পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাস বলছে, মানুষ এখানে একবার কোনো দলকে পছন্দ করলে তাদের অনেক বছর ক্ষমতায় রাখে। আগে কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট যেমন দশকের পর দশক শাসন করেছে, তেমনি তৃণমূলও টানা ১৫ বছর দাপট দেখিয়েছে। ২০২৬-এর ভূমিধস জয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বিজেপি কি তবে আগামী অন্তত দুটি নির্বাচনেও নিজেদের জয়ের পথ সুগম করে ফেলল?
তুফায়েল আহমদ

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর প্রথমবারের মতো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বসছে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার মসনদে। এর মধ্য দিয়ে ১৫ বছরের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের শেষ হলো।
ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই স্বতন্ত্র জায়গা দখল করে আছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে এই রাজ্যে রাজনীতিতে অদ্ভুত 'স্থায়িত্বের সংস্কৃতি' লক্ষ করা গেছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ২৫ বছরের শাসন (১৯৪৭-১৯৭২), বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের ক্ষমতা (১৯৭৭-২০১১) এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের (২০১১-২০২৬) আধিপত্য স্থায়িত্বের বিষয়টিকে প্রমাণ করে।
প্রতিটি রাজনৈতিক পর্বই নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক কাঠামো, মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং সামাজিক বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল। পশ্চিমবঙ্গের এই দীর্ঘস্থায়ী শাসনের নেপথ্যে কেবল জনসমর্থনই কাজ করে না, কাজ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ।
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পেছনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপাদান কাজ করেছে। গবেষক মাইদুল ইসলাম এবং দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির 'হেজিমনি' বা আধিপত্যবাদী তত্ত্বের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এই মতানুসারে শাসক শ্রেণি কেবল বলপ্রয়োগ করে নয়, বরং শাসিতের 'স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি' আদায়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকে। বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল উভয়ই এই সম্মতি উৎপাদনে সফল হয়েছে। তারা মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় ক্লাবের মাধ্যমে ‘তাদের বিকল্প নেই’ এই বোধ তৈরিতে সক্ষম হয়েছে।
মাইদুল ইসলাম এলিজাবেথ নোয়েল-নিম্যানের 'স্পাইরাল অফ সাইলেন্স' বা নীরবতার সর্পিল গতি তত্ত্বের আলোকে বলছেন, মানুষ যখন মনে করে তার রাজনৈতিক মতামত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের বিরোধী, তখন সে একাকী হয়ে যাওয়ার ভয়ে চুপ করে থাকে। দীর্ঘ বাম আমলে এবং তৃণমূল আমলেও এই প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এই নীরবতা এক ধরনের কৃত্রিম জনসমর্থনের আভাস দেয়, যা নির্বাচনে শাসক দলের জয়কে সহজ করে তোলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা ঐতিহাসিকভাবে আবেগী এবং প্রতীকী পরিচয়ের দ্বারা প্রভাবিত। কাজের খতিয়ানের চেয়ে 'আমাদের লোক' বা 'ঘরের মেয়ে' ইমেজগুলো বাঙালির মনস্তত্ত্বে বেশি প্রভাব ফেলে। তৃণমূল কংগ্রেস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধারণ জীবনযাপনের ইমেজকে বাঙালি সংস্কৃতির সাথে সফলভাবে যুক্ত করতে পেরেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তার বিশেষ 'সাংস্কৃতিক আবহ'। বাংলার রাজনীতি কেবল জাতি বা ধর্মের ওপর ভিত্তি করে চলেনি। এখানে 'ভদ্রলোক সংস্কৃতি' এবং 'আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব' বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলার রাজনীতি দীর্ঘ সময় ধরে 'ভদ্রলোক' বা উচ্চবর্ণের হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৪৭-এর পর কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের নেতৃত্বও ছিল মূলত এই শ্রেণির হাতে। বামপন্থীরা উচ্চবর্ণের আভিজাত্যের সঙ্গে নিম্নবর্গের মানুষের স্বার্থকে একীভূত করতে পেরেছিল।
২০১১ সালের পর থেকে এই ভদ্রলোক আধিপত্যে ভাঙন ধরেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান অ-ভদ্রলোক এবং নিম্নবর্ণের নেতৃত্বের পথ প্রশস্ত করেছে। তৃণমূল নিজেদের সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী শাসক দলই 'বাঙালি পরিচয়' এবং 'দিল্লির বঞ্চনা' এই দুটি বিষয় ব্যবহার করেছে। শাসক দলগুলো বোঝাতে চেয়েছে, দিল্লির সরকার বাংলার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। এই 'বহিঃশত্রুর ভয়' বাঙালিদের একজোট হতে সাহায্য করে এবং রাজ্যের শাসক দলের ওপর মানুষের আস্থা বাড়িয়ে দেয়। তৃণমূল কংগ্রেস উৎসব সংস্কৃতিকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবগুলোকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে তারা এক ধরনের সামাজিক সম্মতি উৎপাদন করেছে।
ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানের পর থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ছিল প্রধান শক্তি। দেশভাগের ক্ষত সারিয়ে বিপর্যস্ত রাজ্যকে পুনর্গঠনের লড়াইয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব দেয়। ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রূপকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর দীর্ঘ মুখ্যমন্ত্রিত্বে (১৯৪৮-১৯৬২) রাজ্য শিল্প ও শিক্ষায় অগ্রগতি লাভ করে।
কংগ্রেসের রাজনৈতিক স্থায়িত্বের পেছনে অতুল্য ঘোষ এবং প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের সুশৃঙ্খল এবং দক্ষ সাংগঠনিক কাঠামো কাজ করেছে। অতুল্য ঘোষকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির 'ট্যামানি বস' বলা হতো। তাঁর পরিচালিত রাজনৈতিক মেশিনারি কলকাতা ও গ্রামাঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং জোতদারদের সাথে সংযোগ রক্ষা করত, যা পরে 'সিন্ডিকেট' নামে পরিচিতি পায়।
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বে টানা সাত নির্বাচনে জয়লাভ করে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার ঘটনাও বিরল। এই দীর্ঘস্থায়িত্বের রহস্য কেবল মার্কসবাদী তত্ত্বে নয়, বরং এক গভীর 'পার্টি-মিডিয়েটেড' বা দল-নিয়ন্ত্রিত শাসন কাঠামোর মধ্যে নিহিত। বামফ্রন্টের প্রধান ভিত্তি ছিল গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গ। ক্ষমতায় আসার প্রথম দশকেই তারা 'অপারেশন বর্গা' এবং ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামো বদলে দেয়। জোতদারদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় প্রান্তিক চাষি ও বর্গাদারদের হাতে।
রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বাম আমলের শাসন ব্যবস্থাকে 'পার্টি সোসাইটি' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দল কেবল একটি নির্বাচনী সংগঠন নয়, বরং তা সমাজের প্রতিটি স্তরে অনুপ্রবেশকারী একটি সংস্থায় পরিণত হয়েছিল। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ থেকে শুরু করে সরকারি সুবিধা পাওয়া—সবকিছুর জন্যই মানুষকে স্থানীয় পার্টি অফিসের ওপর নির্ভর করতে হতো। দলীয় কর্মীরা রাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে কাজ করত।
ইতিহাসবিদ পার্থ চ্যাটার্জির মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ধরনের 'পলিটিক্যাল সোসাইটি' কাজ করে। প্রান্তিক মানুষ তাদের দাবি আদায়ের জন্য দলীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। বামফ্রন্ট এই সোসাইটিকে সুকৌশলে পরিচালনা করে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিতরণে দলের ক্যাডারদের মধ্যস্থতা নিশ্চিত করা হয়, যা এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি তৈরি করেছিল। মানুষের মধ্যে এই ধারণা প্রবল ছিল যে, দলের বাইরে গেলে জীবনের নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল তাদের ধর্মনিরপেক্ষ এবং শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতি। তারা মানুষের জাতিগত এবং ধর্মীয় পরিচয়কে ছাপিয়ে 'শ্রেণি' পরিচয়কে বড় করে তুলেছিল। এর ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা বড় ধরনের জাতিগত সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের জয় বামফ্রন্টের 'পার্টি সোসাইটি'র কাঠামো ভেঙে এক নতুন রাজনীতির সূচনা করে। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, প্রত্যক্ষ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং বিকেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক মডেল। দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য এই মডেলকে 'ফ্র্যাঞ্চাইজি পলিটিক্স' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বামফ্রন্টের মতো তৃণমূলের কোনো কঠোর সাংগঠনিক কাঠামো নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন একমাত্র সর্বজনীন ব্র্যান্ড। স্থানীয় নেতারা তাঁর ছবি এবং দলের নাম ব্যবহার করে নিজেদের এলাকায় ক্ষমতা পরিচালনা করেন।
তৃণমূলের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তাদের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বা 'পপুলিস্ট ওয়েলফেয়ারিজম'। নারীদের জন্য 'কন্যাশ্রী', 'রূপশ্রী' এবং 'লক্ষ্মীর ভান্ডার'-এর মতো প্রকল্পগুলি এক বিশাল অনুগত নারী ভোটব্যাংক তৈরি করেছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমানে ২ কোটির বেশি নারী সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সরাসরি অর্থ সাহায্য নারীদের পরিবারের মধ্যে দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং তাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ তৈরি করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস সুকৌশলে বাম আমলের 'পার্টি সোসাইটি'র অবশিষ্টাংশকে নিজেদের কব্জায় নিয়েছে। তারা স্থানীয় ক্লাব এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে ক্ষমতার অংশীদার করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার স্থানীয় ক্লাবগুলোকে অনুদান প্রদান করে তাদের আধা-রাজনৈতিক সংস্থায় পরিণত করেছে। পাশাপাশি, তৃণমূল 'সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি'র রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছে। বামপন্থীরা যেখানে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে অস্বীকার করত, তৃণমূল সেখানে সেগুলোকে উদযাপনের মাধ্যমে সমর্থন আদায় করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের রহস্য কোনো একক জাদুর কাঠিতে নয়, বরং বাস্তববাদী, মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরের জটিল রসায়নে নিহিত। প্রতিটি রাজনৈতিক পর্বই নির্দিষ্ট কৌশল এবং সামাজিক বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল।
২০২৬-এর নির্বাচনে বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের পর তাই অনেকেই সন্দেহ করছেন, পাঁচ বছরে বাংলায় গেরুয়া ঝড় থামবে না। দীর্ঘদিনের জন্যই হয়তো পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বিজেপি টিকে থাকবে।

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর প্রথমবারের মতো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বসছে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার মসনদে। এর মধ্য দিয়ে ১৫ বছরের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের শেষ হলো।
ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই স্বতন্ত্র জায়গা দখল করে আছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে এই রাজ্যে রাজনীতিতে অদ্ভুত 'স্থায়িত্বের সংস্কৃতি' লক্ষ করা গেছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ২৫ বছরের শাসন (১৯৪৭-১৯৭২), বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের ক্ষমতা (১৯৭৭-২০১১) এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের (২০১১-২০২৬) আধিপত্য স্থায়িত্বের বিষয়টিকে প্রমাণ করে।
প্রতিটি রাজনৈতিক পর্বই নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক কাঠামো, মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং সামাজিক বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল। পশ্চিমবঙ্গের এই দীর্ঘস্থায়ী শাসনের নেপথ্যে কেবল জনসমর্থনই কাজ করে না, কাজ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ।
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পেছনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপাদান কাজ করেছে। গবেষক মাইদুল ইসলাম এবং দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির 'হেজিমনি' বা আধিপত্যবাদী তত্ত্বের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এই মতানুসারে শাসক শ্রেণি কেবল বলপ্রয়োগ করে নয়, বরং শাসিতের 'স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি' আদায়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকে। বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল উভয়ই এই সম্মতি উৎপাদনে সফল হয়েছে। তারা মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় ক্লাবের মাধ্যমে ‘তাদের বিকল্প নেই’ এই বোধ তৈরিতে সক্ষম হয়েছে।
মাইদুল ইসলাম এলিজাবেথ নোয়েল-নিম্যানের 'স্পাইরাল অফ সাইলেন্স' বা নীরবতার সর্পিল গতি তত্ত্বের আলোকে বলছেন, মানুষ যখন মনে করে তার রাজনৈতিক মতামত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের বিরোধী, তখন সে একাকী হয়ে যাওয়ার ভয়ে চুপ করে থাকে। দীর্ঘ বাম আমলে এবং তৃণমূল আমলেও এই প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এই নীরবতা এক ধরনের কৃত্রিম জনসমর্থনের আভাস দেয়, যা নির্বাচনে শাসক দলের জয়কে সহজ করে তোলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা ঐতিহাসিকভাবে আবেগী এবং প্রতীকী পরিচয়ের দ্বারা প্রভাবিত। কাজের খতিয়ানের চেয়ে 'আমাদের লোক' বা 'ঘরের মেয়ে' ইমেজগুলো বাঙালির মনস্তত্ত্বে বেশি প্রভাব ফেলে। তৃণমূল কংগ্রেস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধারণ জীবনযাপনের ইমেজকে বাঙালি সংস্কৃতির সাথে সফলভাবে যুক্ত করতে পেরেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তার বিশেষ 'সাংস্কৃতিক আবহ'। বাংলার রাজনীতি কেবল জাতি বা ধর্মের ওপর ভিত্তি করে চলেনি। এখানে 'ভদ্রলোক সংস্কৃতি' এবং 'আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব' বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলার রাজনীতি দীর্ঘ সময় ধরে 'ভদ্রলোক' বা উচ্চবর্ণের হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৪৭-এর পর কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের নেতৃত্বও ছিল মূলত এই শ্রেণির হাতে। বামপন্থীরা উচ্চবর্ণের আভিজাত্যের সঙ্গে নিম্নবর্গের মানুষের স্বার্থকে একীভূত করতে পেরেছিল।
২০১১ সালের পর থেকে এই ভদ্রলোক আধিপত্যে ভাঙন ধরেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান অ-ভদ্রলোক এবং নিম্নবর্ণের নেতৃত্বের পথ প্রশস্ত করেছে। তৃণমূল নিজেদের সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী শাসক দলই 'বাঙালি পরিচয়' এবং 'দিল্লির বঞ্চনা' এই দুটি বিষয় ব্যবহার করেছে। শাসক দলগুলো বোঝাতে চেয়েছে, দিল্লির সরকার বাংলার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। এই 'বহিঃশত্রুর ভয়' বাঙালিদের একজোট হতে সাহায্য করে এবং রাজ্যের শাসক দলের ওপর মানুষের আস্থা বাড়িয়ে দেয়। তৃণমূল কংগ্রেস উৎসব সংস্কৃতিকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবগুলোকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে তারা এক ধরনের সামাজিক সম্মতি উৎপাদন করেছে।
ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানের পর থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ছিল প্রধান শক্তি। দেশভাগের ক্ষত সারিয়ে বিপর্যস্ত রাজ্যকে পুনর্গঠনের লড়াইয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব দেয়। ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রূপকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর দীর্ঘ মুখ্যমন্ত্রিত্বে (১৯৪৮-১৯৬২) রাজ্য শিল্প ও শিক্ষায় অগ্রগতি লাভ করে।
কংগ্রেসের রাজনৈতিক স্থায়িত্বের পেছনে অতুল্য ঘোষ এবং প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের সুশৃঙ্খল এবং দক্ষ সাংগঠনিক কাঠামো কাজ করেছে। অতুল্য ঘোষকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির 'ট্যামানি বস' বলা হতো। তাঁর পরিচালিত রাজনৈতিক মেশিনারি কলকাতা ও গ্রামাঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং জোতদারদের সাথে সংযোগ রক্ষা করত, যা পরে 'সিন্ডিকেট' নামে পরিচিতি পায়।
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বে টানা সাত নির্বাচনে জয়লাভ করে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার ঘটনাও বিরল। এই দীর্ঘস্থায়িত্বের রহস্য কেবল মার্কসবাদী তত্ত্বে নয়, বরং এক গভীর 'পার্টি-মিডিয়েটেড' বা দল-নিয়ন্ত্রিত শাসন কাঠামোর মধ্যে নিহিত। বামফ্রন্টের প্রধান ভিত্তি ছিল গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গ। ক্ষমতায় আসার প্রথম দশকেই তারা 'অপারেশন বর্গা' এবং ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামো বদলে দেয়। জোতদারদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় প্রান্তিক চাষি ও বর্গাদারদের হাতে।
রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বাম আমলের শাসন ব্যবস্থাকে 'পার্টি সোসাইটি' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দল কেবল একটি নির্বাচনী সংগঠন নয়, বরং তা সমাজের প্রতিটি স্তরে অনুপ্রবেশকারী একটি সংস্থায় পরিণত হয়েছিল। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ থেকে শুরু করে সরকারি সুবিধা পাওয়া—সবকিছুর জন্যই মানুষকে স্থানীয় পার্টি অফিসের ওপর নির্ভর করতে হতো। দলীয় কর্মীরা রাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে কাজ করত।
ইতিহাসবিদ পার্থ চ্যাটার্জির মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ধরনের 'পলিটিক্যাল সোসাইটি' কাজ করে। প্রান্তিক মানুষ তাদের দাবি আদায়ের জন্য দলীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। বামফ্রন্ট এই সোসাইটিকে সুকৌশলে পরিচালনা করে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিতরণে দলের ক্যাডারদের মধ্যস্থতা নিশ্চিত করা হয়, যা এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি তৈরি করেছিল। মানুষের মধ্যে এই ধারণা প্রবল ছিল যে, দলের বাইরে গেলে জীবনের নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল তাদের ধর্মনিরপেক্ষ এবং শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতি। তারা মানুষের জাতিগত এবং ধর্মীয় পরিচয়কে ছাপিয়ে 'শ্রেণি' পরিচয়কে বড় করে তুলেছিল। এর ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা বড় ধরনের জাতিগত সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের জয় বামফ্রন্টের 'পার্টি সোসাইটি'র কাঠামো ভেঙে এক নতুন রাজনীতির সূচনা করে। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, প্রত্যক্ষ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং বিকেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক মডেল। দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য এই মডেলকে 'ফ্র্যাঞ্চাইজি পলিটিক্স' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বামফ্রন্টের মতো তৃণমূলের কোনো কঠোর সাংগঠনিক কাঠামো নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন একমাত্র সর্বজনীন ব্র্যান্ড। স্থানীয় নেতারা তাঁর ছবি এবং দলের নাম ব্যবহার করে নিজেদের এলাকায় ক্ষমতা পরিচালনা করেন।
তৃণমূলের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তাদের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বা 'পপুলিস্ট ওয়েলফেয়ারিজম'। নারীদের জন্য 'কন্যাশ্রী', 'রূপশ্রী' এবং 'লক্ষ্মীর ভান্ডার'-এর মতো প্রকল্পগুলি এক বিশাল অনুগত নারী ভোটব্যাংক তৈরি করেছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমানে ২ কোটির বেশি নারী সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সরাসরি অর্থ সাহায্য নারীদের পরিবারের মধ্যে দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং তাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ তৈরি করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস সুকৌশলে বাম আমলের 'পার্টি সোসাইটি'র অবশিষ্টাংশকে নিজেদের কব্জায় নিয়েছে। তারা স্থানীয় ক্লাব এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে ক্ষমতার অংশীদার করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার স্থানীয় ক্লাবগুলোকে অনুদান প্রদান করে তাদের আধা-রাজনৈতিক সংস্থায় পরিণত করেছে। পাশাপাশি, তৃণমূল 'সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি'র রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছে। বামপন্থীরা যেখানে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে অস্বীকার করত, তৃণমূল সেখানে সেগুলোকে উদযাপনের মাধ্যমে সমর্থন আদায় করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের রহস্য কোনো একক জাদুর কাঠিতে নয়, বরং বাস্তববাদী, মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরের জটিল রসায়নে নিহিত। প্রতিটি রাজনৈতিক পর্বই নির্দিষ্ট কৌশল এবং সামাজিক বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল।
২০২৬-এর নির্বাচনে বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের পর তাই অনেকেই সন্দেহ করছেন, পাঁচ বছরে বাংলায় গেরুয়া ঝড় থামবে না। দীর্ঘদিনের জন্যই হয়তো পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বিজেপি টিকে থাকবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্ধশতাব্দীর ফেডারেল কাঠামো বর্তমানে আবুধাবির আগ্রাসী ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অবশিষ্ট আমিরাতগুলোর স্বকীয়তার দ্বন্দ্বে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ওপেকের তেল উৎপাদন নীতি নিয়ে সৌদি আরবের সাথে বিরোধ এবং ওআইসি-র মতো প্যান-ইসলামিক জোট থেকে সরে আসার গুঞ্জন দেশটিকে আরব বল
৪ ঘণ্টা আগে
মমতার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল মানুষের আস্থা দিয়ে। কিন্তু ১৫ বছরের শেষে এসে সেই আস্থার জায়গায় অনেকের মনে জমেছে প্রশ্ন, সরকার কি মানুষের, না কি দলের? প্রকল্প আছে, কিন্তু স্বচ্ছতা কোথায়? ভাতা আছে, কিন্তু কাজ কোথায়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে না পারার ফলেই তৃণমূলের ভিত ভেঙেছে।
৫ ঘণ্টা আগে
বিজেপির অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, বিজেপির এই বিশাল সাফল্যের পেছনে মূলত পাঁচটি কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বা মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাশাপাশি, সরকারি কর্মচারীদের ডিএ (মহার্ঘ ভাতা) এবং পেনশনের প্রতিশ্রুতিও বড় ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া, কেন্দ্র সরকারের মাধ্যমে
১ দিন আগে
তাঁর নামের মধ্যেই রয়েছে ‘জয়’। অভিনেতা-রাজনীতিবিদ থালাপতি বিজয়ের দল ‘টিভিকে’ তামিলনাড়ুর ভোট গণনায় এখন পর্যন্ত ১০০-রও বেশি আসনে এগিয়ে থেকে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
১ দিন আগে