্মান এবং জাতীয় মর্যাদার বিষয়টিও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক, বাংলাদেশ যদি ভারতের জনগণের ওপর হত্যাকাণ্ড চালানো এবং আদালত কর্তৃক দণ্ডিত কোনো রাজনৈতিক নেতা বা অভিযুক্তকে একইভাবে আশ্রয় দিত; ভারত ও তার জনগণ কি সেটা সহজভাবে নিতে পারতো? ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকেই বর্তমান অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে। তার অবসান ঘটানোর উদ্যোগও নিতে হবে ভারতকেই। ভারত যেটা শুরু করেছে, তার শেষও তাকেই করতে হবে। হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ দু’বছর আগেই চিঠি দিয়েছে। ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত জবাব দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখায়নি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বর্তমান টানাপোড়েন কোনো পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর নয়। কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়। বাংলাদেশের অনুরোধের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, বাংলাদেশবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিষয়ে দ্রুত আইনি ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু এবং বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন– এসব পদক্ষেপই হতে পারে আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ।
প্রতিবেশী দু’দেশের সম্পর্ক টেকসই করতে হলে আধিপত্য বা বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়; পারস্পরিক সম্মান, সমতা, ন্যায়বিচার ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাই হতে হবে ভিত্তি। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব তাই ভারতেরই। আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপটি তাদের কাছ থেকেই আসতে হবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
.png)

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও, সাম্প্রতিককালে এতে এক কৌশলগত রূপান্তর বা 'প্যারাডাইম শিফট' ঘটেছে। ক্ষমতার পরিবর্তন, জনগণের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং নতুন পররাষ্ট্রনীতির আগমন এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে এক জটিল ও সংবেদনশীল মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
৪ ঘণ্টা আগে
সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও একটি ছোট রাষ্ট্র তার ভূ-কৌশলগত অবস্থান, অর্থনীতি, মানবসম্পদ ও বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর, ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশাল বাজার হলো প্রধান কৌশলগত সম্পদ।
