মাহজাবিন নাফিসা

ইসলাম ধর্মে হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এই মাসের ১০ তারিখ বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা পালন করেন—আশুরা। বিশেষ করে শিয়া মুসলিমদের কাছে এটি খুবই তাতপর্যপূর্ণ ও উৎসবমুখর একটি দিন। তবে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি সব দেশে একইভাবে পালিত হয় না। অঞ্চল, ইতিহাস, এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাবে আশুরা একেক দেশে একেক রূপ ধারণ করেছে।
সুন্নি মুসলমানরা মূলত নফল ইবাদত, রোজা ও দোয়ার মাধ্যমে এদিন পালন করেন। অন্যদিকে শিয়া মুসলমানদের কাছে ১০ মহররম হলো ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের স্মৃতিবাহী দিন। তাই আশুরা তাদের জন্য শোক, ত্যাগ, ন্যায়বিচার এবং জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।
‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দশ। মহররমের দশম দিন হওয়ায় এ দিনের নামকরণ করা হয়েছে আশুরা। ইসলামি ঐতিহ্য ও বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী এদিন বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী।
অত্যাচারী ফেরাউনের কবল থেকে বনি ইসরায়েলের মুক্তির ঘটনা এই ঐতিহাসিক আশুরার দিনে ঘটেছিল। এ দিনেই ফেরাউন ও তার বাহিনী নবী মুসাকে (আ.) ধাওয়া করতে গিয়ে সাগরের পানিতে তলিয়ে যায়। মুসা (আ.) এবং বনি ইসরায়েলের এই মুক্তির ঘটনাকে স্মরণ করে রাসূল (সা.) আশুরার রোজা পালন করেন।
আশুরার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে কারবালার বেদনাবিধুর ইতিহাস। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম বর্তমান ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
বিশ্বজুড়ে শিয়া মুসলমানদের জন্য আশুরার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ইরাকের ফোরাত নদীর তীরবর্তী শহর কারবালা। এখানেই ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাজার অবস্থিত। মহররমের শুরু থেকেই লাখো মানুষ বিভিন্ন দেশ থেকে কারবালায় সমবেত হন। অনেকেই শত শত কিলোমিটার পথ খালি পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন। কালো পোশাক পরিহিত শোকাহত মানুষ মিছিল করেন, বুক চাপড়ে (লাতম) শোক প্রকাশ করেন এবং কারবালার ঘটনার বর্ণনা শুনে অশ্রুসিক্ত হন।
শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, কারবালায় এই সময় অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক বিনামূল্যে খাবার, পানি ও চিকিৎসাসেবা দেন। শোকের পাশাপাশি এটি পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা ও মানবসেবারও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশে নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী গুরুত্বের সাথে দিনটি পালন করা হয়।

ইরান: নাট্যমঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠে কারবালা
ইরানে আশুরা মানেই শুধু শোকযাত্রা নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন নাট্যশিল্প তাজিয়েহ। এই নাটকে কারবালার যুদ্ধ, ইমাম হুসাইনের পরিবারকে পানি থেকে বঞ্চিত করা, শিশুদের কষ্ট এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাতের ঘটনাগুলো অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
এই নাট্যরীতি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেও স্বীকৃত। পাশাপাশি দেশজুড়ে হুসাইনিয়াহ ও ইমামবারাগুলোতে মজলিস অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আলেমরা কারবালার ইতিহাস ও এর শিক্ষা তুলে ধরেন।
লেবাননের শিয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও আশুরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। হুসাইনিয়াগুলোতে ধারাবাহিক মজলিস অনুষ্ঠিত হয় এবং ধর্মীয় শোকসংগীত বা লাতমিয়ার মাধ্যমে ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়।
তবে গত কয়েক দশকে অনেক শিয়া ধর্মীয় নেতা রক্তক্ষয়ী মাতমের পরিবর্তে মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিচ্ছেন। অনেক স্থানে রক্তদান, দরিদ্রদের খাবার বিতরণ এবং সামাজিক সেবামূলক কর্মসূচি আশুরা পালনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে আশুরার প্রধান আয়োজন ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনি দালানকে ঘিরে। এখান থেকে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল বের হয়। মিছিলে প্রতীকী দুলদুল ঘোড়া, নিশান এবং কারবালার তাবুর প্রতিরূপ বহন করা হয়।
অতীতে কিছু শোকমিছিলে ধারালো অস্ত্র বা চেইন দিয়ে আত্মপ্রহার দেখা গেলেও নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার কারণে বর্তমানে এসব কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত বা নিষিদ্ধ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অধিকাংশ সুন্নি মুসলমান ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম নফল রোজা পালন করেন। অনেক মসজিদে আশুরার তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হয়, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির এবং দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিতরণের আয়োজন করা হয়।

ভারত ও পাকিস্তান: ধর্মীয় আবেগের বিশাল সমাবেশ
ভারতের লখনৌ, হায়দরাবাদ, কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদে আশুরা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। বিশেষ করে লখনৌয়ের বড় ইমামবাড়া ও ছোট ইমামবাড়া শতাব্দী ধরে শিয়া সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এই দেশগুলোতে হাজার হাজার মানুষের শোকযাত্রা বের হয়। অনেক স্থানে তাজিয়া বহন করা হয় এবং কারবালার ঘটনাবলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন অনেক শহরে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একই সময়ে সুন্নি মুসলমানরাও নফল রোজা, নফল ইবাদত ও দান-সদকায় অংশ নেন।

তুরস্ক ও বলকান: আশুরে পুডিংয়ের মিষ্টি ঐতিহ্য
তুরস্কে আশুরা শুধু শোকের নয়, সামাজিক সম্প্রীতিরও প্রতীক। এখানে ‘আশুরে’ বা ‘নূহের পুডিং’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ মিষ্টান্ন রান্না করা হয়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকায় অবশিষ্ট থাকা শস্য, ডাল, বাদাম, শুকনো ফল ও অন্যান্য উপকরণ একত্র করে এই খাবার প্রস্তুত করা হয়েছিল। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আজও তুরস্কের পরিবারগুলো আশুরে রান্না করে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মধ্যে বিতরণ করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই খাবার ভাগাভাগি করা দেশটিতে সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মরক্কোতে আশুরা এক ভিন্ন আবহে উদযাপিত হয়। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি এটি শিশু-কিশোরদের আনন্দের দিন হিসেবেও পরিচিত। নতুন পোশাক পরা, খেলনা উপহার দেওয়া এবং ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজানোর রেওয়াজ রয়েছে।
এ দেশের একটি জনপ্রিয় লোকজ প্রথা হলো ‘জামজমা’, যেখানে তরুণরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। অনেকের বিশ্বাস, এটি পবিত্রতা ও বরকতের প্রতীক।
আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ায় আশুরার দিন নফল রোজা, কবর জিয়ারত, দরিদ্রদের সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে বিশেষ খাবার ভাগাভাগি করার রীতি বেশি দেখা যায়। এখানে দিনটি মূলত ইবাদত, দান ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার উপলক্ষ।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী অনেক শিয়া মুসলিম সম্প্রদায় আশুরাকে আধুনিক মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
অনেক ইসলামিক সেন্টার ‘ইমাম হুসাইন ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পেইন’ আয়োজন করে, যেখানে শত শত মানুষ হাসপাতালে বা রেড ক্রসের মাধ্যমে রক্তদান করেন। তাদের মতে, ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগের প্রকৃত শিক্ষা মানুষের জীবন রক্ষা ও মানবসেবায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টারে আন্তঃধর্মীয় আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়। সেখানে অমুসলিম অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কারবালার ইতিহাস, ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ এবং মানবতার শিক্ষা তুলে ধরা হয়।

ইসলাম ধর্মে হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এই মাসের ১০ তারিখ বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা পালন করেন—আশুরা। বিশেষ করে শিয়া মুসলিমদের কাছে এটি খুবই তাতপর্যপূর্ণ ও উৎসবমুখর একটি দিন। তবে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি সব দেশে একইভাবে পালিত হয় না। অঞ্চল, ইতিহাস, এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাবে আশুরা একেক দেশে একেক রূপ ধারণ করেছে।
সুন্নি মুসলমানরা মূলত নফল ইবাদত, রোজা ও দোয়ার মাধ্যমে এদিন পালন করেন। অন্যদিকে শিয়া মুসলমানদের কাছে ১০ মহররম হলো ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের স্মৃতিবাহী দিন। তাই আশুরা তাদের জন্য শোক, ত্যাগ, ন্যায়বিচার এবং জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।
‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দশ। মহররমের দশম দিন হওয়ায় এ দিনের নামকরণ করা হয়েছে আশুরা। ইসলামি ঐতিহ্য ও বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী এদিন বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী।
অত্যাচারী ফেরাউনের কবল থেকে বনি ইসরায়েলের মুক্তির ঘটনা এই ঐতিহাসিক আশুরার দিনে ঘটেছিল। এ দিনেই ফেরাউন ও তার বাহিনী নবী মুসাকে (আ.) ধাওয়া করতে গিয়ে সাগরের পানিতে তলিয়ে যায়। মুসা (আ.) এবং বনি ইসরায়েলের এই মুক্তির ঘটনাকে স্মরণ করে রাসূল (সা.) আশুরার রোজা পালন করেন।
আশুরার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে কারবালার বেদনাবিধুর ইতিহাস। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম বর্তমান ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
বিশ্বজুড়ে শিয়া মুসলমানদের জন্য আশুরার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ইরাকের ফোরাত নদীর তীরবর্তী শহর কারবালা। এখানেই ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাজার অবস্থিত। মহররমের শুরু থেকেই লাখো মানুষ বিভিন্ন দেশ থেকে কারবালায় সমবেত হন। অনেকেই শত শত কিলোমিটার পথ খালি পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন। কালো পোশাক পরিহিত শোকাহত মানুষ মিছিল করেন, বুক চাপড়ে (লাতম) শোক প্রকাশ করেন এবং কারবালার ঘটনার বর্ণনা শুনে অশ্রুসিক্ত হন।
শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, কারবালায় এই সময় অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক বিনামূল্যে খাবার, পানি ও চিকিৎসাসেবা দেন। শোকের পাশাপাশি এটি পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা ও মানবসেবারও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশে নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী গুরুত্বের সাথে দিনটি পালন করা হয়।

ইরান: নাট্যমঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠে কারবালা
ইরানে আশুরা মানেই শুধু শোকযাত্রা নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন নাট্যশিল্প তাজিয়েহ। এই নাটকে কারবালার যুদ্ধ, ইমাম হুসাইনের পরিবারকে পানি থেকে বঞ্চিত করা, শিশুদের কষ্ট এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাতের ঘটনাগুলো অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
এই নাট্যরীতি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেও স্বীকৃত। পাশাপাশি দেশজুড়ে হুসাইনিয়াহ ও ইমামবারাগুলোতে মজলিস অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আলেমরা কারবালার ইতিহাস ও এর শিক্ষা তুলে ধরেন।
লেবাননের শিয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও আশুরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। হুসাইনিয়াগুলোতে ধারাবাহিক মজলিস অনুষ্ঠিত হয় এবং ধর্মীয় শোকসংগীত বা লাতমিয়ার মাধ্যমে ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়।
তবে গত কয়েক দশকে অনেক শিয়া ধর্মীয় নেতা রক্তক্ষয়ী মাতমের পরিবর্তে মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিচ্ছেন। অনেক স্থানে রক্তদান, দরিদ্রদের খাবার বিতরণ এবং সামাজিক সেবামূলক কর্মসূচি আশুরা পালনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে আশুরার প্রধান আয়োজন ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনি দালানকে ঘিরে। এখান থেকে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল বের হয়। মিছিলে প্রতীকী দুলদুল ঘোড়া, নিশান এবং কারবালার তাবুর প্রতিরূপ বহন করা হয়।
অতীতে কিছু শোকমিছিলে ধারালো অস্ত্র বা চেইন দিয়ে আত্মপ্রহার দেখা গেলেও নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার কারণে বর্তমানে এসব কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত বা নিষিদ্ধ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অধিকাংশ সুন্নি মুসলমান ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম নফল রোজা পালন করেন। অনেক মসজিদে আশুরার তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হয়, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির এবং দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিতরণের আয়োজন করা হয়।

ভারত ও পাকিস্তান: ধর্মীয় আবেগের বিশাল সমাবেশ
ভারতের লখনৌ, হায়দরাবাদ, কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদে আশুরা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। বিশেষ করে লখনৌয়ের বড় ইমামবাড়া ও ছোট ইমামবাড়া শতাব্দী ধরে শিয়া সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এই দেশগুলোতে হাজার হাজার মানুষের শোকযাত্রা বের হয়। অনেক স্থানে তাজিয়া বহন করা হয় এবং কারবালার ঘটনাবলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন অনেক শহরে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একই সময়ে সুন্নি মুসলমানরাও নফল রোজা, নফল ইবাদত ও দান-সদকায় অংশ নেন।

তুরস্ক ও বলকান: আশুরে পুডিংয়ের মিষ্টি ঐতিহ্য
তুরস্কে আশুরা শুধু শোকের নয়, সামাজিক সম্প্রীতিরও প্রতীক। এখানে ‘আশুরে’ বা ‘নূহের পুডিং’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ মিষ্টান্ন রান্না করা হয়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকায় অবশিষ্ট থাকা শস্য, ডাল, বাদাম, শুকনো ফল ও অন্যান্য উপকরণ একত্র করে এই খাবার প্রস্তুত করা হয়েছিল। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আজও তুরস্কের পরিবারগুলো আশুরে রান্না করে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মধ্যে বিতরণ করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই খাবার ভাগাভাগি করা দেশটিতে সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মরক্কোতে আশুরা এক ভিন্ন আবহে উদযাপিত হয়। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি এটি শিশু-কিশোরদের আনন্দের দিন হিসেবেও পরিচিত। নতুন পোশাক পরা, খেলনা উপহার দেওয়া এবং ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজানোর রেওয়াজ রয়েছে।
এ দেশের একটি জনপ্রিয় লোকজ প্রথা হলো ‘জামজমা’, যেখানে তরুণরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। অনেকের বিশ্বাস, এটি পবিত্রতা ও বরকতের প্রতীক।
আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ায় আশুরার দিন নফল রোজা, কবর জিয়ারত, দরিদ্রদের সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে বিশেষ খাবার ভাগাভাগি করার রীতি বেশি দেখা যায়। এখানে দিনটি মূলত ইবাদত, দান ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার উপলক্ষ।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী অনেক শিয়া মুসলিম সম্প্রদায় আশুরাকে আধুনিক মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
অনেক ইসলামিক সেন্টার ‘ইমাম হুসাইন ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পেইন’ আয়োজন করে, যেখানে শত শত মানুষ হাসপাতালে বা রেড ক্রসের মাধ্যমে রক্তদান করেন। তাদের মতে, ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগের প্রকৃত শিক্ষা মানুষের জীবন রক্ষা ও মানবসেবায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টারে আন্তঃধর্মীয় আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়। সেখানে অমুসলিম অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কারবালার ইতিহাস, ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ এবং মানবতার শিক্ষা তুলে ধরা হয়।
.png)

মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যা
২০ মিনিট আগে
পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবারা থেকে বের হয়েছেন শত শত মানুষ। তাদের গায়ে কালো পোশাক। মুখে ধ্বণি—ইয়া হোসেন… ইয়া হোসেন। কাঁধে কারবালার প্রতীকী সমাধি। তারা হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তা দিয়ে।
১ ঘণ্টা আগে
আশুরা এলেই পুরান ঢাকার হোসেনি দালান আবারও প্রাণ ফিরে পায়। কালো পোশাকে শোকযাত্রা, ‘ইয়া হোসেন’ ধ্বনি, তাজিয়া মিছিল—সব মিলিয়ে এটি শুধু শিয়া মুসলমানদের ধর্মীয় আচার নয়, বরং ঢাকার শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। অনেকেই ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে এটিকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শোকের এক সম্মিল
২ ঘণ্টা আগে
২৬ জুন এলেই জার্মানির হ্যামিলন শহরকে ঘিরে ফিরে আসে শতাব্দীপ্রাচীন রহস্যের স্মৃতি। কিংবদন্তি ও নথি অনুযায়ী, ১২৮৪ সালের এই দিনেই শহর থেকে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গিয়েছিল ১৩০ জন শিশু। ঠিক কী ঘটেছিল, তার নির্ভরযোগ্য উত্তর আজও মেলেনি। তবে রহস্যময় বাঁশিওয়ালা আর শিশুদের সেই অন্তর্ধানের গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী
৪ ঘণ্টা আগে