মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

১৯২২ সালের নভেম্বরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যে তরুণ কবিটিকে কলকাতার জেলে এনে তোলা হয়েছিল, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাঁকে চিনেছিল কেবল একটি মামলার নম্বর হিসেবে—‘রাজবন্দি’। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দিটি লিখে দিলেন, সেটি আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না; সেটি ছিল বিচারকের আসনটিকেই উল্টে দেওয়ার দলিল।
‘ধূমকেতু’তে ছাপা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহের প্রমাণ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম জবাবে শুরু করলেন এইভাবে: ‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।’ বাক্যটি নালিশ নয়, ঘোষণা। যে ভাষায় মানুষ ক্ষমা চায়, সে ভাষা এখানে নেই; আছে সেই ভাষা, যে ভাষায় মানুষ রায় শোনায়।
এরপর তিনি যা বললেন, সেটিই এই লেখার কেন্দ্রীয় বাক্য: ‘একধারে রাজশক্তি, একধারে সত্য। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আর একজন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড।’ এক বাক্যে গোটা ঔপনিবেশিক আইনব্যবস্থার মুখোশটা খুলে গেল। রাষ্ট্র বলতে চায়, আইন আর ন্যায় এক জিনিস। আদালত বলতে চায়, রায় আর সত্য এক জিনিস। নজরুল দেখিয়ে দিলেন—না, ওরা দুই জিনিস, এবং প্রায়শই ওরা পরস্পরের শত্রু। রাজদণ্ডের হাতে থাকে পুলিশ, দণ্ডবিধি, কারাগার আর ফাঁসিকাঠ। ন্যায়দণ্ডের হাতে থাকে কেবল একটি কণ্ঠস্বর। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, দ্বিতীয়টিকে ভয় পায় প্রথমটি; উল্টোটা নয়।
নজরুল নিজের অবস্থানকে গুলিয়ে ফেলতে দেননি এক মুহূর্তের জন্যও। তিনি রাজদ্রোহী নন—তিনি অন্যায়ের বিদ্রোহী। এই পার্থক্যটুকু তাঁর জবানবন্দির প্রাণ। রাষ্ট্র চেয়েছিল তাঁকে একটি অপরাধীর খোপে ঢুকিয়ে দিতে, যাতে তাঁর কথার কোনো নৈতিক ওজন না থাকে। তিনি সেই খোপ ভেঙে বেরিয়ে এসে বললেন, তাঁর বিদ্রোহ কোনো ব্যক্তি বা সিংহাসনের বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ‘আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদান করার জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।’ এই আত্মপরিচয়ের ঠিকানাটিই ঔপনিবেশিক আদালতের কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল। কারণ যে মানুষ নিজের বৈধতা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নেয় না, তাকে রাষ্ট্র অবৈধ ঘোষণা করে কোনো লাভ নেই।
একশো বছর পর, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, বাংলাদেশের রাস্তায় ঠিক এই দৃশ্যটাই আবার মঞ্চস্থ হলো। একদিকে রাজদণ্ড—রাষ্ট্রীয় বাহিনী, দলীয় ক্যাডার, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেপ্তার, ‘ব্লক রেইড’। অন্যদিকে ন্যায়দণ্ড—হাতে কেবল একটা প্ল্যাকার্ড আর গলায় একটা স্লোগান নিয়ে দাঁড়ানো কিছু শিক্ষার্থী। রংপুরে আবু সাঈদ যখন দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়ালেন, তখন তিনি আসলে একটি বাক্যকেই শরীরে অনুবাদ করছিলেন। রাজদণ্ডের হাতে ছিল রাইফেল, তাঁর হাতে ছিল একটি লাঠি আর একটি সত্য। গুলিটা তাঁর বুকে লাগল, কিন্তু ভিডিওটা লাগল গোটা দেশের বুকে।
রাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে তাদের গায়ে নাম সেঁটে দিতে চাইল—জঙ্গি, রাজাকার, দেশের শত্রু, বিদেশি ষড়যন্ত্রের দালাল তকমা। ঠিক যেভাবে একশো বছর আগে নজরুলের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল ‘রাজবিদ্রোহী’ তকমাটি। এই নামকরণের রাজনীতিটা বোঝা জরুরি। শাসক আগে প্রতিবাদকারীর পরিচয় নির্ধারণ করে নেয়, তারপর সেই পরিচয়ের উপযুক্ত শাস্তিটা প্রয়োগ করে। নজরুল সেই ফাঁদে পা দেননি; তিনি রাষ্ট্রের দেওয়া নামটা ছুড়ে ফেলে নিজের নামটা নিজে ঘোষণা করেছিলেন। চব্বিশের শিক্ষার্থীরাও তাই করলেন—‘রাজাকার’ গালিটাকে তারা স্লোগানে রূপান্তরিত করে ফিরিয়ে দিলেন। অপমানকে অস্ত্র বানিয়ে ফেরত পাঠানোর এই কৌশলটা আসলে আত্মপরিচয়ের ওপর নিজের দখল ফিরিয়ে নেওয়া।
-bec8bb.jpg)
কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র কখনোই নতুন কৌশল আবিষ্কার করে না, সে কেবল ঔপনিবেশিক পুরোনো ম্যানুয়ালটাই আবার খুলে বসে। ব্রিটিশ যে ১২৪-ক ধারা দিয়ে নজরুলকে ধরেছিল, ফ্যাসিবাদী সরকার সেই একই যুক্তি দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বানিয়েছিল। ব্রিটিশ যেভাবে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’র নামে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করত, চব্বিশে সেভাবেই হল বন্ধ করে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে, শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা হলো। রিমান্ডের নামে নির্যাতন, গুম হয়ে যাওয়া তরুণ, আয়নাঘরের গল্প—এসবের কোনোটিই বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়। এগুলো ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার, যা স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র পরম যত্নে সংরক্ষণ করেছিল, শুধু বন্দুকের নলটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল নিজের নাগরিকদের দিকে।
নজরুল জানতেন, কারাগার আসলে ভয় উৎপাদনের কারখানা। শাসক একজনকে বন্দি করে দশ হাজারকে চুপ করানোর জন্য। তাই তাঁর জবানবন্দির সবচেয়ে বড় আঘাতটা ছিল ভয়ের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, সত্য স্বয়ং-প্রকাশ; তাকে কারারুদ্ধ করা যায় না। কবিকে জেলে পোরা যায়, কিন্তু কবির বাণীকে নয়। এই কথাটির সত্যতা চব্বিশে আমরা চোখের সামনে দেখেছি। সরকার শত শত শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গেছে, ডিবি অফিসে বসিয়ে জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি পড়িয়েছে ক্যামেরার সামনে। ফল কী হলো? পরদিন সেই ভিডিওটাই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় প্ররোচনা। জোর করে আদায় করা স্বীকারোক্তি রাষ্ট্রকে বাঁচায় না, ফাঁসিয়ে দেয়।
‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট’—নজরুলের এই লাইনটা এতদিন আমাদের কাছে ছিল অনুষ্ঠানের গান। চব্বিশে এটা আবার কাজের নির্দেশনা হয়ে উঠল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে যেদিন শিক্ষার্থীরা দখলদার ছাত্রসংগঠনকে বের করে দিলেন, যেদিন গেটের তালা ভেঙে মিছিল রাস্তায় নামল, সেদিন গানটার প্রতিটি শব্দ আক্ষরিক অর্থ ফিরে পেল। রাষ্ট্র ভেবেছিল হলগুলোই তার সবচেয়ে বড় দুর্গ, কারণ ওখানে সিট মানেই আনুগত্য। অথচ সেই দুর্গই প্রথম ভাঙল। ভয় জিনিসটা এমন—যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পাথরের মতো শক্ত, আর ভাঙলে বালির মতো গুঁড়ো।
জবানবন্দিতে নজরুল নিজেকে বলেছিলেন বাঁশি—যন্ত্র, যন্ত্রী নন। বাণীটা তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তিনি কেবল বাহক। এই বিনয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সত্য: যে কথার মালিক কোনো একক ব্যক্তি নয়, সেই কথা মেরে ফেলা যায় না। ব্রিটিশ নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিল, ভেবেছিল ‘ধূমকেতু’র আগুন নিভে যাবে। নেভেনি। চব্বিশের আন্দোলনেরও কোনো একক নেতা ছিল না, কোনো একক দপ্তর ছিল না, যেটা দখল করলেই সব শেষ। সমন্বয়কদের ধরে নিয়ে গিয়েও রাষ্ট্র দেখল, পরদিন রাস্তায় মানুষ আরও বেশি। দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি, ফেসবুকের প্রোফাইল লাল—বাণীর কোনো একটা ঠিকানা ছিল না বলেই সেটা তল্লাশি করে পাওয়া গেল না।
তবে নজরুলের জবানবন্দিকে কেবল সাহসের দলিল বলে পড়লে তার অর্ধেকটা হারিয়ে যায়। ওটা একই সঙ্গে একটা নৈতিক দর্শনের দলিল। তিনি কোথাও প্রতিশোধের কথা বলেননি, ঘৃণার চাষ করেননি। তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অন্যায়কারীর ব্যক্তিসত্তার বিরুদ্ধে নয়। এই জায়গাটায় চব্বিশের তরুণদের সঙ্গে তাঁর মিলটা সবচেয়ে গভীর। যখন আন্দোলনকারীরা নিহত পুলিশ সদস্যের জানাজায় দাঁড়িয়েছেন, যখন মন্দির পাহারা দিতে সারারাত জেগে থেকেছেন, তখন তাঁরা আসলে সেই একই নীতিতেই দাঁড়িয়েছিলেন—অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই আর প্রতিহিংসা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটুকু হারিয়ে ফেললে বিদ্রোহ নিজেই নতুন রাজদণ্ড হয়ে ওঠে।
আরেকটি প্রশ্ন এই লেখাটি লেখকদের দিকে ছুড়ে দেয়। নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন, কবির দায়িত্ব সত্যকে প্রকাশ করা—সরকারের স্তুতি করা নয়, নিরপেক্ষতার ভান করে চুপ থাকাও নয়। অথচ চব্বিশের জুলাইয়ে যখন ছেলেমেয়েগুলো রাস্তায় মরছিল, তখন দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত কবি, অধ্যাপক ও সাংবাদিক নীরবতাকেই ভদ্রতা বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ কেউ আরও এগিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের যৌক্তিকতা খুঁজেছিলেন। ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ তাঁদের জন্য কোনো ছাড় রাখে না। যে কলম রাজদণ্ডের ছায়ায় আরাম খোঁজে, নজরুলের সংজ্ঞায় সে কলম আর কবির থাকে না, কেরানির হয়ে যায়।
এখানেই ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ আমাদের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা করে। নজরুল রাজশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজার বিরুদ্ধে নয়। রাজদণ্ড হাতবদল হতে পারে, কিন্তু রাজদণ্ড রাজদণ্ডই থাকে। যে গুম-খুন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে চব্বিশের ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিলেন, সেই একই যন্ত্র কাল অন্য কারও হাতে গেলে সে কি আপনাআপনি ন্যায়দণ্ড হয়ে যাবে? নজরুলের উত্তর পরিষ্কার—না। যে কণ্ঠ শুধু নিজের প্রতিপক্ষ ক্ষমতায় থাকলে সোচ্চার হয় আর নিজের লোক ক্ষমতায় এলে চুপ করে যায়, সে কণ্ঠ ন্যায়দণ্ড ধরেনি, সে শুধু রাজদণ্ডের পালা বদলের জন্য অপেক্ষা করছিল।

এই কারণেই জবানবন্দিটি এখনো ব্যবহারযোগ্য, জাদুঘরের জিনিস নয়। একটা রাষ্ট্র যখন প্রশ্নকে অপরাধ বানায়, তখন সে যে নামেই ডাকা হোক—ঔপনিবেশিক, জাতীয়তাবাদী, উন্নয়নবাদী, বিপ্লবী—চরিত্রে সে একই। নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে যে মৌলিক প্রশ্নটা তুলেছিলেন, সেটা হলো: সত্য বলার অধিকারের বৈধতা কে দেয়? রাষ্ট্র? তাহলে রাষ্ট্র যা শুনতে চায় না, তা কখনোই বলা যাবে না, এবং কথার স্বাধীনতা কথাটার আর কোনো মানে থাকে না। তিনি সেই বৈধতার উৎসকে রাষ্ট্রের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন—বিবেক ও সত্যের কাছে। এই স্থানান্তরটাই তাঁর সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ, কবিতার চেয়েও বড়।
চব্বিশের জুলাইয়ে যে ছেলেটি টিয়ারশেলের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সহপাঠীর রক্তাক্ত শরীরটা কাঁধে তুলে নিয়েছিল, সে হয়তো ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ পড়েনি। কিন্তু সে ঠিক ওই কাজটাই করছিল, যেটা নজরুল কাগজে করেছিলেন—রাষ্ট্রের ভয়কে অস্বীকার করা। বইয়ের সঙ্গে রাস্তার সম্পর্কটা এইভাবেই তৈরি হয়। কোনো প্রবন্ধ কোনো মিছিল তৈরি করে না, কিন্তু মিছিলটা যখন তৈরি হয়ে যায়, তখন সে নিজের ভাষা খুঁজতে গিয়ে পুরোনো কণ্ঠস্বরগুলোকে আবিষ্কার করে। শহীদ মিনারের দেয়ালে যেদিন কেউ নজরুলের লাইন লিখে দিল, সেদিন একশো বছর আগের একটা আদালতকক্ষ আর ২০২৪ সালের একটা রাস্তা এক হয়ে গেল।
নজরুল সেই মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। জেলে গিয়ে অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে চল্লিশ দিন অনশন করেছিলেন। রাষ্ট্র শাস্তি দিতে পেরেছিল, কিন্তু বশ করতে পারেনি। শাস্তি আর বশীকরণের এই ব্যবধানটাই সব স্বৈরশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা। চব্বিশেও তাই হলো—রাষ্ট্র মারতে পেরেছিল, আটকাতে পারেনি; ইন্টারনেট বন্ধ করতে পেরেছিল, খবর আটকাতে পারেনি; কারফিউ দিতে পেরেছিল, রাস্তা খালি রাখতে পারেনি। যেদিন একটা রাষ্ট্র বুঝতে পারে যে তার নাগরিক আর ভয় পাচ্ছে না, সেদিন তার হাতে আর কোনো হাতিয়ার অবশিষ্ট থাকে না। বন্দুক তখন কেবল শব্দ করে, শাসন করে না।
‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ তাই কোনো একটি সালের দলিল নয়, একটি অবস্থানের নাম। যতদিন কোথাও কোনো তরুণকে সত্য বলার অপরাধে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, যতদিন কোনো আদালত ন্যায়ের বদলে ক্ষমতার সেবা করবে, ততদিন এই লেখাটা কাউকে না কাউকে খুঁজে নেবে। চব্বিশ আমাদের শিখিয়েছে, ন্যায়দণ্ড কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জিনিস নয়; প্রতিটি প্রজন্মকে সেটা নিজের হাতে তুলে নিতে হয়, এবং প্রতিটি প্রজন্মকেই আবার প্রমাণ দিতে হয় যে সে সেটা রাজদণ্ড বানিয়ে ফেলেনি। নজরুল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটা রেখে গিয়েছিলেন, সেটা এখনো আমাদের ঘাড়ের ওপর ঝুলে আছে—আপনার হাতে কোনটা?
• মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়

১৯২২ সালের নভেম্বরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যে তরুণ কবিটিকে কলকাতার জেলে এনে তোলা হয়েছিল, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাঁকে চিনেছিল কেবল একটি মামলার নম্বর হিসেবে—‘রাজবন্দি’। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দিটি লিখে দিলেন, সেটি আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না; সেটি ছিল বিচারকের আসনটিকেই উল্টে দেওয়ার দলিল।
‘ধূমকেতু’তে ছাপা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহের প্রমাণ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম জবাবে শুরু করলেন এইভাবে: ‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।’ বাক্যটি নালিশ নয়, ঘোষণা। যে ভাষায় মানুষ ক্ষমা চায়, সে ভাষা এখানে নেই; আছে সেই ভাষা, যে ভাষায় মানুষ রায় শোনায়।
এরপর তিনি যা বললেন, সেটিই এই লেখার কেন্দ্রীয় বাক্য: ‘একধারে রাজশক্তি, একধারে সত্য। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আর একজন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড।’ এক বাক্যে গোটা ঔপনিবেশিক আইনব্যবস্থার মুখোশটা খুলে গেল। রাষ্ট্র বলতে চায়, আইন আর ন্যায় এক জিনিস। আদালত বলতে চায়, রায় আর সত্য এক জিনিস। নজরুল দেখিয়ে দিলেন—না, ওরা দুই জিনিস, এবং প্রায়শই ওরা পরস্পরের শত্রু। রাজদণ্ডের হাতে থাকে পুলিশ, দণ্ডবিধি, কারাগার আর ফাঁসিকাঠ। ন্যায়দণ্ডের হাতে থাকে কেবল একটি কণ্ঠস্বর। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, দ্বিতীয়টিকে ভয় পায় প্রথমটি; উল্টোটা নয়।
নজরুল নিজের অবস্থানকে গুলিয়ে ফেলতে দেননি এক মুহূর্তের জন্যও। তিনি রাজদ্রোহী নন—তিনি অন্যায়ের বিদ্রোহী। এই পার্থক্যটুকু তাঁর জবানবন্দির প্রাণ। রাষ্ট্র চেয়েছিল তাঁকে একটি অপরাধীর খোপে ঢুকিয়ে দিতে, যাতে তাঁর কথার কোনো নৈতিক ওজন না থাকে। তিনি সেই খোপ ভেঙে বেরিয়ে এসে বললেন, তাঁর বিদ্রোহ কোনো ব্যক্তি বা সিংহাসনের বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ‘আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদান করার জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।’ এই আত্মপরিচয়ের ঠিকানাটিই ঔপনিবেশিক আদালতের কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল। কারণ যে মানুষ নিজের বৈধতা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নেয় না, তাকে রাষ্ট্র অবৈধ ঘোষণা করে কোনো লাভ নেই।
একশো বছর পর, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, বাংলাদেশের রাস্তায় ঠিক এই দৃশ্যটাই আবার মঞ্চস্থ হলো। একদিকে রাজদণ্ড—রাষ্ট্রীয় বাহিনী, দলীয় ক্যাডার, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেপ্তার, ‘ব্লক রেইড’। অন্যদিকে ন্যায়দণ্ড—হাতে কেবল একটা প্ল্যাকার্ড আর গলায় একটা স্লোগান নিয়ে দাঁড়ানো কিছু শিক্ষার্থী। রংপুরে আবু সাঈদ যখন দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়ালেন, তখন তিনি আসলে একটি বাক্যকেই শরীরে অনুবাদ করছিলেন। রাজদণ্ডের হাতে ছিল রাইফেল, তাঁর হাতে ছিল একটি লাঠি আর একটি সত্য। গুলিটা তাঁর বুকে লাগল, কিন্তু ভিডিওটা লাগল গোটা দেশের বুকে।
রাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে তাদের গায়ে নাম সেঁটে দিতে চাইল—জঙ্গি, রাজাকার, দেশের শত্রু, বিদেশি ষড়যন্ত্রের দালাল তকমা। ঠিক যেভাবে একশো বছর আগে নজরুলের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল ‘রাজবিদ্রোহী’ তকমাটি। এই নামকরণের রাজনীতিটা বোঝা জরুরি। শাসক আগে প্রতিবাদকারীর পরিচয় নির্ধারণ করে নেয়, তারপর সেই পরিচয়ের উপযুক্ত শাস্তিটা প্রয়োগ করে। নজরুল সেই ফাঁদে পা দেননি; তিনি রাষ্ট্রের দেওয়া নামটা ছুড়ে ফেলে নিজের নামটা নিজে ঘোষণা করেছিলেন। চব্বিশের শিক্ষার্থীরাও তাই করলেন—‘রাজাকার’ গালিটাকে তারা স্লোগানে রূপান্তরিত করে ফিরিয়ে দিলেন। অপমানকে অস্ত্র বানিয়ে ফেরত পাঠানোর এই কৌশলটা আসলে আত্মপরিচয়ের ওপর নিজের দখল ফিরিয়ে নেওয়া।
-bec8bb.jpg)
কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র কখনোই নতুন কৌশল আবিষ্কার করে না, সে কেবল ঔপনিবেশিক পুরোনো ম্যানুয়ালটাই আবার খুলে বসে। ব্রিটিশ যে ১২৪-ক ধারা দিয়ে নজরুলকে ধরেছিল, ফ্যাসিবাদী সরকার সেই একই যুক্তি দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বানিয়েছিল। ব্রিটিশ যেভাবে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’র নামে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করত, চব্বিশে সেভাবেই হল বন্ধ করে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে, শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা হলো। রিমান্ডের নামে নির্যাতন, গুম হয়ে যাওয়া তরুণ, আয়নাঘরের গল্প—এসবের কোনোটিই বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়। এগুলো ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার, যা স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র পরম যত্নে সংরক্ষণ করেছিল, শুধু বন্দুকের নলটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল নিজের নাগরিকদের দিকে।
নজরুল জানতেন, কারাগার আসলে ভয় উৎপাদনের কারখানা। শাসক একজনকে বন্দি করে দশ হাজারকে চুপ করানোর জন্য। তাই তাঁর জবানবন্দির সবচেয়ে বড় আঘাতটা ছিল ভয়ের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, সত্য স্বয়ং-প্রকাশ; তাকে কারারুদ্ধ করা যায় না। কবিকে জেলে পোরা যায়, কিন্তু কবির বাণীকে নয়। এই কথাটির সত্যতা চব্বিশে আমরা চোখের সামনে দেখেছি। সরকার শত শত শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গেছে, ডিবি অফিসে বসিয়ে জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি পড়িয়েছে ক্যামেরার সামনে। ফল কী হলো? পরদিন সেই ভিডিওটাই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় প্ররোচনা। জোর করে আদায় করা স্বীকারোক্তি রাষ্ট্রকে বাঁচায় না, ফাঁসিয়ে দেয়।
‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট’—নজরুলের এই লাইনটা এতদিন আমাদের কাছে ছিল অনুষ্ঠানের গান। চব্বিশে এটা আবার কাজের নির্দেশনা হয়ে উঠল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে যেদিন শিক্ষার্থীরা দখলদার ছাত্রসংগঠনকে বের করে দিলেন, যেদিন গেটের তালা ভেঙে মিছিল রাস্তায় নামল, সেদিন গানটার প্রতিটি শব্দ আক্ষরিক অর্থ ফিরে পেল। রাষ্ট্র ভেবেছিল হলগুলোই তার সবচেয়ে বড় দুর্গ, কারণ ওখানে সিট মানেই আনুগত্য। অথচ সেই দুর্গই প্রথম ভাঙল। ভয় জিনিসটা এমন—যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পাথরের মতো শক্ত, আর ভাঙলে বালির মতো গুঁড়ো।
জবানবন্দিতে নজরুল নিজেকে বলেছিলেন বাঁশি—যন্ত্র, যন্ত্রী নন। বাণীটা তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তিনি কেবল বাহক। এই বিনয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সত্য: যে কথার মালিক কোনো একক ব্যক্তি নয়, সেই কথা মেরে ফেলা যায় না। ব্রিটিশ নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিল, ভেবেছিল ‘ধূমকেতু’র আগুন নিভে যাবে। নেভেনি। চব্বিশের আন্দোলনেরও কোনো একক নেতা ছিল না, কোনো একক দপ্তর ছিল না, যেটা দখল করলেই সব শেষ। সমন্বয়কদের ধরে নিয়ে গিয়েও রাষ্ট্র দেখল, পরদিন রাস্তায় মানুষ আরও বেশি। দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি, ফেসবুকের প্রোফাইল লাল—বাণীর কোনো একটা ঠিকানা ছিল না বলেই সেটা তল্লাশি করে পাওয়া গেল না।
তবে নজরুলের জবানবন্দিকে কেবল সাহসের দলিল বলে পড়লে তার অর্ধেকটা হারিয়ে যায়। ওটা একই সঙ্গে একটা নৈতিক দর্শনের দলিল। তিনি কোথাও প্রতিশোধের কথা বলেননি, ঘৃণার চাষ করেননি। তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অন্যায়কারীর ব্যক্তিসত্তার বিরুদ্ধে নয়। এই জায়গাটায় চব্বিশের তরুণদের সঙ্গে তাঁর মিলটা সবচেয়ে গভীর। যখন আন্দোলনকারীরা নিহত পুলিশ সদস্যের জানাজায় দাঁড়িয়েছেন, যখন মন্দির পাহারা দিতে সারারাত জেগে থেকেছেন, তখন তাঁরা আসলে সেই একই নীতিতেই দাঁড়িয়েছিলেন—অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই আর প্রতিহিংসা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটুকু হারিয়ে ফেললে বিদ্রোহ নিজেই নতুন রাজদণ্ড হয়ে ওঠে।
আরেকটি প্রশ্ন এই লেখাটি লেখকদের দিকে ছুড়ে দেয়। নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন, কবির দায়িত্ব সত্যকে প্রকাশ করা—সরকারের স্তুতি করা নয়, নিরপেক্ষতার ভান করে চুপ থাকাও নয়। অথচ চব্বিশের জুলাইয়ে যখন ছেলেমেয়েগুলো রাস্তায় মরছিল, তখন দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত কবি, অধ্যাপক ও সাংবাদিক নীরবতাকেই ভদ্রতা বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ কেউ আরও এগিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের যৌক্তিকতা খুঁজেছিলেন। ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ তাঁদের জন্য কোনো ছাড় রাখে না। যে কলম রাজদণ্ডের ছায়ায় আরাম খোঁজে, নজরুলের সংজ্ঞায় সে কলম আর কবির থাকে না, কেরানির হয়ে যায়।
এখানেই ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ আমাদের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা করে। নজরুল রাজশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজার বিরুদ্ধে নয়। রাজদণ্ড হাতবদল হতে পারে, কিন্তু রাজদণ্ড রাজদণ্ডই থাকে। যে গুম-খুন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে চব্বিশের ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিলেন, সেই একই যন্ত্র কাল অন্য কারও হাতে গেলে সে কি আপনাআপনি ন্যায়দণ্ড হয়ে যাবে? নজরুলের উত্তর পরিষ্কার—না। যে কণ্ঠ শুধু নিজের প্রতিপক্ষ ক্ষমতায় থাকলে সোচ্চার হয় আর নিজের লোক ক্ষমতায় এলে চুপ করে যায়, সে কণ্ঠ ন্যায়দণ্ড ধরেনি, সে শুধু রাজদণ্ডের পালা বদলের জন্য অপেক্ষা করছিল।

এই কারণেই জবানবন্দিটি এখনো ব্যবহারযোগ্য, জাদুঘরের জিনিস নয়। একটা রাষ্ট্র যখন প্রশ্নকে অপরাধ বানায়, তখন সে যে নামেই ডাকা হোক—ঔপনিবেশিক, জাতীয়তাবাদী, উন্নয়নবাদী, বিপ্লবী—চরিত্রে সে একই। নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে যে মৌলিক প্রশ্নটা তুলেছিলেন, সেটা হলো: সত্য বলার অধিকারের বৈধতা কে দেয়? রাষ্ট্র? তাহলে রাষ্ট্র যা শুনতে চায় না, তা কখনোই বলা যাবে না, এবং কথার স্বাধীনতা কথাটার আর কোনো মানে থাকে না। তিনি সেই বৈধতার উৎসকে রাষ্ট্রের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন—বিবেক ও সত্যের কাছে। এই স্থানান্তরটাই তাঁর সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ, কবিতার চেয়েও বড়।
চব্বিশের জুলাইয়ে যে ছেলেটি টিয়ারশেলের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সহপাঠীর রক্তাক্ত শরীরটা কাঁধে তুলে নিয়েছিল, সে হয়তো ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ পড়েনি। কিন্তু সে ঠিক ওই কাজটাই করছিল, যেটা নজরুল কাগজে করেছিলেন—রাষ্ট্রের ভয়কে অস্বীকার করা। বইয়ের সঙ্গে রাস্তার সম্পর্কটা এইভাবেই তৈরি হয়। কোনো প্রবন্ধ কোনো মিছিল তৈরি করে না, কিন্তু মিছিলটা যখন তৈরি হয়ে যায়, তখন সে নিজের ভাষা খুঁজতে গিয়ে পুরোনো কণ্ঠস্বরগুলোকে আবিষ্কার করে। শহীদ মিনারের দেয়ালে যেদিন কেউ নজরুলের লাইন লিখে দিল, সেদিন একশো বছর আগের একটা আদালতকক্ষ আর ২০২৪ সালের একটা রাস্তা এক হয়ে গেল।
নজরুল সেই মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। জেলে গিয়ে অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে চল্লিশ দিন অনশন করেছিলেন। রাষ্ট্র শাস্তি দিতে পেরেছিল, কিন্তু বশ করতে পারেনি। শাস্তি আর বশীকরণের এই ব্যবধানটাই সব স্বৈরশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা। চব্বিশেও তাই হলো—রাষ্ট্র মারতে পেরেছিল, আটকাতে পারেনি; ইন্টারনেট বন্ধ করতে পেরেছিল, খবর আটকাতে পারেনি; কারফিউ দিতে পেরেছিল, রাস্তা খালি রাখতে পারেনি। যেদিন একটা রাষ্ট্র বুঝতে পারে যে তার নাগরিক আর ভয় পাচ্ছে না, সেদিন তার হাতে আর কোনো হাতিয়ার অবশিষ্ট থাকে না। বন্দুক তখন কেবল শব্দ করে, শাসন করে না।
‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ তাই কোনো একটি সালের দলিল নয়, একটি অবস্থানের নাম। যতদিন কোথাও কোনো তরুণকে সত্য বলার অপরাধে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, যতদিন কোনো আদালত ন্যায়ের বদলে ক্ষমতার সেবা করবে, ততদিন এই লেখাটা কাউকে না কাউকে খুঁজে নেবে। চব্বিশ আমাদের শিখিয়েছে, ন্যায়দণ্ড কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জিনিস নয়; প্রতিটি প্রজন্মকে সেটা নিজের হাতে তুলে নিতে হয়, এবং প্রতিটি প্রজন্মকেই আবার প্রমাণ দিতে হয় যে সে সেটা রাজদণ্ড বানিয়ে ফেলেনি। নজরুল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটা রেখে গিয়েছিলেন, সেটা এখনো আমাদের ঘাড়ের ওপর ঝুলে আছে—আপনার হাতে কোনটা?
• মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়
.png)
-207c16-256x144.webp)
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবিনশ্বর রচনা তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। বিখ্যাত এই কবিতা নজরুলকে এনে দিয়েছে ‘বিদ্রোহী কবি’ খেতাব। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বয়স একশ বছর অতিক্রান্ত। কবিতার জন্ম থেকে আজ অবধি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও ‘বিদ্রোহী’ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অতিক্রান্ত শত বছরেও এই কবি
১ ঘণ্টা আগে
একদিকে দিল্লি, অন্যদিকে কলকাতা। পশ্চিমবঙ্গের তামাম অধিবাসীর জীবন এখন এই দুটি কেন্দ্রের জাঁতাকলে পিষ্ট। বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে দিল্লির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে আছে আরএসএস-বিজেপি। আর তার জেরে ভারতব্যাপী প্রান্তিক, কর্মজীবী জনতা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের প্রাণ এমনিতেই ওষ্ঠাগত। আর তার ওপর ছাব
২ ঘণ্টা আগে
(প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে) একাডেমিক লেখালেখির প্রায় পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে একটা কাজের উপর, যাকে বলে ‘ক্রিটিক করা’। কিন্তু ‘ক্রিটিক’ (Critique) শব্দটা একরৈখিক কোনো অর্থ বহন করে না, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন চিন্তা-ঐতিহ্যে ক্রিটিকের ধারণা বিভিন্নভাবে পরিগঠিত হয়েছে। ক্রিটিকের ধারণাগত ইতিহাসট
১ দিন আগে-537618-256x144.webp)
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যেটে এমন এক নাম, যাকে শুধু কবি বা নাট্যকার বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কঠিন। আজ তাঁর ২৭৭তম জন্মদিন। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং শিল্প-সংস্কৃতির গভীর পর্যবেক্ষক। কিন্তু এত পরিচয়ের মধ্যেও গ্যেটের সবচ
২৮ আগস্ট ২০২৬