জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

অপারেশন সার্চলাইট: পেন্সিলে লেখা পরিকল্পনা থেকে নির্মম গণহত্যা

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১৬: ০৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। ওই রাতের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞকে কেবল সামরিক অভিযানের নিক্তিতে দেখলে হবে না। এর উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে চিরতরে মুছে ফেলা। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের ওপর তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখতে।

পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা নিজেরাই এই অভিযানকে ‘নরকের দরজা খুলে দেওয়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কেউ কেউ একে হালাকু খান ও চেঙ্গিস খানের আগ্রাসনের চেয়েও ভয়াবহ বলে স্বীকার করেছেন। এই অভিযানের ফলে টানা নয় মাস ধরে চলা এক নির্মম হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৩০ লাখ বাঙালি শহীদ হন। লাখো নারী ধর্ষণের শিকার হন। কোটি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। তৈরি হয় পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বড় মানবিক সংকট।

অপারেশন সার্চলাইট হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, ছিল বিগত ২৫ বছরের সামরিক হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা। সামরিক বাহিনী শুরু থেকেই পাকিস্তানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন জারির আগে থেকেই নানা অঞ্চলে ছোট পরিসরে সামরিক আইন জারি করা হচ্ছিল। বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর নির্যাতন ও দমন-পীড়ন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ছিল প্রকট। বিশেষ করে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে বাঙালিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল পাহাড়সম। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের শারীরিক অক্ষমতা ও ভীরুতার অজুহাত দেখিয়ে এই বৈষম্যকে জায়েজ করার চেষ্টা করত।

নির্বাচন ও ষড়যন্ত্রের নকশা

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ক্ষমতায় বসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক এলিটরা এই রায় মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। ইয়াহিয়া খান ভেবেছিলেন কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। তিনি আশা করেছিলেন কিছু বাঙালি নেতাকে অর্থের প্রলোভন বা পদের লোভ দেখিয়ে পশ্চিমা শাসন বজায় রাখা যাবে।

সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর ‘দ্য রেপ অব বাংলাদেশ’ বইয়ে লিখেছেন, ইয়াহিয়া খান কখনোই জনগণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেননি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের নামে একটি নাটক সাজানো।

আওয়ামী লীগ যখন ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচনার ঘোষণা দেয়, তখন ইয়াহিয়ার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। হয় গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করা, নাহয় জোর করে তা আটকে দেওয়া। তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন। সামরিক বাহিনী ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা নতুন রাজনৈতিক নাটকের পরিকল্পনা শুরু করেন।

অপারেশন সার্চলাইট হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, ছিল বিগত ২৫ বছরের সামরিক হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা। সামরিক বাহিনী শুরু থেকেই পাকিস্তানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন জারির আগে থেকেই নানা অঞ্চলে ছোট পরিসরে সামরিক আইন জারি করা হচ্ছিল।

জানুয়ারি মাসে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করলেও কোনো সমাধানে পৌঁছাননি। তিনি ফিরে গিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে লারকানায় গোপন বৈঠক করেন। সেখানে বাঙালি নেতাদের দমনের ছক কষা হয়।

ফেব্রুয়ারি মাসে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হয়। ভুট্টো হুমকি দেন, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেউ ঢাকা অধিবেশনে যোগ দিলে রক্তের বন্যা বইয়ে দেওয়া হবে। অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান বেসামরিক মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন। তিনি ক্ষমতা সম্পূর্ণ সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

‘অপারেশন ব্লিটজ’ থেকে ‘অপারেশন সার্চলাইট’

১৯৭১ সালের শুরুর দিকেই সামরিক সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। রাওয়ালপিন্ডিতে এক বৈঠকে ইয়াহিয়া খান সামরিক শক্তি প্রয়োগের চূড়ান্ত নির্দেশ দেন। এর আগে ১৯৭০ সালের নভেম্বরে ‘অপারেশন ব্লিটজ’ নামে একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিক্ষোভ দমন করা।

তবে পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, যেমন অ্যাডমিরাল আহসান ও জেনারেল ইয়াকুব, সামরিক সমাধানের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁরা রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে ছিলেন। ফলে তাঁদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। তাঁদের জায়গায় নিয়ে আসা হয় জেনারেল টিক্কা খানকে। টিক্কা খান বেলুচিস্তানে নির্মমতার জন্য ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ‘বাংলার কসাই’ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেন।

মার্চ মাসের শুরু থেকেই পাকিস্তান থেকে বিপুল পরিমাণ সৈন্য ঢাকায় আসতে শুরু করে। পিআইএ-এর বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলোতে করে সাধারণ যাত্রীর বদলে সৈন্য আনা হচ্ছিল। বাঙালি সৈন্যদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান আবার ঢাকায় আসেন। শুরু হয় প্রহসনের আলোচনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই আলোচনা ছিল কেবল সামরিক প্রস্তুতির জন্য সময় কেনার কৌশল। ১৭ই মার্চ শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকের পর ইয়াহিয়া টিক্কা খানকে বলেন, ‘বাঙালিরা কথা শুনছে না। তুমি প্রস্তুত হও।’

পাকিস্তানের আর্মি অফিসার সিদ্দিক সালিক তাঁর আত্মজীবনীতে (অটোবায়োগ্রাফিতে) লিখেছেন, ১৮ মার্চ সকালে জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং রাও ফরমান আলী খাদিমের বাসভবনে বসে অপারেশন সার্চলাইটের চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করেন। পাঁচ পৃষ্ঠার ওই পরিকল্পনা পেন্সিলে লেখা হয়েছিল। ২০শে মার্চ জেনারেল হামিদ ও টিক্কা খানের উপস্থিতিতে তা অনুমোদন করা হয়। গণহত্যার নকশার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না রাখতেই এই পরিকল্পনা পেন্সিলে করা হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হয়।

হত্যার নকশা ও টার্গেট

অপারেশন সার্চলাইটের খসড়ার শুরুতেই বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের যেকোনো পদক্ষেপকে বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হবে। যারা সামরিক আইনের বিরোধিতা করবে, তাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। যেহেতু সেনাবাহিনীতেও আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল, তাই সারা দেশে একযোগে আকস্মিক ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

মূল লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্য রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতাদের গ্রেপ্তার করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, বিশেষ করে ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এবং জগন্নাথ হল ছিল প্রধান টার্গেট। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং সংস্কৃতিকর্মীদেরও ‘চরমপন্থী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরিকল্পনার প্রধান বিষয়গুলো ছিল: ১. বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করা। ২. বাঙালি পুলিশ ও ইপিআরের সদস্যদের নিরস্ত্র করা। পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এবং চট্টগ্রামের অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। ৩. সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। ৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে তল্লাশি চালানো। ৫. শেখ মুজিবকে জীবিত গ্রেপ্তার করতে হবে এবং অন্য নেতাদের বাড়ি তল্লাশি করতে হবে।

২৫ মার্চের কালরাত

২৪ মার্চ রাও ফরমান আলী ও খাদিম হোসেন হেলিকপ্টারে করে ঢাকার বাইরের সেনানিবাসগুলোতে যান। সেখানে তাঁরা স্থানীয় কমান্ডারদের অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। ২৫শে মার্চ বেলা ১১টার দিকে টিক্কা খান খাদিমকে জানিয়ে দেন যে ওই রাতেই অভিযান শুরু হবে। সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন।

অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার কথা ছিল রাত ১টায়। কিন্তু তা শুরু হয়ে যায় রাত সাড়ে ১১টার দিকে। ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক ও সামরিক যান নেমে পড়ে। শুরু হয় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ।

সাংবাদিক সাইমন ড্রিং, যিনি তখন লুকিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন, পরে তাঁর প্রতিবেদনে লেখেন, ‘অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার নামে ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার নির্মম ও ঠান্ডা মাথার গোলাবর্ষণে প্রায় ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।’

২৫ মার্চ রাতের অভিযানে পাকিস্তানি সেনাদের নির্দেশ ছিল, রাস্তায় যাকে দেখা যাবে, তাকেই গুলি করা হবে এবং রাস্তার দুপাশের ভবন ধ্বংস করা হবে। এই নির্দেশনার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন সামরিক দলিলে।

গণহত্যার প্রমাণ ও উদ্দেশ্য

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ প্রমাণ করতে হলে ‘উদ্দেশ্য’ এবং ‘লক্ষ্যবস্তু’ প্রমাণ করা জরুরি। অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা, সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ ও তৎপরবর্তী কার্যক্রম স্পষ্টভাবে সেই উদ্দেশ্য প্রমাণ করে।

‘দ্য রেমেডি’ নামের একটি দলিলে উল্লেখ আছে, এই আন্দোলন শুধু আওয়ামী লীগের নয়, বরং পুরো বাঙালি জাতির। সেখানে বাঙালি নেতাদের প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাঙালিদের অন্তত দশ বছর ব্রেইনওয়াশ করতে হবে। বাঙালি সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

এই অভিযান কোনো সাধারণ সামরিক দমন-পীড়ন ছিল না, ছিল বাঙালি জাতিসত্তাকে নির্মূল করার পরিকল্পিত ও ভয়াবহ নীলনকশা। অপারেশন সার্চলাইটের সেই ভয়াল রাত বাংলার মাটিতে এমন ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ প্রশস্ত করে।

সম্পর্কিত