leadT1ad

কাজীর সংসার: মাসুদ রানা-কুয়াশা-রহস্য পত্রিকা-সেবা প্রকাশনী

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮: ৫০
স্ট্রিম গ্রাফিক

কাজী আনোয়ার হোসেন বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও প্রভাবশালী নাম। তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন, যখন বাংলা সাহিত্যে বিনোদনমূলক থ্রিলার, গোয়েন্দা ও অ্যাকশনধর্মী কাহিনির সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত। ষাটের দশকের শুরুতে ‘কুয়াশা’ সিরিজ এবং মধ্যভাগে ‘মাসুদ রানা’ নামক গুপ্তচর চরিত্র সৃষ্টি করে তিনি বাংলা পাঠকদের সামনে এক নতুন ধারার সাহিত্য উপহার দেন, যা পরবর্তী সময়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাঠকপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

কাজী আনোয়ার হোসেন বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের এক উজ্জ্বল পথপ্রদর্শক। তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্র ও গল্প আজও পাঠকের মনে জীবন্ত, এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তিনি শুধু একজন লেখক নন, বরং বাংলা থ্রিলার ও গোয়েন্দা সাহিত্যের একটি যুগের নাম।

কাজী আনোয়ার হোসেনের অনেক রচনা যদিও বিদেশি কাহিনি দ্বারা অনুপ্রাণিত, তবুও সেগুলোকে বাংলা ভাষা, সমাজ ও পাঠক মানসিকতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন। তাঁর লেখালেখি প্রমাণ করে, সাহিত্য শুধু উচ্চাঙ্গের জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের আনন্দ, কল্পনা ও স্বপ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি সাহিত্যকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ, রোমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন।

‘মাসুদ রানা’ সিরিজ

কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ সিরিজ যারা পড়েছেন, তারা শুধু রোমাঞ্চকর গল্পের আনন্দই পাননি, বরং পাঠক হিসেবে জীবনের নৈতিক শিক্ষা, সাহসিকতা ও কৌশলগত চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। এই সিরিজের গল্পগুলো পাঠকের মনকে উত্তেজনা ও কৌতূহলের মাধ্যমে আলোকিত করে এবং তাদের চিন্তার জগতে নতুন দিশা প্রবর্তন করে। যারা ইতিমধ্যেই পড়েছেন, তারা এর সৌন্দর্য উপলব্ধি করেছেন, আর ভবিষ্যতের পাঠকরাও এই অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।

গোয়েন্দা ও অ্যাকশন থ্রিলার হিসেবে মাসুদ রানা সিরিজ ব্যাপক জনপ্রিয়। মূলত থ্রিলার ও গুপ্তচর কাহিনির এক অনন্য সংমিশ্রণ এই সিরিজ, যা বাংলা সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র ধারার সৃষ্টি করেছে। এই সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাসুদ রানা একজন প্রশিক্ষিত গুপ্তচর, যিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন বিপজ্জনক মিশনে অংশ নেন। রহস্য, উত্তেজনা, দ্রুতগতির অ্যাকশন এবং বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের সমন্বয়ে প্রতিটি কাহিনি পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনার মধ্যে ধরে রাখে।

মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই। ছবি: সংগৃহীত
মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই। ছবি: সংগৃহীত

এই সিরিজের থ্রিলার দিকটি ফুটে ওঠে আকস্মিক বিপদ, শত্রুর গোপন ষড়যন্ত্র, প্রাণঘাতী পরিস্থিতি এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা অভিযানের মাধ্যমে। গল্পের বাঁকে বাঁকে রয়েছে চমক, বিশ্বাসঘাতকতা ও অপ্রত্যাশিত মোড়, যা পাঠকের কৌতূহলকে ক্রমাগত উসকে দেয়। মাসুদ রানার সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি ও মানসিক দৃঢ়তা তাকে প্রতিটি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে, যা থ্রিলার কাহিনির মূল আকর্ষণকে আরও শক্তিশালী করে।

মাসুদ রানা সিরিজ কেবল বিনোদনমূলক থ্রিলার নয়; এটি সাহস, দায়িত্ববোধ এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর বার্তা বহন করে। থ্রিলার ও গুপ্তচর কাহিনির এই সফল মিশ্রণই সিরিজটিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনপ্রিয় করে রেখেছে এবং বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় স্থান করে দিয়েছে।

‘মাসুদ রানা’ সিরিজের প্রথম গ্রন্থ ‘ধ্বংস-পাহাড়’ ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয়, এবং তখন থেকেই এটি তরুণ ও গোয়েন্দা সাহিত্যের প্রেমীদের মাঝে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই সিরিজে চার শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। সিরিজের প্রথম দুইটি বই মৌলিক হলেও পরবর্তীতে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার বইয়ের ভাবানুবাদ বা ছায়া অবলম্বনে রচিত হওয়া বইয়ের আধিক্য দেখা যায়।

কুয়াশা সিরিজ

ব্যতিক্রমধর্মী থ্রিলার ‘কুয়াশা’ সিরিজ। এই সিরিজের গল্পগুলোতে রহস্য, আতঙ্ক, এবং অতিপ্রাকৃত আবহ একসঙ্গে মিশে এক ভিন্নধর্মী পাঠ অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। কুয়াশা সিরিজ বাংলা থ্রিলার সাহিত্যে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে পরিচিত, যা পাঠকের কল্পনা ও ভয়ের জগতে এক রহস্যময় কুয়াশা ছড়িয়ে আজও আলোচিত হয়ে আছে।

প্রথম গ্রন্থ ‘কুয়াশা-১’ প্রকাশের মাধ্যমে এই সিরিজের যাত্রা শুরু হয়। ধারাবাহিকভাবে ‘কুয়াশা-৭৮’ গ্রন্থের মাধ্যমে সিরিজটির সমাপ্তি ঘটে। ৭৮টি গ্রন্থ নিয়ে এই সিরিজ দীর্ঘ সময় ধরে পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিশেষ করে রহস্য ও ভৌতিক-থ্রিলার ঘরানার পাঠকদের কাছে কুয়াশা সিরিজ ছিল ভীষণ আকর্ষণীয়।

কুয়াশা সিরিজের প্রথম বই। ছবি: সংগৃহীত
কুয়াশা সিরিজের প্রথম বই। ছবি: সংগৃহীত

‘কুয়াশা’ সিরিজ যৌথ সৃষ্টির বৈচিত্র্য বহন করে—কাজী আনোয়ার হোসেন ছাড়াও এই সিরিজের কিছু গ্রন্থ লিখেছেন শেখ আবদুল হাকিম। তাঁর লেখায় গল্পের ভিন্নতা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হয়েছে, যা সিরিজকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

রহস্য পত্রিকা

কাজী আনোয়ার হোসেনের সম্পাদনায় ‘রহস্য পত্রিকা’ অন্যতম জনপ্রিয় একটি পত্রিকা। রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চারধর্মী মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালের নভেম্বরে। তবে চারটি সংখ্যা বের হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় পত্রিকাটির প্রকাশনা স্থগিত রাখা হয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন কারণে পত্রিকাটি প্রকাশ আর সম্ভব হয়নি। তবে ১৯৮৪ সাল থেকে ‘রহস্য পত্রিকা’ আবার প্রকাশিত হয়, যা আজ অবধি চলমান আছে।

সেবা প্রকাশনী

সেবা প্রকাশনী ১৯৬৩ সালে কাজী আনোয়ার হোসেন প্রতিষ্ঠা করেন এবং রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মূলত মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, কুয়াশা-এর মতো জনপ্রিয় থ্রিলার ও গোয়েন্দা কাহিনি এবং কিশোর ক্লাসিক ও ওয়েস্টার্ন ধারার বইয়ের জন্য এই প্রকাশনী পরিচিত। পেপারব্যাক সাহিত্য এবং রহস্য-রোমাঞ্চ ঘরানার বইয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সেবা পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে।

সেবা প্রকাশনী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৩ সালের মে মাসে। ১৯৬৪ সালের জুন মাসে কুয়াশা সিরিজের প্রকাশনা শুরু হয়। কুয়াশা সিরিজ সেবা থেকে প্রকাশিত প্রথম সিরিজ বা গ্রন্থমালা।

সেবা প্রকাশনীর মূল অফিস ছিল ঢাকার তৎকালীন সেগুনবাগান এলাকায়। দুজন কর্মচারী নিয়ে সেগুনবাগান প্রেসের যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে নাম পাল্টে হয় সেবা প্রকাশনী। এই সেগুন বাগান নামটির দুই অংশের প্রথম অক্ষর দুটি নিয়ে সেবার নামকরণ করা হয়। বর্তমানে এলাকাটির নাম সেগুনবাগিচা।

সেবা প্রকাশনীর লোগো। ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া
সেবা প্রকাশনীর লোগো। ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া

সেবা থেকে প্রকাশিত অন্যান্য জনপ্রিয় সিরিজগুলো হলো: তিন গোয়েন্দা সিরিজ, অয়ন-জিমি সিরিজ, কিশোর হরর সিরিজ, গোয়েন্দা রাজু সিরিজ, রোমহর্ষক সিরিজ, অ্যাডভেঞ্চার সিরিজ, কিশোর ক্লাসিক সিরিজ, সেবা রোমান্টিক সিরিজ, আত্মউন্নয়ন সিরিজ।

কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু একক কোনো চরিত্র বা সিরিজের স্রষ্টা নয়, তিনি বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ যুগের রূপকার। মাসুদ রানা ও কুয়াশা সিরিজের মাধ্যমে তিনি থ্রিলার, গুপ্তচর ও রহস্য সাহিত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন; রহস্য পত্রিকার মাধ্যমে পাঠকের কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসাকে লালন করেছেন; আর সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমে এই ধারাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম সাধারণ মানুষের বিনোদন, কল্পনা ও চিন্তার জগতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বইমুখী করেছে। তাই কাজী আনোয়ার হোসেনকে শুধু একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবে নয়, বরং বাংলা রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় পথপ্রদর্শক ও স্থপতি হিসেবেই স্মরণ করা হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত