হুমায়ূনের বইয়ের রয়্যালটি: অর্ধেকের বেশি শাওন পরিবারের, বাকিদের ভাগ কত

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং সাহিত্যকর্ম থেকে অর্জিত রয়্যালটির বণ্টন নিয়ে কৌতূহল রয়েছে সাহিত্যমহলে। প্রকাশকদের সূত্রে জানা গেছে, অর্ধেকের বেশি রয়্যালটি পায় শাওন পরিবার। অন্যরা ৪৬ শতাংশেরও বেশি।

আবার আয়েশা ফয়েজের মৃত্যুর পরে রয়্যালটির একটা অংশ হুমায়ূনের ভাই-বোনেরাও পেতেন, কিন্তু লেখকের ভাই-বোনেরা সেই অংশ নেন না বলে জানিয়েছেন প্রকাশকেরা।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর স্বাক্ষরিত উত্তরাধিকার সনদ অনুযায়ী, ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ সম্পদ পায় শাওন পরিবার। বাকিটা পেয়েছেন গুলতেকিন খানের সন্তানেরা।

রয়্যালটি বণ্টনের বর্তমান হিসাব ও পরিস্থিতি

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটি কীভাবে বণ্টন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রকাশকদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রকাশকের মতে, বর্তমানে মেহের আফরোজ শাওনের পরিবারকে রয়্যালটির ৫২ দশমিক ৪৩ শতাংশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, গুলতেকিন খানের সন্তানদের দেওয়া হয় ৪৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ওই প্রকাশক জানান, আগে হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজও রয়্যালটির অংশ পেতেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর লেখকের ভাই-বোনেরাও পেতেন। তবে বর্তমানে তাঁরা তা নেন না। সেই রয়্যালটির টাকা লেখকের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

রয়্যালটি বণ্টনের এই বিষয়ে সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ জানান, আগে রয়্যালটির মোট তিনটি ভাগ ছিল। প্রথম ভাগে ছিলেন মেহের আফরোজ শাওন ও তাঁর ছেলেরা। দ্বিতীয় ভাগে ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ। তৃতীয় ভাগে ছিলেন গুলতেকিন খানের সন্তানেরা (তবে গুলতেকিন খান নিজে কোনো ভাগ পেতেন না)। হুমায়ূন আহমেদের মা মারা যাওয়ার পর তাঁর অংশটি দুই পরিবারের সন্তানদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। তাঁর মতে, বর্তমানে শাওন ও তাঁর সন্তানেরা পান ৫০ শতাংশের ওপরে এবং অন্য পরিবারের সন্তানেরা পান ৪৬ শতাংশের ওপরে।

রয়্যালটির বিষয়ে অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘কোর্ট থেকে এটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ীই আমরা দিই। শাওন পরিবার পায় ৫২ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং গুলতেকিন খানের সন্তানদের দেওয়া হয় ৪৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ।’

তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদের মা মারা যাওয়ার পরে এভাবে দেওয়া হয়। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় রয়্যালটির একটা অংশ পেতেন। পরে আয়েশা ফয়েজের ছেলে-মেয়েদের সেই সম্মানী দেওয়া হতো। কিন্তু তারাও এই রয়্যালটি এখন নেন না। সেই রয়্যালটি এখন হুমায়ূন আহমেদের ছেলেমেয়েদের সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়।

আইনি ব্যাখ্যা

একজন মুসলিম লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর রয়্যালটি এবং কপিরাইট বণ্টনের ক্ষেত্রে আইনি রূপরেখা কেমন হয়, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, একজন লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর সাহিত্যকর্ম থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির ক্ষেত্রে কপিরাইট আইন প্রথমে নির্ধারণ করে লেখকের মৃত্যুর পর কতদিন পর্যন্ত তাঁর কপিরাইট বহাল থাকবে এবং কারা সেই কপিরাইটের মালিক হতে পারবেন।

লেখক যদি মুসলিম হন, তবে সে ক্ষেত্রে কপিরাইট আইন এবং মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ)—এই দুটি আইন একসঙ্গে কাজ করে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন নির্ধারণ করে যে, মৃত লেখকের সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কী অনুপাতে বণ্টিত হবে।

আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান আরও বলেন, কার্যত একজন লেখকের কপিরাইট একটি ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। লেখক মারা গেলে তাঁর এই কপিরাইট উত্তরাধিকারীদের সম্পদের অংশে পরিণত হয়। তখন লেখক মুসলিম হলে তাঁর কপিরাইটের মালিকানা মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে।

তবে এখানে একটি বিশেষ দিক রয়েছে। কপিরাইট আইন কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখককে তাঁর জীবদ্দশায় কপিরাইট অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ দেয়। যদি লেখক তাঁর জীবদ্দশায় বৈধভাবে কোনো প্রকাশকের কাছে কপিরাইট হস্তান্তর করে থাকেন, তবে মৃত্যুর পর সেই কপিরাইট উত্তরাধিকারীদের কাছে নাও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীরা কেবল চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য রয়্যালটি দাবি করতে পারবেন, যদি চুক্তিতে তেমন কোনো বিধান রাখা হয়ে থাকে।

আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামানের মতে, সংক্ষেপে বলতে গেলে—কপিরাইট আইন নির্ধারণ করে দেয় ‘কী’ উত্তরাধিকারসূত্রে যাবে, আর মুসলিম উত্তরাধিকার আইন নির্ধারণ করে ‘কারা’ এবং ‘কত অংশে’ তা পাবে। অর্থাৎ একজন মুসলিম লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর কপিরাইট ও অর্জিত রয়্যালটি বণ্টনের ক্ষেত্রে কপিরাইট আইন এবং মুসলিম উত্তরাধিকার আইন পরস্পর পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির আইনি বণ্টন ও উত্তরাধিকারীদের সুনির্দিষ্ট অংশ

২০১২ সালের ১৯ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি প্রয়াত ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং আয়েশা ফয়েজের পুত্র। মৃত্যুর পর তিনি তাঁর মা, স্ত্রী, তিন কন্যা ও তিন পুত্রসহ মোট আটজন উত্তরাধিকারী রেখে গেছেন।

২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশের আইনজীবী তাপস বন্ধু দাশের স্বাক্ষর ও সিলমোহরসহ তাঁর চেম্বারের ঠিকানা উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি উত্তরাধিকার সনদ প্রদান করা হয়। হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই সনদটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই নথিটি এসেছে স্ট্রিমের হাতে।

এই আইনি নথির তথ্যানুযায়ী, হুমায়ূন আহমেদের রেখে যাওয়া সমস্ত স্থাবর, অস্থাবর, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সম্পত্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অনুপাতে তাঁর আটজন উত্তরাধিকারী অংশ পাওয়ার অধিকারী।

নথি অনুযায়ী, ড. হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজের তৎকালীন বয়স ছিল ৮৩ বছর। তিনি মোট সম্পত্তির ১/৬ অংশ বা ৩৬/২১৬ অংশের অংশীদার হন, যা শতকরা হিসাবে ১৬.৬৭ শতাংশ। এছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন (তৎকালীন বয়স ৩১ বছর) সম্পত্তির ১/৮ অংশ বা ২৭/২১৬ অংশের অংশীদার, যা শতকরা হিসাবে ১২.৫০ শতাংশ।

নথি অনুযায়ী, হুমায়ূন আহমেদের কন্যা নোভা আহমেদের তৎকালীন বয়স ছিল ৩৬ বছর। তিনি মোট সম্পত্তির ১৭/২১৬ অংশ পেয়েছেন, যা শতকরা হিসাবে ৭.৮৭ শতাংশ। অপর কন্যা শীলা আহমেদের তৎকালীন বয়স ছিল ৩২ বছর। তিনি সম্পত্তির ১৭/২১৬ অংশের অংশীদার, যা শতকরা হিসাবে ৭.৮৭ শতাংশ। হুমায়ূন আহমেদের আরেক কন্যা বিপাশা আহমেদ (তৎকালীন বয়স ২৯ বছর) সম্পত্তির ১৭/২১৬ অংশ পেয়েছেন, যা শতকরা হিসাবে ৭.৮৭ শতাংশ।

নথি অনুযায়ী, হুমায়ূন আহমেদের পুত্র নুহাশ হুমায়ূনের তৎকালীন বয়স ছিল ২১ বছর। তিনি মোট সম্পত্তির ৩৪/২১৬ অংশের অংশীদার, যা শতকরা হিসাবে ১৫.৭৪ শতাংশ। হুমায়ূন আহমেদের নাবালক পুত্র নিষাদ হুমায়ূনের তৎকালীন বয়স ছিল ৬ বছর। তিনি সম্পত্তির ৩৪/২১৬ অংশ পেয়েছেন, যা শতকরা হিসাবে ১৫.৭৪ শতাংশ। লেখকের অপর নাবালক পুত্র নিনিত হুমায়ূনের তৎকালীন বয়স ছিল ৩ বছর। তিনি সম্পত্তির ৩৪/২১৬ অংশের অংশীদার, যা শতকরা হিসাবে ১৫.৭৪ শতাংশ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত