মাহবুবুল আলম তারেক

একসময় পাকিস্তানের নাম উচ্চারিত হতো বিদ্যুৎ সংকট, লোডশেডিং আর জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে। দিনের পর দিন বিদ্যুৎ থাকত না, শিল্পকারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিত, আর সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ খাত টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হতো। সেই পাকিস্তানই আজ বিশ্বের আলোচিত সৌরবিদ্যুৎ বাজারগুলোর একটি।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে লাখো পরিবার, হাজারো শিল্পকারখানা ও অসংখ্য কৃষি খামার নিজেদের উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকেছে। এমনকি এত বিপুল পরিমাণ সোলার প্যানেল আমদানি হয়েছে যে, সেটি দেশটির পুরো জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিবর্তনের নায়ক সরকার নয়। নায়ক সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশও এখন এক ধরনের জ্বালানি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির ব্যয়, ডলার সংকট, উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং ভর্তুকির চাপ বেড়েই চলেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে—পাকিস্তানের সৌর বিপ্লব থেকে বাংলাদেশ কী শিখতে পারে?
পাকিস্তানের সৌরবিপ্লবকে দেশটির জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন—‘সোলার রাশ’। এটি কোনো পরিকল্পিত সরকারি কর্মসূচি নয়। কোনো বড় বাজেটও ছিল না। বরং মানুষ নিজেই বুঝতে পেরেছে যে, জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার চেয়ে নিজের ছাদে সোলার প্যানেল বসানো বেশি লাভজনক। ফলে তারা একযোগে সোলারের দিকে ঝুঁকেছে।
পাকিস্তানের সিভিল সোসাইটি সংগঠন ‘রিনিউয়েবলস ফার্স্ট’-এর স্পেশাল ইনিশিয়েটিভস ও চায়না প্রোগ্রামের ম্যানেজার মোহাম্মদ বাসিত ঘৌরি মঙ্গলবার (২৩ জুন) ঢাকায় সিপিডির এক সেমিনারে এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, গত কয়েক বছরে পাকিস্তান প্রায় ৫০ গিগাওয়াট সোলার প্যানেল আমদানি করেছে। অথচ দেশটির জাতীয় গ্রিডের মোট সক্ষমতা প্রায় ৪৮ গিগাওয়াট।
এই আমদানিকৃত প্যানেলের মধ্যে ২৮ থেকে ৩৮ গিগাওয়াট ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এর প্রায় ৯৮ শতাংশই বিকেন্দ্রীভূত বা ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার—অর্থাৎ বাড়ি, দোকান, শিল্পকারখানা এবং কৃষি খামারে।
এটি আসলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক নতুন দর্শন। আগে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত সরকার বা বড় কোম্পানি। এখন একজন গৃহস্থ, একজন ব্যবসায়ী কিংবা একজন কৃষকও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী।
পাকিস্তানের এই পরিবর্তনের পেছনে তিনটি কারণ সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। প্রথম কারণ, বিদ্যুতের দাম। আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচির আওতায় পাকিস্তানে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে (২০২১-২০২৪) বিদ্যুতের দাম প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। এতে মানুষ বিকল্প খুঁজতে শুরু করে।
বাসিত ঘৌরি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, মানুষ সৌর বিদ্যুতের প্রতি ভালোবাসার কারণে সোলারে যায়নি। তারা গেছে কারণ গ্রিডের বিদ্যুৎ তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
দ্বিতীয় কারণ, সোলার প্যানেলের দাম কমে যাওয়া। চীনে ব্যাপক উৎপাদনের কারণে বিশ্ববাজারে সোলার প্যানেলের দাম দ্রুত কমে আসে। প্রতি ওয়াট প্যানেলের দাম ৩২ সেন্ট থেকে নেমে প্রায় ১৬ সেন্টে আসে। অর্থাৎ একদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সোলার সস্তা হচ্ছে। ফলে এটি মানুষের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
তৃতীয় কারণ, সরকারের নীতিগত সহায়তা। পাকিস্তান সরকার সোলার প্যানেলের ওপর শূন্য আমদানি শুল্ক আরোপ করে। পাশাপাশি নেট মিটারিং সুবিধা চালু করে, যাতে একজন গ্রাহক নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারেন। অর্থাৎ সরকার মানুষকে সোলার ব্যবহার করতে বাধ্য করেনি, বরং পথটা সহজ করে দিয়েছে।
পাকিস্তানের সৌরবিপ্লবের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এর অর্থায়ন। প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের এই বিপুল বিনিয়োগের ৯৫ শতাংশই এসেছে সাধারণ মানুষের নিজস্ব অর্থ থেকে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবদান মাত্র ৫ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ মানুষ বিশ্বাস করেছে, সোলারে বিনিয়োগ করলে তারা লাভবান হবে।
এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা। কারণ আমাদের দেশে প্রায়ই মনে করা হয়, বড় অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভব নয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষ যদি লাভ দেখতে পায়, তাহলে তারা নিজেরাই বিনিয়োগ করবে।
প্রথম লাভ হলো জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়া। বাসিত ঘৌরির দাবি, সৌরবিদ্যুতের কারণে পাকিস্তান প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের তেল ও গ্যাস আমদানি এড়াতে পেরেছে। একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বিশাল সাফল্য।
দ্বিতীয় লাভ হলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তন। বাসিত ঘৌরি জানান, পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের প্রায় ৭৩ শতাংশই গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ। অর্থাৎ এটি শুধু শহরের ধনী মানুষের প্রযুক্তি নয়।
তৃতীয় লাভ হলো কর্মসংস্থান। সোলার প্যানেল বিক্রি, স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি, ইনভার্টার—সব মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
চতুর্থ লাভ হলো পরিবেশ। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমায় কার্বন নিঃসরণও কমছে।
তবে পাকিস্তানের গল্পের আরেকটি দিকও আছে। যখন লাখ লাখ মানুষ নিজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, তখন জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায়। ফলে বড় বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহার কমে যায়।
কিন্তু এসব কেন্দ্রের জন্য সরকারকে এখনও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে মানুষ সোলারে যাচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচও বহন করতে হচ্ছে। এটি পাকিস্তানের নতুন চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাটারি। সোলার দিনে বিদ্যুৎ দেয়, কিন্তু রাতে নয়। তাই এখন পাকিস্তানে ব্যাটারি স্টোরেজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সোলারের পর পাকিস্তানের পরবর্তী বিপ্লব হবে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে।
বাংলাদেশের গল্প পাকিস্তানের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। ২০০৩ সালে সৌরবিদ্যুতের পথে হাঁটা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আতিকুজ্জামান সাজিদ জানান, সোলার হোম সিস্টেম বা এসএইচএস কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসে।
একসময় এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অফ-গ্রিড সৌর কর্মসূচিগুলোর একটি। কিন্তু জাতীয় গ্রিড দ্রুত গ্রামে পৌঁছে যাওয়ায় এই মডেল জনপ্রিয়তা হারায়। আজ অনেক সৌর হোম সিস্টেম অকেজো।
এখানেই বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা। প্রযুক্তি স্থাপন করাই শেষ কথা নয়। সেটিকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা হবে, তার পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রুফটপ সোলারে। সিপিডির গবেষণা বলছে, দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার নেট মিটারিংভিত্তিক রুফটপ সোলার ইনস্টলেশন রয়েছে। এসব থেকে ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ ঢাকায়।
পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল, ওষুধ শিল্প, সিরামিক, কোল্ড স্টোরেজ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প—এসব খাতে বিশাল পরিমাণ ছাদ রয়েছে। অর্থাৎ জায়গার সংকট থাকলেও ছাদের সংকট নেই।
এছাড়া দেশে ৩ হাজারের বেশি সৌরচালিত সেচপাম্প রয়েছে। কিন্তু এগুলোর বড় অংশ এখনও গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত নয়। সঠিক নীতি গ্রহণ করা গেলে এখানেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রথম বাধা অর্থায়ন। বাংলাদেশে সহজ শর্তে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঋণ পাওয়া যায় না। ব্যাংকগুলো ছোট অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। দ্বিতীয় বাধা কর ও শুল্ক। বর্তমানে সৌর যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর কাঠামোয় বৈষম্য রয়েছে।
স্রেডার (টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) চেয়ারম্যান ড. আশরাফুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ আমদানিকারকদের প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়, যেখানে অন্যদের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ১ শতাংশ। এই বৈষম্য দূর করা জরুরি।
তৃতীয় বাধা নীতিগত জটিলতা। নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির নিয়মও এক নয়। চতুর্থ বাধা মানসিকতা। আমরা এখনও বিদ্যুৎকে শুধু বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে উৎপাদিত একটি সেবা হিসেবে দেখি।
কিন্তু বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। এখন একজন গ্রাহক একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী এবং উৎপাদকও হতে পারেন।
পাকিস্তানের সৌরবিপ্লবের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জ্বালানি রূপান্তর সবসময় সরকারের হাত ধরে আসে না। অনেক সময় মানুষই পরিবর্তনের সূচনা করে। সরকারের কাজ হলো সেই পরিবর্তনের পথ সহজ করা।
শুল্ক কমানো, সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা, নেট মিটারিং সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন—এই কাজগুলো সরকার করতে পারে। বাকি কাজটা করবে মানুষ।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। প্রশ্নটি আর শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, সেটি নয়।
প্রশ্নটি হলো—আমরা কি ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীভূত, সাশ্রয়ী এবং জনগণনির্ভর করতে পারব?
পাকিস্তান সেই পথের একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। তাদের সবকিছু অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ অবশ্যই আছে।
আর সেই শিক্ষা যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের পরবর্তী বড় পরিবর্তন হয়তো কোনো নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রে নয়, বরং লাখো মানুষের ঘরের ছাদেই শুরু হবে।

একসময় পাকিস্তানের নাম উচ্চারিত হতো বিদ্যুৎ সংকট, লোডশেডিং আর জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে। দিনের পর দিন বিদ্যুৎ থাকত না, শিল্পকারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিত, আর সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ খাত টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হতো। সেই পাকিস্তানই আজ বিশ্বের আলোচিত সৌরবিদ্যুৎ বাজারগুলোর একটি।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে লাখো পরিবার, হাজারো শিল্পকারখানা ও অসংখ্য কৃষি খামার নিজেদের উদ্যোগে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকেছে। এমনকি এত বিপুল পরিমাণ সোলার প্যানেল আমদানি হয়েছে যে, সেটি দেশটির পুরো জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিবর্তনের নায়ক সরকার নয়। নায়ক সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশও এখন এক ধরনের জ্বালানি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির ব্যয়, ডলার সংকট, উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং ভর্তুকির চাপ বেড়েই চলেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে—পাকিস্তানের সৌর বিপ্লব থেকে বাংলাদেশ কী শিখতে পারে?
পাকিস্তানের সৌরবিপ্লবকে দেশটির জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন—‘সোলার রাশ’। এটি কোনো পরিকল্পিত সরকারি কর্মসূচি নয়। কোনো বড় বাজেটও ছিল না। বরং মানুষ নিজেই বুঝতে পেরেছে যে, জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার চেয়ে নিজের ছাদে সোলার প্যানেল বসানো বেশি লাভজনক। ফলে তারা একযোগে সোলারের দিকে ঝুঁকেছে।
পাকিস্তানের সিভিল সোসাইটি সংগঠন ‘রিনিউয়েবলস ফার্স্ট’-এর স্পেশাল ইনিশিয়েটিভস ও চায়না প্রোগ্রামের ম্যানেজার মোহাম্মদ বাসিত ঘৌরি মঙ্গলবার (২৩ জুন) ঢাকায় সিপিডির এক সেমিনারে এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, গত কয়েক বছরে পাকিস্তান প্রায় ৫০ গিগাওয়াট সোলার প্যানেল আমদানি করেছে। অথচ দেশটির জাতীয় গ্রিডের মোট সক্ষমতা প্রায় ৪৮ গিগাওয়াট।
এই আমদানিকৃত প্যানেলের মধ্যে ২৮ থেকে ৩৮ গিগাওয়াট ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এর প্রায় ৯৮ শতাংশই বিকেন্দ্রীভূত বা ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার—অর্থাৎ বাড়ি, দোকান, শিল্পকারখানা এবং কৃষি খামারে।
এটি আসলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক নতুন দর্শন। আগে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত সরকার বা বড় কোম্পানি। এখন একজন গৃহস্থ, একজন ব্যবসায়ী কিংবা একজন কৃষকও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী।
পাকিস্তানের এই পরিবর্তনের পেছনে তিনটি কারণ সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। প্রথম কারণ, বিদ্যুতের দাম। আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচির আওতায় পাকিস্তানে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে (২০২১-২০২৪) বিদ্যুতের দাম প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। এতে মানুষ বিকল্প খুঁজতে শুরু করে।
বাসিত ঘৌরি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, মানুষ সৌর বিদ্যুতের প্রতি ভালোবাসার কারণে সোলারে যায়নি। তারা গেছে কারণ গ্রিডের বিদ্যুৎ তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
দ্বিতীয় কারণ, সোলার প্যানেলের দাম কমে যাওয়া। চীনে ব্যাপক উৎপাদনের কারণে বিশ্ববাজারে সোলার প্যানেলের দাম দ্রুত কমে আসে। প্রতি ওয়াট প্যানেলের দাম ৩২ সেন্ট থেকে নেমে প্রায় ১৬ সেন্টে আসে। অর্থাৎ একদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সোলার সস্তা হচ্ছে। ফলে এটি মানুষের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
তৃতীয় কারণ, সরকারের নীতিগত সহায়তা। পাকিস্তান সরকার সোলার প্যানেলের ওপর শূন্য আমদানি শুল্ক আরোপ করে। পাশাপাশি নেট মিটারিং সুবিধা চালু করে, যাতে একজন গ্রাহক নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারেন। অর্থাৎ সরকার মানুষকে সোলার ব্যবহার করতে বাধ্য করেনি, বরং পথটা সহজ করে দিয়েছে।
পাকিস্তানের সৌরবিপ্লবের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এর অর্থায়ন। প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের এই বিপুল বিনিয়োগের ৯৫ শতাংশই এসেছে সাধারণ মানুষের নিজস্ব অর্থ থেকে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবদান মাত্র ৫ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ মানুষ বিশ্বাস করেছে, সোলারে বিনিয়োগ করলে তারা লাভবান হবে।
এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা। কারণ আমাদের দেশে প্রায়ই মনে করা হয়, বড় অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভব নয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষ যদি লাভ দেখতে পায়, তাহলে তারা নিজেরাই বিনিয়োগ করবে।
প্রথম লাভ হলো জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়া। বাসিত ঘৌরির দাবি, সৌরবিদ্যুতের কারণে পাকিস্তান প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের তেল ও গ্যাস আমদানি এড়াতে পেরেছে। একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বিশাল সাফল্য।
দ্বিতীয় লাভ হলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তন। বাসিত ঘৌরি জানান, পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের প্রায় ৭৩ শতাংশই গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ। অর্থাৎ এটি শুধু শহরের ধনী মানুষের প্রযুক্তি নয়।
তৃতীয় লাভ হলো কর্মসংস্থান। সোলার প্যানেল বিক্রি, স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি, ইনভার্টার—সব মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
চতুর্থ লাভ হলো পরিবেশ। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমায় কার্বন নিঃসরণও কমছে।
তবে পাকিস্তানের গল্পের আরেকটি দিকও আছে। যখন লাখ লাখ মানুষ নিজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, তখন জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায়। ফলে বড় বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহার কমে যায়।
কিন্তু এসব কেন্দ্রের জন্য সরকারকে এখনও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে মানুষ সোলারে যাচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচও বহন করতে হচ্ছে। এটি পাকিস্তানের নতুন চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাটারি। সোলার দিনে বিদ্যুৎ দেয়, কিন্তু রাতে নয়। তাই এখন পাকিস্তানে ব্যাটারি স্টোরেজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সোলারের পর পাকিস্তানের পরবর্তী বিপ্লব হবে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে।
বাংলাদেশের গল্প পাকিস্তানের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। ২০০৩ সালে সৌরবিদ্যুতের পথে হাঁটা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আতিকুজ্জামান সাজিদ জানান, সোলার হোম সিস্টেম বা এসএইচএস কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসে।
একসময় এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অফ-গ্রিড সৌর কর্মসূচিগুলোর একটি। কিন্তু জাতীয় গ্রিড দ্রুত গ্রামে পৌঁছে যাওয়ায় এই মডেল জনপ্রিয়তা হারায়। আজ অনেক সৌর হোম সিস্টেম অকেজো।
এখানেই বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা। প্রযুক্তি স্থাপন করাই শেষ কথা নয়। সেটিকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা হবে, তার পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রুফটপ সোলারে। সিপিডির গবেষণা বলছে, দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার নেট মিটারিংভিত্তিক রুফটপ সোলার ইনস্টলেশন রয়েছে। এসব থেকে ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ ঢাকায়।
পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল, ওষুধ শিল্প, সিরামিক, কোল্ড স্টোরেজ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প—এসব খাতে বিশাল পরিমাণ ছাদ রয়েছে। অর্থাৎ জায়গার সংকট থাকলেও ছাদের সংকট নেই।
এছাড়া দেশে ৩ হাজারের বেশি সৌরচালিত সেচপাম্প রয়েছে। কিন্তু এগুলোর বড় অংশ এখনও গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত নয়। সঠিক নীতি গ্রহণ করা গেলে এখানেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রথম বাধা অর্থায়ন। বাংলাদেশে সহজ শর্তে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঋণ পাওয়া যায় না। ব্যাংকগুলো ছোট অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। দ্বিতীয় বাধা কর ও শুল্ক। বর্তমানে সৌর যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর কাঠামোয় বৈষম্য রয়েছে।
স্রেডার (টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) চেয়ারম্যান ড. আশরাফুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ আমদানিকারকদের প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়, যেখানে অন্যদের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ১ শতাংশ। এই বৈষম্য দূর করা জরুরি।
তৃতীয় বাধা নীতিগত জটিলতা। নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির নিয়মও এক নয়। চতুর্থ বাধা মানসিকতা। আমরা এখনও বিদ্যুৎকে শুধু বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে উৎপাদিত একটি সেবা হিসেবে দেখি।
কিন্তু বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। এখন একজন গ্রাহক একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী এবং উৎপাদকও হতে পারেন।
পাকিস্তানের সৌরবিপ্লবের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জ্বালানি রূপান্তর সবসময় সরকারের হাত ধরে আসে না। অনেক সময় মানুষই পরিবর্তনের সূচনা করে। সরকারের কাজ হলো সেই পরিবর্তনের পথ সহজ করা।
শুল্ক কমানো, সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা, নেট মিটারিং সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন—এই কাজগুলো সরকার করতে পারে। বাকি কাজটা করবে মানুষ।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। প্রশ্নটি আর শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, সেটি নয়।
প্রশ্নটি হলো—আমরা কি ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীভূত, সাশ্রয়ী এবং জনগণনির্ভর করতে পারব?
পাকিস্তান সেই পথের একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। তাদের সবকিছু অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ অবশ্যই আছে।
আর সেই শিক্ষা যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের পরবর্তী বড় পরিবর্তন হয়তো কোনো নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রে নয়, বরং লাখো মানুষের ঘরের ছাদেই শুরু হবে।
.png)

সম্প্রতি কলকাতার একটি সড়কের নাম হাসান শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পরিবর্তে গোপাল চন্দ্র মুখোপাধ্যাইয়ের নামে করার সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একপক্ষের কাছে এটি ‘ইতিহাসের সংশোধন’, অন্যপক্ষের কাছে ‘হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির’ অংশ।
৯ মিনিট আগে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বেইজিংয়ের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
১ দিন আগে
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবার খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এই দুই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে পারে।
২ দিন আগে
স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, সরকারি ভবন, পার্ক, সড়ক কিংবা সেতুর নামকরণ নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক নতুন নয়। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বদলেছে, আর তার সঙ্গে বদলেছে অনেক প্রতিষ্ঠানের নামও। ইদানীং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিজেদের বা পরিবারের নামে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
২ দিন আগে