সাদাত হাসান মান্টোর লেখা চিঠির অনুবাদ
জাভেদ হুসেন

(সাদাত হাসান মান্টো উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী উর্দু কথাসাহিত্যিক। জন্ম পাঞ্জাবের লুধিয়ানায়। কর্মজীবনে তিনি সাংবাদিকতা করেন, অনুবাদ ও চিত্রনাট্য লেখেন। বাস করেছেন বোম্বে ও লাহোরে। দেশভাগ তাঁর লেখালেখির বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ‘টোবা টেক সিং’, ‘ঠান্ডা গোশত’, ‘খোল দো’-এর মতো গল্পে তিনি সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে নির্মম স্পষ্টতায় তুলে ধরেন। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে তিনি আজকের দিনে লাহোরে গত হন। এই লেখাটি তাঁর বন্ধু নাদিমকে সেপ্টেম্বর ১৯৩৭ সালে বোম্বে থেকে লেখা চিঠির অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন জাভেদ হুসেন।)
আজ থেকে কয়েক বছর আগের কথা। আমার জীবনে একটা অদ্ভুত দিন এসেছিল। সেদিন আমার মনে হচ্ছিল…আমি নিঃস্ব, চরম নিঃস্ব। সেই হাহাকার আমাকে ভীষণ অস্থির করে তুলেছিল। কষ্ট হলো, তবে আমি নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের ভেতরটা হাতড়ে দেখলাম। দেখতে চাইলাম, আমার অবশিষ্ট সহায়-সম্বল আসলে কী আছে।
দেখলাম, সেখানে ফেলে আসা দিনগুলোর একটা বিশাল স্তূপ জমে আছে। তাদের মধ্যে কিছু দিন ছিল এমন উজ্জ্বল যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়! আর কিছু ছিল এমন অন্ধকার যে চাঁদহীন অমবস্যার রাতগুলোও সেই আঁধার দেখে হিংসে করবে। কিছু স্মৃতি ছিল খুব মিষ্টি। আর কিছু এতটাই তিতকুটে যে আজ যদি সেগুলো লিখতে বসি, তবে কলম কাগজের ওপর থুতু ফেলতে ফেলতে ক্লান্ত হয়ে যাবে, তবুও সেই তিক্ততা মুছবে না।
সেই এলোমেলো স্তূপের ভেতর এক জায়গায় দেখলাম আমার ‘সরলতা’ ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। আরেক কোণে দেখি আমার স্বভাবের অস্থিরতা ছটফট করছে। এত বড় সেই স্তূপে কাজের মতো একটা জিনিসও খুঁজে পেলাম না। মানে এমন কিছু, যা এই দুনিয়ায় আমার কোনো কাজে আসতে পারে।
সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা সারা হলো। কিন্তু নিজের ভেতর কাজের মতো কিছুই খুঁজে পেলাম না। আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। সে যে কী প্রবল চরম নিরাশা! নিরাশ হতাশ আমি সেই মুহূর্তে নিজের অস্তিত্বের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই একটা দুর্বল কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। মৃদু… কান না পাতলে শোনা যায় না। কেউ যেন বলছিল, ‘আমি তোমার কাজে আসতে পারি।’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কে?’
উত্তর এল, ‘আমি গল্প।’
আমি বিস্ময়ে থমকে গেলাম, ‘গল্প? তুমি কোথায় লুকিয়ে ছিলে? আচ্ছা, তার আগে বলো, তুমি আমার ভেতরে ঢুকলে কী করে?’
গল্প ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘কীভাবে তোমার ভেতরে ঢুকেছি তা আমি জানি না। শুধু জানি, অনেক দিন ধরে তোমার ভেতরের এক অন্ধকার কুঠুরিতে আমি বন্দি হয়ে আছি। মনে হয়… আমার জন্ম হয়েছে এই অন্ধকারেই।’

গল্পের কথাগুলো শুনে আমার বেশ কৌতূহল হলো। সেই অন্ধকার কুঠুরি থেকে বের করে যখন তাকে আলোতে আনলাম, তখন আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না! দেখলাম সে হুবহু আমারই মতো দেখতে!
আমি বললাম, ‘আরে, তুমি তো দেখি আমারই প্রতিচ্ছবি! আচ্ছা বলো, কী বলতে চাও তুমি?’
গল্পের ঠোঁটে একটা হালকা হাসি খেলে গেল, ‘বলার তো অনেক কিছুই আছে। কিন্তু আমার কথা বলার শক্তি এখন খুব কম। পরে বলব। তুমি শুধু এটা বলো, এত দিন পরে আমাকে তোমার চোখে পড়ল কী করে? তুমি যদি সত্যিই তখন দরজা বন্ধ করে চলে যেতে, তবে জানো কী হতো?’
আমি কিছুটা অবহেলার সুরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী আর হতো?’
উত্তর এল, ‘এক বিশাল সম্পত্তি থেকে তুমি বঞ্চিত হতে।’
আমি হেসে উঠলাম, ‘সম্পত্তি!’
কণ্ঠস্বরটি বলে উঠল, ‘তোমার আসল সম্পত্তি তো আমিই। আমাকে আগলে রাখো। কাজে লাগাও। আমাকে বাইরে বের করো, প্রকাশ করো। তোমার সংবেদনশীল হৃদয়ের স্পন্দন আমাকে কোলে নিয়ে খাইয়েছে, তোমার সরলতা আমাকে পুষ্ট করেছে। তোমার জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো আমার দোলনা দুলিয়েছে। তোমার স্বভাবের অস্থিরতা আমার বিছানা। আমি যদি তোমার ভেতর থেকে চলে যাই, তবে তোমার দশা হবে মুক্তো হারিয়ে ফেলা সেই ঝিনুকের মতো। এদিকে এসো। হাত বাড়িয়ে দাও, আমি বাইরে বেরোতে চাই।’
আর এভাবেই আমি গল্পকার হয়ে গেলাম। আমার জীবনের খারাপ দিনগুলোই আমাকে একজন ভালো গল্পকার বানিয়ে দিল।

(সাদাত হাসান মান্টো উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী উর্দু কথাসাহিত্যিক। জন্ম পাঞ্জাবের লুধিয়ানায়। কর্মজীবনে তিনি সাংবাদিকতা করেন, অনুবাদ ও চিত্রনাট্য লেখেন। বাস করেছেন বোম্বে ও লাহোরে। দেশভাগ তাঁর লেখালেখির বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ‘টোবা টেক সিং’, ‘ঠান্ডা গোশত’, ‘খোল দো’-এর মতো গল্পে তিনি সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে নির্মম স্পষ্টতায় তুলে ধরেন। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে তিনি আজকের দিনে লাহোরে গত হন। এই লেখাটি তাঁর বন্ধু নাদিমকে সেপ্টেম্বর ১৯৩৭ সালে বোম্বে থেকে লেখা চিঠির অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন জাভেদ হুসেন।)
আজ থেকে কয়েক বছর আগের কথা। আমার জীবনে একটা অদ্ভুত দিন এসেছিল। সেদিন আমার মনে হচ্ছিল…আমি নিঃস্ব, চরম নিঃস্ব। সেই হাহাকার আমাকে ভীষণ অস্থির করে তুলেছিল। কষ্ট হলো, তবে আমি নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের ভেতরটা হাতড়ে দেখলাম। দেখতে চাইলাম, আমার অবশিষ্ট সহায়-সম্বল আসলে কী আছে।
দেখলাম, সেখানে ফেলে আসা দিনগুলোর একটা বিশাল স্তূপ জমে আছে। তাদের মধ্যে কিছু দিন ছিল এমন উজ্জ্বল যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়! আর কিছু ছিল এমন অন্ধকার যে চাঁদহীন অমবস্যার রাতগুলোও সেই আঁধার দেখে হিংসে করবে। কিছু স্মৃতি ছিল খুব মিষ্টি। আর কিছু এতটাই তিতকুটে যে আজ যদি সেগুলো লিখতে বসি, তবে কলম কাগজের ওপর থুতু ফেলতে ফেলতে ক্লান্ত হয়ে যাবে, তবুও সেই তিক্ততা মুছবে না।
সেই এলোমেলো স্তূপের ভেতর এক জায়গায় দেখলাম আমার ‘সরলতা’ ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। আরেক কোণে দেখি আমার স্বভাবের অস্থিরতা ছটফট করছে। এত বড় সেই স্তূপে কাজের মতো একটা জিনিসও খুঁজে পেলাম না। মানে এমন কিছু, যা এই দুনিয়ায় আমার কোনো কাজে আসতে পারে।
সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা সারা হলো। কিন্তু নিজের ভেতর কাজের মতো কিছুই খুঁজে পেলাম না। আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। সে যে কী প্রবল চরম নিরাশা! নিরাশ হতাশ আমি সেই মুহূর্তে নিজের অস্তিত্বের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই একটা দুর্বল কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। মৃদু… কান না পাতলে শোনা যায় না। কেউ যেন বলছিল, ‘আমি তোমার কাজে আসতে পারি।’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কে?’
উত্তর এল, ‘আমি গল্প।’
আমি বিস্ময়ে থমকে গেলাম, ‘গল্প? তুমি কোথায় লুকিয়ে ছিলে? আচ্ছা, তার আগে বলো, তুমি আমার ভেতরে ঢুকলে কী করে?’
গল্প ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘কীভাবে তোমার ভেতরে ঢুকেছি তা আমি জানি না। শুধু জানি, অনেক দিন ধরে তোমার ভেতরের এক অন্ধকার কুঠুরিতে আমি বন্দি হয়ে আছি। মনে হয়… আমার জন্ম হয়েছে এই অন্ধকারেই।’

গল্পের কথাগুলো শুনে আমার বেশ কৌতূহল হলো। সেই অন্ধকার কুঠুরি থেকে বের করে যখন তাকে আলোতে আনলাম, তখন আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না! দেখলাম সে হুবহু আমারই মতো দেখতে!
আমি বললাম, ‘আরে, তুমি তো দেখি আমারই প্রতিচ্ছবি! আচ্ছা বলো, কী বলতে চাও তুমি?’
গল্পের ঠোঁটে একটা হালকা হাসি খেলে গেল, ‘বলার তো অনেক কিছুই আছে। কিন্তু আমার কথা বলার শক্তি এখন খুব কম। পরে বলব। তুমি শুধু এটা বলো, এত দিন পরে আমাকে তোমার চোখে পড়ল কী করে? তুমি যদি সত্যিই তখন দরজা বন্ধ করে চলে যেতে, তবে জানো কী হতো?’
আমি কিছুটা অবহেলার সুরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী আর হতো?’
উত্তর এল, ‘এক বিশাল সম্পত্তি থেকে তুমি বঞ্চিত হতে।’
আমি হেসে উঠলাম, ‘সম্পত্তি!’
কণ্ঠস্বরটি বলে উঠল, ‘তোমার আসল সম্পত্তি তো আমিই। আমাকে আগলে রাখো। কাজে লাগাও। আমাকে বাইরে বের করো, প্রকাশ করো। তোমার সংবেদনশীল হৃদয়ের স্পন্দন আমাকে কোলে নিয়ে খাইয়েছে, তোমার সরলতা আমাকে পুষ্ট করেছে। তোমার জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো আমার দোলনা দুলিয়েছে। তোমার স্বভাবের অস্থিরতা আমার বিছানা। আমি যদি তোমার ভেতর থেকে চলে যাই, তবে তোমার দশা হবে মুক্তো হারিয়ে ফেলা সেই ঝিনুকের মতো। এদিকে এসো। হাত বাড়িয়ে দাও, আমি বাইরে বেরোতে চাই।’
আর এভাবেই আমি গল্পকার হয়ে গেলাম। আমার জীবনের খারাপ দিনগুলোই আমাকে একজন ভালো গল্পকার বানিয়ে দিল।
.png)
চিত্রশিল্পী তৌহিন হাসান ঘুরে দেখেছেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব আর্ট মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি। প্রতিটি সংগ্রহশালায় ক্যানভাস থেকে ক্যানভাসে তিনি খুঁজেছেন শিল্পের ভাষা; রঙ, আলো আর তুলির আঁচড়ে অনুভব করেছেন শিল্পীদের জীবন, সময় ও সৃষ্টির গল্প। সেই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক ‘আর্ট মিউজ
১৯ মিনিট আগে
ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
২১ ঘণ্টা আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
১ দিন আগে
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
২৫ জুলাই ২০২৬