এক্সপ্লেইনার
কাজী নিশাত তাবাসসুম

ইরানের তেল বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আজ শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে খার্গ দ্বীপে অন্তত ১৫টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এই হামলায় দ্বীপের তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে দাবি করেছে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি।
ফার্স নিউজ জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির সামরিক স্থাপনা ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দিয়েছে— ট্রাম্পের এমন দাবি সত্ত্বেও ইরানি বাহিনী সেখান থেকে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। হামলার এক ঘণ্টার মধ্যেই দ্বীপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় হয়ে যায়।
খবরে আরও বলা হয়, হামলায় একটি সেনা প্রতিরক্ষা স্থাপনা, নৌ ঘাঁটি, হেলিকপ্টার নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার এবং হেলিকপ্টারবাহী জাহাজ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খার্গ দ্বীপে হামলা করা হবে না বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। ফক্স নিউজ রেডিওর এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, খার্গ দ্বীপে হামলা করবেন কিনা। জবাবে ট্রাম্প বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের প্রশ্ন কে করে আর কোন বোকা এর জবাব দেয়? ধরুন, আমি দখল করব বা করব না— কেন আমি তা আপনাকে বলব?
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এমন একটি লক্ষ্য নিয়ে, যাতে ‘ইরানি শাসনব্যবস্থা ভবিষ্যতে কখনোই যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র দেশগুলো এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে।’
এ পর্যন্ত চালানো হামলার বড় অংশই ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হয়েছে। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোও হামলার শিকার হয়েছে। গত ৮ মার্চ তেহরানের কাছে দুটি তেল শোধনাগার ও দুটি তেল সংরক্ষণাগারে হামলা চালায় ইসরায়েল। একই দিনে একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান।
ইরানের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানি টার্মিনাল রয়েছে খার্গ দ্বীপে। ইরানের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে তেল আনা হয়। এরপর সেখান থেকে তেলবাহী জাহাজে তুলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়, যার বেশিরভাগই যায় চীনের উদ্দেশ্যে।
খার্গ টার্মিনালের বিশাল সংরক্ষণাগার ও একাধিক জেটি প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রাখে। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে হয়। এর মাধ্যমে দেশটির সরকার প্রতি বছর কয়েক শ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আয় করে।
কোনো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশই তাদের তেল রপ্তানির জন্য এতটা একক স্থাপনার ওপর নির্ভরশীল নয়। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যেমন সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের তেল রপ্তানির সক্ষমতা এক জায়গায় রাখেনি।
একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যেমন- রাশিয়া, মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলার মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের প্রায় সব তেল রপ্তানি একটি মাত্র স্থানের ওপর নির্ভর করে না। বরং এসব দেশের একাধিক বন্দর ও টার্মিনাল রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়।
ইরানের তেল শিল্পের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু খার্গ দ্বীপ। ইতিহাস ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সমন্বয়ে দ্বীপটি ইরানের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও গোপনীয়তার কারণে ইরানিদের কাছে খার্গ দ্বীপকে প্রায়ই “নিষিদ্ধ দ্বীপ” হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
তবে আধুনিক ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্বের আড়ালে রয়েছে দ্বীপটির দীর্ঘ প্রাচীন ইতিহাস। প্রায় চার হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে এখানে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার প্রমাণ রয়েছে। বিভিন্ন সাম্রাজ্যও একসময় এই দ্বীপ দখল করে রেখেছিল, কারণ তারা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে দেখত। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে দ্বীপটিতে রাজনৈতিক বন্দিদেরও রাখা হতো। পরে ১৯৫৮ সালে এখানে আধুনিক তেল রপ্তানি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
দুটি প্রধান কারণে খার্গ দ্বীপ দ্রুতই ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি বন্দরে পরিণত হয়। প্রথমত, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের বড় বড় তেলক্ষেত্রের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে সহজেই এই দ্বীপকে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, দ্বীপটির গভীর সমুদ্রবন্দর বড় আকারের সুপারট্যাংকার নোঙর করার উপযোগী ছিল। সে সময় এসব বিশাল তেলবাহী জাহাজ তেল পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছিল।
পরবর্তীতে দ্বীপে বিশাল তেল সংরক্ষণাগার, জেটি এবং সমুদ্রতলের পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে একটি বড় রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে ওঠে। ফলে একাধিক তেলক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত তেল একই সংরক্ষণ ও লোডিং সুবিধা ব্যবহার করতে পারে, যা সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর জাতীয় তেল রপ্তানি ব্যবস্থায় খার্গ দ্বীপের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং আত্মনির্ভরশীল নীতির কারণে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর ভেতর দিয়ে যাওয়া পাইপলাইন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হয়। ফলে দেশের নিজস্ব রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন হামলার কারণে খার্গ দ্বীপ যদি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছরের জন্য ইরানের পুরো তেল শিল্প অচল হয়ে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, খার্গ টার্মিনালে হামলা হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এর তুলনায় দেখা যায়, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম চার মাসের বেশি সময় ধরে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। সে সময় বিশ্বজুড়ে যে প্রায় ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছিল, তার একমাত্র কারণ জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। এর ফলেই পরবর্তীতে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, খার্গে হামলা চালিয়ে সম্ভবত ভুল করলেন ট্রাম্প। মার্কিন ভোক্তাদের কাছে দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে এই হামলা। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের কাছে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তেলের দাম প্রায় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বক্তব্যে মুজতবা খামেনি ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অবরুদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য কনভারসেশন ও ফার্স নিউজ

ইরানের তেল বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আজ শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে খার্গ দ্বীপে অন্তত ১৫টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এই হামলায় দ্বীপের তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে দাবি করেছে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি।
ফার্স নিউজ জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির সামরিক স্থাপনা ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দিয়েছে— ট্রাম্পের এমন দাবি সত্ত্বেও ইরানি বাহিনী সেখান থেকে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। হামলার এক ঘণ্টার মধ্যেই দ্বীপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় হয়ে যায়।
খবরে আরও বলা হয়, হামলায় একটি সেনা প্রতিরক্ষা স্থাপনা, নৌ ঘাঁটি, হেলিকপ্টার নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার এবং হেলিকপ্টারবাহী জাহাজ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খার্গ দ্বীপে হামলা করা হবে না বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। ফক্স নিউজ রেডিওর এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, খার্গ দ্বীপে হামলা করবেন কিনা। জবাবে ট্রাম্প বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের প্রশ্ন কে করে আর কোন বোকা এর জবাব দেয়? ধরুন, আমি দখল করব বা করব না— কেন আমি তা আপনাকে বলব?
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এমন একটি লক্ষ্য নিয়ে, যাতে ‘ইরানি শাসনব্যবস্থা ভবিষ্যতে কখনোই যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র দেশগুলো এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে।’
এ পর্যন্ত চালানো হামলার বড় অংশই ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হয়েছে। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোও হামলার শিকার হয়েছে। গত ৮ মার্চ তেহরানের কাছে দুটি তেল শোধনাগার ও দুটি তেল সংরক্ষণাগারে হামলা চালায় ইসরায়েল। একই দিনে একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান।
ইরানের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানি টার্মিনাল রয়েছে খার্গ দ্বীপে। ইরানের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে তেল আনা হয়। এরপর সেখান থেকে তেলবাহী জাহাজে তুলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়, যার বেশিরভাগই যায় চীনের উদ্দেশ্যে।
খার্গ টার্মিনালের বিশাল সংরক্ষণাগার ও একাধিক জেটি প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রাখে। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে হয়। এর মাধ্যমে দেশটির সরকার প্রতি বছর কয়েক শ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আয় করে।
কোনো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশই তাদের তেল রপ্তানির জন্য এতটা একক স্থাপনার ওপর নির্ভরশীল নয়। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যেমন সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের তেল রপ্তানির সক্ষমতা এক জায়গায় রাখেনি।
একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যেমন- রাশিয়া, মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলার মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের প্রায় সব তেল রপ্তানি একটি মাত্র স্থানের ওপর নির্ভর করে না। বরং এসব দেশের একাধিক বন্দর ও টার্মিনাল রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়।
ইরানের তেল শিল্পের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু খার্গ দ্বীপ। ইতিহাস ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সমন্বয়ে দ্বীপটি ইরানের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও গোপনীয়তার কারণে ইরানিদের কাছে খার্গ দ্বীপকে প্রায়ই “নিষিদ্ধ দ্বীপ” হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
তবে আধুনিক ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্বের আড়ালে রয়েছে দ্বীপটির দীর্ঘ প্রাচীন ইতিহাস। প্রায় চার হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে এখানে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার প্রমাণ রয়েছে। বিভিন্ন সাম্রাজ্যও একসময় এই দ্বীপ দখল করে রেখেছিল, কারণ তারা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে দেখত। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে দ্বীপটিতে রাজনৈতিক বন্দিদেরও রাখা হতো। পরে ১৯৫৮ সালে এখানে আধুনিক তেল রপ্তানি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
দুটি প্রধান কারণে খার্গ দ্বীপ দ্রুতই ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি বন্দরে পরিণত হয়। প্রথমত, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের বড় বড় তেলক্ষেত্রের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে সহজেই এই দ্বীপকে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, দ্বীপটির গভীর সমুদ্রবন্দর বড় আকারের সুপারট্যাংকার নোঙর করার উপযোগী ছিল। সে সময় এসব বিশাল তেলবাহী জাহাজ তেল পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছিল।
পরবর্তীতে দ্বীপে বিশাল তেল সংরক্ষণাগার, জেটি এবং সমুদ্রতলের পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে একটি বড় রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে ওঠে। ফলে একাধিক তেলক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত তেল একই সংরক্ষণ ও লোডিং সুবিধা ব্যবহার করতে পারে, যা সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর জাতীয় তেল রপ্তানি ব্যবস্থায় খার্গ দ্বীপের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং আত্মনির্ভরশীল নীতির কারণে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর ভেতর দিয়ে যাওয়া পাইপলাইন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হয়। ফলে দেশের নিজস্ব রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন হামলার কারণে খার্গ দ্বীপ যদি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছরের জন্য ইরানের পুরো তেল শিল্প অচল হয়ে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, খার্গ টার্মিনালে হামলা হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এর তুলনায় দেখা যায়, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম চার মাসের বেশি সময় ধরে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। সে সময় বিশ্বজুড়ে যে প্রায় ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছিল, তার একমাত্র কারণ জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। এর ফলেই পরবর্তীতে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, খার্গে হামলা চালিয়ে সম্ভবত ভুল করলেন ট্রাম্প। মার্কিন ভোক্তাদের কাছে দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে এই হামলা। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের কাছে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তেলের দাম প্রায় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বক্তব্যে মুজতবা খামেনি ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অবরুদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য কনভারসেশন ও ফার্স নিউজ

ইরানের যুদ্ধক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তার কুয়াশা ঘন। এই যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই এখনো অস্পষ্ট। সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর জবাব যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এখনো দেয়নি। বিশেষ করে প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধ শেষ হবে কীভাবে? এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক ঝুঁকির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিণতি কী
১ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাঠামোও পরিবর্তনের মুখোমুখি।
৩ ঘণ্টা আগে
ইরানের 'মোজাইক ডিফেন্স ডকট্রিন' হলো একটি বিকেন্দ্রীকৃত সামরিক কৌশল, যেখানে মোজাইকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোর মতো প্রতিটি প্রদেশকে একেকটি স্বাধীন প্রতিরক্ষা ইউনিটে রূপান্তর করা হয়েছে।
১ দিন আগে
মোজতাবা খামেনির শাসনামলে ইরান কি শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলোর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে, নাকি চীনের অখণ্ড সমর্থন ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে পুঁজি করে একটি নতুন এশীয় অক্ষের শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হবে—তা-ই এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান প্রশ্ন।
২ দিন আগে