এক্সপ্লেইনার
কাজী নিশাত তাবাসসুম

গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কারণ এর মূল কাজ হলো সমাজের দর্পণ হয়ে তথ্য তুলে ধরা, সত্য যাচাই করা এবং জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, মূলধারার অনেক গণমাধ্যমই ধীরে ধীরে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ থেকে সরে গিয়ে পপুলার কালচার বা বিনোদনকেন্দ্রিক কনটেন্টের দিকে ঝুঁকছে।
চলচ্চিত্র, তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, ভাইরাল ট্রেন্ড কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত বিষয়— এসবই এখন অনেক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে নিচ্ছে। কেন এই পরিবর্তন? কেন গণমাধ্যম তার আদর্শ মানদণ্ড থেকে সরে যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটে। গণমাধ্যমও এর বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ডহ্যামের ম্যাকগ্যানন সেন্টার ফর কমিউনিকেশনস রিসার্চের পরিচালক ফিলিপ এম ন্যাপোলি তাঁর ‘অডিয়েন্স ইভালুয়েশন: নিউ টেকনোলজিস অ্যান্ড দ্য ট্রান্সফরমেশন অব মিডিয়া অডিয়েন্স’ বইয়ে লিখেছেন, আগে যেখানে ‘ম্যাস অডিয়েন্স’ ছিল, এখন সেখানে ‘নিশ অডিয়েন্স’ তৈরি হচ্ছে। ফলে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে বিনোদন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির দিকে বেশি ঝুঁকছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্বায়নের এই যুগে তথ্যপ্রবাহ যেমন দ্রুত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে দর্শক শ্রোতার রুচির বৈচিত্র্য ও প্রতিযোগিতা। ফলে প্রচলিত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি গণমাধ্যম এখন বেশি ঝুঁকছে পপ কালচারের দিকে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা গণমাধ্যমের কনটেন্ট নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞাপননির্ভর গণমাধ্যমে পাঠক বা দর্শকের সংখ্যা সরাসরি আয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বেশি ক্লিক, বেশি ভিউ এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো এমন কনটেন্ট বেছে নিচ্ছে যা দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এ ব্যাপারেও রয়েছে গবেষণা। গবেষক অ্যাঞ্জেলা এম লি, সেথ সি লুইস ও ম্যাথিউ পাওয়ার্স তাঁদের ‘অডিয়েন্স ক্লিকস অ্যান্ড নিউজ প্লেসমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক বা অর্থনীতির জটিল বিশ্লেষণের চেয়ে তারকাদের জীবনযাপন বা বিনোদনমূলক খবর অনেক বেশি ক্লিক পায়।
তাই তো, দেশে বন্যায় কৃষকের ফসল তলিয়ে যাওয়া মানবিক সংবাদের চেয়ে অভিনেত্রীর বিয়ে বা বিচ্ছেদের খবর সামাজিক মাধ্যমে কয়েকগুণ বেশি শেয়ার হয়। ফলে ব্যবসায়িক চাপ সংবাদমাধ্যমকে পপ কালচারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল যুগের অ্যালগরিদমভিত্তিক বাস্তবতা এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব বা গুগলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমন কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয় যা মানুষ বেশি সময় ধরে দেখে বা শেয়ার করে।
ফলে সংবাদমাধ্যমগুলোও অ্যালগরিদমবান্ধব কনটেন্ট তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছে। একটি ভাইরাল ভিডিও বা ট্রেন্ডিং টপিক নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি করা এখন অনেক সময় গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের চেয়ে বেশি লাভজনক। যেমন, কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনের তুলনায় একটি ভাইরাল নাচ বা গান নিয়ে তৈরি সংবাদ মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ‘আকাশ ছোঁয়া’ ভাইরাল ‘কাঁচা বাদাম’ গান তারই উদাহরণ।
তৃতীয়ত, দর্শক-মানসিকতার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। আশল্যান্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক কু উয়ান চেন তাঁর ‘দ্য ইমপ্যাক্ট অব শর্ট ফর্ম ভিডিও কনজাম্পশন অন স্টুডেন্টস অ্যাটেনশন স্প্যান’ গবেষণায় দেখিয়েছেন, বর্তমান প্রজন্ম দ্রুত, সংক্ষিপ্ত এবং বিনোদনমূলক কনটেন্টে অভ্যস্ত। দীর্ঘ বিশ্লেষণ বা জটিল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন পড়ার ধৈর্য অনেকেরই কমে গেছে। ফলে গণমাধ্যমগুলোও দর্শকের এই চাহিদার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে গিয়ে সংবাদকে আরও ‘সহজপাচ্য’ ও বিনোদনধর্মী করে তুলছে।
এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এখন ‘ইনফোটেইনমেন্ট’ অর্থাৎ তথ্য ও বিনোদনের মিশ্রণ একটি বড় ট্রেন্ড। আর তাই, বিবিসি, সিএনএন বা ফক্স নিউজের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রায়ই দেখা যায়, বড় রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি সেলিব্রিটি খবর শিরোনামে উঠে আসে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হলিউড সেলিব্রিটি জনি ডেপের নাম বলা যায়। তাঁর সিনেমা, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সংবাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা জলবায়ু সংকটের খবরের চেয়েও বেশি ভিউ পায়।
চতুর্থত, প্রতিযোগিতার চাপও গণমাধ্যমকে এই পথে ঠেলে দিচ্ছে। আগে যেখানে সংবাদমাধ্যমের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল অন্য সংবাদমাধ্যম, এখন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে ইউটিউবার, টিকটকার, ব্লগারসহ নানা কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
তারা দ্রুত এবং আকর্ষণীয়ভাবে তথ্য উপস্থাপন করে দর্শক টেনে নিচ্ছে। ফলে মূলধারার গণমাধ্যমও নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে গিয়ে একই ধরনের কনটেন্টে ঝুঁকছে।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, অনেক সংবাদমাধ্যম এখন ইউটিউব শর্টস বা ফেসবুক, টিকটকের রিলসের ফরম্যাটে বিনোদনধর্মী সংবাদ তৈরি করছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।
তবে এই পরিবর্তনের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সুইডেনের কার্লস্টাডস ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক মারজু হিম্মা ও রাউল ফেরার কনিল তাঁদের ‘ইজ নিউজ এনগেজমেন্ট ওয়ার্থহোয়াইল’ গবেষণায় দেখিয়েছেন, পপ কালচারভিত্তিক কনটেন্ট অনেক সময় তরুণদের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত করে। আগে যারা সংবাদে আগ্রহী ছিল না, তারাও এখন বিনোদনমূলক কনটেন্টের মাধ্যমে গণমাধ্যমে আসছে। এর ফলে একটি বৃহত্তর দর্শকগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে গভীরতর সংবাদ পড়ার দিকেও আগ্রহী হতে পারে।
কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ক্ষয়। যখন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ইস্যু পেছনে পড়ে যায় এবং তার জায়গা দখল করে হালকা বিনোদন, তখন সমাজের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো বড় নীতি পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক সংকটের খবর যদি যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তবে সাধারণ মানুষ সেই বিষয়ে সচেতন হতে পারে না।
এ ছাড়া ‘ক্লিকবেইট’ সংস্কৃতিও একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। অনেক সময় আকর্ষণীয় শিরোনাম দিয়ে এমন সংবাদ প্রকাশ করা হয়, যার ভেতরে তেমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে না। এতে পাঠকের আস্থা কমে যায় এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি গণমাধ্যমের জন্যই ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। অনেক অনলাইন পোর্টালে দেখা যায়, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তুলনায় নাটক, সিনেমা বা সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডসংক্রান্ত খবর বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একই ঘটনার বিভিন্ন ‘অ্যাঙ্গেল’ তৈরি করে একাধিক বিনোদনধর্মী সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, যা মূল সংবাদকে আড়াল করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। গণমাধ্যমকে একদিকে যেমন দর্শকের চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে, তেমনি অন্যদিকে তাদের মৌলিক দায়িত্ব বস্তুনিষ্ঠ ও জনস্বার্থমূলক সাংবাদিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। শুধুমাত্র ক্লিক বা ভিউয়ের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কারণ এর মূল কাজ হলো সমাজের দর্পণ হয়ে তথ্য তুলে ধরা, সত্য যাচাই করা এবং জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, মূলধারার অনেক গণমাধ্যমই ধীরে ধীরে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ থেকে সরে গিয়ে পপুলার কালচার বা বিনোদনকেন্দ্রিক কনটেন্টের দিকে ঝুঁকছে।
চলচ্চিত্র, তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, ভাইরাল ট্রেন্ড কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত বিষয়— এসবই এখন অনেক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে নিচ্ছে। কেন এই পরিবর্তন? কেন গণমাধ্যম তার আদর্শ মানদণ্ড থেকে সরে যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটে। গণমাধ্যমও এর বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ডহ্যামের ম্যাকগ্যানন সেন্টার ফর কমিউনিকেশনস রিসার্চের পরিচালক ফিলিপ এম ন্যাপোলি তাঁর ‘অডিয়েন্স ইভালুয়েশন: নিউ টেকনোলজিস অ্যান্ড দ্য ট্রান্সফরমেশন অব মিডিয়া অডিয়েন্স’ বইয়ে লিখেছেন, আগে যেখানে ‘ম্যাস অডিয়েন্স’ ছিল, এখন সেখানে ‘নিশ অডিয়েন্স’ তৈরি হচ্ছে। ফলে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে বিনোদন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির দিকে বেশি ঝুঁকছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্বায়নের এই যুগে তথ্যপ্রবাহ যেমন দ্রুত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে দর্শক শ্রোতার রুচির বৈচিত্র্য ও প্রতিযোগিতা। ফলে প্রচলিত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি গণমাধ্যম এখন বেশি ঝুঁকছে পপ কালচারের দিকে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা গণমাধ্যমের কনটেন্ট নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞাপননির্ভর গণমাধ্যমে পাঠক বা দর্শকের সংখ্যা সরাসরি আয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বেশি ক্লিক, বেশি ভিউ এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো এমন কনটেন্ট বেছে নিচ্ছে যা দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এ ব্যাপারেও রয়েছে গবেষণা। গবেষক অ্যাঞ্জেলা এম লি, সেথ সি লুইস ও ম্যাথিউ পাওয়ার্স তাঁদের ‘অডিয়েন্স ক্লিকস অ্যান্ড নিউজ প্লেসমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক বা অর্থনীতির জটিল বিশ্লেষণের চেয়ে তারকাদের জীবনযাপন বা বিনোদনমূলক খবর অনেক বেশি ক্লিক পায়।
তাই তো, দেশে বন্যায় কৃষকের ফসল তলিয়ে যাওয়া মানবিক সংবাদের চেয়ে অভিনেত্রীর বিয়ে বা বিচ্ছেদের খবর সামাজিক মাধ্যমে কয়েকগুণ বেশি শেয়ার হয়। ফলে ব্যবসায়িক চাপ সংবাদমাধ্যমকে পপ কালচারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল যুগের অ্যালগরিদমভিত্তিক বাস্তবতা এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব বা গুগলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমন কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয় যা মানুষ বেশি সময় ধরে দেখে বা শেয়ার করে।
ফলে সংবাদমাধ্যমগুলোও অ্যালগরিদমবান্ধব কনটেন্ট তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছে। একটি ভাইরাল ভিডিও বা ট্রেন্ডিং টপিক নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি করা এখন অনেক সময় গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের চেয়ে বেশি লাভজনক। যেমন, কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনের তুলনায় একটি ভাইরাল নাচ বা গান নিয়ে তৈরি সংবাদ মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ‘আকাশ ছোঁয়া’ ভাইরাল ‘কাঁচা বাদাম’ গান তারই উদাহরণ।
তৃতীয়ত, দর্শক-মানসিকতার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। আশল্যান্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক কু উয়ান চেন তাঁর ‘দ্য ইমপ্যাক্ট অব শর্ট ফর্ম ভিডিও কনজাম্পশন অন স্টুডেন্টস অ্যাটেনশন স্প্যান’ গবেষণায় দেখিয়েছেন, বর্তমান প্রজন্ম দ্রুত, সংক্ষিপ্ত এবং বিনোদনমূলক কনটেন্টে অভ্যস্ত। দীর্ঘ বিশ্লেষণ বা জটিল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন পড়ার ধৈর্য অনেকেরই কমে গেছে। ফলে গণমাধ্যমগুলোও দর্শকের এই চাহিদার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে গিয়ে সংবাদকে আরও ‘সহজপাচ্য’ ও বিনোদনধর্মী করে তুলছে।
এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এখন ‘ইনফোটেইনমেন্ট’ অর্থাৎ তথ্য ও বিনোদনের মিশ্রণ একটি বড় ট্রেন্ড। আর তাই, বিবিসি, সিএনএন বা ফক্স নিউজের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রায়ই দেখা যায়, বড় রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি সেলিব্রিটি খবর শিরোনামে উঠে আসে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হলিউড সেলিব্রিটি জনি ডেপের নাম বলা যায়। তাঁর সিনেমা, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সংবাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা জলবায়ু সংকটের খবরের চেয়েও বেশি ভিউ পায়।
চতুর্থত, প্রতিযোগিতার চাপও গণমাধ্যমকে এই পথে ঠেলে দিচ্ছে। আগে যেখানে সংবাদমাধ্যমের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল অন্য সংবাদমাধ্যম, এখন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে ইউটিউবার, টিকটকার, ব্লগারসহ নানা কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
তারা দ্রুত এবং আকর্ষণীয়ভাবে তথ্য উপস্থাপন করে দর্শক টেনে নিচ্ছে। ফলে মূলধারার গণমাধ্যমও নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে গিয়ে একই ধরনের কনটেন্টে ঝুঁকছে।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, অনেক সংবাদমাধ্যম এখন ইউটিউব শর্টস বা ফেসবুক, টিকটকের রিলসের ফরম্যাটে বিনোদনধর্মী সংবাদ তৈরি করছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।
তবে এই পরিবর্তনের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সুইডেনের কার্লস্টাডস ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক মারজু হিম্মা ও রাউল ফেরার কনিল তাঁদের ‘ইজ নিউজ এনগেজমেন্ট ওয়ার্থহোয়াইল’ গবেষণায় দেখিয়েছেন, পপ কালচারভিত্তিক কনটেন্ট অনেক সময় তরুণদের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত করে। আগে যারা সংবাদে আগ্রহী ছিল না, তারাও এখন বিনোদনমূলক কনটেন্টের মাধ্যমে গণমাধ্যমে আসছে। এর ফলে একটি বৃহত্তর দর্শকগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে গভীরতর সংবাদ পড়ার দিকেও আগ্রহী হতে পারে।
কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ক্ষয়। যখন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ইস্যু পেছনে পড়ে যায় এবং তার জায়গা দখল করে হালকা বিনোদন, তখন সমাজের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো বড় নীতি পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক সংকটের খবর যদি যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তবে সাধারণ মানুষ সেই বিষয়ে সচেতন হতে পারে না।
এ ছাড়া ‘ক্লিকবেইট’ সংস্কৃতিও একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। অনেক সময় আকর্ষণীয় শিরোনাম দিয়ে এমন সংবাদ প্রকাশ করা হয়, যার ভেতরে তেমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে না। এতে পাঠকের আস্থা কমে যায় এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি গণমাধ্যমের জন্যই ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। অনেক অনলাইন পোর্টালে দেখা যায়, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তুলনায় নাটক, সিনেমা বা সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডসংক্রান্ত খবর বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একই ঘটনার বিভিন্ন ‘অ্যাঙ্গেল’ তৈরি করে একাধিক বিনোদনধর্মী সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, যা মূল সংবাদকে আড়াল করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। গণমাধ্যমকে একদিকে যেমন দর্শকের চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে, তেমনি অন্যদিকে তাদের মৌলিক দায়িত্ব বস্তুনিষ্ঠ ও জনস্বার্থমূলক সাংবাদিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। শুধুমাত্র ক্লিক বা ভিউয়ের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

স্থান নিউইয়র্ক। নিউইয়র্ক টাইমসের অফিস। সময় ১৯৭১ সালের জুনের প্রচণ্ড গরমের এক সন্ধ্যা। পত্রিকার নিউজরুমে তখন প্রবল উত্তেজনা। উত্তেজনার কারণ গুপ্তধনের মতো পাওয়া কিছু গোপন দলিল। তাতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সরকারের লুকানো সত্য লেখা।
৩ ঘণ্টা আগে
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের আড়াই মাসের কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে– সরকার আসলে চলছে ‘সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র’ নীতিতে।
১৬ ঘণ্টা আগে
২০২৫ সালে সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা পাঁচ দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, জার্মানি এবং ভারত।
১৮ ঘণ্টা আগে
আজকালকের ছেলেমেয়েদের পছন্দের সমীকরণ কেন বদলে যাচ্ছে, তা নিয়ে সাংস্কৃতিক মহলে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। জেনজি বা আজকের প্রজন্মের কাছে শার্লক হোমস যতটা ‘আইকনিক’, ফেলুদা কেন ততটা নয়—এই প্রশ্নও চায়ের আড্ডায়, ঘরোয়া আলোচনায় প্রায়ই শোনা যায়।
১ দিন আগে