যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি: একটি অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য এবং সবচেয়ে বড় রপ্তানি আয়ের উৎস, তাই এই সিদ্ধান্ত একদিকে ব্যবসায়ী মহল, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনিতেই, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর থেকে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা হারিয়েছে, ফলে প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকে ইতিমধ্যেই ১৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছিল।

বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনে, বাংলাদেশ কেনে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার, ঘাটতি ৬ বিলিয়নের বেশি। ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের অর্থহীন উঁচু শুল্ক (ট্যারিফ ও নন ট্যারিফ ব্যারিয়ার) কাঠামো যা কোনো পণ্যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, দেশের শ্রম মানহীন আইন ও পরিবেশগত মেজার, বিভিন্ন সেক্টরের কমপ্লায়েন্সহীনতা, কপিরাইট ও পাইরেসি বাস্তবতা ইত্যাদি আলোচনায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।

দরকষাকষিতে বসে, বাংলাদেশ আমদানি বৈচিত্র্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে করে ভারত থেকে গম, ভুট্টা ও তুলা, কৃষি পণ্য; ইন্দোনেশিয়া থেকে ভোজ্যতেল; ইউরোপ থেকে বিমান ও অস্ত্র; মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি ও জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি কমিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোর্স করার ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে, ঐ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কিছুটা কমে আসবে (যদিও বন্ধ হবে না), এবং এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়েছে। ফলে, এসব দেশের প্রভাববলয়ে থাকা বুদ্ধিজীবীরাও বেশ সরব। পাশাপাশি যেসব ব্যবসায়ী এসব আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতো তারাও নাখোশ হয়েছে। পাশাপাশি, নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষর এবং বৈষম্যমূলক ধারাগুলোর জন্য স্বাভাবিক ও যৌক্তিক প্রতিবাদও চলমান।

৩২ পাতার চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি ১৭৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে ‘উইল’ মাত্র ৩ বার। ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ ব্যবহৃত হয়েছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ মাত্র ৬ বার। বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা বেশি। দরকষাকষি দলের মতে, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ট্রেড গ্যাপ বেশি, তাই তা কমাতে বাংলাদেশের ওপর শর্তও বেশি।

চুক্তি ও ট্যারিফের বর্তমান অবস্থা
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যে দুই স্তরে ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ ট্যারিফ নির্ধারিত হয়েছে (প্রধান প্রধান শিডিউল মেনে চুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ২০ শতাংশ, চূড়ান্ত স্বাক্ষরের পর ১৯ শতাংশ), এবং মার্কিন তুলা ও ম্যানমেড ফাইবার দিয়ে তৈরি আরএমজিতে শূন্য শুল্কের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে রায় দেয় যে আইইইপিএ আইন প্রেসিডেন্টকে ট্যারিফ আরোপের ক্ষমতা দেয় না। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন সেকশন ১২২-এর অধীনে ১০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করে, কিন্তু ৭ মে ২০২৬-এ সেই ১০ শতাংশ ট্যারিফও কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড বাতিল করে দেয়। ট্রাম্প প্রশাসন তৃতীয় আইনি পথ খুঁজছে। অর্থাৎ চুক্তির মূল ভিত্তি ৩৭ শতাংশ ট্যারিফের ভয়, এখন আইনত বিদ্যমান নেই।

১৩১ বনাম ৬ শর্ত: এই অসাম্য কতটা বাস্তব

৩২ পাতার চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি ১৭৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে ‘উইল’ মাত্র ৩ বার। ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ ব্যবহৃত হয়েছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ মাত্র ৬ বার। বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা বেশি। দরকষাকষি দলের মতে, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ট্রেড গ্যাপ বেশি, তাই তা কমাতে বাংলাদেশের ওপর শর্তও বেশি। তুলনামূলকভাবে, ইন্দোনেশিয়ার চুক্তিতে ‘ইন্দনেশিয়া শ্যাল’ ব্যবহৃত হয়েছে ২০০ বারের বেশি, আর ‘ইউনাইটেড স্টেটস শ্যাল’ মাত্র ৯ বার, যার অনুপাত ২২:১। এ ধরনের বৈষম্য, ট্রাম্প-যুগের সব এআরটি চুক্তির কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, শুধু বাংলাদেশের জন্য আলাদা নয়। তবে সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শর্তগুলোর মান। কোনগুলো গ্রহণযোগ্য, কোনগুলো বাড়াবাড়ি, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার ভালোভাবে।

এটাও ঠিক বিমানের উড়োজাহাজ দরকার, জাহাজ না কিনলে এটি লোকসানেই থাকবে। আবার কারিগরি দক্ষতা, জনবল ও খরচের দিক থেকে দুটি ফ্লিট, বোয়িং ও এয়ারবাস একসঙ্গে চালানো বিমানের জন্য বিলাসিতা।

বাড়াবাড়ি শর্তগুলো কী কী

ক. ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা সবচেয়ে বিপজ্জনক

আর্টিকেল ৪.১-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক কারণে কোনো দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেবে, বাংলাদেশকেও ‘পরিপূরক নিষেধাজ্ঞা’ নিতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকা চীন বা রাশিয়াকে শাস্তি দিলে বাংলাদেশকেও সেই পথে হাঁটতে হবে, এমনকি যদি তা বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও যায়। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস; এই শর্ত মানলে রোহিঙ্গা সংকট থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ অবকাঠামো পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বিঘ্নিত হতে পারে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এমন চুক্তি আছে। কিন্তু একটি স্বল্প-আয়ের উন্নয়নশীল দেশের জন্য চরম অবিবেচক শর্ত। এই চুক্তি কার্যত বাংলাদেশকে চীন বা রাশিয়ার সাথে এফটিএ করতে বাধা দেয়, চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস, অবকাঠামো বিনিয়োগকারী এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী।

খ. জিএমও শর্ত কৃষি সার্বভৌমত্বের হুমকি

আর্টিকেল ১.৬-এ বলা হয়েছে ২৪ মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত যেকোনো কৃষি বায়োটেকনোলজি পণ্য অর্থাৎ জিএমও নিজস্ব পূর্ব-বাজার পর্যালোচনা, লেবেলিং বা অনুমোদন ছাড়াই আমদানি ও বাজারজাতকরণের অনুমতি দিতে হবে। বাংলাদেশের ৮৩ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত, মার্কিন পশুখাদ্য শিল্পকে গত কয়েক দশকে ইউএসডিএ সরাসরি ৭২ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়েছে, ফলে এই অসম প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আবার এটাও কথা, অনুমোদন দেওয়া মানেই আমদানি নয়। এসব পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা, স্বাদ ও ক্রয়ক্ষমতা ইত্যাদিও গুরুত্বপূর্ণ। তথাপি, বাজার খুলে দিলে স্থানীয় চাষি ও খামারিরা বিপদে পড়তে পারে।

গ. বোয়িং ক্রয় বাধ্যবাধকতা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে (বলা হচ্ছে পরামর্শ না করেই) ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, ইতিমধ্যেই ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সই করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, যা ২০৩১-৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। এতে এয়ারবাস থেকে কেনার চাপও বাড়বে, কেননা ইইউ-ও বাংলাদেশের রপ্তানি গন্তব্য।

এটাও ঠিক বিমানের উড়োজাহাজ দরকার, জাহাজ না কিনলে এটি লোকসানেই থাকবে। আবার কারিগরি দক্ষতা, জনবল ও খরচের দিক থেকে দুটি ফ্লিট, বোয়িং ও এয়ারবাস একসঙ্গে চালানো বিমানের জন্য বিলাসিতা।

ঘ. আরসিইপিতে সংযুক্তির পথ বন্ধ

চুক্তিটি বাংলাদেশকে চীন বা রাশিয়ার সাথে নতুন ডিজিটাল বা বাণিজ্য চুক্তি করতে বাধা দেয় এবং আরসিইপিতে যোগদানও জটিল করে তুলতে পারে, কারণ চীন আরসিইপির সদস্য।

ঙ. ডব্লিউটিওতে ভোটের অধিকার বিক্রি

বাংলাদেশকে ডিজিটাল পণ্যের ওপর কাস্টমস ডিউটিতে স্থায়ী মোরেটোরিয়াম সমর্থন করতে হবে ডব্লিউটিওতে। এটি একটি বিতর্কিত বিষয় যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে রাজস্বের উৎস হারানোর ভয়ে বিরোধিতা করে। একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে বহুপাক্ষিক ভোটের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সার্বভৌমত্বের সীমা অতিক্রম করে বলে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে।

১৫ মার্চ ২০২৬-এ মালয়েশিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী সরাসরি ঘোষণা করেন যে মার্কিন-মালয়েশিয়া এআরটি চুক্তি এখন ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’। যদিও পরে এই অবস্থান কিছুটা নরম হয়েছে, কিন্তু তারা প্রমাণ করেছে রিনেগোসিয়েশনের জন্য চাপ দেওয়া সম্ভব।

কোন শর্তগুলো গ্রহণযোগ্য

সব শর্তই ক্ষতিকর নয়, কিছু বাংলাদেশের নিজের সংস্কার এজেন্ডার সাথে মিলে যায়।

১। শ্রম আইন সংস্কার (ইউনিয়ন নিবন্ধন সহজ করা, ইপিজেডে শ্রম আইন প্রযোজ্য করা) বাংলাদেশের নিজেরই দরকার ছিল। রপ্তানি বাজার সুরক্ষায় শিল্পে শিশুশ্রম, চুক্তিবদ্ধ বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক শ্রম ইত্যাদিতে কমপ্লায়েন্স আনা জরুরি ছিল।

২। ডিজিটাল ট্রেড-সংক্রান্ত কিছু শর্ত যেমন সম্প্রচারে এনক্রিপশন কি হস্তান্তর বাধ্যবাধকতা বাতিল ঠিক আছে বলা যায়। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দিক থেকেও ইতিবাচক।

৩। পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ বিধিমালাও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৪। চুক্তিটির নিজের এক্সিট ক্লজ এবং রি-নেগোসিয়েশন ক্লজ দুটাই আছে। এ ধরনের চুক্তিকে গড়পড়তাভাবে দেখা যায় না। কারণ রিনেগোসিয়েশন উইন্ডোগুলো খোলা আছে। এটা তাই চিরস্থায়ী আত্মসমর্পণও নয়।

পুনরায় আলোচনায় কী দাবি করা যায়? তুলনামূলক দৃষ্টান্ত কী বলে?

১৫ মার্চ ২০২৬-এ মালয়েশিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী সরাসরি ঘোষণা করেন যে মার্কিন-মালয়েশিয়া এআরটি চুক্তি এখন ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’। যদিও পরে এই অবস্থান কিছুটা নরম হয়েছে, কিন্তু তারা প্রমাণ করেছে রিনেগোসিয়েশনের জন্য চাপ দেওয়া সম্ভব।

ইন্দোনেশিয়া ৯৯ শতাংশ মার্কিন পণ্যে শুল্ক তুলে দিয়েছে এবং ৩৩ বিলিয়নের ক্রয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বিপরীতে ইন্দোনেশিয়া ফ্রিপোর্ট-ম্যাকমোরানের মাধ্যমে গ্র্যাসবার্গ খনির লাইসেন্স রক্ষা করেছে, যেখান থেকে বার্ষিক ১০ বিলিয়ন রাজস্ব আসবে। অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়া বড় ছাড় দিয়েও কৌশলগত খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

বাংলাদেশও এই কৌশল নিতে পারে। ইন্দোনেশিয়া হালাল সার্টিফিকেশনে আংশিক নমনীয়তা দেখিয়েছে। বাংলাদেশও জিএমও লেবেলিং ও প্রি-মার্কেট রিভিউতে নিজস্ব মান বজায় রেখে একটি পৃথক প্রোটোকল আলোচনা করতে পারে। সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ডস ঠিকঠাক নেই।

চীন ও রাশিয়া থেকে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও সার আমদানিকে সব মার্কিন শর্তের বাইরে রাখতে পুনরায় আলোচনা শুরু করতে পারে।

ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স আরোপের অধিকার ধরে রাখা দরকার, এটি ভবিষ্যতের রাজস্বের উৎস। অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় দেশগুলো এই অবস্থান বহাল রেখেছে। বাংলাদেশও ডব্লিউটিও ডিজিটাল মোরেটোরিয়ামে স্বয়ংক্রিয় সমর্থনের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার দাবি করতে পারে।

ভিয়েনা কনভেনশনের আইনি ভিত্তি

ভিয়েনা কনভেনশনের আর্টিকেল ৬২-তে বলা আছে, যখন কোনো চুক্তির মূল ভিত্তিগত পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটে এবং সেটি প্রত্যাশিত ছিল না, তখন একটি দেশ চুক্তি থেকে বের হওয়ার বা পুনরায় আলোচনার দাবি রাখে। আইইইপিএ ট্যারিফ বাতিলের পর এই আইনি ভিত্তি বাংলাদেশের হাতে রয়েছে।

কৃষি ও মৎস্য:

জিএমও শর্তে একটি পাল্টা প্রস্তাব হতে পারে ‘সায়েন্স-বেসড ফার্মওয়ার্ক’ মেনে নিয়েও নিজস্ব ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেফটি রিভিউ’র অধিকার এবং জিএমও লেবেলিং-এর অধিকার ধরে রাখা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বছরের পর বছর ধরে এই অবস্থান ধরে রেখেছে।

ডব্লিউটিও মৎস্য ভর্তুকি চুক্তি থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্টিকেল ১২ বিশেষ ছাড় ছিল, বাংলাদেশ এই ছাড় ছাড়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এটি পুনরায় দাবি করার যুক্তিযুক্ত ভিত্তি আছে।

ডিজিটাল ট্রেড:

১। ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স আরোপের অধিকার ধরে রাখা দরকার, এটি ভবিষ্যতের রাজস্বের উৎস। অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় দেশগুলো এই অবস্থান বহাল রেখেছে। বাংলাদেশও ডব্লিউটিও ডিজিটাল মোরেটোরিয়ামে স্বয়ংক্রিয় সমর্থনের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার দাবি করতে পারে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের নতুন ডেটা প্রটেকশন আইনে ডেটা প্রসেসিং এ লভ্যাংশের ওপর ভ্যাট ও করারোপ করার বিধান আছে।

২। প্ল্যাটফর্ম গুলোর ডাটা লোকালাইজেশন-বিরোধী কিছু দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন থেকে ক্রিটিক্যাল সেক্টরে সিঙ্ক্রোনাস লোকাল ব্যাকাপ, ডেটা ডিকশনারি জানানো, সিকিউরিটি প্রটোকল শেয়ার করা, ডেটা ব্রেচ ডিক্লারেশন ইত্যাদি সভ্রেন্টি মেকানিজম ও প্রটেকশন তুলে দিয়েছে। কিন্তু নাগরিকের সংবেদনশীল ডেটার স্থানীয় ব্যাকআপ বাধ্যবাধকতা রাখার অধিকার বাংলাদেশের নিজের স্বার্থেই দরকার। এতে কোনো সেক্টর হঠাৎ প্যারালাইজড হবার ঝুঁকি থাকবে না।

ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, জিএমও চাপানো, উচ্চাভিলাষী আমদানির চাপ, এবং নির্বাচনের তিন দিন আগে স্বাক্ষর—এগুলো গুরুতর ত্রুটি। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত মিলিয়ে বিএনপি সরকারের কাছে এখন পুনরায় আলোচনার একটি বাস্তব সুযোগ আছে, যদি না তারা নিজেরাই ক্ষমতায় আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে।

বিএনপি সরকার এখন কী করবে?

১. চুক্তি বাতিল নয়, পুনরায় কৌশলী আলোচনা শুরু

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত মিলিয়ে সরকারের হাতে এখন নতুন বার্গেনিং লেভারেজ আছে। নির্বাচিত সরকার ভয়ে চুপ করে থাকবে, এমন কিছুর দরকার নেই। চুক্তির আর্টিকেল ৬.২ পুনরায় আলোচনার সুযোগ দেয়, আর্টিকেল ৬.৫ বের হওয়ার সুযোগ দেয়। ৬.২ ধারা ব্যবহার করে নতুন আলোচনায় যেতে হবে।

২. পুনরায় আলোচনার জন্য অগ্রাধিকার তালিকা:

সবচেয়ে জরুরি হলো আর্টিকেল ৪.২-এর ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা সংশোধন, জিএমওতে লেবেলিং ও স্বাধীন পর্যালোচনার অধিকার পুনরুদ্ধার, বোয়িং ক্রয় এবং অপরাপর আমদানির শর্ত কিছুটা শিথিল করে টার্গেট ইয়ার স্প্রেড বাড়িয়ে দেওয়া, এবং আরসিইপি যোগদানের পথ খোলা রাখা এবং ডিজিটাল ট্রেড সভ্রেন্টি অক্ষুণ্ন রাখা।

৩. ইউএস কটন আরএমজি শূন্য শুল্কের সুবিধা অবিলম্বে নেওয়া

চুক্তির এই বাস্তব সুবিধাটি নষ্ট করা ঠিক হবে না। সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠন করে মার্কিন তুলার ব্যবহার বাড়িয়ে শূন্য শুল্কের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

৪. বিশেষজ্ঞ নেগোশিয়েটিং টিম গঠন

আন্তর্জাতিক ট্রেড নেগোশিয়েটর, আইনজীবী ও স্বীকৃত অর্থনীতিবিদের নিয়ে পরবর্তী রাউন্ডের নেগোসিয়েশনের জন্য এক্সপার্ট পুল তৈরি করা।

সারসংক্ষেপে চুক্তিটি সংকটের মুহূর্তে দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনার ফলাফল। আরএমজি খাতের জন্য ১৯ শতাংশ ট্যারিফ এবং ইউএস কটন শূন্য শুল্ক বাস্তব সুফল। কিন্তু ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, জিএমও চাপানো, উচ্চাভিলাষী আমদানির চাপ, এবং নির্বাচনের তিন দিন আগে স্বাক্ষর—এগুলো গুরুতর ত্রুটি। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত মিলিয়ে বিএনপি সরকারের কাছে এখন পুনরায় আলোচনার একটি বাস্তব সুযোগ আছে, যদি না তারা নিজেরাই ক্ষমতায় আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ালে ভারতসহ কোনো বিশেষ দেশ থেকে আমদানি কমে যাবে, এ জন্য চুক্তির বিরোধিতা নয় বরং আমদানির যৌক্তিক বহুমুখীকরণ করাই শ্রেয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য ট্রাম্প রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ নেগোসিয়েশন সহজ ছিল না, বিএনপির জন্যও তা সহজ না। কঠিন কাজটি ধর্তব্যে রেখেই সম্পাদন করতে হবে। সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থই মুখ্য।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক।

সম্পর্কিত