বাংলার সংস্কৃতি
ফাবিহা বিনতে হক

পয়লা বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। বৈশাখী মেলার নাগরদোলা, জিলাপি, বাতাসা আর মুড়ি-মুড়কির গন্ধে ফিরে আসে আমাদের ফেলে আসা শৈশব। আর মেলা মানেই চোখের সামনে রঙিন হয়ে ওঠে মাটির তৈরি নানা রকম খেলনা। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত খেলনা ‘টেপা পুতুল’।
বাবার আঙুল ধরে মেলা থেকে কিনে আনা টেপা পুতুল আমাদের অনেকেরই শৈশবের মধুর স্মৃতি। এই পুতুলগুলোর সঙ্গে যেমন আমাদের শৈশবের স্মৃতি মিশে আছে, তেমনি দেশের আবহমান সংস্কৃতির সঙ্গেও টেপা পুতুল আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে।
‘টেপা’ শব্দটিই যেন বেশ আদুরে, ঘরোয়া প্রকৃতির। বাড়ির সবচেয়ে আদুরে মেয়েটিকে যেমন আমরা আদর করে নানা নামে ডাকি, টেপা পুতুলের ‘টেপা’ নামটিও ঠিক তেমন। নরম এঁটেল মাটিকে হাতের আঙুল দিয়ে টিপে টিপে এই পুতুল বানানো হয়। এ জন্যই এর নাম রাখা হয়েছে ‘টেপা পুতুল’। এই পুতুল তৈরিতে কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচ, ফর্মা বা আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হয় না। মাটির দলা আঙুলের চাপে হয়ে ওঠে চমৎকার শিল্পকর্ম।
প্রথমে নরম কাদামাটি দিয়ে পুতুলের মূল কাঠামো বা অবয়ব তৈরি করা হয়। এরপর আঙুল দিয়ে চেপে চোখ, নাক, কান ও মুখ ফুটিয়ে তোলা হয়। বাঁশের কাঠি, চিকন সুচ বা খড়কে দিয়ে আঁচড় কেটে পুতুলের গায়ে পোশাক, শাড়ির ভাঁজ এবং গহনার নকশা করা হয়। এরপর এই কাঁচা মাটির পুতুলগুলো রোদে শুকানো হয়। ভালো করে শুকিয়ে গেলে সেগুলো কাঠের আগুনে পোড়ানো হয়। আগুনে পুড়লে পুতুলগুলো শক্ত হয় এবং পোড়া মাটির সুন্দর খয়েরি বা লালচে রং ধারণ করে।

অনেক সময় পুতুল পোড়ানোর পর লাল, কালো, হলুদ ও সাদা রং দিয়ে চমৎকার নকশা করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে গ্রামবাংলার নারীরাই টেপা পুতুল তৈরিতে সবচেয়ে বেশি দক্ষ ছিলেন। অবসরে তাঁরা পরম মমতায় এই পুতুল বানাতেন। পরে জীবিকার প্রয়োজনে পুরুষরাও এই শিল্পের সাথে যুক্ত হন।
টেপা পুতুল বাংলার অন্যতম প্রাচীন লোকশিল্প। কবে থেকে এই পুতুল বানানো শুরু হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই মৃৎশিল্পের বয়স হাজার বছর। প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা, অর্থাৎ হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতেও খননকাজে পোড়ামাটির পুতুলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আমাদের বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি ও পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের খননকাজেও প্রচুর পোড়ামাটির ফলক উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো প্রাচীনকালের মানুষের জীবনযাত্রা ও শিল্পের পরিচয় বহন করে।
ধারণা করা হয়, প্রথমে হয়ত ধর্মীয় আচার বা পূজা-পার্বণের নৈবেদ্য হিসেবে এসব পুতুল বানানো শুরু হয়েছিল। পরে মায়েরা শিশুদের জন্য নরম মাটি টিপে পুতুল বানানো শুরু করেন। এভাবেই খেলার ছলে শুরু হওয়া টেপা পুতুল ধীরে ধীরে বাংলার লোকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। মা-শিশু, বউ-জামাই, কৃষক, নথ পরা বউ, ঘোড়া, হাতি, পাখি—গ্রামের খুব চেনা চরিত্রগুলোই এই পুতুলের আদলে রূপ পায়।
একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি কুমারপাড়াতেই টেপা পুতুল বানানো হতো। উৎসব বা মেলার সময় এলে কুম্ভকাররা (কুমার) দিনরাত ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তবে কালের বিবর্তনে এর পরিধি বেশ কমে এসেছে। তারপরও দেশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় বংশপরম্পরায় পাল বা কুমার পরিবারগুলো আজও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার চরপাড়া গ্রাম টেপা পুতুলের জন্য সারা দেশে বেশ বিখ্যাত। এখানকার কুমার দম্পতি সুনীল কুমার পাল ও আরতী রানী পাল প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে টেপা পুতুল তৈরি করছেন। তাঁরা এই শিল্পের অত্যন্ত নিপুণ কারিগর।
এছাড়া ময়মনসিংহের পালবাড়িতেও দীর্ঘকাল ধরে এই ঐতিহ্যবাহী পুতুল বানানো হয়। ঢাকার রায়েরবাজার, সাভার ও ধামরাই এলাকা একসময় মৃৎশিল্পের জন্য খুব বিখ্যাত ছিল। সোনারগাঁও, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, জামালপুর, ফরিদপুর ও শেরপুরের অনেক মৃৎশিল্পী এখনো পরম মমতায় নিখুঁত সব টেপা পুতুল বানান।
তবে এখন মাটির খেলনার জায়গা দখল করে নিয়েছে বাজারচলতি প্লাস্টিক ও ব্যাটারিচালিত বিদেশি খেলনা। গ্রামের মেলায় আর আগের মতো মাটির পুতুলের বড় বড় পসরা দেখা যায় না। তবে আশার কথাও আছে।
শহুরে শৌখিন মানুষের কাছে এখন মাটির জিনিসের কদর নতুন করে বাড়ছে। অনেকেই ড্রয়িংরুম সাজাতে বা অন্দরমহলের সৌন্দর্য বাড়াতে দেশীয় মোটিফ হিসেবে টেপা পুতুল কিনে রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বৈশাখী মেলা, সোনারগাঁয়ের লোকজ মেলা বা দোয়েল চত্বরের দোকানগুলোতে সারা বছরই এই পুতুল বিক্রি হয়। আজকাল মাটির টেপা পুতুলের আদলে মেয়েদের গয়নাও তৈরি হচ্ছে।

পয়লা বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। বৈশাখী মেলার নাগরদোলা, জিলাপি, বাতাসা আর মুড়ি-মুড়কির গন্ধে ফিরে আসে আমাদের ফেলে আসা শৈশব। আর মেলা মানেই চোখের সামনে রঙিন হয়ে ওঠে মাটির তৈরি নানা রকম খেলনা। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত খেলনা ‘টেপা পুতুল’।
বাবার আঙুল ধরে মেলা থেকে কিনে আনা টেপা পুতুল আমাদের অনেকেরই শৈশবের মধুর স্মৃতি। এই পুতুলগুলোর সঙ্গে যেমন আমাদের শৈশবের স্মৃতি মিশে আছে, তেমনি দেশের আবহমান সংস্কৃতির সঙ্গেও টেপা পুতুল আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে।
‘টেপা’ শব্দটিই যেন বেশ আদুরে, ঘরোয়া প্রকৃতির। বাড়ির সবচেয়ে আদুরে মেয়েটিকে যেমন আমরা আদর করে নানা নামে ডাকি, টেপা পুতুলের ‘টেপা’ নামটিও ঠিক তেমন। নরম এঁটেল মাটিকে হাতের আঙুল দিয়ে টিপে টিপে এই পুতুল বানানো হয়। এ জন্যই এর নাম রাখা হয়েছে ‘টেপা পুতুল’। এই পুতুল তৈরিতে কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচ, ফর্মা বা আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হয় না। মাটির দলা আঙুলের চাপে হয়ে ওঠে চমৎকার শিল্পকর্ম।
প্রথমে নরম কাদামাটি দিয়ে পুতুলের মূল কাঠামো বা অবয়ব তৈরি করা হয়। এরপর আঙুল দিয়ে চেপে চোখ, নাক, কান ও মুখ ফুটিয়ে তোলা হয়। বাঁশের কাঠি, চিকন সুচ বা খড়কে দিয়ে আঁচড় কেটে পুতুলের গায়ে পোশাক, শাড়ির ভাঁজ এবং গহনার নকশা করা হয়। এরপর এই কাঁচা মাটির পুতুলগুলো রোদে শুকানো হয়। ভালো করে শুকিয়ে গেলে সেগুলো কাঠের আগুনে পোড়ানো হয়। আগুনে পুড়লে পুতুলগুলো শক্ত হয় এবং পোড়া মাটির সুন্দর খয়েরি বা লালচে রং ধারণ করে।

অনেক সময় পুতুল পোড়ানোর পর লাল, কালো, হলুদ ও সাদা রং দিয়ে চমৎকার নকশা করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে গ্রামবাংলার নারীরাই টেপা পুতুল তৈরিতে সবচেয়ে বেশি দক্ষ ছিলেন। অবসরে তাঁরা পরম মমতায় এই পুতুল বানাতেন। পরে জীবিকার প্রয়োজনে পুরুষরাও এই শিল্পের সাথে যুক্ত হন।
টেপা পুতুল বাংলার অন্যতম প্রাচীন লোকশিল্প। কবে থেকে এই পুতুল বানানো শুরু হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই মৃৎশিল্পের বয়স হাজার বছর। প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা, অর্থাৎ হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতেও খননকাজে পোড়ামাটির পুতুলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আমাদের বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি ও পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের খননকাজেও প্রচুর পোড়ামাটির ফলক উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো প্রাচীনকালের মানুষের জীবনযাত্রা ও শিল্পের পরিচয় বহন করে।
ধারণা করা হয়, প্রথমে হয়ত ধর্মীয় আচার বা পূজা-পার্বণের নৈবেদ্য হিসেবে এসব পুতুল বানানো শুরু হয়েছিল। পরে মায়েরা শিশুদের জন্য নরম মাটি টিপে পুতুল বানানো শুরু করেন। এভাবেই খেলার ছলে শুরু হওয়া টেপা পুতুল ধীরে ধীরে বাংলার লোকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। মা-শিশু, বউ-জামাই, কৃষক, নথ পরা বউ, ঘোড়া, হাতি, পাখি—গ্রামের খুব চেনা চরিত্রগুলোই এই পুতুলের আদলে রূপ পায়।
একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি কুমারপাড়াতেই টেপা পুতুল বানানো হতো। উৎসব বা মেলার সময় এলে কুম্ভকাররা (কুমার) দিনরাত ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তবে কালের বিবর্তনে এর পরিধি বেশ কমে এসেছে। তারপরও দেশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় বংশপরম্পরায় পাল বা কুমার পরিবারগুলো আজও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার চরপাড়া গ্রাম টেপা পুতুলের জন্য সারা দেশে বেশ বিখ্যাত। এখানকার কুমার দম্পতি সুনীল কুমার পাল ও আরতী রানী পাল প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে টেপা পুতুল তৈরি করছেন। তাঁরা এই শিল্পের অত্যন্ত নিপুণ কারিগর।
এছাড়া ময়মনসিংহের পালবাড়িতেও দীর্ঘকাল ধরে এই ঐতিহ্যবাহী পুতুল বানানো হয়। ঢাকার রায়েরবাজার, সাভার ও ধামরাই এলাকা একসময় মৃৎশিল্পের জন্য খুব বিখ্যাত ছিল। সোনারগাঁও, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, জামালপুর, ফরিদপুর ও শেরপুরের অনেক মৃৎশিল্পী এখনো পরম মমতায় নিখুঁত সব টেপা পুতুল বানান।
তবে এখন মাটির খেলনার জায়গা দখল করে নিয়েছে বাজারচলতি প্লাস্টিক ও ব্যাটারিচালিত বিদেশি খেলনা। গ্রামের মেলায় আর আগের মতো মাটির পুতুলের বড় বড় পসরা দেখা যায় না। তবে আশার কথাও আছে।
শহুরে শৌখিন মানুষের কাছে এখন মাটির জিনিসের কদর নতুন করে বাড়ছে। অনেকেই ড্রয়িংরুম সাজাতে বা অন্দরমহলের সৌন্দর্য বাড়াতে দেশীয় মোটিফ হিসেবে টেপা পুতুল কিনে রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বৈশাখী মেলা, সোনারগাঁয়ের লোকজ মেলা বা দোয়েল চত্বরের দোকানগুলোতে সারা বছরই এই পুতুল বিক্রি হয়। আজকাল মাটির টেপা পুতুলের আদলে মেয়েদের গয়নাও তৈরি হচ্ছে।

পয়লা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম ধুমধাম করে পালন করা উৎসব। এটি শুধু একটি দিন নয়, একটি সমষ্টিগত আচার। শহর আর গ্রামে এই দিনটিতে মানুষ নিজেরাই বিভিন্ন উপায়ে উদযাপন করত। দোকানের হালখাতা, পাড়ার মাঠে মেলা, নাগরদোলা, গ্রামীণ খেলাধুলা—সব মিলিয়ে বৈশাখ উদযাপন আড়ম্ববরপূর্ণ হলেও এর চেহারা ছিল বেশ সাদামাটা।
৩ ঘণ্টা আগে
সব বিতর্ককে ছাপিয়ে ইলিশ এখন পুরোপুরি বাণিজ্যিকীকরণের পথে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে অধ্যাপক নাসের বলছেন, সবাই ইলিশ রক্ষা করতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতটা রক্ষা করা যাচ্ছে?
৩ ঘণ্টা আগে
বছর ঘুরে আবারও ফিরে এলো বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। আর এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘শোভাযাত্রা’। রঙিন মুখোশ, বিশালাকৃতির প্রতীকী ভাস্কর্য, ঢাকের তালে তালে মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এটি যেন এক বর্ণিল সাংস্কৃতিক আয়োজন।
৪ ঘণ্টা আগে
বাংলা নববর্ষ নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; গভীর এক সামাজিক চেতনা এবং ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ধারক, বাঙালির আত্মপরিচয়ের যথাযথ প্রকাশ। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়, আর কোথায় আমাদের মিলনস্থল।
৬ ঘণ্টা আগে