এক্সপ্লেইনার

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট: ট্রাম্প কি দায় এড়াতে পারেন?

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ২০: ২৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ বছর অন্তত ৩৮ জন শিশু হাম ও এর জটিলতায় মারা গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু মার্চ মাসেই ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) ২১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে । এছাড়া গত দুই দিনে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জেও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৪৬ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হঠাৎ করে কেন হাম এমন প্রাণঘাতী হয়ে উঠল? এই সংকটের পেছনে কি কেবল অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা দায়ী, নাকি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ারও বড় কোনো প্রভাব রয়েছে?

টিকাদানে ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ সংকট

বিভিন্ন গণমাধ্যমে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে হামের রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এ বছর তা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই হামের টিকা পায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হামের টিকাদানের হার ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ। প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। এই ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতি চার বছর পর পর বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। ২০২০ সালে সর্বশেষ এমন কর্মসূচি হয়েছিল। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি।

এছাড়া গত বছর স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি অন্তত তিনবার ব্যাহত হয়েছে। ভিটামিন এ এবং কৃমিনাশক কর্মসূচিও গত বছর অনুষ্ঠিত হয়নি। পুষ্টিহীন শিশুরা হামের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গা হলো তহবিলের অভাব। টিকাদানের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সরবরাহকারী সেক্টর প্রোগ্রামের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে হামের টিকার কেন্দ্রীয় মজুত শেষ এবং মাঠপর্যায়ে মাত্র এক মাসের টিকা অবশিষ্ট আছে।

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য তহবিলে কাটছাঁট

বাংলাদেশের এই টিকাদান কর্মসূচির বিশাল একটি অংশ আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি) এবং ইউএসএআইডির মতো সংস্থার তহবিলের ওপর। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির দোহাই দিয়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাত থেকে বিশাল অংকের তহবিল প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।

ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএআইডির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এই সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এইচআইভি, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, পোলিও এবং হামের মতো রোগ প্রতিরোধে সহায়তা দেওয়া হতো। হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক এবং ইউএসএআইডির সাবেক কর্মকর্তা অতুল গাওয়ান্ডে দ্য হার্ভাড গেজেটকে জানিয়েছেন, ইউএসএআইডি বন্ধ হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে এরই মধ্যে কয়েক লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। তিনি একে ‘মানুষের তৈরি মৃত্যু’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র গ্যাভির তৃতীয় বৃহত্তম দাতা দেশ। তারা ২০২৬-২০৩০ সালের জন্য ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বা গ্যাভির মোট তহবিলের ১৫ শতাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন সেই তহবিল আটকে যাওয়ায় গ্যাভির প্রধান ডা. সানিয়া নিশতার সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন তহবিল বাতিল হলে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১০ লাখ শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা যেতে পারে। এর মধ্যে হাম, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া ও পোলিও রয়েছে। ৭ কোটি ৫০ লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে চলে যাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান

শুধু ইউএসএআইডি বা গ্যাভি নয়, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে গেছে। করোনা মহামারির সময় ডব্লিউএইচও ‘চীন-কেন্দ্রিক’ আচরণ করেছে—এমন অভিযোগ তুলে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নেন। যুক্তরাষ্ট্র ছিল ডব্লিউএইচওর অন্যতম বড় দাতা। তারা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বকেয়া ২৬০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর ফলে ডব্লিউএইচও-তে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ডব্লিউএইচও তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করেছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বজুড়ে পোলিও বা এইচআইভি প্রতিরোধের বৈশ্বিক প্রচেষ্টা হুমকির মুখে পড়েছে। ডব্লিউএইচও-এর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্থান যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো বিশ্বের জন্যই একটি বড় ক্ষতি।

টেক্সাস বা নিউ মেক্সিকোর মতো যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের এলাকাতেও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাস্থ্য তহবিলে ১১ বিলিয়ন ডলার কাটছাঁটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় ক্লিনিকগুলোও টিকার অভাবে ভুগছে। রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো ভ্যাকসিনবিরোধী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকায় সেখানেও শঙ্কা বাড়ছে।

বাংলাদেশের মতো দেশের ওপর প্রভাব

বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া বা কেনিয়ার মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে এসব আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে এই দেশগুলো চরম বিপাকে পড়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও মারাত্মক। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক তহবিল আটকে যাওয়ায় জরুরি মুহূর্তে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সরকার ৬০৪ কোটি টাকার টিকা কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। কিন্তু সেই টিকা কবে আসবে এবং কবে শিশুদের দেওয়া হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

গ্যাভির প্রধান ডা. সানিয়া নিশতার বলেছেন, তাঁদের অনুদানের ১ ডলারের ৯৭ সেন্টই টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যয় হয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল কমানোর অর্থ হলো বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলা।

বাংলাদেশে হামের কারণে শিশুদের এই করুণ মৃত্যু নিঃসন্দেহে স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তবে এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি নিষ্ঠুর প্রতিফলনও বটে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য লাভজনক হতে পারে। কিন্তু এই নীতির কারণে বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর লাখ লাখ নিরপরাধ শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো এখন তাদের দাতা দেশগুলোর তালিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ, যারা একসময় সাহায্য নিত, তারা এখন দাতা দেশে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকা সিডিসির মতো সংস্থাগুলো বলছে, বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের তহবিল তৈরি করা জরুরি।

বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়। জনস্বাস্থ্যের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা এই হামের প্রাদুর্ভাব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণ করছে, পরাশক্তির একটি কলমের আঁচড় কীভাবে হাজার মাইল দূরের কোনো দেশের শিশুদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য হার্ভাড গেজেট, দ্য গার্ডিয়ান এবং দেশীয় সংবাদমাধ্যম

সম্পর্কিত