সংগীত
আনুশেহ আনাদিল

মানুষ সম্ভবত কথা বলার আগেই সুর চিনেছিল। পৃথিবীর শব্দ শুনেছিল। নদীর গর্জন, বাতাসের চলন, পাখির ডাক, বৃষ্টির ছন্দ—এসবের মধ্যেই মানুষ প্রথম উপলব্ধি করেছিল যে অস্তিত্ব নিছক নীরব নয়; বরং সবকিছুই এক গভীর অনুরণনের অংশ।
আজ বিজ্ঞানও বলছে, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই কম্পমান। প্রতিটি গ্রহের নিজস্ব তরঙ্গ আছে, পৃথিবীর নিজস্ব অনুরণন আছে; এমনকি মানুষের শরীরও এক জটিল ছন্দে পরিচালিত হয়। হৃদস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, মস্তিষ্কের তরঙ্গ—সবকিছুই মূলত কম্পনের ভাষায় কাজ করে।
এই উপলব্ধি নতুন নয়। আমাদের এই উপমহাদেশ বহু শতাব্দী আগেই শব্দ ও কম্পনের এই সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছে।
এখানকার প্রাচীন সংগীতচর্চা বুঝেছিল যে দিনের প্রতিটি সময়ের নিজস্ব এক আবহ, এক স্পন্দন রয়েছে। তাই কিছু রাগ নির্ধারিত ছিল ভোরের জন্য, কিছু সন্ধ্যার জন্য, কিছু বর্ষার জন্য। কারণ মানুষের মন, শরীর ও প্রকৃতি—তিনটিই পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত।
আয়ুর্বেদেও স্বর, ছন্দ ও শরীরের সম্পর্ক নিয়ে ভাবা হয়েছে। “সা রে গা মা পা ধা নি”—এই সাতটি স্বরকে অনেকেই শুধু সুর নয়, মানুষের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও অনুভূতির সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে দেখেছেন। আমরা যেমন সাতটি রং দেখি, তেমনি সাতটি প্রধান স্বর শুনি। এই সংখ্যাগুলোর পুনরাবৃত্তি মানুষকে বহুদিন ধরেই ভাবিয়েছে যে প্রকৃতির মধ্যে হয়তো একধরনের অন্তর্নিহিত গাণিতিক ও সুরগত ভারসাম্য রয়েছে।
কিন্তু এই উপমহাদেশের সংগীত শুধু উচ্চাঙ্গ রাগসংগীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলার মরমি গান, বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মাইজভান্ডারি, পালাগান—এসবের ভেতরেও এক বিশাল দার্শনিক ও মানবিক জগৎ লুকিয়ে আছে।
অনেক বাউল গান হয়তো কঠোর সুরতত্ত্ব মেনে চলে না। কণ্ঠও হয়তো নিখুঁত নয়। কিন্তু সেই গানের বাণী মানুষের ভেতরে এমন এক দরজা খুলে দেয়, যা নিখুঁত কৌশল দিয়েও সবসময় সম্ভব হয় না। কিছু গান আয়নার মতো। সেগুলো আমাদের নিজেদের সামনে দাঁড় করায়।
লালনের গান কিংবা শাহ আব্দুল করিমের সুর মানুষকে শুধু বিনোদন দেয় না; তারা মানুষকে নিজেকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।
এই অঞ্চলের গান শুধু প্রেম বা আধ্যাত্মিকতা নিয়েও ছিল না। কৃষিকাজ, ঋতুচক্র, নদী, বীজ বোনা, ফসল তোলা—সবকিছুকে ঘিরেও গান ছিল। কারণ জ্ঞান একসময় বইয়ে নয়, মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকত। মৌখিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়েই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ত জীবনবোধ।
আজও গ্রামের ভেতরে সেই সংস্কৃতির অনেক অংশ টিকে আছে। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের শিকড় থেকে দূরে সরে গেছি। উপনিবেশবাদ শুধু ভূখণ্ড দখল করেনি; মানুষের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসও দুর্বল করেছে। ফলে আমরা অনেক সময় নিজেদের ঐতিহ্যকে অবহেলা করে বাইরের সংস্কৃতিকে ‘উন্নত’ মনে করতে শিখেছি।
তবে এর মানে এই নয় যে আধুনিক বা বৈশ্বিক সংগীত খারাপ। বরং আজকের পৃথিবী এক অভূতপূর্ব সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের শিল্পী অন্য প্রান্তের শিল্পীর সঙ্গে একই মুহূর্তে সংগীত তৈরি করছেন। নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র, নতুন নতুন সাউন্ডস্কেপ, নতুন ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা—সবকিছুই মানুষের সৃজনশীলতাকে আরও বিস্তৃত করছে।
জ্যাজ, ওয়ার্ল্ড মিউজিক, ফিউশন—এসবের মধ্যেও একধরনের বৈশ্বিক সংলাপ তৈরি হচ্ছে। কারণ সংগীত এমন একটি ভাষা, যেখানে শব্দ না বুঝেও মানুষ একে অপরকে অনুভব করতে পারে। তবে এই সময়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সব ফ্রিকোয়েন্সি একরকম নয়। সব সঙ্গীতের উদ্দেশ্যও এক নয়।
কিছু সংগীত প্রশান্তি দেয়। কিছু সংগীত প্রতিবাদ শেখায়। কিছু সংগীত মানুষের জমে থাকা রাগকে সামনে নিয়ে আসে। আবার কোনো কোনো সংগীত ধ্যানের মতো নীরব করে দেয়।
সংগীত মানুষের চেতনাকে পরিবর্তন করে। আর মানুষ যা বারবার নিজের ভেতরে প্রবেশ করায়, তা ধীরে ধীরে তার অংশ হয়ে যায়। তাই সংগীতকে শুধু ভোগ করার বিষয় হিসেবে নয়, ধারণ করার বিষয় হিসেবেও দেখা দরকার।
কারণ কখনো কখনো নিখুঁত কৌশল মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে না, অথচ একটি সাধারণ কণ্ঠ, একটি সরল সুর কিংবা একটি গভীর বাণী মানুষের ভেতরকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংগীত হয়তো সেখানেই সবচেয়ে সত্য, যেখানে শিল্পী নিজেকে সরিয়ে দেন, সুরের ভেতরে পৃথিবী—শব্দ, কম্পন ও মানুষের অন্তর্জগৎ।

মানুষ সম্ভবত কথা বলার আগেই সুর চিনেছিল। পৃথিবীর শব্দ শুনেছিল। নদীর গর্জন, বাতাসের চলন, পাখির ডাক, বৃষ্টির ছন্দ—এসবের মধ্যেই মানুষ প্রথম উপলব্ধি করেছিল যে অস্তিত্ব নিছক নীরব নয়; বরং সবকিছুই এক গভীর অনুরণনের অংশ।
আজ বিজ্ঞানও বলছে, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই কম্পমান। প্রতিটি গ্রহের নিজস্ব তরঙ্গ আছে, পৃথিবীর নিজস্ব অনুরণন আছে; এমনকি মানুষের শরীরও এক জটিল ছন্দে পরিচালিত হয়। হৃদস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, মস্তিষ্কের তরঙ্গ—সবকিছুই মূলত কম্পনের ভাষায় কাজ করে।
এই উপলব্ধি নতুন নয়। আমাদের এই উপমহাদেশ বহু শতাব্দী আগেই শব্দ ও কম্পনের এই সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছে।
এখানকার প্রাচীন সংগীতচর্চা বুঝেছিল যে দিনের প্রতিটি সময়ের নিজস্ব এক আবহ, এক স্পন্দন রয়েছে। তাই কিছু রাগ নির্ধারিত ছিল ভোরের জন্য, কিছু সন্ধ্যার জন্য, কিছু বর্ষার জন্য। কারণ মানুষের মন, শরীর ও প্রকৃতি—তিনটিই পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত।
আয়ুর্বেদেও স্বর, ছন্দ ও শরীরের সম্পর্ক নিয়ে ভাবা হয়েছে। “সা রে গা মা পা ধা নি”—এই সাতটি স্বরকে অনেকেই শুধু সুর নয়, মানুষের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও অনুভূতির সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে দেখেছেন। আমরা যেমন সাতটি রং দেখি, তেমনি সাতটি প্রধান স্বর শুনি। এই সংখ্যাগুলোর পুনরাবৃত্তি মানুষকে বহুদিন ধরেই ভাবিয়েছে যে প্রকৃতির মধ্যে হয়তো একধরনের অন্তর্নিহিত গাণিতিক ও সুরগত ভারসাম্য রয়েছে।
কিন্তু এই উপমহাদেশের সংগীত শুধু উচ্চাঙ্গ রাগসংগীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলার মরমি গান, বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মাইজভান্ডারি, পালাগান—এসবের ভেতরেও এক বিশাল দার্শনিক ও মানবিক জগৎ লুকিয়ে আছে।
অনেক বাউল গান হয়তো কঠোর সুরতত্ত্ব মেনে চলে না। কণ্ঠও হয়তো নিখুঁত নয়। কিন্তু সেই গানের বাণী মানুষের ভেতরে এমন এক দরজা খুলে দেয়, যা নিখুঁত কৌশল দিয়েও সবসময় সম্ভব হয় না। কিছু গান আয়নার মতো। সেগুলো আমাদের নিজেদের সামনে দাঁড় করায়।
লালনের গান কিংবা শাহ আব্দুল করিমের সুর মানুষকে শুধু বিনোদন দেয় না; তারা মানুষকে নিজেকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।
এই অঞ্চলের গান শুধু প্রেম বা আধ্যাত্মিকতা নিয়েও ছিল না। কৃষিকাজ, ঋতুচক্র, নদী, বীজ বোনা, ফসল তোলা—সবকিছুকে ঘিরেও গান ছিল। কারণ জ্ঞান একসময় বইয়ে নয়, মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকত। মৌখিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়েই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ত জীবনবোধ।
আজও গ্রামের ভেতরে সেই সংস্কৃতির অনেক অংশ টিকে আছে। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের শিকড় থেকে দূরে সরে গেছি। উপনিবেশবাদ শুধু ভূখণ্ড দখল করেনি; মানুষের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসও দুর্বল করেছে। ফলে আমরা অনেক সময় নিজেদের ঐতিহ্যকে অবহেলা করে বাইরের সংস্কৃতিকে ‘উন্নত’ মনে করতে শিখেছি।
তবে এর মানে এই নয় যে আধুনিক বা বৈশ্বিক সংগীত খারাপ। বরং আজকের পৃথিবী এক অভূতপূর্ব সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের শিল্পী অন্য প্রান্তের শিল্পীর সঙ্গে একই মুহূর্তে সংগীত তৈরি করছেন। নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র, নতুন নতুন সাউন্ডস্কেপ, নতুন ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা—সবকিছুই মানুষের সৃজনশীলতাকে আরও বিস্তৃত করছে।
জ্যাজ, ওয়ার্ল্ড মিউজিক, ফিউশন—এসবের মধ্যেও একধরনের বৈশ্বিক সংলাপ তৈরি হচ্ছে। কারণ সংগীত এমন একটি ভাষা, যেখানে শব্দ না বুঝেও মানুষ একে অপরকে অনুভব করতে পারে। তবে এই সময়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সব ফ্রিকোয়েন্সি একরকম নয়। সব সঙ্গীতের উদ্দেশ্যও এক নয়।
কিছু সংগীত প্রশান্তি দেয়। কিছু সংগীত প্রতিবাদ শেখায়। কিছু সংগীত মানুষের জমে থাকা রাগকে সামনে নিয়ে আসে। আবার কোনো কোনো সংগীত ধ্যানের মতো নীরব করে দেয়।
সংগীত মানুষের চেতনাকে পরিবর্তন করে। আর মানুষ যা বারবার নিজের ভেতরে প্রবেশ করায়, তা ধীরে ধীরে তার অংশ হয়ে যায়। তাই সংগীতকে শুধু ভোগ করার বিষয় হিসেবে নয়, ধারণ করার বিষয় হিসেবেও দেখা দরকার।
কারণ কখনো কখনো নিখুঁত কৌশল মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে না, অথচ একটি সাধারণ কণ্ঠ, একটি সরল সুর কিংবা একটি গভীর বাণী মানুষের ভেতরকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংগীত হয়তো সেখানেই সবচেয়ে সত্য, যেখানে শিল্পী নিজেকে সরিয়ে দেন, সুরের ভেতরে পৃথিবী—শব্দ, কম্পন ও মানুষের অন্তর্জগৎ।
.png)

ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয়, ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। চার বছর ধরে এর জন্য সারা পৃথিবী যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, ভবিষ্যদ্বাণী আর তর্কাতর্কিতে। অথচ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় না। তবুও কেন এ খেলাকে ঘিরে এত আবেগ?
১৮ ঘণ্টা আগে
মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যা
২১ ঘণ্টা আগে
আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কার কবিতায় বাংলাদেশের প্রাণের স্পন্দন আর মর্মের সুর শুনতে পাওয়া যায়? সমস্ত কুণ্ঠা আর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আমি আল মাহমুদের নাম নেব। এই কবিই আমাকে চমকে দিয়ে গিয়েছিলেন স্বপ্নের ভেতর, ‘নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল/ ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা গোলগাল।’
২১ ঘণ্টা আগে
আজ ১১ জুলাই, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এ দিন জনসংখ্যা নিয়ে নানা আলোচনা হয়। চলুন, একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। বিশ্বের জনসংখ্যা এখন— ক) কমছে খ) বাড়ছে, তবে আর ১০ বছরের মধ্যেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে গ) বাড়ছে, এবং ২০৮০-এর দশকে গিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে
১১ জুলাই ২০২৬