অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়ে বিতর্ক কেন, তিন সরকারের আমলে এটি কেন পাল্টেছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০০: ৩০
ছবি: মেডএক্স থেকে নেওয়া

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। হাতে স্টেথোস্কোপ, মাথায় প্রশ্ন—দেশ তো স্বাধীন হলো, দেশের গরিব মানুষগুলো অসুখ হলে ওষুধ কিনবে কীভাবে? বিলেতে ভাস্কুলার সার্জন হিসেবে কাজ করার সময় তিনি দেখেছিলেন, পশ্চিমা ওষুধ কোম্পানিগুলো কীভাবে গরিব দেশের বাজারে অ্যান্টিবায়োটিকের বদলে ভিটামিন, টনিক আর গ্রাইপ ওয়াটার বিক্রি করে মুনাফা করে। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি দেশে ফিরে সাভারে গড়ে তোলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। তারপর হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ওষুধনীতির রূপকারদের একজন।

আটজনের কমিটি, ছিল না কোনো আমলা

১৯৮২ সালের ২৮ এপ্রিল। দেশের ওষুধ খাতে শৃঙ্খলা আনতে আটজনের একটি কমিটি গঠন করল তৎকালীন সেনা শাসক। কিন্তু কমিটিতে রাখা হলো না কোনো সরকারি আমলাকে। কমিটির সবাই ছিলেন চিকিৎসাবিদ্যার মানুষ। পিজি হাসপাতালের (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ) তৎকালীন অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম ছিলেন কমিটির চেয়ারম্যান, আর জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সেই কমিটির একজন সদস্য। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কারসাজি সবচেয়ে জোরালোভাবে যিনি সামনে এনেছিলেন, তিনিই জাফরুল্লাহ। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের বদলে অপ্রয়োজনীয় ওষুধে বাজার সয়লাব করে মানুষকে ঠকানোর চিত্র তিনি জনসম্মুখে তুলে ধরেছিলেন।

এই কমিটির সুপারিশেই তৈরি হয় ‘জাতীয় ওষুধনীতি ১৯৮২’। এর মূল কথা ছিল দেশের মানুষের আসল প্রয়োজন যেসব ওষুধে মেটে, সেগুলো চিহ্নিত করে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী দামে বাজারে রাখতে হবে। আর অপ্রয়োজনীয়, ক্ষতিকর বা নকল ওষুধ বাজার থেকে সরাতে হবে। এই নীতির হাত ধরেই বিদেশি কোম্পানির একচেটিয়া বাজার ভেঙে দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশের পথ খুলে যায়। আজ বাংলাদেশ নিজের চাহিদার প্রায় ৯৭-৯৮ শতাংশ ওষুধ নিজেই তৈরি করে, এমনকি আমেরিকা-ইউরোপেও রপ্তানি করে। এই অর্জন এসেছে সেই ১৯৮২ সালের ওষুধনীতির পথ ধরেই।

এ ছাড়া সাধারণ মানুষ পেয়েছে বিরাট সুফল। নির্দিষ্ট কিছু ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ চিহ্নিত করে সরকার তার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) বেঁধে দিত। ফলে যে কোম্পানিই তৈরি করুক না কেন, একই জেনেরিক ওষুধের দাম সব জায়গায় প্রায় একরকম থাকত। এতে গরিব রোগীকে বাজারের খামখেয়ালিপনার শিকার হতে হতো না। বলে রাখা ভালো, সেই ওষুধনীতিতে ১৫০টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। আর ১৭৪২টি ওষুধকে অপ্রয়োজনীয় চিহ্নিত করে সেগুলোর উৎপাদন ও বিপণন বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছিল।

তিন দশক পর কেন নতুন করে তালিকা বড় হলো

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সেই তালিকাটা পরে বদলে যায়। ১৯৯৪ সালে অত্যাবশ্যকীয় তালিকা ১৫০ থেকে কমিয়ে ১১৭-তে নামানো হয়। বাকি সব ছেড়ে দেওয়া হয় বাজারের হাতে। এরপর তিন দশক ধরে এই সংখ্যা আর বাড়েনি। কিন্তু বাজারে ওষুধের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় দেড় হাজারে। ফলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা প্রায় ১৩০০ ওষুধের দামে তৈরি হয় বিশাল বৈষম্য। স্বাস্থ্যখাতে মানুষের মোট খরচের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই চলে যেতে থাকে ওষুধ কিনতে।

এই ফাঁক পূরণ করতেই বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর হাইকোর্ট এক রায়ে পুরনো ১১৭ ওষুধের তালিকা বাতিল করে নতুন করে তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন। এর ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি ‘জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ অনুমোদিত হয়। সেখানে ওষুধের সংখ্যা ১১৭ থেকে বাড়িয়ে ২৯৫টি করা হয়। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান তখন একে ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী’ সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছিলেন। কারণ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগ ও রোগীর চিকিৎসা এই তালিকার আওতায় চলে আসার কথা ছিল। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চার বছরে ধাপে ধাপে (বছরে ২৫ শতাংশ হারে) নতুন নির্ধারিত দামে নামিয়ে আনার সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, যাতে শিল্পের ওপর হঠাৎ ধাক্কা না লাগে।

বিএনপি সরকার বাতিল করল অন্তর্বর্তী সরকারের সেই তালিকা

সাত মাস না পেরোতেই দৃশ্যপট বদলে গেল। গত ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। সরকারের যুক্তি হচ্ছে, ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী নতুন কোনো তালিকা করার আগে ‘জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ’-এর পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত তালিকাটি সেই পরিষদের মতামত ছাড়াই তৈরি হয়েছিল। ফলে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিটও হয়েছে, যা এখনো বিচারাধীন। এই আইনি ফাঁক এড়াতেই সরকার গত ২৯ জুন নতুন করে ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে এবং পুরনো তালিকা বাতিল করে ১৯৯৪ সালের সেই ১১৭ ওষুধের তালিকাতেই সাময়িকভাবে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার বলেছে, তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়া চলবে, তবে এবার নিয়মমাফিক পরামর্শ নিয়ে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কেন সমালোচনা

সরকার যতই বলুক, তারা একটি প্রশাসনিক ভুল সংশোধনের চেষ্টা করছে, কিন্তু বাস্তবে তো মানুষের পকেটই কাটা পড়ছে। সংগত কারণেই সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে মানুষ। কয়েক মাস আগে যে ২৯৫টি ওষুধ সরকারনির্ধারিত সাশ্রয়ী দামে কেনার প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন মানুষ, রাতারাতি সেই সুরক্ষা সংকুচিত হয়ে ফিরে গেল তিন দশক আগের ১১৭ ওষুধের গণ্ডিতে। যে প্রায় ১৭৮টি ওষুধ নতুন করে নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছিল, সেগুলো আবার বাজারের খামখেয়ালি দামের মুখে পড়ল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলছেন, আইনি ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করে তালিকাটা বহাল রাখা যেত না কি? পুরো তালিকা বাতিল করে পুরনো, সংকীর্ণ কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে? সাধারণ রোগীর, নাকি যেসব ওষুধ কোম্পানি নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে বেশি মুনাফা করছিল, তাদের? জাফরুল্লাহ চৌধুরীর হাতে গড়া যে নীতি একদিন গরিবের ওষুধ প্রাপ্তির লড়াই ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার সেই লড়াইকে আধুনিক যুগে টেনে এনে সম্প্রসারিত করেছিল বলে অনেকে মনে করতেন। এখন সেই সম্প্রসারণ বাতিল হওয়ায় সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এটাকে দেখছেন জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতি থেকে পিছু হটা হিসেবে।

সরকার অবশ্য বলছে, এটা স্থায়ী পশ্চাদপসরণ নয়। নিয়মমাফিক প্রক্রিয়ায় তালিকা আবার হালনাগাদ হবে। দাম এমনভাবে ঠিক করা হবে যাতে মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতাও বজায় থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমলাতান্ত্রিক ও আইনি প্রক্রিয়ার প্যাঁচে যতদিন নতুন তালিকা তৈরি না হচ্ছে, ততদিন যে দেড় হাজার ওষুধের মধ্যে মাত্র ১১৭টির দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বাকিগুলোর দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, ফলে সবচেয়ে বেশি ভুগবে সেই দরিদ্র রোগীরাই।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত