সিনেমা রিভিউ
বাংলা সিনেমার আকাশে রইদটা অবশেষে উঠেই গেল কিনা! ব্যথাকে সেই কোন কালে সুখ ডেকেছিলেন রবি ঠাকুর, আর একালে এসে আঁধারকে রইদ ডাকলেন সুমন।
তানভীর সিরাজ অন্তু

‘পোভার্টি পর্ন’ শব্দটি এখন বেশ প্রচলিত। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, আশির দশকে এর জন্ম। অনেক সময় বিভিন্ন এনজিও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে বিজ্ঞাপনের বিষয় বানিয়ে টাকা তোলার চেষ্টা করে। এই প্রবণতাকে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে তুলনা করেই শব্দটির উদ্ভব। ‘রইদ’ সিনেমা নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি পোভার্টি পর্ন নিয়ে এত কথা বলছি, কারণ এই সিনেমা নিয়েও কেউ না কেউ এমন অভিযোগ তুলবেন। আমি শুরুতেই অভিযোগটাকে খারিজ করে দিতে চাচ্ছি!
মানুষের আদিম জৈবিক সত্তার কাছে কি ধনী বা দরিদ্রের কোনো শ্রেণিভেদ আছে? মিলনের শেষে মহাকাল আশ্রয় নেয় কোনো এক জীবদেহে; কিন্তু সেই অমৃতের জন্য সুদীর্ঘ সমুদ্র মন্থনের পর কাউকে না কাউকে তো বিষ পান করে ‘নীলকণ্ঠ’ হতেই হয়! ‘রইদ’ সিনেমায় সেই নীলকণ্ঠের ভূমিকায় যে-ই থাকুক, তা কোনোভাবেই ‘দারিদ্র্য’ নয়। মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের অস্তিত্বের যে আকাঙ্ক্ষা, তাকেই আমরা নীলকণ্ঠ বলে ডাকতে চাই।
‘রইদ’ শব্দটা রোদ শব্দেরই আঞ্চলিক রূপ। কোন সে অঞ্চল? আন্তর্জাতিক দর্শকেরা হয়তো বুঝবে না, কিন্তু বাংলাদেশের বাংলাভাষী মানুষ মাত্রই কিছুটা হোঁচট খাবে। কারণ সিনেমার দৃশ্যায়নে দেখবে সিলেটের পাহাড়ঘেরা নীলাভ পানির পাশে বাস করা কিছু মানুষ দিনাতিপাতের কথাবার্তার পাশাপাশি সাবলীলভাবে খিস্তি খেউড়ও করছে খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাতেও! পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন যেন শুরুতেই দর্শকের মনের জোরের পরীক্ষা নিতে চাইলেন।
পর্দায় ভেসে আসতে থাকল একের পর এক পরাবাস্তব দৃশ্য। খুব বেশি মনযোগী দর্শক মাত্রই খেই হারানোর কথা এমন দৃশ্যবানের ঢল নামতে দেখে। অমনোযোগী দর্শকের জন্য অবশ্য ভাবনা নেই! সহজ সরল সংলাপ শুনে শুনে দিব্যি একটা মানব-মানবীর প্রেমের গল্পের সিনেমা দেখে নিতে পারে।
যেমন ধরুণ, একজন মধ্যবয়সী দরিদ্র পুরুষ এক অল্পবয়সী মেয়েকে বউ হিসেবে পেয়ে তাকে আগলে রাখতে চায় জান-প্রাণ দিয়ে। মেয়েটার যদিও মাথার এক আধটু সমস্যা আছে। এরপর সম্পর্কে কখনো কামনার তীব্রতা, কখনো দুরত্ব, কখনো একের অভাববোধে অন্যের বিপন্ন জীবন, কখনো ফিরে আসা, কখনো সম্পর্কে ঈর্ষার ছায়া, কখনো শিশুর আদুরে পুতুলটার মতো করে আগলে রাখার চেষ্টা—সবকিছু মিলে একটা সহজ-সরল প্রেমের গল্পই তো বলা যায় এই সিনেমাকে, তাই না? আচ্ছা, একেবারে সহজ-সরল নাহয় না-ই বা বলি, কারণ এটুকু পড়েই মনোযোগী কিংবা অমনোযোগী সব দর্শক মিলে দল বেঁধে তেড়ে আসতে পারে। কারণ মনোযোগীরা আমার মূর্খতায় হতাশ হবে, আর অমনোযোগীরা নিতে চাইতে পারে অপমানের বদলা! তারচেয়ে বরং ধরে নেই রইদ একটা অতি জটিল মানবিক মনস্তাত্বিক প্রেমের গল্প —এতেও তো খুব সহজেই বুঝে ফেলা গেল সিনেমাটা, তাই না?
না, তা না! আর এখানেই তো রইদের আসল আনন্দ। নিখুঁত শিল্পের আনন্দ। এই শিল্প যে যার মতো বুঝে নিতে পারবে, উপভোগ করতে পারবে। সংলাপের কথা একটু আগেই যা বলেছি, তা কিন্তু সত্য। জটিল সব শব্দ মেশানো দীর্ঘ অবোধ্য বাক্যের অত্যাচার নেই, নেই অতি সাহিত্যিক গাম্ভীর্যের মেকি প্রদর্শনী। ঠিক যেন ‘সহজিয়া’ গান, কৃত্রিম আচার-অনুষ্ঠান বা জটিল শাস্ত্রপাঠ বাদ দিয়ে মানুষের স্বভাবজাত বা ‘সহজ’ পথে আত্মোপলব্ধি করা। দেহকে ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড মনে করে, দৈহিক ও মানসিক সাধনার মাধ্যমে পরম সত্যকে পাওয়ার চেষ্টা করাই যেমন সহজিয়া দর্শনের লক্ষ্য, রইদ নিয়ে সুমনের লক্ষ্যও যেন তাই।
লেখাটা একটু ছাড়া ছাড়া করেই লিখতে হচ্ছে, সিনেমাটা মাত্রই মুক্তি পেলো তো। অনেকেই এখনও দেখেনি, তাই সিনেমা দেখার আগেই খোলামেলাভাবে বলে দেয়াটা যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। তবে খানিক রেখে ঢেকে নিজের অনুভূত কিছু অনুভূতি আড়ালে-আবডালে যে অল্প বলব না, তাও না। যেমন, অভিনয়ের প্রশংসা তো করাই যায়। বিশেষ করে ‘সাদু’ চরিত্রের অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান এবং ‘সাদুর বউ’ চরিত্রের অভিনেত্রী নাজিফা তুষি, এই দুজনের কথা। দু’জন পাল্লা দিয়ে চেষ্টা করেছেন কে কার চেয়ে বেশি নিখুঁত অভিনয় করতে পারেন! এটা করতে গিয়ে সম্ভবত তারা দুজনেই স্বাধীন বাংলাদেশের বাংলা সিনেমার শ্রেষ্ঠ অভিনয়টা করে ফেলেছেন (কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে হলেও মন্তব্যটা করে ফেললাম!)।
বেশ লম্বা চওড়া সুঠাম দেহের সাদু সিনেমা জুড়ে একের পর এক দৃশ্যে কুঁজো হয়ে হেঁটেছে এবং নিচু কোমল গলায় কথা বলেছে। সে জানে যে সে শরীরে শক্তিশালী, তার মাংসপেশীতে এই আত্মবিশ্বাস দেখা যায়। আবার একইসঙ্গে সে জানে, সে সমাজের দুর্বল মানুষ, তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তিতে সারাক্ষণ লেগে থাকে এই দ্বিধা। এই দ্বিধা কাটাতে পারে একটা মাত্র দৃশ্যেই, যখন মুখ ভর্তি তালের পিঠা নিয়ে চিবোতে চিবোতে লালা মাখানো আধগলা পিঠা কুৎসিত ভাবে দাঁত-ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দেখিয়ে সে একটা নির্মল হাসি দিয়ে বলে, ‘বাপের জন্মেও এমন পিডা খাই নাই!’ তার আবেগ বা উচ্ছ্বাস প্রকাশের বাক্য যেন এই সমগ্র পৃথিবীতে একটাই, এ ছাড়া আর কোন শব্দ বা বাক্যের খেলা সে জানে না। একটা গরু বা ছাগলের যেমন আবেগ প্রকাশের ভাষা কেবলই একই ধ্বনিতে বারবার ডাকা, আর প্রিয়জনের সঙ্গে একটু মুখ ঘষা, এইতো। এর বেশি তো আর কিছু লাগছে না ওদের! সাদুর তবে লাগবে কেন?
সাদুর বউয়ের নাম কেউ জানে না। সাদুও জানে না। সাদুর বউ নিজেও জানে না! সাদুকে জানলেই হবে। কী নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে সে সাদুর কাছে বারেবারে ফিরে আসে। সাদু তাকে আগলে রাখে, কিন্তু সবসময় যে পারে বা পারতে চায়, তা না। কিন্তু সাদুর বউয়ের এই নির্মল বিশ্বাসের সঙ্গে আর কিসের তুলনা করা যায়? সে যেভাবে ছুটে ছুটে হাঁটে, বসে, পিঠা বানায়, মারপিট করে, আর মুখে হাসি ধরে রেখে বুকের ভেতর থেকে হাসে, এ দৃশ্যগুলো কেন যেন অন্য ভুবন থেকে উঠে আসা কোনো চিত্রকল্প মনে হতে থাকে। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে থাকতে শুধু একবার একটা দৃশ্যে সাদুর বউকে নৌকায় বসে থাকতে দেখে চমকে উঠি, কেন যেন বাংলা সিনেমার যুবতী বয়সের ববিতার মতো লাগে তাকে। পর্দায় সাদুর বউ কি তবে বাংলাদেশের শক্তিশালী নারী চরিত্র হবার পথে?
পুরো সময় জুড়েই দৃশ্যকল্পে দর্শকের চোখে এবং অদৃশ্যকল্পে মন ও মগজে চাপা অস্বস্তির জন্ম দেয় আলো-আঁধারির খেলা। সিনেমা, ক্যামেরা, আলোক প্রক্ষেপণ—এসব নিয়ে পুঁথিগত জানাশোনা একদমই নেই আমার। কিন্তু সিনেমার পর্দায় চেয়ে থাকতে গিয়ে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে অনুভূতিতে না চাইতেও আক্রান্ত হতে হয়। এই অনুভূতি তো আর বই পড়ে শিখতে হয়নি।
ইন্দ্রিয়ানুভূতি শুধু চোখকে দিলাম, আর কানকে অভুক্ত রাখলাম, এ তো হবে না। তাই কানের জন্যও আছে বিশেষ বরাদ্দ — দুর্দান্ত সব শব্দের কারুকাজ। জটিল সব সংলাপের ভার অযথা বইতে হয় না যখন প্রকৃতি এবং মানুষের হরেক রকমের শব্দ এমনিতেই ঘোরের ঘোরে পৌঁছে দেয়। তাই বলে সংলাপগুলোকে একেবারে আজেবাজে প্রলাপের কাতারে ধরার কিছু নেই, মোহনীয় দৃশ্যকাব্যের পাশে সেগুলোকে শুধুই গৌণ বিষয় লাগে।
এবারে আসা যাক সিনেমার সেই দৃশ্যগুলোর কথায়, যা দেখে কারো কারো মনে হতে পারে, এগুলো বুঝি কেবল ‘দারিদ্র্য’ দেখানোর চেষ্টা। যেটার কথা প্রথমেই বলছিলাম। মাটিতে বসে গোগ্রাসে ভাত খাওয়া, এক ঘরে মানুষের সঙ্গে গবাদি পশুর বসবাস, কাদামাখা শরীর, ছাগলের বিষ্ঠার মাঝে শুয়ে ঘুম, বৃষ্টির দিনে বাড়ির ভেতর ব্যাঙের আনাগোনা, কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে ছোটখাটো ঝগড়া আর কথায় কথায় খিস্তি-খেউড়—এগুলো সবই সেই রইদের ক্ষুধা তৈরির মাধ্যম, এর সঙ্গে দারিদ্র্যের সম্পর্ক সামান্যই।
সিনেমাটিতে যৌনতার উপস্থাপনাটিও বেশ অভিনব। এখানে দৃশ্যের চেয়েও বড় রূপক হয়ে উঠেছে সাদুর মুখে তালের পিঠা খেয়ে যৌন তৃপ্তির অভিব্যক্তি। অথচ শেষ পর্যন্ত সাদু ও তার স্ত্রীর মধ্যে আদৌ শারীরিক কোনো সম্পর্ক ঘটে কি না, তা নিয়ে দর্শক সন্দিহানই থেকে যায়। তবে কি মরিয়মের গর্ভে যীশুর জন্মের মতো কোনো রহস্যময় ঘটনা ঘটতে চলেছে? সাদুর মনের ঈর্ষা কি তবে পুরোপুরি অমূলক?
রূপকের প্লাবনে প্লাবিত হবার কথা যা বলছিলাম, তারই মনে করতে পারা কয়েকটা তুলে ধরে শেষের পথ ধরি।
- বিয়ের দৃশ্যে নারীর আগমন এবং দেবী দূর্গার প্রস্থান
- কুকুরের হাত থেকে জুতা বাঁচাতে লুকিয়ে ফেলা
- প্রেমের প্রতিদানে গায়ে বল্লা ছেড়ে দেয়া
- কামনার জোয়ারের মতো প্রেমেরও বারবার ফিরে ফিরে আসা
- আগুনে সব পুড়ে যাবার পরেও পুনরুত্থানের মতো বেঁচে ফেরা
- শিলাবৃষ্টিতে নূহের প্লাবন
- প্রেমকে শিকল পরিয়ে গৃহবন্দী করার পুরুষালি প্রবৃত্তি
এই দৃশ্যগুলোর একেকজন একেক রকম ব্যাখ্যা করবেন, তাই আমি কেবল তালিকা দিয়েই খালাস। তবে তিনটি দৃশ্য কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছি না।
প্রথম, নূহের প্লাবনের সময় সকল পশুপাখি আশ্রয় নেয় একই ঘরে। একটা বিরাট মহিষও জানালায় মুখ ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে নানা পশু পাখির বাচ্চা। অথচ একজন পুরুষ একেবারে শিশুর মাতৃগর্ভে থাকার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে আশ্রয় নেয় নারীর কোলেই। নারীই যেন সেই মহাকালের আদিমতম শক্তি।
দ্বিতীয়, প্রবল হিংস্রতায় মৃত ছাগীর চামড়া টেনে তুলতে গিয়ে রক্তের বদলে দুধ ঝরতে থাকা। এরপর সেই ছাগীর মাংস জোর করে খেতেই থাকা, খেতেই থাকা। এই কামনার হিংস্রতা এবং কামনার শেষ কোথায়?
তৃতীয়, গাছ থেকে পড়া তালকেই আদম-হাওয়ার গন্ধম তথা কামনাবাহী ফল হিসেবে উপস্থাপন করা। সেই গন্ধমের নেশা এতই প্রবল, তাতে চাপা পড়ে মৃত্যুতেও যেন আপত্তি নেই! আকাশ থেকে মাটিতে ঝরে পড়া প্রতিটা গন্ধম কুড়াতেই হবে যেকোনো ভাবেই। তবে শেষ পর্যন্ত নারীর সঙ্গে পুরুষের কিংবা এক মহাজাগতিক সত্তার সঙ্গে আরেক সত্তার মিলন কি আসলেই কেউ আটকাতে পারে? নূহের প্লাবনে জীবনের নৌকায় ঠাঁই হয় সকল অস্তিত্বের।
রইদ এক ধরণের মহাজাগতিক আর মহাকালিক অনুভূতি নিয়ে এসেছে বাংলা ভাষার সিনেমার জন্য। এর রেশ পুরোপুরি কাটতে আরও কিছুদিন সময় যে লাগবে, তা বেশ বুঝতে পারছি। কিংবা কে জানে, এই সিনেমা দিয়ে বাংলা সিনেমার আকাশে রইদটা অবশেষে উঠেই গেল কিনা! ব্যথাকে সেই কোন কালে সুখ ডেকেছিলেন রবি ঠাকুর, আর একালে এসে আঁধারকে রইদ ডাকলেন সুমন। এভাবে সিনেমার নামে একটা জলজ্যান্ত কবিতা লিখে বসলে দর্শকের বুকে সুখের মতো ব্যথা না বেজে উপায় কী!

‘পোভার্টি পর্ন’ শব্দটি এখন বেশ প্রচলিত। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, আশির দশকে এর জন্ম। অনেক সময় বিভিন্ন এনজিও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে বিজ্ঞাপনের বিষয় বানিয়ে টাকা তোলার চেষ্টা করে। এই প্রবণতাকে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে তুলনা করেই শব্দটির উদ্ভব। ‘রইদ’ সিনেমা নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি পোভার্টি পর্ন নিয়ে এত কথা বলছি, কারণ এই সিনেমা নিয়েও কেউ না কেউ এমন অভিযোগ তুলবেন। আমি শুরুতেই অভিযোগটাকে খারিজ করে দিতে চাচ্ছি!
মানুষের আদিম জৈবিক সত্তার কাছে কি ধনী বা দরিদ্রের কোনো শ্রেণিভেদ আছে? মিলনের শেষে মহাকাল আশ্রয় নেয় কোনো এক জীবদেহে; কিন্তু সেই অমৃতের জন্য সুদীর্ঘ সমুদ্র মন্থনের পর কাউকে না কাউকে তো বিষ পান করে ‘নীলকণ্ঠ’ হতেই হয়! ‘রইদ’ সিনেমায় সেই নীলকণ্ঠের ভূমিকায় যে-ই থাকুক, তা কোনোভাবেই ‘দারিদ্র্য’ নয়। মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের অস্তিত্বের যে আকাঙ্ক্ষা, তাকেই আমরা নীলকণ্ঠ বলে ডাকতে চাই।
‘রইদ’ শব্দটা রোদ শব্দেরই আঞ্চলিক রূপ। কোন সে অঞ্চল? আন্তর্জাতিক দর্শকেরা হয়তো বুঝবে না, কিন্তু বাংলাদেশের বাংলাভাষী মানুষ মাত্রই কিছুটা হোঁচট খাবে। কারণ সিনেমার দৃশ্যায়নে দেখবে সিলেটের পাহাড়ঘেরা নীলাভ পানির পাশে বাস করা কিছু মানুষ দিনাতিপাতের কথাবার্তার পাশাপাশি সাবলীলভাবে খিস্তি খেউড়ও করছে খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাতেও! পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন যেন শুরুতেই দর্শকের মনের জোরের পরীক্ষা নিতে চাইলেন।
পর্দায় ভেসে আসতে থাকল একের পর এক পরাবাস্তব দৃশ্য। খুব বেশি মনযোগী দর্শক মাত্রই খেই হারানোর কথা এমন দৃশ্যবানের ঢল নামতে দেখে। অমনোযোগী দর্শকের জন্য অবশ্য ভাবনা নেই! সহজ সরল সংলাপ শুনে শুনে দিব্যি একটা মানব-মানবীর প্রেমের গল্পের সিনেমা দেখে নিতে পারে।
যেমন ধরুণ, একজন মধ্যবয়সী দরিদ্র পুরুষ এক অল্পবয়সী মেয়েকে বউ হিসেবে পেয়ে তাকে আগলে রাখতে চায় জান-প্রাণ দিয়ে। মেয়েটার যদিও মাথার এক আধটু সমস্যা আছে। এরপর সম্পর্কে কখনো কামনার তীব্রতা, কখনো দুরত্ব, কখনো একের অভাববোধে অন্যের বিপন্ন জীবন, কখনো ফিরে আসা, কখনো সম্পর্কে ঈর্ষার ছায়া, কখনো শিশুর আদুরে পুতুলটার মতো করে আগলে রাখার চেষ্টা—সবকিছু মিলে একটা সহজ-সরল প্রেমের গল্পই তো বলা যায় এই সিনেমাকে, তাই না? আচ্ছা, একেবারে সহজ-সরল নাহয় না-ই বা বলি, কারণ এটুকু পড়েই মনোযোগী কিংবা অমনোযোগী সব দর্শক মিলে দল বেঁধে তেড়ে আসতে পারে। কারণ মনোযোগীরা আমার মূর্খতায় হতাশ হবে, আর অমনোযোগীরা নিতে চাইতে পারে অপমানের বদলা! তারচেয়ে বরং ধরে নেই রইদ একটা অতি জটিল মানবিক মনস্তাত্বিক প্রেমের গল্প —এতেও তো খুব সহজেই বুঝে ফেলা গেল সিনেমাটা, তাই না?
না, তা না! আর এখানেই তো রইদের আসল আনন্দ। নিখুঁত শিল্পের আনন্দ। এই শিল্প যে যার মতো বুঝে নিতে পারবে, উপভোগ করতে পারবে। সংলাপের কথা একটু আগেই যা বলেছি, তা কিন্তু সত্য। জটিল সব শব্দ মেশানো দীর্ঘ অবোধ্য বাক্যের অত্যাচার নেই, নেই অতি সাহিত্যিক গাম্ভীর্যের মেকি প্রদর্শনী। ঠিক যেন ‘সহজিয়া’ গান, কৃত্রিম আচার-অনুষ্ঠান বা জটিল শাস্ত্রপাঠ বাদ দিয়ে মানুষের স্বভাবজাত বা ‘সহজ’ পথে আত্মোপলব্ধি করা। দেহকে ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড মনে করে, দৈহিক ও মানসিক সাধনার মাধ্যমে পরম সত্যকে পাওয়ার চেষ্টা করাই যেমন সহজিয়া দর্শনের লক্ষ্য, রইদ নিয়ে সুমনের লক্ষ্যও যেন তাই।
লেখাটা একটু ছাড়া ছাড়া করেই লিখতে হচ্ছে, সিনেমাটা মাত্রই মুক্তি পেলো তো। অনেকেই এখনও দেখেনি, তাই সিনেমা দেখার আগেই খোলামেলাভাবে বলে দেয়াটা যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। তবে খানিক রেখে ঢেকে নিজের অনুভূত কিছু অনুভূতি আড়ালে-আবডালে যে অল্প বলব না, তাও না। যেমন, অভিনয়ের প্রশংসা তো করাই যায়। বিশেষ করে ‘সাদু’ চরিত্রের অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান এবং ‘সাদুর বউ’ চরিত্রের অভিনেত্রী নাজিফা তুষি, এই দুজনের কথা। দু’জন পাল্লা দিয়ে চেষ্টা করেছেন কে কার চেয়ে বেশি নিখুঁত অভিনয় করতে পারেন! এটা করতে গিয়ে সম্ভবত তারা দুজনেই স্বাধীন বাংলাদেশের বাংলা সিনেমার শ্রেষ্ঠ অভিনয়টা করে ফেলেছেন (কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে হলেও মন্তব্যটা করে ফেললাম!)।
বেশ লম্বা চওড়া সুঠাম দেহের সাদু সিনেমা জুড়ে একের পর এক দৃশ্যে কুঁজো হয়ে হেঁটেছে এবং নিচু কোমল গলায় কথা বলেছে। সে জানে যে সে শরীরে শক্তিশালী, তার মাংসপেশীতে এই আত্মবিশ্বাস দেখা যায়। আবার একইসঙ্গে সে জানে, সে সমাজের দুর্বল মানুষ, তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তিতে সারাক্ষণ লেগে থাকে এই দ্বিধা। এই দ্বিধা কাটাতে পারে একটা মাত্র দৃশ্যেই, যখন মুখ ভর্তি তালের পিঠা নিয়ে চিবোতে চিবোতে লালা মাখানো আধগলা পিঠা কুৎসিত ভাবে দাঁত-ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দেখিয়ে সে একটা নির্মল হাসি দিয়ে বলে, ‘বাপের জন্মেও এমন পিডা খাই নাই!’ তার আবেগ বা উচ্ছ্বাস প্রকাশের বাক্য যেন এই সমগ্র পৃথিবীতে একটাই, এ ছাড়া আর কোন শব্দ বা বাক্যের খেলা সে জানে না। একটা গরু বা ছাগলের যেমন আবেগ প্রকাশের ভাষা কেবলই একই ধ্বনিতে বারবার ডাকা, আর প্রিয়জনের সঙ্গে একটু মুখ ঘষা, এইতো। এর বেশি তো আর কিছু লাগছে না ওদের! সাদুর তবে লাগবে কেন?
সাদুর বউয়ের নাম কেউ জানে না। সাদুও জানে না। সাদুর বউ নিজেও জানে না! সাদুকে জানলেই হবে। কী নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে সে সাদুর কাছে বারেবারে ফিরে আসে। সাদু তাকে আগলে রাখে, কিন্তু সবসময় যে পারে বা পারতে চায়, তা না। কিন্তু সাদুর বউয়ের এই নির্মল বিশ্বাসের সঙ্গে আর কিসের তুলনা করা যায়? সে যেভাবে ছুটে ছুটে হাঁটে, বসে, পিঠা বানায়, মারপিট করে, আর মুখে হাসি ধরে রেখে বুকের ভেতর থেকে হাসে, এ দৃশ্যগুলো কেন যেন অন্য ভুবন থেকে উঠে আসা কোনো চিত্রকল্প মনে হতে থাকে। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে থাকতে শুধু একবার একটা দৃশ্যে সাদুর বউকে নৌকায় বসে থাকতে দেখে চমকে উঠি, কেন যেন বাংলা সিনেমার যুবতী বয়সের ববিতার মতো লাগে তাকে। পর্দায় সাদুর বউ কি তবে বাংলাদেশের শক্তিশালী নারী চরিত্র হবার পথে?
পুরো সময় জুড়েই দৃশ্যকল্পে দর্শকের চোখে এবং অদৃশ্যকল্পে মন ও মগজে চাপা অস্বস্তির জন্ম দেয় আলো-আঁধারির খেলা। সিনেমা, ক্যামেরা, আলোক প্রক্ষেপণ—এসব নিয়ে পুঁথিগত জানাশোনা একদমই নেই আমার। কিন্তু সিনেমার পর্দায় চেয়ে থাকতে গিয়ে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে অনুভূতিতে না চাইতেও আক্রান্ত হতে হয়। এই অনুভূতি তো আর বই পড়ে শিখতে হয়নি।
ইন্দ্রিয়ানুভূতি শুধু চোখকে দিলাম, আর কানকে অভুক্ত রাখলাম, এ তো হবে না। তাই কানের জন্যও আছে বিশেষ বরাদ্দ — দুর্দান্ত সব শব্দের কারুকাজ। জটিল সব সংলাপের ভার অযথা বইতে হয় না যখন প্রকৃতি এবং মানুষের হরেক রকমের শব্দ এমনিতেই ঘোরের ঘোরে পৌঁছে দেয়। তাই বলে সংলাপগুলোকে একেবারে আজেবাজে প্রলাপের কাতারে ধরার কিছু নেই, মোহনীয় দৃশ্যকাব্যের পাশে সেগুলোকে শুধুই গৌণ বিষয় লাগে।
এবারে আসা যাক সিনেমার সেই দৃশ্যগুলোর কথায়, যা দেখে কারো কারো মনে হতে পারে, এগুলো বুঝি কেবল ‘দারিদ্র্য’ দেখানোর চেষ্টা। যেটার কথা প্রথমেই বলছিলাম। মাটিতে বসে গোগ্রাসে ভাত খাওয়া, এক ঘরে মানুষের সঙ্গে গবাদি পশুর বসবাস, কাদামাখা শরীর, ছাগলের বিষ্ঠার মাঝে শুয়ে ঘুম, বৃষ্টির দিনে বাড়ির ভেতর ব্যাঙের আনাগোনা, কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে ছোটখাটো ঝগড়া আর কথায় কথায় খিস্তি-খেউড়—এগুলো সবই সেই রইদের ক্ষুধা তৈরির মাধ্যম, এর সঙ্গে দারিদ্র্যের সম্পর্ক সামান্যই।
সিনেমাটিতে যৌনতার উপস্থাপনাটিও বেশ অভিনব। এখানে দৃশ্যের চেয়েও বড় রূপক হয়ে উঠেছে সাদুর মুখে তালের পিঠা খেয়ে যৌন তৃপ্তির অভিব্যক্তি। অথচ শেষ পর্যন্ত সাদু ও তার স্ত্রীর মধ্যে আদৌ শারীরিক কোনো সম্পর্ক ঘটে কি না, তা নিয়ে দর্শক সন্দিহানই থেকে যায়। তবে কি মরিয়মের গর্ভে যীশুর জন্মের মতো কোনো রহস্যময় ঘটনা ঘটতে চলেছে? সাদুর মনের ঈর্ষা কি তবে পুরোপুরি অমূলক?
রূপকের প্লাবনে প্লাবিত হবার কথা যা বলছিলাম, তারই মনে করতে পারা কয়েকটা তুলে ধরে শেষের পথ ধরি।
- বিয়ের দৃশ্যে নারীর আগমন এবং দেবী দূর্গার প্রস্থান
- কুকুরের হাত থেকে জুতা বাঁচাতে লুকিয়ে ফেলা
- প্রেমের প্রতিদানে গায়ে বল্লা ছেড়ে দেয়া
- কামনার জোয়ারের মতো প্রেমেরও বারবার ফিরে ফিরে আসা
- আগুনে সব পুড়ে যাবার পরেও পুনরুত্থানের মতো বেঁচে ফেরা
- শিলাবৃষ্টিতে নূহের প্লাবন
- প্রেমকে শিকল পরিয়ে গৃহবন্দী করার পুরুষালি প্রবৃত্তি
এই দৃশ্যগুলোর একেকজন একেক রকম ব্যাখ্যা করবেন, তাই আমি কেবল তালিকা দিয়েই খালাস। তবে তিনটি দৃশ্য কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছি না।
প্রথম, নূহের প্লাবনের সময় সকল পশুপাখি আশ্রয় নেয় একই ঘরে। একটা বিরাট মহিষও জানালায় মুখ ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে নানা পশু পাখির বাচ্চা। অথচ একজন পুরুষ একেবারে শিশুর মাতৃগর্ভে থাকার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে আশ্রয় নেয় নারীর কোলেই। নারীই যেন সেই মহাকালের আদিমতম শক্তি।
দ্বিতীয়, প্রবল হিংস্রতায় মৃত ছাগীর চামড়া টেনে তুলতে গিয়ে রক্তের বদলে দুধ ঝরতে থাকা। এরপর সেই ছাগীর মাংস জোর করে খেতেই থাকা, খেতেই থাকা। এই কামনার হিংস্রতা এবং কামনার শেষ কোথায়?
তৃতীয়, গাছ থেকে পড়া তালকেই আদম-হাওয়ার গন্ধম তথা কামনাবাহী ফল হিসেবে উপস্থাপন করা। সেই গন্ধমের নেশা এতই প্রবল, তাতে চাপা পড়ে মৃত্যুতেও যেন আপত্তি নেই! আকাশ থেকে মাটিতে ঝরে পড়া প্রতিটা গন্ধম কুড়াতেই হবে যেকোনো ভাবেই। তবে শেষ পর্যন্ত নারীর সঙ্গে পুরুষের কিংবা এক মহাজাগতিক সত্তার সঙ্গে আরেক সত্তার মিলন কি আসলেই কেউ আটকাতে পারে? নূহের প্লাবনে জীবনের নৌকায় ঠাঁই হয় সকল অস্তিত্বের।
রইদ এক ধরণের মহাজাগতিক আর মহাকালিক অনুভূতি নিয়ে এসেছে বাংলা ভাষার সিনেমার জন্য। এর রেশ পুরোপুরি কাটতে আরও কিছুদিন সময় যে লাগবে, তা বেশ বুঝতে পারছি। কিংবা কে জানে, এই সিনেমা দিয়ে বাংলা সিনেমার আকাশে রইদটা অবশেষে উঠেই গেল কিনা! ব্যথাকে সেই কোন কালে সুখ ডেকেছিলেন রবি ঠাকুর, আর একালে এসে আঁধারকে রইদ ডাকলেন সুমন। এভাবে সিনেমার নামে একটা জলজ্যান্ত কবিতা লিখে বসলে দর্শকের বুকে সুখের মতো ব্যথা না বেজে উপায় কী!

পাকিস্তান আন্দোলন শেষে ভারতবর্ষ ভেঙে পৃথক দেশ সৃষ্টি প্রায় আট দশক পুরোনো ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে বিস্তর লেখা হয়েছে বহু ভাষায়, বহু দেশে।
২ ঘণ্টা আগে
২০০৫ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু হয়েছিল এক অদম্য স্বপ্নযাত্রা। দীর্ঘ ২০ বছরের নিরন্তর পথচলা শেষে চীনের শহর গুইলিংয়ে পা রাখার মাধ্যমে ১ হাজার শহর ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করলেন ভ্রমণপিপাসু তানভীর অপু।
৬ ঘণ্টা আগে
অ্যালেন গিন্সবার্গের শততম জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা বিট প্রজন্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবিকে শ্রদ্ধা জানানো, একই সঙ্গে সেই বিশ্বনাগরিক বিবেককে স্মরণ করা—যিনি ক্ষমতার ভাষার বিপরীতে মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন। শতবর্ষ পরেও তিনি কেবল একজন আমেরিকান কবি নন; বাংলাদেশের ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সাক্ষী।
১ দিন আগে
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। মুক্তিযুদ্ধ চলছে। পশ্চিমবাংলার দমদম পার হতেই অ্যালেন গিন্সবার্গের চোখে পড়ল চারদিকে সারি সারি তাঁবু আর ছাউনি। এখানে থাকছেন শত শত শরণার্থী। সেই বছরের তুমুল বৃষ্টিতে রাস্তার পাশের ছোট ছোট নালাগুলোও ভরে গেছে কানায় কানায়। নোংরা জলের ধারেই অমানবিক পরিবেশে দিন কাটছে মানুষগুলোর।
১ দিন আগে