সীতাকুণ্ডে হত্যা মামলার আসামি গণপিটুনিতে নিহত, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

সীতাকুণ্ডে হামলায় নিহত নুরুল ইসলাম ওরফে ইরান ও তার বাড়ি। সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কিশোর নাঈম হত্যা মামলার প্রধান আসামি মো. নুরুল ইসলাম ওরফে ইরান (৪০) গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার (২৫ জুলাই) গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা তার ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এ ঘটনায় গুরুতর আহত তার এক সহযোগী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাড়িতে হামলার ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ভাটেরখীল এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। মারধরে আহত যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুল ইসলাম। তবে আজ রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত পিটিয়ে হত্যা ও আগুনের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ আলমগীর।

আজ রোববার দুপুরে ইরানের ছেলে রিফাত অভিযোগ করেন, ‘আমার বাবা মাদক কেনাবেচা নিয়ে এক ছেলেকে মারধর করেছে, সেই ছেলেটি মারা গেছে। তা নিয়ে গতকাল গ্রামবাসী আমাদের বাড়ি হামলা করে। এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী মুরাদপুর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির শহিদুল ইসলাম ও ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. এজহারুল ইসলাম এজহার। তারা মানুষজন নিয়ে আমাদের বাড়ির ওপর হামলা করে।’

সীতাকুণ্ড থানা-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নুর ইসলাম ওরফে ইরানের বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কিশোর নাঈম উদ্দিন ও ছাত্রলীগ নেতা শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি তিনি। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলাও রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন বলে জানান স্থানীয়রা।

এর আগে ২০ জুলাই (সোমবার) রাতে নাঈম উদ্দিনকে (১৬) তুলে নিয়ে নির্যাতন চালায় ইরানের সহযোগীরা। পরে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শনিবার সন্ধ্যায় নুর ইসলাম ইরানকে প্রধান আসামি করে থানায় একটি মামলা করেন নাঈমের বাবা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত সোমবার রাতে নাঈমকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে ইরানের সহযোগীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে বাড়ির পাশে ফেলে যায় তারা। নাঈমকে উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শনিবার ভোরের দিকে তার মৃত্যু হয়।

এদিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। গতকাল রাতে নাঈমের জানাজা শেষে ইরান ও তার সহযোগীদের খুঁজতে থাকে বিক্ষুব্ধ লোকজন। প্রথমে তার এক সহযোগীকে ধরে গণপিটুনি দেয় তারা। পরে পশ্চিম ভাটেরখীল এলাকায় ইরানের আত্মগোপনের খবর পেয়ে রাতে ওই ঘর ঘিরে ফেলে এলাকাবাসী। এ সময় উত্তেজিত জনতার এলোপাতাড়ি মারধরে নিহত হন ইরান। পরে ওই বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

ইরানের স্ত্রী খালেদা বেগম বলেন, অপরাধের বিচার আইনের মাধ্যমে হওয়া উচিত ছিল। গণপিটুনি দিয়ে হত্যা এবং বাড়িতে আগুন দেওয়ায় তারা নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

রিফাত বলেন, ‘আমার কথা হচ্ছে, আমার বাবা অন্যায়কারী, তাকে লোকজন মেরেছে। কিন্তু এই যে আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, এর দায়ভার কে নেবে?’ তিনি জানান, হামলাকারীরা গোয়ালঘরসহ ২৩টি ঘর ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে। শুরুতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগুন দেয়, যার বর্তমান বাজারদর সাড়ে ছয় লাখ টাকার বেশি।

হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মুরাদপুর ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. এজহারুল ইসলাম এজহারের ব্যক্তিগত ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম বলেন, নাঈম হত্যাকাণ্ডে শনিবার নুরুল ইসলাম ওরফে ইরানের বিরুদ্ধে মামলার পর তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালালেও ধরা সম্ভব হয়নি। রাতে গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে চিকিৎসাধীন তার এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এদিকে ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যরা নজরদারি চালাচ্ছেন। কিশোর হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনিতে মৃত্যু এবং অগ্নিসংযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত