অতনু সিংহ

একদিকে দিল্লি, অন্যদিকে কলকাতা। পশ্চিমবঙ্গের তামাম অধিবাসীর জীবন এখন এই দুটি কেন্দ্রের জাঁতাকলে পিষ্ট। বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে দিল্লির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে আছে আরএসএস-বিজেপি। আর তার জেরে ভারতব্যাপী প্রান্তিক, কর্মজীবী জনতা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের প্রাণ এমনিতেই ওষ্ঠাগত। আর তার ওপর ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাও এখন বিজেপির দখলে।
কলকাতার পশ্চিম উপকণ্ঠে ভাগীরথীর তীরে প্রদেশ সচিবালয়ের রঙ এখন গেরুয়া। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে, আড়াই লক্ষ আধা সামরিক বাহিনীর সেনাকর্মী নিয়োগ করে, নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বহিরাগত ও বাংলা বিদ্বেষী বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মসনদ দখল করেছে। আর তার জেরে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।
একদিকে বাংলার মানুষের (বিশেষত নিম্নবর্গ) জীবন-জীবিকা ও জল-জমি-জঙ্গলের ওপর পড়ছে ফ্যাসিবাদী থাবা, অন্যদিকে বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরম্পরার ওপর নেমে এসেছে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি আঘাত। আর এই ঘনঘোর ফ্যাসিবাদের যুগে বাংলার মনীষীরা আক্রান্ত। তাঁদের রেখে যাওয়া কাজ, তাঁদের স্মৃতি সবই উজাড় করতে উদ্যত ফ্যাসিস্ট বিজেপি ও তাদের মেন্টর আরএসএস।
কিন্তু বাংলার মাটি যে দুর্জয় ঘাঁটি, যেখান থেকে উচ্চারিত হয়—
‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।’
— কাজী নজরুল ইসলাম (‘বিদ্রোহী’ কবিতার অংশ)
পশ্চিমবঙ্গে চলমান এই ফ্যাসিবাদী তাণ্ডবের মুখে প্রতিরোধের শক্ত হাতিয়ার হয়ে উঠেছেন নজরুল। সাম্য আর ইনসাফের পক্ষে জিহাদ ঘোষণা করা বিদ্রোহের কবি বাংলাদেশের জাতীয় কবি, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ তাঁর মাতৃভূমি। সেই মাতৃভূমিতে নজরুল আবারও প্রাসঙ্গিক প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মধ্যে। তিনি আবারও প্রাসঙ্গিক ফ্যাসিস্টদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠার মাধ্যমে।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি জাতিবাদী বিভাজন ও মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতিকে তুঙ্গে তুলতে দেখা যায় বিজেপি অনুগত গণমাধ্যমে। দেখা যায়, কী নির্লজ্জভাবে কাজী নজরুল ইসলামের সৃজনসম্ভারকে অপমান করা হচ্ছে। ‘হিন্দু-মুসলমান’ কবিতা তথা নজরুলগীতির সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তাকে ভেঙে চুরমার করতে চাওয়া বিজেপি অনুগত টেলিভিশন সাংবাদিক অনস্ক্রিন বলতে থাকলেন, ‘একই বৃন্তে দুইটি কুসুম! কিসের কুসুম’।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার আগেই গত বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আবহে রিপাব্লিক বাংলা নামক একটি বিকৃত বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাংবাদিক ময়ূখরঞ্জন ঘোষ নজরুলের কবিতাকে কটাক্ষ করে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও ঐক্যের মূলে যেভাবে কুঠারাঘাতের চেষ্টা চালিয়েছিল, তাতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল মোদিপন্থী ভারতীয় বাংলাবিদ্বেষী মিডিয়া-সহ হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি মতবাদের দৃষ্টিকোণে নজরুল কতটা ‘খতরনাক’!
কিন্তু বৃহৎ বঙ্গের গণমানুষের মনে নজরুল অধিষ্ঠিত। আর তাই বিজেপির ফ্যাসিবাদী হামলার সামনে নজরুলই হয়ে উঠছেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। রাজ্যের সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় এটি আরও পরিষ্কার হয়েছে। কলকাতার পার্কস্ট্রিটের ফুটপাতবাসীদের মধ্যে এক নারী তাঁর শিশু সন্তানের জন্য দুধ গরম করছিলেন। সেই সময় রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর নজরে পড়ে ওই দুধ গরম করার দৃশ্য। তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর গাড়ি থেকে ফুটপাতের ওই নারীর কাছে গিয়ে গলা তুলে প্রশ্ন করতে থাকেন, ‘ফুটপাতটা কি দুধ গরম করার জায়গা?’

শিশু সন্তানের জন্য দুধ গরম করার কথা শুনেও তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং একপ্রকারে তিনি ওই দুধের গামলাটি সরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। ফুটপাত থেকে ওই পরিবারকে সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। এই দৃশ্য ভাইরাল হয় গোটা পশ্চিমবঙ্গে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে প্রতিস্পর্ধী নাগরিক সমাজ। তাঁদের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে নজরুলের কবিতা। একটি গ্রাফিক ইমেজ ভাইরাল হয় ফেসবুকে। যাতে ওই মন্ত্রীকে দেখানো হয় ফুটপাতবাসীর দিকে তেড়ে যেতে। আর ওই ইমেজের মধ্যে উদ্ধৃত হয় নজরুলের আমার কৈফিয়ত কবিতার লাইনগুলো—
‘প্রার্থনা করো—যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস
যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ!’
— ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতার অংশ
পশ্চিমবঙ্গের ভূমিসন্তান নজরুল। অবিভক্ত বাংলার অখণ্ড বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে তাঁর পৈত্রিক ভিটা। জীবনের অনেকগুলো দিন তিনি কাটিয়ে ছিলেন মধ্য কলকাতার তালতলায়। যদিও তাঁকে শেষাবধি ধারণ করেছিল বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে তিনি পেয়েছেন জাতীয় কবির মর্যাদা। কিন্তু ‘জাতীয়’ শব্দটি তো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সীমানায় সঙ্কীর্ণ নয়। জাতি থেকেই যদি জাতীয়তা হয়, তাহলে ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক বাংলা জাতীয়তায় তিনি রবীন্দ্রনাথের মতোই বৃহৎ বঙ্গের জাতীয় কবি। আর তাই তো প্রবল হিন্দু-মুসলিম জাতিবাদী বাইনারির যুগেও তিনি পশ্চিমবঙ্গের গণমানুষের অন্তঃস্থলে অধিষ্ঠিত আজও। তাই তাঁকে নিয়ে চরম বিড়ম্বনায় ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার।
যখন পশ্চিমবঙ্গের ভূমিসন্তান বাঙালি মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠাতে উদ্যত বিজেপি সরকার, যখন বাঙালি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাংলাভাষীদের ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ‘বাংলাদেশি’ হিসাবে চিহ্নিত করে চরম হেনস্তা করা হচ্ছে, যখন মুসলিমবিদ্বেষ, বাংলাদেশবিদ্বেষ আর বাংলাবিদ্বেষ একসঙ্গে কার্যকরী, তখন কাজী নজরুল ইসলামকে বিজেপি না পারছে ফেলতে, না পারছে হজম করতে। ময়ূখরঞ্জনকে দিয়ে বিজেপি নজরুলের সৃজনকে কটাক্ষ করতে গিয়ে টের পেয়ে গিয়েছিল, কবির অপমান হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। আর তারপরেই সমঝে গিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। তারা আর নজরুলকে নিশানা করতে সাহস পাচ্ছে না। তাই বৃহৎ বঙ্গ তথা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-শিখ-ঈসায়ীসহ বঙ্গের অধিবাসীদের মধ্যে গণঐক্যের অন্তিম সেতু হিসেবে নজরুলের চেতনা আজও জাগ্রত।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নজরুল একদিকে আধুনিকতাবাদী সেক্যুলার চিন্তাপ্রক্রিয়া ও অন্যদিকে ধর্মীয় সম্প্রদায়গত জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা, এই দুটি বিষয়েরই সমান্তরালে অবস্থান করেছেন। তিনি বাংলার ভাব ও ধর্মযাপনের বহুত্ব ও সম্প্রীতির ঔদার্য্যকে ধারণ করেছেন বৃহৎ বঙ্গের পারম্পরিক সংস্কৃতির অন্তর্জগৎ থেকেই। বাংলা কাব্যের মধ্যে ঔপনিবেশিকতা সূত্রে অনুপ্রবেশ করা আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে নজরুল আবির্ভূত হয়েছিলেন ভাবান্দোলন পরম্পরার একজন কবি হিসেবে।
কাজী নজরুল ইসলাম ভাবান্দোলন পরম্পরার একজন কবি। তাঁর কালী-কৃষ্ণ গীতি কিম্বা আল্লাহ-নবীর আশিকানায় বাঁধা গান- সবটাই বঙ্গের ভূমিমানুষের ভাব-বস্তুর যুগল দ্বৈতাদ্বৈত সম্পর্কের অভিসন্দর্ভ থেকে। আধুনিকতাবাদীরা নজরুলকে আধুনিক করে তুলতে চেয়েছেন বটে, কিন্তু নজরুল কখনোই বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের কবি নন, তিনি বড় বাংলার। যে বঙ্গে ভাব ও বস্তু মিশে থাকে একে অপরের সঙ্গে, আর তৈরি হয় লীলা। নজরুল সেই লীলার অন্তর্জগতে মিশে যেতে পেরেছিলেন। আর তাই নজরুলের ইসলামিক গজল ও শ্যামা সংগীতগুলো আজ আমাদের ফের নতুন করে ভাবায়। কাজী নজরুল ইসলাম কখনোই ইউরোপ থেকে আসা কেতাবি জ্ঞান বা তথাকথিত ‘আলোকায়ন’কে চোখ বুজে মেনে নেননি। তিনি তাঁর চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে জায়গা দিয়েছিলেন বাংলার সাধারণ ও পরিশ্রমী প্রান্তিক মানুষদের (সাব অল্টার্ন) মুখে মুখে চলে আসা লোকজ সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রাকে।
প্রান্তিক মানুষের এই লোকজ শক্তিকে ধারণ করার মাধ্যমেই নজরুল একসঙ্গে তিনটি প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথমত, পশ্চিমা আধুনিকতার চাপিয়ে দেওয়া জ্ঞানগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে; দ্বিতীয়ত, উচ্চবর্ণের বৈদিক বা শাস্ত্রীয় চিন্তাধারার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে; এবং তৃতীয়ত, ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণার বিরুদ্ধে, যেমন মওদুদীর প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামো। কী বলছেন নজরুল?
‘আমার হাতে কালি মুখে কালি, মা
আমার কালিমাখা মুখ দেখে মা
পাড়ার লোকে হাসে খালি।।
মোর লেখাপড়া হ’ল না মা,
আমি ‘ম’ দেখিতেই দেখি শ্যামা,
আমি ‘ক’ দেখতেই কালী ব’লে
নাচি দিয়ে করতালি।।
কালো আঁক দেখে মা ধারাপাতের
ধারা নামে আঁখিপাতে,
আমার বর্ণ পরিচয় হ’লো না মা
তোর বর্ণ বিনা কালী।
যা লিখিস মা বনের পাতায়
সাগরজলে আকাশ খাতায়,
আমি সে লেখা তো পড়তে পারি
মূর্খ বলে দিক্ না গালি মা,
লোকে মূর্খ ব’লে দিক্ না গালি।।’
— নজরুলগীতি
বঙ্গের শাস্ত্রবিরোধিতা, জ্ঞানতাত্ত্বিক শোষণ-পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে জিহাদ ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরমের সহাবস্থানের যে ভূমিনিবিড় চেতনা, যা বঙ্গের ভাবান্দোলনের মধ্যে মূর্ত হয়েছিল, নজরুল তা লালন করে গেছেন তাঁর চিন্তায়, জীবনচর্যায়। আধুনিকতার সকল চিহ্ন-প্রকরণের অন্দরের মধ্যে বসবাস করেও ঔপনিবেশিক চিন্তা, ঔপনিবেশিক জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিকাঠামো ও আধুনিকতাবাদী নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। বাংলার ভাবান্দোলন পরম্পরাকে আধুনিক পরিসরে ছড়ায়ে দিয়ে গেছেন অবলীলায়। তিনি বহন করেছেন সৈয়দ সুলতান, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, রামপ্রসাদ, লালন সাঁই প্রমুখ মহাজনের পরম্পরা।
কল্লোল যুগের সমসাময়িক কবি হয়েও নজরুল এই আধুনিকতার ভাবসংঘ থেকে নিজেকে পৃথক রেখে গেছেন। তিনি মুজফফর আহমেদের সঙ্গে দিনবদলের আলাপ করেছেন, সক্রিয় হয়েছেন নিজেও দিনবদলের দ্রোহ-অধ্যায়ে। তাঁকে ভাষা জুগিয়েছে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, কোরআন, ত্রিপিটক, আবেস্তা, বেদ। আর তাই তিনি ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া, খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া, হয়ে উঠেছিলেন চির-বিস্ময় তিনি বিশ্ববিধাতৃর…।
উপনিবেশবাদী আধুনিক কবিরা আধুনিকতার নামে যখন অবলীলায় বাংলা ভাষা থেকে বাদ দিয়ে গেছেন আরবী, ফার্সী শব্দ আর চাপিয়ে দিয়েছেন তৎসম, তদ্ভব শব্দ রাশি রাশি, তখন তার সমান্তরালে আরবি-ফার্সি অক্ষুণ্ণ রেখে রেফারেন্সে নজরুল কোরআন, পুরাণ—সব কিছুকে পেশ করে গেছেন চির উন্নতশিরে। অন্যদিকে বাংলার ধর্মবিবেচনার দার্শনিক পর্যবেক্ষণ, আল্লাহ থাকেন বান্দার মনের অন্দরে বা সাঁই আছেন আপন অন্তঃপুরে… যা কি না মানুষ ভজনার নিগূঢ় ভাব, তা নজরুলের কাব্যে, গীতিতে চিরকাল প্রতিফলিত হয়েছে।
‘বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মস্জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহাগীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।’
—‘সাম্যবাদী’ কবিতার অংশ
নজরুল তাঁর প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ। একদিকে কৃষ্ণ অন্যদিকে মোহাম্মদ। যেভাবে বঙ্গের ভাষা, ভাব ও ইতিহাসের বিস্তার-অগ্রসরতায় ইসলাম অবদান রেখেছে ইতিবাচক, যেভাবে জাতপাত,-বর্ণবিভাজনের বিরুদ্ধে ও ইনসাফ-সমানাধিকারেরে পক্ষে ইসলামের ঝাণ্ডা পতপত করে উড়েছে এই বৃহৎ বঙ্গে আর বাংলার কালীকৃষ্ণের মাথায় ছাতা ধরে থেকেছে পরম মাবুদের নাম; আর তাই বড় বাংলার কবি কাজী নজরুলেরও প্রেরণা ইসলাম। তিনিও নবীজীর আশিকানায় পরিপূর্ণ।
‘তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম
ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি, খোদায়ী-কালাম
ঐ নামের দামন ধ’রে আছি- আমার কিসের ভয়
ঐ নামের গুণে পাবো আমি খোদার পরিচয়
তাঁর কদম মোবারক যে আমার বেহেশতী তান্জাম
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম।।
আল্লাহকে পেতে হলে রসূলের অছিলা চাইতে হবে। কবি বলেন-
আল্লাকে যে পাইতে চায় হযরতকে ভালবেসে
আরশ কুরসি লওহ কালাম না চাইতেই পেয়েছে সে।।
রাসূল নামের রশি ধরে
যেতে হবে খোদার ঘরে।’
— কাজী নজরুল বিরচিত ইসলামিক গজল
সাম্যের কবি কাজী নজরুল, প্রেমের কবি কাজী নজরুল, জিহাদের কবি কাজী নজরুল কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠা কিংবা তার আগে-পরে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সখ্যের সম্পর্ক রেখেছেন, তাঁদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন কিন্তু পার্টির সদস্য হন নাই কখনো। নজরুল কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের বঙ্গীয় ভাবানুবাদ রচনা করেছেন কিন্তু হুবহু তর্জমা করেন নাই, কারণ বাংলার দল বাংলার কাব্য বাংলার স্লোগান, বাংলার সাম্যবাদী অ্যান্থেম বাংলার মতো হবে। প্রথমে বঙ্গীয় হতে না পারলে বিশ্বজনীন হওয়ার উপায় নাই, বুঝেছিলেন নজরুল। হুবহু অনুবাদ না হওয়ায় নজরুলের ভাবানুবাদ গ্রহণ করেনি কমিউনিস্ট পার্টি।
নজরুল ব্রাত্য থেকে গেছেন ব্রাত্যজনের মুক্তি আন্দোলনেও। কারণ সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে থেকেছে ইউরোসেন্ট্রিক বাবুরা। যেভাবে তিরিশের দশকের কমিউনিস্টরা ব্রাত্য করেছিল নজরুলকে। আজ দরকার বাংলার নিজস্ব শ্রেণির বয়ানকে পুনরুদ্ধার ও বৈশ্বিক শ্রেণি রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ স্থাপন করা, স্থানিকতাকে আমলে নিয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার প্রত্যয়ে। এই কারণে নজরুল আজও আমাদের কাছে দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক তাঁর সৃষ্টিসুখসম্ভারের ভেতর থেকেই।
আমরা দেখেছি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে নজরুলকে প্রেরণা হয়ে উঠতে। এমনকি এই সেদিনও, অর্থাৎ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও বাংলাদেশের ছাত্রজনতার প্রেরণা ছিলেন কাজী নজরুল। আর আজ রাষ্ট্রনৈতিক ও জাতিবাদী বিভাজনের যুগে, এই হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানি ফ্যাসিবাদের যুগে এবং তার উল্টোপিঠে ইসলামের নাম ভাঙানো মুসলিম জাতিবাদীদের উত্থানের যুগে কাজী নজরুল ইসলাম আজ বড়ই প্রাসঙ্গিক এই বড় বাংলায়।
বাংলার ভাব-বস্তুর লীলাজগতে, ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ডের সম্বন্ধ স্থাপনের দার্শনিকতায়, মুক্তির ইস্তেহার নির্মাণে বঙ্গের ভূমিজনতার কাছে নজরুল চিরপ্রাসঙ্গিক এক কবি। পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা ভারতে তাঁর সৃষ্টিসম্ভার হয়ে উঠছে ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনীতির সাংস্কৃতিক অস্ত্র।

একদিকে দিল্লি, অন্যদিকে কলকাতা। পশ্চিমবঙ্গের তামাম অধিবাসীর জীবন এখন এই দুটি কেন্দ্রের জাঁতাকলে পিষ্ট। বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে দিল্লির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে আছে আরএসএস-বিজেপি। আর তার জেরে ভারতব্যাপী প্রান্তিক, কর্মজীবী জনতা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের প্রাণ এমনিতেই ওষ্ঠাগত। আর তার ওপর ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাও এখন বিজেপির দখলে।
কলকাতার পশ্চিম উপকণ্ঠে ভাগীরথীর তীরে প্রদেশ সচিবালয়ের রঙ এখন গেরুয়া। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে, আড়াই লক্ষ আধা সামরিক বাহিনীর সেনাকর্মী নিয়োগ করে, নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বহিরাগত ও বাংলা বিদ্বেষী বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মসনদ দখল করেছে। আর তার জেরে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।
একদিকে বাংলার মানুষের (বিশেষত নিম্নবর্গ) জীবন-জীবিকা ও জল-জমি-জঙ্গলের ওপর পড়ছে ফ্যাসিবাদী থাবা, অন্যদিকে বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরম্পরার ওপর নেমে এসেছে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি আঘাত। আর এই ঘনঘোর ফ্যাসিবাদের যুগে বাংলার মনীষীরা আক্রান্ত। তাঁদের রেখে যাওয়া কাজ, তাঁদের স্মৃতি সবই উজাড় করতে উদ্যত ফ্যাসিস্ট বিজেপি ও তাদের মেন্টর আরএসএস।
কিন্তু বাংলার মাটি যে দুর্জয় ঘাঁটি, যেখান থেকে উচ্চারিত হয়—
‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।’
— কাজী নজরুল ইসলাম (‘বিদ্রোহী’ কবিতার অংশ)
পশ্চিমবঙ্গে চলমান এই ফ্যাসিবাদী তাণ্ডবের মুখে প্রতিরোধের শক্ত হাতিয়ার হয়ে উঠেছেন নজরুল। সাম্য আর ইনসাফের পক্ষে জিহাদ ঘোষণা করা বিদ্রোহের কবি বাংলাদেশের জাতীয় কবি, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ তাঁর মাতৃভূমি। সেই মাতৃভূমিতে নজরুল আবারও প্রাসঙ্গিক প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মধ্যে। তিনি আবারও প্রাসঙ্গিক ফ্যাসিস্টদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠার মাধ্যমে।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি জাতিবাদী বিভাজন ও মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতিকে তুঙ্গে তুলতে দেখা যায় বিজেপি অনুগত গণমাধ্যমে। দেখা যায়, কী নির্লজ্জভাবে কাজী নজরুল ইসলামের সৃজনসম্ভারকে অপমান করা হচ্ছে। ‘হিন্দু-মুসলমান’ কবিতা তথা নজরুলগীতির সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তাকে ভেঙে চুরমার করতে চাওয়া বিজেপি অনুগত টেলিভিশন সাংবাদিক অনস্ক্রিন বলতে থাকলেন, ‘একই বৃন্তে দুইটি কুসুম! কিসের কুসুম’।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার আগেই গত বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আবহে রিপাব্লিক বাংলা নামক একটি বিকৃত বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সাংবাদিক ময়ূখরঞ্জন ঘোষ নজরুলের কবিতাকে কটাক্ষ করে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও ঐক্যের মূলে যেভাবে কুঠারাঘাতের চেষ্টা চালিয়েছিল, তাতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল মোদিপন্থী ভারতীয় বাংলাবিদ্বেষী মিডিয়া-সহ হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি মতবাদের দৃষ্টিকোণে নজরুল কতটা ‘খতরনাক’!
কিন্তু বৃহৎ বঙ্গের গণমানুষের মনে নজরুল অধিষ্ঠিত। আর তাই বিজেপির ফ্যাসিবাদী হামলার সামনে নজরুলই হয়ে উঠছেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। রাজ্যের সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় এটি আরও পরিষ্কার হয়েছে। কলকাতার পার্কস্ট্রিটের ফুটপাতবাসীদের মধ্যে এক নারী তাঁর শিশু সন্তানের জন্য দুধ গরম করছিলেন। সেই সময় রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর নজরে পড়ে ওই দুধ গরম করার দৃশ্য। তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর গাড়ি থেকে ফুটপাতের ওই নারীর কাছে গিয়ে গলা তুলে প্রশ্ন করতে থাকেন, ‘ফুটপাতটা কি দুধ গরম করার জায়গা?’

শিশু সন্তানের জন্য দুধ গরম করার কথা শুনেও তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং একপ্রকারে তিনি ওই দুধের গামলাটি সরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। ফুটপাত থেকে ওই পরিবারকে সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। এই দৃশ্য ভাইরাল হয় গোটা পশ্চিমবঙ্গে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে প্রতিস্পর্ধী নাগরিক সমাজ। তাঁদের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে নজরুলের কবিতা। একটি গ্রাফিক ইমেজ ভাইরাল হয় ফেসবুকে। যাতে ওই মন্ত্রীকে দেখানো হয় ফুটপাতবাসীর দিকে তেড়ে যেতে। আর ওই ইমেজের মধ্যে উদ্ধৃত হয় নজরুলের আমার কৈফিয়ত কবিতার লাইনগুলো—
‘প্রার্থনা করো—যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস
যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ!’
— ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতার অংশ
পশ্চিমবঙ্গের ভূমিসন্তান নজরুল। অবিভক্ত বাংলার অখণ্ড বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে তাঁর পৈত্রিক ভিটা। জীবনের অনেকগুলো দিন তিনি কাটিয়ে ছিলেন মধ্য কলকাতার তালতলায়। যদিও তাঁকে শেষাবধি ধারণ করেছিল বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে তিনি পেয়েছেন জাতীয় কবির মর্যাদা। কিন্তু ‘জাতীয়’ শব্দটি তো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সীমানায় সঙ্কীর্ণ নয়। জাতি থেকেই যদি জাতীয়তা হয়, তাহলে ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক বাংলা জাতীয়তায় তিনি রবীন্দ্রনাথের মতোই বৃহৎ বঙ্গের জাতীয় কবি। আর তাই তো প্রবল হিন্দু-মুসলিম জাতিবাদী বাইনারির যুগেও তিনি পশ্চিমবঙ্গের গণমানুষের অন্তঃস্থলে অধিষ্ঠিত আজও। তাই তাঁকে নিয়ে চরম বিড়ম্বনায় ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার।
যখন পশ্চিমবঙ্গের ভূমিসন্তান বাঙালি মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠাতে উদ্যত বিজেপি সরকার, যখন বাঙালি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাংলাভাষীদের ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ‘বাংলাদেশি’ হিসাবে চিহ্নিত করে চরম হেনস্তা করা হচ্ছে, যখন মুসলিমবিদ্বেষ, বাংলাদেশবিদ্বেষ আর বাংলাবিদ্বেষ একসঙ্গে কার্যকরী, তখন কাজী নজরুল ইসলামকে বিজেপি না পারছে ফেলতে, না পারছে হজম করতে। ময়ূখরঞ্জনকে দিয়ে বিজেপি নজরুলের সৃজনকে কটাক্ষ করতে গিয়ে টের পেয়ে গিয়েছিল, কবির অপমান হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। আর তারপরেই সমঝে গিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। তারা আর নজরুলকে নিশানা করতে সাহস পাচ্ছে না। তাই বৃহৎ বঙ্গ তথা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-শিখ-ঈসায়ীসহ বঙ্গের অধিবাসীদের মধ্যে গণঐক্যের অন্তিম সেতু হিসেবে নজরুলের চেতনা আজও জাগ্রত।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নজরুল একদিকে আধুনিকতাবাদী সেক্যুলার চিন্তাপ্রক্রিয়া ও অন্যদিকে ধর্মীয় সম্প্রদায়গত জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা, এই দুটি বিষয়েরই সমান্তরালে অবস্থান করেছেন। তিনি বাংলার ভাব ও ধর্মযাপনের বহুত্ব ও সম্প্রীতির ঔদার্য্যকে ধারণ করেছেন বৃহৎ বঙ্গের পারম্পরিক সংস্কৃতির অন্তর্জগৎ থেকেই। বাংলা কাব্যের মধ্যে ঔপনিবেশিকতা সূত্রে অনুপ্রবেশ করা আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে নজরুল আবির্ভূত হয়েছিলেন ভাবান্দোলন পরম্পরার একজন কবি হিসেবে।
কাজী নজরুল ইসলাম ভাবান্দোলন পরম্পরার একজন কবি। তাঁর কালী-কৃষ্ণ গীতি কিম্বা আল্লাহ-নবীর আশিকানায় বাঁধা গান- সবটাই বঙ্গের ভূমিমানুষের ভাব-বস্তুর যুগল দ্বৈতাদ্বৈত সম্পর্কের অভিসন্দর্ভ থেকে। আধুনিকতাবাদীরা নজরুলকে আধুনিক করে তুলতে চেয়েছেন বটে, কিন্তু নজরুল কখনোই বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের কবি নন, তিনি বড় বাংলার। যে বঙ্গে ভাব ও বস্তু মিশে থাকে একে অপরের সঙ্গে, আর তৈরি হয় লীলা। নজরুল সেই লীলার অন্তর্জগতে মিশে যেতে পেরেছিলেন। আর তাই নজরুলের ইসলামিক গজল ও শ্যামা সংগীতগুলো আজ আমাদের ফের নতুন করে ভাবায়। কাজী নজরুল ইসলাম কখনোই ইউরোপ থেকে আসা কেতাবি জ্ঞান বা তথাকথিত ‘আলোকায়ন’কে চোখ বুজে মেনে নেননি। তিনি তাঁর চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে জায়গা দিয়েছিলেন বাংলার সাধারণ ও পরিশ্রমী প্রান্তিক মানুষদের (সাব অল্টার্ন) মুখে মুখে চলে আসা লোকজ সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রাকে।
প্রান্তিক মানুষের এই লোকজ শক্তিকে ধারণ করার মাধ্যমেই নজরুল একসঙ্গে তিনটি প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথমত, পশ্চিমা আধুনিকতার চাপিয়ে দেওয়া জ্ঞানগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে; দ্বিতীয়ত, উচ্চবর্ণের বৈদিক বা শাস্ত্রীয় চিন্তাধারার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে; এবং তৃতীয়ত, ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণার বিরুদ্ধে, যেমন মওদুদীর প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামো। কী বলছেন নজরুল?
‘আমার হাতে কালি মুখে কালি, মা
আমার কালিমাখা মুখ দেখে মা
পাড়ার লোকে হাসে খালি।।
মোর লেখাপড়া হ’ল না মা,
আমি ‘ম’ দেখিতেই দেখি শ্যামা,
আমি ‘ক’ দেখতেই কালী ব’লে
নাচি দিয়ে করতালি।।
কালো আঁক দেখে মা ধারাপাতের
ধারা নামে আঁখিপাতে,
আমার বর্ণ পরিচয় হ’লো না মা
তোর বর্ণ বিনা কালী।
যা লিখিস মা বনের পাতায়
সাগরজলে আকাশ খাতায়,
আমি সে লেখা তো পড়তে পারি
মূর্খ বলে দিক্ না গালি মা,
লোকে মূর্খ ব’লে দিক্ না গালি।।’
— নজরুলগীতি
বঙ্গের শাস্ত্রবিরোধিতা, জ্ঞানতাত্ত্বিক শোষণ-পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে জিহাদ ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরমের সহাবস্থানের যে ভূমিনিবিড় চেতনা, যা বঙ্গের ভাবান্দোলনের মধ্যে মূর্ত হয়েছিল, নজরুল তা লালন করে গেছেন তাঁর চিন্তায়, জীবনচর্যায়। আধুনিকতার সকল চিহ্ন-প্রকরণের অন্দরের মধ্যে বসবাস করেও ঔপনিবেশিক চিন্তা, ঔপনিবেশিক জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিকাঠামো ও আধুনিকতাবাদী নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। বাংলার ভাবান্দোলন পরম্পরাকে আধুনিক পরিসরে ছড়ায়ে দিয়ে গেছেন অবলীলায়। তিনি বহন করেছেন সৈয়দ সুলতান, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, রামপ্রসাদ, লালন সাঁই প্রমুখ মহাজনের পরম্পরা।
কল্লোল যুগের সমসাময়িক কবি হয়েও নজরুল এই আধুনিকতার ভাবসংঘ থেকে নিজেকে পৃথক রেখে গেছেন। তিনি মুজফফর আহমেদের সঙ্গে দিনবদলের আলাপ করেছেন, সক্রিয় হয়েছেন নিজেও দিনবদলের দ্রোহ-অধ্যায়ে। তাঁকে ভাষা জুগিয়েছে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, কোরআন, ত্রিপিটক, আবেস্তা, বেদ। আর তাই তিনি ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া, খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া, হয়ে উঠেছিলেন চির-বিস্ময় তিনি বিশ্ববিধাতৃর…।
উপনিবেশবাদী আধুনিক কবিরা আধুনিকতার নামে যখন অবলীলায় বাংলা ভাষা থেকে বাদ দিয়ে গেছেন আরবী, ফার্সী শব্দ আর চাপিয়ে দিয়েছেন তৎসম, তদ্ভব শব্দ রাশি রাশি, তখন তার সমান্তরালে আরবি-ফার্সি অক্ষুণ্ণ রেখে রেফারেন্সে নজরুল কোরআন, পুরাণ—সব কিছুকে পেশ করে গেছেন চির উন্নতশিরে। অন্যদিকে বাংলার ধর্মবিবেচনার দার্শনিক পর্যবেক্ষণ, আল্লাহ থাকেন বান্দার মনের অন্দরে বা সাঁই আছেন আপন অন্তঃপুরে… যা কি না মানুষ ভজনার নিগূঢ় ভাব, তা নজরুলের কাব্যে, গীতিতে চিরকাল প্রতিফলিত হয়েছে।
‘বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মস্জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহাগীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।’
—‘সাম্যবাদী’ কবিতার অংশ
নজরুল তাঁর প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ। একদিকে কৃষ্ণ অন্যদিকে মোহাম্মদ। যেভাবে বঙ্গের ভাষা, ভাব ও ইতিহাসের বিস্তার-অগ্রসরতায় ইসলাম অবদান রেখেছে ইতিবাচক, যেভাবে জাতপাত,-বর্ণবিভাজনের বিরুদ্ধে ও ইনসাফ-সমানাধিকারেরে পক্ষে ইসলামের ঝাণ্ডা পতপত করে উড়েছে এই বৃহৎ বঙ্গে আর বাংলার কালীকৃষ্ণের মাথায় ছাতা ধরে থেকেছে পরম মাবুদের নাম; আর তাই বড় বাংলার কবি কাজী নজরুলেরও প্রেরণা ইসলাম। তিনিও নবীজীর আশিকানায় পরিপূর্ণ।
‘তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম
ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি, খোদায়ী-কালাম
ঐ নামের দামন ধ’রে আছি- আমার কিসের ভয়
ঐ নামের গুণে পাবো আমি খোদার পরিচয়
তাঁর কদম মোবারক যে আমার বেহেশতী তান্জাম
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম।।
আল্লাহকে পেতে হলে রসূলের অছিলা চাইতে হবে। কবি বলেন-
আল্লাকে যে পাইতে চায় হযরতকে ভালবেসে
আরশ কুরসি লওহ কালাম না চাইতেই পেয়েছে সে।।
রাসূল নামের রশি ধরে
যেতে হবে খোদার ঘরে।’
— কাজী নজরুল বিরচিত ইসলামিক গজল
সাম্যের কবি কাজী নজরুল, প্রেমের কবি কাজী নজরুল, জিহাদের কবি কাজী নজরুল কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠা কিংবা তার আগে-পরে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সখ্যের সম্পর্ক রেখেছেন, তাঁদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন কিন্তু পার্টির সদস্য হন নাই কখনো। নজরুল কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের বঙ্গীয় ভাবানুবাদ রচনা করেছেন কিন্তু হুবহু তর্জমা করেন নাই, কারণ বাংলার দল বাংলার কাব্য বাংলার স্লোগান, বাংলার সাম্যবাদী অ্যান্থেম বাংলার মতো হবে। প্রথমে বঙ্গীয় হতে না পারলে বিশ্বজনীন হওয়ার উপায় নাই, বুঝেছিলেন নজরুল। হুবহু অনুবাদ না হওয়ায় নজরুলের ভাবানুবাদ গ্রহণ করেনি কমিউনিস্ট পার্টি।
নজরুল ব্রাত্য থেকে গেছেন ব্রাত্যজনের মুক্তি আন্দোলনেও। কারণ সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে থেকেছে ইউরোসেন্ট্রিক বাবুরা। যেভাবে তিরিশের দশকের কমিউনিস্টরা ব্রাত্য করেছিল নজরুলকে। আজ দরকার বাংলার নিজস্ব শ্রেণির বয়ানকে পুনরুদ্ধার ও বৈশ্বিক শ্রেণি রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ স্থাপন করা, স্থানিকতাকে আমলে নিয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার প্রত্যয়ে। এই কারণে নজরুল আজও আমাদের কাছে দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক তাঁর সৃষ্টিসুখসম্ভারের ভেতর থেকেই।
আমরা দেখেছি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে নজরুলকে প্রেরণা হয়ে উঠতে। এমনকি এই সেদিনও, অর্থাৎ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও বাংলাদেশের ছাত্রজনতার প্রেরণা ছিলেন কাজী নজরুল। আর আজ রাষ্ট্রনৈতিক ও জাতিবাদী বিভাজনের যুগে, এই হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানি ফ্যাসিবাদের যুগে এবং তার উল্টোপিঠে ইসলামের নাম ভাঙানো মুসলিম জাতিবাদীদের উত্থানের যুগে কাজী নজরুল ইসলাম আজ বড়ই প্রাসঙ্গিক এই বড় বাংলায়।
বাংলার ভাব-বস্তুর লীলাজগতে, ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ডের সম্বন্ধ স্থাপনের দার্শনিকতায়, মুক্তির ইস্তেহার নির্মাণে বঙ্গের ভূমিজনতার কাছে নজরুল চিরপ্রাসঙ্গিক এক কবি। পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা ভারতে তাঁর সৃষ্টিসম্ভার হয়ে উঠছে ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনীতির সাংস্কৃতিক অস্ত্র।
.png)
-207c16-256x144.webp)
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবিনশ্বর রচনা তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। বিখ্যাত এই কবিতা নজরুলকে এনে দিয়েছে ‘বিদ্রোহী কবি’ খেতাব। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বয়স একশ বছর অতিক্রান্ত। কবিতার জন্ম থেকে আজ অবধি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও ‘বিদ্রোহী’ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অতিক্রান্ত শত বছরেও এই কবি
৮ মিনিট আগে
(প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে) একাডেমিক লেখালেখির প্রায় পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে একটা কাজের উপর, যাকে বলে ‘ক্রিটিক করা’। কিন্তু ‘ক্রিটিক’ (Critique) শব্দটা একরৈখিক কোনো অর্থ বহন করে না, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন চিন্তা-ঐতিহ্যে ক্রিটিকের ধারণা বিভিন্নভাবে পরিগঠিত হয়েছে। ক্রিটিকের ধারণাগত ইতিহাসট
১ দিন আগে-537618-256x144.webp)
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যেটে এমন এক নাম, যাকে শুধু কবি বা নাট্যকার বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কঠিন। আজ তাঁর ২৭৭তম জন্মদিন। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং শিল্প-সংস্কৃতির গভীর পর্যবেক্ষক। কিন্তু এত পরিচয়ের মধ্যেও গ্যেটের সবচ
১ দিন আগে-06f111-256x144.webp)
অবশ্য সেই সব মধ্যবিত্তিয় রুচির শিক্ষিত শিল্পীরা নিজেরাও খুব ভালো করে জানেন না যে কে এই মাতাল রাজ্জাক। প্রায়শই দেখা যায় তাঁর গান আংশিক কিংবা বিকৃত করে গাইছেন। এমনকি ইন্ডাস্ট্রিগুলোও তাঁকে আর পরিচয় করিয়ে দিতে চান না। আর আমাদের একাডেমিগুলো তো আছেই দূরে ঠেলে দেবার জন্য।
২৭ আগস্ট ২০২৬-537618-256x144.webp)