তৃণমূলে ভাঙনের পর বিজেপির নতুন টার্গেট কারা

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ২১: ০১
স্ট্রিম গ্রাফিক

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়। কিন্তু ভোটের ফলের চেয়েও বেশি চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই লোকসভায় তৃণমূলের এক বড় অংশের সাংসদ দলছাড়া হয়েছেন। একই সময়ে মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনাতেও ভাঙন দেখা গিয়েছে। এই দুই ঘটনাকে আলাদা করে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, এর পিছনে রয়েছে অনেক বড় একটি সংসদীয় কৌশল—লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে পৌঁছে দেওয়া।

প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূল ও শিবসেনার পর এবার বিজেপির নজর কি উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টির দিকে? শুধু সরকার টিকিয়ে রাখাই নয়, সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা অর্জনের লক্ষ্যেই কি বিরোধী দলগুলির সাংসদদের নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চলছে? সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই জল্পনাকেই আরও জোরালো করেছে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। দলটি ২৪০টি আসনে জিতলেও সরকার গঠনের জন্য নির্ভর করতে হয়েছে এনডিএ-র শরিকদের উপর। বিশেষ করে তেলুগু দেশম পার্টি ও জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর সমর্থন সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে তৃতীয়বারের মোদী সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই জোটসঙ্গীদের উপর নির্ভরশীল ছিল।

এই অবস্থায় দিল্লির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। লক্ষ্য, বিরোধী শিবিরের এমন সব সাংসদদের একত্রিত করা, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ না দিলেও সংসদে এনডিএ সরকারকে সমর্থন করবেন। অর্থাৎ, দল ভাঙলেও সবাইকে বিজেপিতে নেওয়া নয়; বরং পৃথক রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রেখে সংখ্যার অঙ্কে এনডিএকে শক্তিশালী করা।

তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে ঠিক এই মডেলই দেখা গিয়েছে। প্রায় ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ বিজেপিতে যোগ না দিয়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই) নামে একটি ছোট দলে যোগ দিয়েছেন। পরে তাঁরা লোকসভার স্পিকারের কাছে নিজেদেরই আসল তৃণমূল দাবি করে সংসদে পৃথক গোষ্ঠীর স্বীকৃতি চেয়েছেন এবং একই সঙ্গে এনডিএ সরকারকে গঠনমূলক সমর্থনের কথাও জানিয়েছেন।

দলত্যাগীদের সরাসরি বিজেপিতে নিলে রাজনৈতিক সমালোচনা আরও তীব্র হতে পারত। কিন্তু আলাদা দলে রেখে এনডিএকে সমর্থনের পথ বেছে নেওয়ায় বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সদস্যসংখ্যা না বাড়িয়েও কার্যত সংসদে সমর্থনের ভিত্তি বিস্তৃত করার সুযোগ পাচ্ছে।

একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মহারাষ্ট্রেও। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার একাধিক সাংসদ শিন্ডে শিবসেনার সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শিন্ডেপন্থী শিবসেনা ইতোমধ্যেই এনডিএর শরিক। ফলে এখানেও বিজেপির সদস্যসংখ্যা না বাড়লেও সরকারের সমর্থনভিত্তি শক্তিশালী হচ্ছে।

এই ঘটনাগুলির পরে রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সমাজবাদী পার্টিকে নিয়ে। উত্তরপ্রদেশের এই দলের লোকসভায় ৩৭ জন সদস্য রয়েছেন। দলবদল সংক্রান্ত আইনের আওতায় দুই-তৃতীয়াংশ ভাঙন দেখাতে হলে প্রয়োজন হবে অন্তত ২৬ জন সাংসদের সমর্থন। সেই কারণেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে, বিজেপির পরবর্তী লক্ষ্য কি সমাজবাদী পার্টি?

যদিও এ বিষয়ে সরকারি বা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য নেই, তবু দিল্লির রাজনৈতিক মহলে এই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কারণ, সংসদে এখনও বিজেপি কাঙ্ক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেকটাই দূরে।

তিনটি আসন খালি থাকায় বর্তমানে লোকসভায় কার্যকর সদস্য রয়েছেন ৫৪০ জন। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে প্রয়োজন ৩৬০ জন সদস্যের সমর্থন। এনডিএর বর্তমান সংখ্যা প্রায় ২৯৩। তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ জন এবং উদ্ধবপন্থী শিবসেনার ৬ জনকে যোগ করলে সমর্থনের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩১৯। অর্থাৎ এখনও আরও ৪১ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

এই কারণেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির কৌশল এখানেই শেষ হচ্ছে না। সমাজবাদী পার্টিতে যদি উল্লেখযোগ্য ভাঙন ধরানো যায়, তবে প্রয়োজনীয় সংখ্যার অনেকটাই পূরণ হয়ে যাবে। এরপরও কিছু সংখ্যার ঘাটতি থাকবে, যার জন্য দক্ষিণ ভারতের কোনো বড় দলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এই জায়গাতেই উঠে আসছে ডিএমকের নাম। লোকসভায় ডিএমকের ২২ জন সাংসদ রয়েছেন। তামিলনাড়ুর এই দল দীর্ঘদিন ধরেই সংসদের আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বৃদ্ধির বিরোধিতা করে আসছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন করে আসন বৃদ্ধি হলে উত্তর ভারতের তুলনায় দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাবে।

এই অবস্থায় ডিএমকের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের জন্য তাদের অবস্থান ভবিষ্যতের সমীকরণে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এত আগ্রহের কারণও স্পষ্ট। সংবিধান সংশোধনের জন্য লোকসভা ও রাজ্যসভা—উভয় কক্ষেই উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতাও আবশ্যক।

বিজেপির দীর্ঘদিনের কয়েকটি রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে, যার মধ্যে নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা, সংসদের আসন বৃদ্ধি, ডিলিমিটেশন এবং 'এক দেশ এক ভোট' ব্যবস্থা চালুর মতো বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ। এগুলির অনেক ক্ষেত্রেই সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সংসদে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজেপির কাছে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজ্যসভার চিত্র অবশ্য লোকসভার তুলনায় এনডিএর পক্ষে কিছুটা সুবিধাজনক। বিভিন্ন সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পরে উচ্চকক্ষে এনডিএর সংখ্যা বেড়েছে। তৃণমূলের কয়েকটি শূন্য আসনে ভবিষ্যতে বিজেপি সুবিধা পেতে পারে বলেও রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা। ফলে দুই-তৃতীয়াংশের লক্ষ্যে রাজ্যসভায় দূরত্ব তুলনামূলকভাবে কম।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস ইতোমধ্যেই স্পিকারের কাছে বিদ্রোহী সাংসদদের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে। দলের বক্তব্য, সাংসদরা দলবিরোধী কাজ করেছেন এবং তাঁদের সদস্যপদ খারিজ হওয়া উচিত। অন্যদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী দাবি করছে, তারা দলত্যাগ করেনি; বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হিসেবে নতুন অবস্থান নিয়েছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে বিদ্রোহী সাংসদদের অধিকাংশকেই বিজেপি নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেনি। বরং আলাদা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রেখে এনডিএ-র সমর্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে দলবদল নিয়ে সরাসরি সমালোচনার চাপ কিছুটা কমে, অন্যদিকে সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থনও পাওয়া যায়। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এই মডেল ভবিষ্যতেও ব্যবহার করা হতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসেই বোঝা যাবে বিজেপির এই সংসদ-কেন্দ্রিক কৌশল কতটা সফল হয়। সমাজবাদী পার্টিতে কোনো ভাঙন ঘটে কি না, ডিএমকে ভবিষ্যতে কী অবস্থান নেয় এবং স্পিকারের সিদ্ধান্তের পরে আদালত কী রায় দেয়—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতির দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন এবং উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার একাংশের সরে যাওয়া আপাতদৃষ্টিতে রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক ঘটনা হলেও, সংসদের সংখ্যার অঙ্কে সেগুলির প্রভাব অনেক বড়। কারণ, এগুলি শুধু সরকার টিকিয়ে রাখার লড়াই নয়; বরং ভবিষ্যতের আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ বলেই এখন রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে।

ফলে এখন নজর উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টি এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকের দিকে। আগামী দিনে বিজেপি সংসদে কাঙ্ক্ষিত দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের আরও কাছে পৌঁছতে পারে কি না, সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন পথে এগোবে।

তনভিয়া বড়ুয়া: ভারতীয় লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত