পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ, আরও যেসব দেশ আছে এই তালিকায়

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৪৩
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং হওয়ার কথা রয়েছে। ঈশ্বরদীর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম লোডিং হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করতে যাচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে।

বিশ্বের খুব কম দেশেই রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বিশ্বের মাত্র ৩১টি দেশ এই সক্ষমতা অর্জন করেছে। এসব দেশের মোট ৪১৫টি রিয়্যাক্টর থেকে বৈশ্বিক বিদ্যুতের প্রায় ৯ শতাংশ উৎপন্ন হয়। এর সর্বোচ্চ সক্ষমতা ৩৮২ গিগাওয়াট। তবে এই শক্তির বণ্টন সমান নয়—কিছু দেশ এই খাতে অনেক এগিয়ে, আবার অনেক দেশ একেবারেই নতুন।

বিশ্বের যেসব দেশে আছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

বিশ্বের পারমাণবিক শক্তির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণের তালিকার শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের রিয়্যাক্টর সংখ্যা ৯৪ যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। চীনে বর্তমানে ৫০-এর বেশি পারমাণবিক রিয়্যাক্টর চালু রয়েছে এবং দেশটি দ্রুত নতুন কেন্দ্র নির্মাণ করছে। এরপরই রয়েছে ফ্রান্স যার রিয়্যাক্টর সংখ্যা প্রায় ৫৭টি। তাদের বিদ্যুতের প্রায় ৭০ শতাংশ পারমাণবিক উৎস থেকে আসে।

ইউরোপে যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, স্পেন, বেলজিয়ামসহ প্রায় ১৩টি দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ চালু আছে। এশিয়ায় জাপান, ভারত, পাকিস্তান, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই তালিকায় রয়েছে। জাপান একসময় বড় শক্তি ছিল, তবে ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর তাদের কার্যক্রম কমে যায়। তবে তারা এখন আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। আমেরিকা মহাদেশে কানাডা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকো পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

বেলজিয়ামের বন্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: এসএফসি
বেলজিয়ামের বন্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: এসএফসি

বর্তমানে রাশিয়া শুধু নিজ দেশে নয়, অন্য দেশেও প্রযুক্তি ও সহায়তা দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়াও এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে রপ্তানির ক্ষেত্রে। এছাড়াও চীন আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ ৭০ হাজার মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। পাকিস্তান ২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ ক্ষমতা ৮ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বর্তমানের তুলনায় ছয় গুণেরও বেশি।

বিশ্বে এখন নতুন করে কিছু দেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ, তুরস্ক ও মিশর এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সৌদি আরব, নাইজেরিয়া, পোল্যান্ডের মতো কয়েকটি দেশ পরিকল্পনার পর্যায়ে আছে। তাদের লক্ষ্য—জ্বালানি ঘাটতি কমানো এবং ভবিষ্যতের জন্য স্থিতিশীল বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।

যেসব দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে সরে এসেছে

তবে সব দেশ একই পথে হাঁটছে না। ২০১১ সালে ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর জার্মানি পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাপে ধাপে বন্ধ করে দিচ্ছে। ১৯৯০ সালে ইতালি চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর তাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। তাইওয়ানও ধীরে ধীরে ২০২৫ সালে এই খাত থেকে বেরিয়ে এসেছে। পারমাণবিক শক্তি ধীরে ধীরে বন্ধ করার প্রবণতা সাধারণত নিরাপত্তা উদ্বেগ, জনমত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে।

কিছু দেশ এখনো পুরোপুরি বন্ধ না করলেও এ ব্যাপারে পরিকল্পনা করছে। বেলজিয়াম ধাপে ধাপে ২০৩৫ সালের ভেতরেই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্পেনও একই পথে হাঁটছে। তারা ২০২৭ থেকে ২০৩৫ এর মধ্যে সকল কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুইজারল্যান্ড নতুন কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ রেখেছে।

তাইওয়ানের এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছবি: এসএফসি
তাইওয়ানের এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছবি: এসএফসি

তবে কিছু দেশ আবার নতুন করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ চালু করার কথা ভাবছে। জাপান আবার তাদের রিয়্যাক্টর চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুইডেন ও ফ্রান্স নতুন কেন্দ্রের পরিকল্পনা করছে।

এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি দেখাচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পারমাণবিক শক্তি এখন একটি বাস্তব বিকল্প হয়ে উঠছে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে—এই পরিস্থিতিতে পারমাণবিক শক্তি অনেক দেশের কাছে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিশ্বে পারমাণবিক শক্তির চিত্র একরৈখিক নয়। কেউ এগোচ্ছে, কেউ সরে যাচ্ছে, আবার কেউ নতুন করে শুরু করছে। বাংলাদেশ এই পথে নতুন যাত্রা শুরু করছে, যেখানে সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়।

তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি, ইনস্টিটিউট অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স ও স্ট্যান্ড আপ ফর নিউক্লিয়ার

সম্পর্কিত