আব্দুর রহমান সার্জিল

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। এ যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না। কিন্তু ছয় মাসে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক ফ্রন্টে, এমনকি ক্যাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত।
এ যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে হামলায় শতাধিক শিশু নিহত হয়।
যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহেও বড় সংকট তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই করছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশের বেশি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
এই যুদ্ধে আনুমানিক ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১০ হাজার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ককেই বদলে দিচ্ছে না; এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন আনছে। নতুন জোট তৈরি হচ্ছে, আবার পুরোনো জোটগুলোর মধ্যেও ফাটল দেখা দিচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পরিষ্কার ছিল না। শুরুতে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে পূর্বপ্রস্তুতিমূলক হামলা চালানো হয়েছে।

তবে যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দাবি এবং ট্রাম্প ও মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে কয়েকটি লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছিল।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও হামলায় যোগ দিয়েছিল। তখন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। কিন্তু এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার দাবি করে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ লাগবে।
যুদ্ধের সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে একাধিক হামলা চালানো হয়েছে। এতে স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ইরানের কাছে এখনো প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, ইরান এই ইউরেনিয়ামের মজুত তাদের হাতে তুলে দিক এবং ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করুক। ইরান এতে রাজি হয়নি। তবে একপর্যায়ে তৃতীয় কোনো দেশের কাছে এই মজুত হস্তান্তরের বিষয়ে তারা আগ্রহ দেখিয়েছিল।
ইরান একই সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অধিকারও ধরে রাখতে চেয়েছে। এ জন্য তুলনামূলক কম মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন হয়।
পরে ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলেছিলেন। এমন অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারত।
১৭ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। এতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা না করার বিষয়ে সম্মত হয়। তবে ইরান আগে থেকেই এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল। সমঝোতা স্মারকের অস্পষ্ট ভাষা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে সেটি ভেঙে পড়ে।
নর্থ ক্যারোলিনার বেলমন্ট অ্যাবি কলেজের অধ্যাপক ও সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ক্লার্ক সামার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বলতে পারে যে তারা এসব লক্ষ্য অর্জন করেছে। তবে ইরান কত দ্রুত আবার নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে, তা বলা কঠিন।
তবে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এএনইউ) ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আলাম সালেহ এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি এখনো টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর আগেই হেরে গিয়েছিল।
তাঁর মতে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা এই যুদ্ধের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও ইরানের আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।
এর দুই দিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে সেটিই হবে সবচেয়ে ভালো বিষয়।
যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প ইরানের জনগণের প্রতি সরকার উৎখাতের আহ্বানও জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। নিহত খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন।
ক্লার্ক সামার্সের মতে, ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যটি হয়তো যুদ্ধের সময় তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করা হয়েছিল, এর আগে ভালোভাবে পরিকল্পিত ছিল না।
আলাম সালেহ বলেন, কোনো দেশের নেতাদের হত্যা করা সামরিক দিক থেকে তাৎক্ষণিক সাফল্য হতে পারে, কিন্তু সেটি কৌশলগত সাফল্য নিশ্চিত করে না।
ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ করা
ইরানের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত জোটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। ইরান এসব গোষ্ঠীকে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, গাজার হামাস এবং ইরাক ও সিরিয়ার কয়েকটি ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী।
ইরান এসব গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন বন্ধ করেছে— এমন কোনো লক্ষণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা সমঝোতা স্মারকেও এ বিষয়ে কোনো শর্ত ছিল না।
ইরানের পক্ষে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে। ইরানও লেবানন ফ্রন্টকে আলোচনার অংশ না করে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা করতে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে হুথিরা ইরানের সমর্থনে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি আরবের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেবে। ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করার কথাও বলেছিল ওয়াশিংটন।
পরে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের প্রায় ৮২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়েছে এবং দেশটির নৌবাহিনীও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এপ্রিলে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ১৫৮টি নৌযানে হামলা চালানো হয়েছে। সেন্টকম ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিভিন্ন কমান্ড সেন্টারে হামলার কথাও জানিয়েছে।
তবে ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। জুলাই মাসে দেশটি একটি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে জর্ডানে তিন মার্কিন সেনা নিহত হন।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার দাবিও জুলাইয়ের সমঝোতা স্মারকে রাখা হয়নি।
জুন মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের তেল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্র দখল ও নিয়ন্ত্রণ করবে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই সরু জলপথটি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। এখন সেই সংখ্যা কমে গড়ে প্রায় পাঁচটিতে দাঁড়িয়েছে।

প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ইরান সেখানে চলাচলকারী কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও প্রণালির আশপাশে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
ট্রাম্প বারবার ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানালেও তেহরান তা করেনি।
বর্তমানে ইরান ওমানের সঙ্গে প্রণালিটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করছে। ইরান এ সপ্তাহে জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে এমন একটি নৌপথে তারা সম্মত হয়েছে, যার ওপর ইরানের আংশিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়েছে এবং এটি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। তবে বাস্তবে সেখানে জাহাজ চলাচল এখনো খুবই কম। ইরান অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরির হাতিয়ার। আলাম সালেহ বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে দেখে।
যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। দেশটির মুদ্রা রিয়াল কার্যত ধসে পড়েছে। খাদ্যের দাম বেড়েছে। মার্কিন অবরোধ ও নতুন করে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি কমেছে।
অবরোধের কারণে ইরানের তেল থেকে আয় অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার কমেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই দুর্বল ছিল। যুদ্ধবিরতির সময় কিছুটা স্বস্তি মিললেও পরিস্থিতি এখনো কঠিন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত সপ্তাহে বলেছেন, অর্থনৈতিক চাপ তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। দেশটি কীভাবে এমন চাপ মোকাবিলা করতে হয়, তা জানে।
যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চাপ অনুভব করেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের জুলাইয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
ক্লার্ক সামার্স বলেন, অনেক আমেরিকান যুদ্ধের কথা ভুলে গেলেও পেট্রোলের দাম বাড়লে তারা তা খুব ভালোভাবেই মনে রাখে। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গ্যাসোলিনের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন অনেক ভোটার।
মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক
ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং সামরিক-বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে ইরানের হামলা হয়েছে।
এসব দেশ ইরানের হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে। ফলে আঞ্চলিকভাবে ইরানের জনপ্রিয়তা কমেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এখনো বজায় আছে। চীন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করছে, আবার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে না।
রাশিয়ার সঙ্গেও ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী রয়েছে।
এই যুদ্ধে ন্যাটোর মিত্রদের কাছ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি। ট্রাম্প সরাসরি আহ্বান জানালেও ইউরোপের দেশগুলো যুদ্ধে যোগ দেয়নি।
স্পেন ও ইতালি যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেছে। জার্মানিও যুদ্ধের সমালোচনা করেছে। ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো, পাকিস্তান ও তুরস্কও যুদ্ধে যোগ দেয়নি। এশিয়ায় জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াও একই অবস্থান নিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগের একটি কারণ হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে তারাও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশটির বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় ৮২ শতাংশ কমেছে।
তবে ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এখনো ইরানের হাতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের আগে যে অবস্থায় ছিল তার তুলনায় এখন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে পারে।
তেহরান একই সঙ্গে সস্তা ও ব্যাপকভাবে উৎপাদিত শাহেদ ড্রোন তৈরি ও ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে।
এপ্রিল পর্যন্ত আনুমানিক ১ হাজার ২২১ জন ইরানি সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
ক্লার্ক সামার্সের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের কিছু শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর মধ্যে বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এ দাবি অস্বীকার করেছে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বছরে মাত্র কয়েক ডজন তৈরি হয় এবং প্রতিটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার।
আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র রেথিয়নের সঙ্গে ২২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। এর ফলে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বছরে ৬০টি থেকে বাড়িয়ে ১ হাজারের বেশি করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধে সরাসরি কোনো বিজয়ী নেই।
এএনইউর অধ্যাপক আলাম সালেহ বলেন, তাদের কেউই কিছু অর্জন করতে পারেনি।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘পরাশক্তি’ হয়েও একটি ‘মধ্যম শক্তির’ বিরুদ্ধে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বাস্তব রাজনৈতিক অর্জনে পরিণত করতে পারেনি।
চীন ও রাশিয়া সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ হলে তারা নতুন করে সামরিক কৌশল নির্ধারণ করতে পারে।
এর প্রভাব তাইওয়ানের ওপরও পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থাকা তার সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরীটি মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরী নেই, যদিও ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের তালিকায় এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইরান টিকে গেছে বলেই যে তারা বিজয়ী হয়েছে, তা নয়।
আলাম সালেহর ভাষায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরাজয় হতে পারে, কিন্তু ইরানের জন্যও এটি বিজয় নয়।
সূত্র: আলজাজিরা

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। এ যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না। কিন্তু ছয় মাসে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক ফ্রন্টে, এমনকি ক্যাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত।
এ যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে হামলায় শতাধিক শিশু নিহত হয়।
যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহেও বড় সংকট তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই করছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশের বেশি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
এই যুদ্ধে আনুমানিক ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১০ হাজার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ককেই বদলে দিচ্ছে না; এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন আনছে। নতুন জোট তৈরি হচ্ছে, আবার পুরোনো জোটগুলোর মধ্যেও ফাটল দেখা দিচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পরিষ্কার ছিল না। শুরুতে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে পূর্বপ্রস্তুতিমূলক হামলা চালানো হয়েছে।

তবে যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দাবি এবং ট্রাম্প ও মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে কয়েকটি লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছিল।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও হামলায় যোগ দিয়েছিল। তখন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। কিন্তু এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার দাবি করে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ লাগবে।
যুদ্ধের সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে একাধিক হামলা চালানো হয়েছে। এতে স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ইরানের কাছে এখনো প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, ইরান এই ইউরেনিয়ামের মজুত তাদের হাতে তুলে দিক এবং ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করুক। ইরান এতে রাজি হয়নি। তবে একপর্যায়ে তৃতীয় কোনো দেশের কাছে এই মজুত হস্তান্তরের বিষয়ে তারা আগ্রহ দেখিয়েছিল।
ইরান একই সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অধিকারও ধরে রাখতে চেয়েছে। এ জন্য তুলনামূলক কম মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন হয়।
পরে ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলেছিলেন। এমন অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারত।
১৭ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। এতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা না করার বিষয়ে সম্মত হয়। তবে ইরান আগে থেকেই এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল। সমঝোতা স্মারকের অস্পষ্ট ভাষা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে সেটি ভেঙে পড়ে।
নর্থ ক্যারোলিনার বেলমন্ট অ্যাবি কলেজের অধ্যাপক ও সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ক্লার্ক সামার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বলতে পারে যে তারা এসব লক্ষ্য অর্জন করেছে। তবে ইরান কত দ্রুত আবার নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে, তা বলা কঠিন।
তবে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এএনইউ) ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আলাম সালেহ এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি এখনো টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর আগেই হেরে গিয়েছিল।
তাঁর মতে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা এই যুদ্ধের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও ইরানের আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।
এর দুই দিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে সেটিই হবে সবচেয়ে ভালো বিষয়।
যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প ইরানের জনগণের প্রতি সরকার উৎখাতের আহ্বানও জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। নিহত খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন।
ক্লার্ক সামার্সের মতে, ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যটি হয়তো যুদ্ধের সময় তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করা হয়েছিল, এর আগে ভালোভাবে পরিকল্পিত ছিল না।
আলাম সালেহ বলেন, কোনো দেশের নেতাদের হত্যা করা সামরিক দিক থেকে তাৎক্ষণিক সাফল্য হতে পারে, কিন্তু সেটি কৌশলগত সাফল্য নিশ্চিত করে না।
ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ করা
ইরানের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত জোটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। ইরান এসব গোষ্ঠীকে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, গাজার হামাস এবং ইরাক ও সিরিয়ার কয়েকটি ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী।
ইরান এসব গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন বন্ধ করেছে— এমন কোনো লক্ষণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা সমঝোতা স্মারকেও এ বিষয়ে কোনো শর্ত ছিল না।
ইরানের পক্ষে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে। ইরানও লেবানন ফ্রন্টকে আলোচনার অংশ না করে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা করতে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে হুথিরা ইরানের সমর্থনে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি আরবের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেবে। ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করার কথাও বলেছিল ওয়াশিংটন।
পরে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের প্রায় ৮২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়েছে এবং দেশটির নৌবাহিনীও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এপ্রিলে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ১৫৮টি নৌযানে হামলা চালানো হয়েছে। সেন্টকম ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিভিন্ন কমান্ড সেন্টারে হামলার কথাও জানিয়েছে।
তবে ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। জুলাই মাসে দেশটি একটি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে জর্ডানে তিন মার্কিন সেনা নিহত হন।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার দাবিও জুলাইয়ের সমঝোতা স্মারকে রাখা হয়নি।
জুন মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের তেল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্র দখল ও নিয়ন্ত্রণ করবে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই সরু জলপথটি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। এখন সেই সংখ্যা কমে গড়ে প্রায় পাঁচটিতে দাঁড়িয়েছে।

প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ইরান সেখানে চলাচলকারী কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও প্রণালির আশপাশে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
ট্রাম্প বারবার ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানালেও তেহরান তা করেনি।
বর্তমানে ইরান ওমানের সঙ্গে প্রণালিটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করছে। ইরান এ সপ্তাহে জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে এমন একটি নৌপথে তারা সম্মত হয়েছে, যার ওপর ইরানের আংশিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়েছে এবং এটি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। তবে বাস্তবে সেখানে জাহাজ চলাচল এখনো খুবই কম। ইরান অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরির হাতিয়ার। আলাম সালেহ বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে দেখে।
যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। দেশটির মুদ্রা রিয়াল কার্যত ধসে পড়েছে। খাদ্যের দাম বেড়েছে। মার্কিন অবরোধ ও নতুন করে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি কমেছে।
অবরোধের কারণে ইরানের তেল থেকে আয় অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার কমেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই দুর্বল ছিল। যুদ্ধবিরতির সময় কিছুটা স্বস্তি মিললেও পরিস্থিতি এখনো কঠিন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত সপ্তাহে বলেছেন, অর্থনৈতিক চাপ তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। দেশটি কীভাবে এমন চাপ মোকাবিলা করতে হয়, তা জানে।
যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চাপ অনুভব করেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের জুলাইয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
ক্লার্ক সামার্স বলেন, অনেক আমেরিকান যুদ্ধের কথা ভুলে গেলেও পেট্রোলের দাম বাড়লে তারা তা খুব ভালোভাবেই মনে রাখে। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গ্যাসোলিনের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন অনেক ভোটার।
মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক
ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং সামরিক-বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে ইরানের হামলা হয়েছে।
এসব দেশ ইরানের হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে। ফলে আঞ্চলিকভাবে ইরানের জনপ্রিয়তা কমেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এখনো বজায় আছে। চীন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করছে, আবার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে না।
রাশিয়ার সঙ্গেও ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী রয়েছে।
এই যুদ্ধে ন্যাটোর মিত্রদের কাছ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি। ট্রাম্প সরাসরি আহ্বান জানালেও ইউরোপের দেশগুলো যুদ্ধে যোগ দেয়নি।
স্পেন ও ইতালি যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেছে। জার্মানিও যুদ্ধের সমালোচনা করেছে। ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো, পাকিস্তান ও তুরস্কও যুদ্ধে যোগ দেয়নি। এশিয়ায় জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াও একই অবস্থান নিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগের একটি কারণ হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে তারাও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশটির বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় ৮২ শতাংশ কমেছে।
তবে ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এখনো ইরানের হাতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের আগে যে অবস্থায় ছিল তার তুলনায় এখন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে পারে।
তেহরান একই সঙ্গে সস্তা ও ব্যাপকভাবে উৎপাদিত শাহেদ ড্রোন তৈরি ও ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে।
এপ্রিল পর্যন্ত আনুমানিক ১ হাজার ২২১ জন ইরানি সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
ক্লার্ক সামার্সের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের কিছু শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর মধ্যে বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এ দাবি অস্বীকার করেছে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বছরে মাত্র কয়েক ডজন তৈরি হয় এবং প্রতিটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার।
আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র রেথিয়নের সঙ্গে ২২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। এর ফলে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বছরে ৬০টি থেকে বাড়িয়ে ১ হাজারের বেশি করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধে সরাসরি কোনো বিজয়ী নেই।
এএনইউর অধ্যাপক আলাম সালেহ বলেন, তাদের কেউই কিছু অর্জন করতে পারেনি।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘পরাশক্তি’ হয়েও একটি ‘মধ্যম শক্তির’ বিরুদ্ধে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বাস্তব রাজনৈতিক অর্জনে পরিণত করতে পারেনি।
চীন ও রাশিয়া সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ হলে তারা নতুন করে সামরিক কৌশল নির্ধারণ করতে পারে।
এর প্রভাব তাইওয়ানের ওপরও পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থাকা তার সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরীটি মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরী নেই, যদিও ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের তালিকায় এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইরান টিকে গেছে বলেই যে তারা বিজয়ী হয়েছে, তা নয়।
আলাম সালেহর ভাষায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরাজয় হতে পারে, কিন্তু ইরানের জন্যও এটি বিজয় নয়।
সূত্র: আলজাজিরা
.png)

গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদনে ধস, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার অপচয় আর বাসাবাড়িতে নিভু নিভু চুলা—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদেরও উদ্বেগের কারণ। এটি সত্য, গ্যাসের সমস্যা নতুন নয়। তবে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে ঠিক
২৭ আগস্ট ২০২৬
চীন-তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যা-ভূমিধসের ব্যাপক বিধ্বংসী রূপ দেখা যাচ্ছে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত প্রলয়ঙ্করী এই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৬২, বিদেশি পর্যটকসহ নিখোঁজ ৪ শতাধিক মানুষ। সুবিশাল হিমালয়ের কোলের দেশটিতে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়।
২৭ আগস্ট ২০২৬
জেন-জিদের সাম্প্রতিক আন্দোলন ও বিক্ষোভ এশিয়াজুড়ে রাজনীতির প্রচলিত বয়ান বদলে দিচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে– রাজপথে তারুণ্যের প্রতিবাদ কী তাহলে শাসন ক্ষমতা ও স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, নাকি আন্দোলন শেষে তাদের তেজ নিঃশেষ হয়ে যায়?
২৬ আগস্ট ২০২৬
দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার পর ৩১ বছর কেটে গেছে। এই তিন দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক দূর এগিয়েছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র— সর্বস্তরে নারীদের সরব উপস্থিতি দৃশ্যমান। কিন্তু ৩১ বছর পরও যে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে—নারীর নিরাপত্তা কতটা বাড়ল? ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের
২৪ আগস্ট ২০২৬