বিশ্লেষণ/ইয়াসমিন ধর্ষণ-হত্যার ৩১ বছর পর কতটা বদলাল নারীর নিরাপত্তা

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৫৫
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার পর ৩১ বছর কেটে গেছে। এই তিন দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক দূর এগিয়েছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র— সর্বস্তরে নারীদের সরব উপস্থিতি দৃশ্যমান। কিন্তু ৩১ বছর পরও যে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে—নারীর নিরাপত্তা কতটা বাড়ল?

ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের পর নারী সুরক্ষায় দেশে অনেক কঠোর আইন হয়েছে, ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও খবরের কাগজের পাতা উল্টালে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলে আজও প্রতিদিন চোখে পড়ে অসংখ্য নাম না জানা নারীর ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের চিত্র। রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, সাইবার স্পেস এমনকি নিজের গৃহকোণেও নারীদের নিরাপত্তার চরম অভাব আজও প্রবলভাবে দৃশ্যমান।

আইনের আধুনিকায়ন হলেও দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির স্থবিরতা এবং ক্ষমতাবানদের প্রভাব বিস্তারের কারণে নারী নির্যাতনের চিত্র আগের মতোই রয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃষ্টিকটুভাবে বেড়েছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট যা ঘটেছিল

দিনাজপুরের ১৪ বছর বয়সী ইয়াসমিন আক্তার ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করত। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট সে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী একটি নৈশ কোচে করে যাত্রা করেছিল। ভুল করে ঠাকুরগাঁওগামী বাসে ওঠায় রাত প্রায় তিনটার দিকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে এসে কোচ থেকে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এসময় কোচের সুপারভাইজার দশমাইল মোড়ের পানদোকানি জাবেদ আলী, ওসমান গনি ও রহিমসহ আশপাশের কিছু স্থানীয় ব্যক্তির কাছে মেয়েটিকে রেখে যান এবং অনুরোধ করেন, সকাল হলে যেন তাকে দিনাজপুর শহরগামী কোনো একটি গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়।

ছবি: বিবিসি বাংলা থেকে নেওয়া
ছবি: বিবিসি বাংলা থেকে নেওয়া

এর কিছুক্ষণ পরই সেখানে হাজির হয় দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার একটি টহল পুলিশ ভ্যান। পুলিশ সদস্যরা মেয়েটির পরিচয় জানতে চান, এবং একপর্যায়ে তাকে শহরের রামনগর এলাকায় তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পিকআপ ভ্যানে তুলে নেন। এরপর ভ্যানটি দশমাইলের কাছাকাছি সাধনা আদিবাসী প্রাথমিক স্কুলের সামনে এসে থামে।

সেখানেই পুলিশ সদস্যরা ইয়াসমিনকে স্কুলের ভেতরে নিয়ে গিয়ে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করেন এবং পরে তাকে হত্যা করেন। এরপর তারা দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের রানীগঞ্জ এলাকায় একটি বাড়ির সামনে তার মরদেহ ফেলে রেখে চলে যান।

পরদিন সকালে সেই স্থানে ইয়াসমিনের লাশ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ডাক্তারি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয় যে, পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই ধর্ষণের শিকার হয়ে খুন হয়েছিল দিনাজপুরের এই কিশোরী।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দিনাজপুরে শুরু হয় তীব্র আন্দোলন। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের গুলিতে সাতজন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হন। ইয়াসমিনের হত্যার বিচার দাবির সেই আন্দোলন পরে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়।

তিন অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিচার হয়। তারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনজনেরই ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২৪ আগস্ট এখনো বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের প্রতীকী দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়। কিন্তু ইয়াসমিন হত্যার ৩১ বছর পর বাংলাদেশ কি সত্যিই বদলেছে?

২০২৬ সালেও থামেনি ধর্ষণ

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ১২ বছরের কম বয়সী অন্তত ৫৬টি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬ জনের বয়স ছিল ছয় বছরের নিচে।

শুধু পরিসংখ্যান নয়, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা দেখলেই সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। চলতি বছরের জুনে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় পাঁচ বছরের শিশু নিশামণিকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর নদীতে ফেলে হত্যার অভিযোগ ওঠে। মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত।

এর আগে ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। চট্টগ্রামে সাত বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল নিশা ইরাকে সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের গভীর জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। আবার নেত্রকোনায় ১১ বছরের এক মেয়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ধর্ষণের শিকার হয়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি করে।

গত জুলাই মাসে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, এক মাসেই ধর্ষণের ৯০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে । জুনে যা ছিল ৬৮টিতে।

আইন আছে, শাস্তিও কঠোর হয়েছে

১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন হত্যার সময় বর্তমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের যে বিধি, তা ছিল না। পরে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দমনে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো তৈরি করে। বর্তমানে ধর্ষণের ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ ধারায় কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ২০২০ সালের সংশোধনের পর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড; পাশাপাশি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।

আইনে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন সহিংসতা এবং নারী-শিশুর ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ফৌজদারি আইনেও ধর্ষণের সংজ্ঞা ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিধান রয়েছে।

আইনের সাম্প্রতিক সংস্কারেও দ্রুত বিচারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধনী উদ্যোগে ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি যৌন হয়রানির সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাগজে-কলমে তাই বাংলাদেশের আইন এখন ১৯৯৫ সালের চেয়ে অনেক কঠোর।

বিচার কতটা নিশ্চিত

কঠোর আইন থাকলেই অপরাধ কমে না, যদি মামলা করা, তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচার প্রক্রিয়া কার্যকর না হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোর বড় সমস্যা হিসেবে মামলার জট, দীর্ঘসূত্রতা এবং কম হারে সাজা হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্লেষণ করা ৪ হাজারের বেশি মামলার মাত্র ৩ শতাংশে সাজা হয়েছে। আইনে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা থাকলেও একটি মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে সময় লেগেছে তিন বছর সাত মাস।

ছবি: বিবিসি বাংলা থেকে নেওয়া
ছবি: বিবিসি বাংলা থেকে নেওয়া

অনেক মামলায় তদন্ত শেষ করতেই দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে বাধ্য হয়। সামাজিক ভয়, অর্থনৈতিক চাপ এবং আসামিপক্ষের প্রভাবও অনেক পরিবারকে মামলা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করে।

তবে সব মামলার চিত্র একই নয়। ২০২৬ সালে পল্লবীর শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলায় সারা দেশের মানুষের চাপের মুখে আসামি সোহেল রানা ও স্ত্রী স্বপ্না খাতুন উভয়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্র চাইলে দ্রুত বিচার সম্ভব।

৩১ বছরে বদলটা কোথায়

ইয়াসমিনের সময়ে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়েছিল। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনগুলো অনেক দ্রুত জনমত তৈরি করতে পারে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন আগের তুলনায় বেশি প্রকাশ্যে আসে। আইনও হয়েছে কঠোর।

কিন্তু বাস্তবতা হলো ধর্ষণের অনেক ঘটনা এখনো প্রকাশ্যে আসে না। সামাজিক লজ্জা, ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক পরিবারকে নীরব থাকতে বাধ্য করে। ফলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানও পুরো বাস্তবতার প্রতিফলন নয়।

নারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন তাই শুধু আইন বা শাস্তির প্রশ্ন নয়। পুলিশি জবাবদিহি, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ফরেনসিক সক্ষমতা, সাক্ষী সুরক্ষা, আদালতের মামলাজট কমানো এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সামাজিক-মানসিক সহায়তা সবকিছুর সমন্বয় দরকার।

ইয়াসমিন হত্যার ৩১ বছর পর বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে অনেক দূর এগিয়েছে। আইন বদলেছে, বিচারব্যবস্থায় এসেছে নানা উদ্যোগ, বেড়েছে সচেতনতা। কিন্তু পাঁচ বছরের শিশু, ১১ বছরের কিশোরী কিংবা ঘর থেকে বের হওয়া একজন নারী যদি আজও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে সেই অগ্রগতির কী মানে?

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত