কাজে ‘ঠনঠন’, ৮ মাসে জকসু আটকা অঙ্গীকারে

রজব আল ফাহিম
রজব আল ফাহিম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শিক্ষার্থী ২০ হাজারের বেশি। ছাত্রীরা একটি হল পেলেও, বঞ্চিত ছাত্ররা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনে প্রার্থীদের প্যানেলগুলো প্রচারে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের এই সংকট তুলে ধরে। বিজয়ী হলে সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেয়।

তবে গত ৬ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রধান তিন পদসহ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল আবাসন নিয়ে কিছুই করেনি। এমনকি প্যানেল থেকে নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে হল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও, আছেন হাত গুটিয়ে। আবাসন সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, বড় বড় বুলি দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোট নেওয়ার পর নির্বাচিতরা কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করছেন না।

সাতটি অনুষদ, দুটি ইনস্টিটিউট ও ৩৮টি বিভাগের ১৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভাড়া বাসাবাড়ি কিংবা মেসে থেকে পড়োলেখা করছেন।

সূত্র জানায়, আবাসন ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এখন পর্যন্ত মাত্র চারটি কর্মসূচি পালন করেছে, যেগুলো আবার স্মারকলিপি জমা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যদিও জকসু নেতারা বলছেন, তারা প্রশাসনের সঙ্গে বসার সুযোগ পেলেই, আবাসন সংকটের বিষয়টি তুলে ধরছেন।

সংকট প্রকট, পদক্ষেপে কচ্ছপগতি

রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রায় সাত একর জমিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৫ সালে এটি কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হয়। এরপর প্রথম ১৬ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আবাসিক হল হয়নি। ২০২০ সালে ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব’ নামে প্রথম হল করা হয়, যেটি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নাম পেয়েছে ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা’। ছাত্রীদের এই হলে সিট মাত্র ১ হাজার ২৫০। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী প্রায় আট হাজার।

এর বাইরে সাতটি অনুষদ, দুটি ইনস্টিটিউট ও ৩৮টি বিভাগের ১৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভাড়া বাসাবাড়ি কিংবা মেসে থেকে পড়োলেখা করছেন। অবশ্য ঢাকার কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় প্রায় ২০০ একর জমিতে দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি একই প্রকল্পের আওতায় পুরান ঢাকায় বাণী ভবন ও ড. হাবিবুর রহমান হল নির্মাণাধীন। তবে শিক্ষার্থীরা কবে এসব স্থাপনার সুফল পাবেন, তা কেউই নিশ্চিত বলতে পারছেন না।

আমরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসন নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছি। দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছি। আবদুল আলিম আরিফ, জকসুর জিএস ও শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী লাবিব বসুনিয়া স্ট্রিমকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাসের পরিবেশ নেই। অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি বা ভবনে থাকছেন, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই। ক্যাম্পাসে যাতায়াতে পর্যাপ্ত বাসও নেই। জকসুর নেতারা আবাসনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু গত আট মাসে তাদের কার্যক্রমে আমরা হতাশ।’

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের বালু ভরাট, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণসহ অন্যান্য কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। আট বছর পরেও অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাস নির্মাণের ধীরগতি নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের কাছে জোরালো দাবি পর্যন্ত জানায়নি জকসু।

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মুস্তাকিম স্ট্রিমকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সব প্রার্থীই বলেছিলেন– দ্রুত আবাসন সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন। নির্বাচন হয়েছে আট মাস। কিন্তু এখনো তাদের কোনো নড়াচড়া নেই।’

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রাহাতুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে জকসু নেতাদের মনোযোগ কম। সংসদ নির্বাচনে তো তারা একটি দলের পক্ষে ভোটের ক্যাম্পেইন করলেন। এই চেষ্টা আমাদের নিয়ে করলে এতদিন কিছু না কিছু হতো।’

নেতারা মানতে নারাজ

আবাসন সংকট নিরসনে জকসুর কার্যক্রম সীমিত– এমন অভিযোগ মানতে নারাজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও জকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আবদুল আলিম আরিফ। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসন নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছি। দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছি।’

জকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানা বলেন, ‘দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ও সম্পূরক বৃত্তির দাবিতে আমরা সব সময় সরব। নিয়মিত হলগুলোর কাজের খোঁজখবর নিচ্ছি। সর্বশেষ আবাসনের দাবিতে আন্দোলনে গিয়েই আমরা ছাত্রদলের হামলার শিকার হয়েছি।’

রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রায় সাত একর জমিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৫ সালে এটি কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হয়। এরপর প্রথম ১৬ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আবাসিক হল হয়নি। ২০২০ সালে ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব’ নামে প্রথম হল করা হয়, যেটি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নাম পেয়েছে ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা’। ছাত্রীদের এই হলে সিট মাত্র ১ হাজার ২৫০। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী প্রায় আট হাজার।

ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত জকসুর পরিবহন সম্পাদক মাহিদ হাসান দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজের শ্লথগতি এবং জকসুর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘সম্পাদকীয় থেকে শীর্ষ তিন পদের নেতারা যেভাবে জোরালো দাবি তুলতে পারবেন, অন্যদের পক্ষে তা কঠিন। তবে ব্যক্তিগতভাবে ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আমি আবাসন সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছি। পুরান ঢাকার দুটি হলের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা এবং আবাসন ভাতা নিশ্চিত করা আমাদের মূল দাবি ছিল। এক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।’

জকসু নেতাদের কার্যক্রম নিয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল স্ট্রিমকে বলেন, ‘জকসু নেতারা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ করেছে– এমন আমরা পাইনি। তাদের কাজ ফেসবুকেই বেশি।’

শাখা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক শাহিন আহমেদ বলেন, মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নসহ জকসু কিছু ভালো কাজ করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জকসু ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি। আবাসনের মতো প্রধান সংকট নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কার্যত নির্বিকার। তাদের আরও সোচ্চার হওয়া দরকার।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত