প্রবন্ধ

ইচক দুয়েন্দে: যে ভাষা একাকী, যে জীবন লালঘর

স্ট্রিম গ্রাফিক

ইচক দুয়েন্দের জীবনে দুটি ঘর ছিল।

একটি ছিল রাজশাহী শহরে, শিরোইল আবাসিক অঞ্চলের ‘শারিক স্মৃতি’ নামের বাড়িতে। সূর্যকণা স্কুলগলির শেষ মাথায় প্রায়-পরিত্যক্ত এই বাড়িটির গুমোট ঘর, অন্ধকার করিডর, বন্ধ দরজা, স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের আবহে প্রাত্যহিক বিকেলও ওই বাড়িতে বিকেলবেলার স্নিগ্ধতা নিয়ে থাকতে পারে না। জানালা পেরিয়ে আলো আসে ঠিকই, সে-আলো ঘষা-কাঁচের মতো ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। বাতাস ঢোকে, কিন্তু সে-বাতাস কোনো মানুষের গায়ের গন্ধ বহন করে আনে না। মনে হয়, বাড়িটির ভেতরে ‘সময়’ অনেক আগে এসে বসেছিল; তারপর ধীরে ধীরে সময়ও পচতে শুরু করেছে।

সেই পচনোন্মুখ বাড়িতে থাকতেন শামসুল কবীর কচি—ইচক দুয়েন্দে।

একদিন তিনি বলেছিলেন, ঘরে প্রায়ই সাপ আসে। কথাটি বলেছিলেন এমন নিবিড় নির্লিপ্তি নিয়ে, যেন সাপ কোনো আতঙ্ক নয়, কোনো ব্যতিক্রম নয়; সে যেন ঘরেরই এক বাসিন্দা। যেন মানুষেরা কম এলে নিঃসঙ্গতা নিজের স্বভাবমতো কাউকে পাঠায়—সাপ, পোকা, দেয়ালের নোনা ধরা গন্ধ, পুরোনো কাগজ, একা চেয়ারে পড়ে থাকা বিকেলের ছায়া। মানুষের সঙ্গ নয়, তবু এক ধরনের সঙ্গ। অনুপস্থিতির সঙ্গ।

আরেকটি ঘর তাঁর লেখা লালঘর

৯ ফুট বাই ৯ ফুটের একটি বর্গাকার ঘর। উচ্চতা প্রায় ১২ ফুট। গরাদ আছে। তালা আছে। সান্ত্রি আছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার ছোট্ট পায়খানা আছে। শীত আছে। নীল কম্বল আছে। ঠাসাঠাসি দেহ আছে। আর আছে একজন মানুষ—চিকচাক রুই—যে রাত তিনটায় প্রথমবার নিজের বুকের ওঠা-নামা, পাকস্থলীর সঙ্কোচন, দেয়ালঘড়ির সেকেন্ডের শব্দ শুনতে পায়।

এই দুটি ঘর আলাদা; আবার আলাদা নয়।

একটিতে ইচক দুয়েন্দে নিজে থাকতেন। আরেকটিতে তিনি আমাদের আটকে রেখেছেন।

আমরা যারা তাঁকে দূর থেকে দেখেছি, তাঁর গল্প শুনেছি, তাঁকে দুর্বোধ্য বলেছি, মহামতি, মহাত্মা, কিংবদন্তি বলেছি—কিন্তু একদিনও তাঁর পাশে গিয়ে বসিনি, তাঁর ঘরে যাইনি, তাঁর লেখার সামনে যথেষ্ট সময় দাঁড়াইনি—লালঘর সেই দূরবর্তী-আমাদের জন্য লেখা। এটি কেবল কয়েকজন মানুষের পুলিশ-হাজতে আটকে পড়ার গল্প নয়; এটি আমাদের সাহিত্যিক ভীরুতার গল্প। আমাদের না-পড়ার গল্প। আমাদের না-বোঝার গল্প। দেরিতে এসে দরজায় কড়া নাড়ার গল্প।

ইচক দুয়েন্দে নামটিও যেন একটি দরজা ভাঙার শব্দ।

শামসুল কবীর কচি নিজের নামকে উল্টে, কচি থেকে ইচক বানিয়েছিলেন। এই নাম-নির্মাণে যেন তাঁর সমগ্র শিল্পদর্শনের সংকেত লুকিয়ে আছে। তিনি পরিচিত জিনিসকে পরিচিত থাকতে দেন না। নাম, বাক্য, চরিত্র, রাষ্ট্র, ঘর, ভাষা—সবকিছুকে তিনি একটুকরে দূরে সরিয়ে দেন। এমনভাবে সরিয়ে দেন যে আমরা অস্বস্তিতে পড়ি। মনে হয়, এই তো বাস্তব, কিন্তু আবার বাস্তব নয়; এই তো ভাষা, কিন্তু ভাষা যেন সাপের মতো খোলশ পাল্টেছে।

তাঁর নামের দ্বিতীয় অংশ—‘দুয়েন্দে’—আরও রহস্যময়। স্প্যানিশ নন্দনতত্ত্বে ‘duende’ শিল্পের এক অন্ধকার, শরীরী, মৃত্যুসন্নিহিত শক্তির নাম; এমন এক শক্তি, যা সৌন্দর্যকে মসৃণ রাখে না, বরং তাকে ক্ষত, রক্ত, অস্বস্তি ও গভীর মানবিক স্পন্দনের অঞ্চলে নামিয়ে আনে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ইচক সম্ভবত নামটির এই অনুরণন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। কারণ তাঁর জীবন ও ভাষা পড়লে মনে হয় শব্দটি তাঁর সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। ‘ইচক’ যেমন পরিচিত নামের বিপর্যয়, ‘দুয়েন্দে’ তেমনি ভাষার ভেতরে জেগে থাকা অন্ধকার আত্মা।

রাজশাহীর সেই সাপ-আসা ঘর ফেলে ইচক দুয়েন্দে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর ‘লালঘর’ রয়ে গেছে— রাষ্ট্রের ভেতরে, সমাজের ভেতরে, বাংলা ভাষার ভেতরে। আর আমাদের না-পড়া বিবেকের ভেতরে।

লালঘর-এর চরিত্রগুলোর নাম দেখলেই বোঝা যায়, ইচক ইচ্ছে করে আমাদের নিরাপদ পাঠ-অভ্যাসে আঘাত করেন। চিকচাক রুই, মিয়ান টিনটুই, রজেট চিনচুই, পুঁই চুলভি, দিল আনচান ভাই, লালু পাঞ্জুমম, তিঞ্জি খর্খর, উল্লাস ছাপ্পান্ন, ইন্টুম কাসকেট, তুনির চুমক, ভুটক নন্দনচাট, উবাব রহনাং, ফ্লিজ ফ্যাল, জিয়াফ ব্যানব্যাট, বিরবিট্টি, ইমুস ক্যাট্স, শ্যামল চিল, তিয়াস ঠিসটক, ফিটিক চ্যাক—এসব নাম কেবল কৌতুক নয়। এগুলো পরিচয়ের গরাদ ভাঙার পদ্ধতি। বাংলা কথাসাহিত্যে নাম শুনেই আমরা চরিত্রকে চিনে ফেলতে চাই—এমনকি তার ধর্ম, শ্রেণি, অঞ্চল, পেশা, সামাজিক অবস্থান ও মানসিকতাসমেত। ইচক আমাদের সেই চেনার অধিকার কেড়ে নেন। তিনি যেন বলতে চান—তুমি সহজে কাউকে চিনবে না। চেনার আরাম থেকেই তোমার বন্দিত্ব শুরু।

কিন্তু লালঘর কেবল ভাষা-আড়ালের খেলা নয়। খেলার মতো দেখালেও তার তলায় আছে হাড়ের শব্দ। এটি প্রথমত শরীরের বই। শরীর বলতে আমরা সাধারণত যে শরীর-সংক্রান্ত জৈবিকতা বুঝি, এখানে কেবল তা নয়। শরীর এখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের হিসেব-রাখার পদ্ধতি। রাষ্ট্রের হাতে পড়ার পর মানুষ আর নাগরিক থাকে না; দেহে পরিণত হয়। যে মানুষ কিছুক্ষণ আগেও বন্ধুদের সঙ্গে ছিল, আড্ডায় ছিল, যুক্তিতে ছিল, সম্মানে ছিল, সে হঠাৎ বুঝতে পারে—তার বুক উঠছে, নামছে; তার পাকস্থলী আছে; সে দাঁড়িয়ে আছে; তার বসার জায়গা নেই, ঘুম নেই, গরম নেই, দরজা নেই। স্বাধীনতার সমস্ত অনুভব এক মুহূর্তে এসে ঠেকে যায় দেহের ওপর।

রাষ্ট্র এই দেহ হিসেব রাখে—কতজন হলো।

রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার আগে তার দেহকে সংকুচিত করে। জায়গা কমিয়ে দেয়। দাঁড় করিয়ে রাখে। বসার অধিকার অনিশ্চিত করে। আলো নিয়ন্ত্রণ করে। শব্দ বাড়িয়ে দেয়। অপেক্ষাকে দীর্ঘ করে। তারপর মানুষ নিজেই নিজের শরীরকে ভয় পেতে শুরু করে। লালঘর-এর শুরুতে চিকচাক রুই নিজের দেহ-শব্দ শোনে: ‘ঘড়ির টিক টিক ঠিক ঠিক ধ্বনি, বুকের ভেতরের ধুকপুক ধ্বনির সঙ্গে একাকার হয়ে ছলাৎ ছলাৎ করে বাজে।’ এ দৃশ্য বাংলা কথাসাহিত্যের এক গভীরতম আটক-মুহূর্ত। কারণ এখানে কারাবাস শুধু আইনি নয়, অস্তিত্বগত।

আর এই অস্তিত্বগত কারাবাস প্রথমে চোখে নয়, কানে শুরু হয়। ফলে, লালঘর-এ ইচক লেখেন: ‘চিকচাক রুই সন্তর্পণে পায়চারি করল ঘরটির যৎসামান্য ফাঁকা জায়গাটুকুতে। মাঝে মাঝে সে থামল। আরও জোরালো করে সে তার কান পাতল। শুনল।’

ইচক দৃশ্যের আগে শব্দ তৈরি করেন। সেকেন্ডের কাঁটার ‘স্কিক স্কিক’ ধ্বনি, ঘড়ির টিকটিক, বুকের ধুকপুক, তালার টকাং, গরাদের খটখটাং, বলিষ্ঠ পায়ের ধপধপ, অনিচ্ছুক পায়ের ছেঁচড়ে চলা—এসব শব্দ মিলে লালঘর-কে তিনি যেন একটি শব্দ-কারাগারে পরিণত করেন। আমরা পাঠকেরা কেবল পড়ি না, শুনতে থাকি। আর শুনতে শুনতে একসময় নিজেরাও গরাদের ভেতরে ঢুকে পড়ি। পাশের হাজতঘরে কাউকে নিয়ে যাওয়া হয়। দেখা যায় না। শুধু শোনা যায়। জেরা। থাপ্পড়। চিৎকার। অস্বীকার। স্বীকারোক্তি। আবার অস্বীকার।

এই অদেখা সহিংসতা লালঘর-এর ভয়কে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ যা দেখা যায়, তার সীমা আছে; যা শোনা যায়, তার কল্পনার অভিঘাত অনেক দূর অবধি যায়। আটকে থাকা মানুষগুলো শব্দ শুনে ছবি বানায়। কেউ শিউরে ওঠে। কেউ ভাবে, ‘অমন কিছু তাদের জীবনে ঘটতেই পারে না।’ এই যে ‘আমার জীবনে ঘটতে পারে না’—ধরনের আপ্তবাক্যই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা। তারা ভাবে, অত্যাচার আছে, কিন্তু তা অন্যের জন্য। পুলিশ আছে, কিন্তু তা অপরাধীর জন্য। গরাদ আছে, কিন্তু তা আমাদের জন্য নয়।

ইচকের লালঘর এই মিথ নিদারুণভাবে ভেঙে দেয়। গরাদ ভদ্রলোক-অভদ্রলোক চেনে না। তালা শিক্ষাগত যোগ্যতা বোঝে না। সান্ত্রি আপনার নৈতিক আত্মপরিচয় শুনে দরজা খোলে না। রাষ্ট্রের চোখে আপনি যেকোনো মুহূর্তে ‘মানুষ’ থেকে কেবল একটি ‘কেস’ হয়ে যেতে পারেন।

শামসুল কবীর কচি নিজের নামকে উল্টে, কচি থেকে ইচক বানিয়েছিলেন। এই নাম-নির্মাণে যেন তাঁর সমগ্র শিল্পদর্শনের সংকেত লুকিয়ে আছে। তিনি পরিচিত জিনিসকে পরিচিত থাকতে দেন না। নাম, বাক্য, চরিত্র, রাষ্ট্র, ঘর, ভাষা—সবকিছুকে তিনি একটুকরে দূরে সরিয়ে দেন।

লালঘর-এ ইচক দুয়েন্দে এই কেন্দ্রীয় প্রশ্নটিকেই মুখ্য করে তোলেন যে, ‘আমাদের অপরাধ কী?’ প্রশ্নটিকে শুনতে যতটা সরল মনে হয়, এর উত্তর ততটাই বিপজ্জনক। কারণ তারা হয়তো সত্যিই অপরাধ করেনি। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে অনেক সময় অপরাধ করার আগেই মানুষ অপরাধী হয়ে যায়। সন্দেহ, অর্ডার, রিপোর্ট, ভুল বোঝাবুঝি, ক্ষমতার বিরক্তি—এসবই যথেষ্ট। এখানে অপরাধের আগে গ্রেপ্তার-পরোয়ানা আসে। সত্যের আগে আসে গুজব। আদালতের আগে সংবাদ। বিচারকের আগে সমাজ রায় দিয়ে দেয়।

আর এই সমস্ত রাষ্ট্রীয় অযৌক্তিকতার ভেতরে ভাষা হয়ে ওঠে বিপজ্জনক বস্তু। দিল আনচান ভাই এসে গরাদের ওপারে দাঁড়িয়ে হাস্যরসসমেত সতর্কতা ঘোষণা করেন। অফিসারের সামনে ইংরেজি বলা, জ্ঞান ফলানো, যুক্তি দেখানো—এসবই বিপদ ডেকে আনে। এ অংশটিকে লালঘর-এর ভাষা-রাজনীতির কেন্দ্র বলা যায়। এখানে ইংরেজি শুধু ভাষা নয়; শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা, ঔপনিবেশিক অবশেষ, সামাজিক পুঁজি, আবার ক্ষমতার সামনে আত্মবিনাশী প্রদর্শন। মদ খাওয়া বড় অপরাধ নয়; রাষ্ট্রের সামনে ভাষা দিয়ে দাঁড়ানো বড় অপরাধ।

এই দৃশ্যটি অসাধারণ, কারণ ইচক দেখান—জ্ঞান ক্ষমতার সামনে জ্ঞান থাকে না, তা হয়ে যায় বেয়াদবি। ইংরেজিতে কথা বলা নাগরিকের আত্মবিশ্বাস হতে পারে, কিন্তু অফিসারের কানে তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে শোনায়। যুক্তি অধিকার হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে তা অবাধ্যতা। স্বাধীনতা একটি সাংবিধানিক শব্দ, কিন্তু মাটির ওপর দাঁড়ানো সশস্ত্র ক্ষমতার সামনে সে শব্দের উচ্চারণই বিপজ্জনক।

ইচক দুয়েন্দের নিজের ভাষাও তাই বিপজ্জনক। লালঘর-এর ভাষা প্রচলিত অর্থে মসৃণ বা পরিশীলিত নয়; তার শক্তি তার ভাঙনে, হোঁচটে, বেসুরো উপস্থাপনে। নিরাপদ ভাষা দিয়ে অনিরাপদ বাস্তব লেখা যায় না। ইচক বাংলা গদ্যকে ভদ্র, গ্রহণযোগ্য, প্রতিষ্ঠানোপযোগী রাখতে চাননি। তাঁর বাক্য কখনও হোঁচট খায়, কখনও ছুটে যায়, কখনও অদ্ভুত নামে থামে, কখনও হাসতে হাসতে রক্ত বের করে। এই ভাষা পাঠককে আরাম দেয় না, আটকে দেয়। আমরা বুঝি না। অবশেষে বুঝতে পারি—এই না-বোঝাই দরজা।

কিন্তু লালঘর শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। এটি ভুক্তভোগীকেও ছাড় দেয় না। এই বড়গল্প বা নভেলার মানুষেরা অপরাধী নয়, আবার সরল অর্থে তারা নির্দোষও নয়। তাদের ভেতরে আছে আত্মমর্যাদা, ভীরুতা, সামাজিক ভয়, শ্রেণি-অহংকার, অস্থিরতা, তদবিরের লোভ, নৈতিক কুণ্ঠা। ইচক দুয়েন্দে তাঁদের সাধু বানিয়ে তোলেন না। তিনি ভুক্তভোগীকেও পরীক্ষা করেন।

মিয়ান টিনটুই টাকা দিয়ে খবর থামাতে চায়। রজেট চিনচুই প্রতিবাদ করতে চায়। ফ্রিজ ফ্যাল সামাজিক সম্মান হারানোর ভয় পায়। কেউ ভাবে স্ত্রী কী বলবে, কেউ ভাবে পাড়া কী বলবে, কেউ ভাবে সংবাদ ছাপা হলে কী হবে। এই মানুষগুলো রাষ্ট্রের হাতে আটক, কিন্তু তাদের আত্মা আরও আগে থেকেই সমাজের চোখে আটক ছিল। সামাজিক সম্মান, স্ত্রীর সন্দেহ, পাড়ার কথা, প্রেমিকার কাছে ব্যাখ্যা, খবরের কাগজে ছবি—এসবও তো লালঘর। গরাদ কেবল লোহায় নয়, গরাদ স্মৃতিতে, সম্পর্কে, সম্মানে এবং ভাষাতেও।

পুঁই চুলভির অন্তর্মানসিক ভাবনায় আমরা জেনে যাই, সে তিথি বরাভয়ের কথা ভাবে। ভাবে, যদি তিথির কথা শুনত, তবে আজ এ দশা হতো না। সে কল্পনায় শহর ছেড়ে মিশুকে নির্জন মাঠে চলে যায়; হলুদাভ সবুজ ঘাস, মৃদু ঠান্ডা বাতাস, তিথির পিটপিটে চোখ, ঘাস মুখে দেওয়া, ঘাস কেন সবুজ—এই শিশুসুলভ প্রশ্ন। হাজতের ভেতর এই কোমল দৃশ্য একেবারে অপ্রত্যাশিত। কিন্তু সেই কোমলতার মাঝেই আত্মরক্ষা, আত্মমুগ্ধতা, ভীরুতা, বন্ধুদের প্রতি বিরক্তি, পুরুষ-সঙ্গের প্রতি ক্লান্তি, মায়ের কাছে ফিরতে চাওয়া—সব মিশে থাকে। পুঁই চুলভির এই উচ্চারণকে বলা যায় লালঘর-এর কোমল অথচ নির্মম অধ্যায়।

পুঁই চুলভি হাস্যকর; কিন্তু সে পাথর নয়। সে কোমল, তবু নৈতিকভাবে তাকে বিশুদ্ধ বলা যায় না। সে নিজের বন্ধুদের বর্বর ভাবে, নিজেকে আলাদা ভাবে, তিথিকে বুঝিয়ে বলার গল্প বানায়। তার ভেতরে কাজ করে একদিকে প্রেমিকের নম্রতা, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত আত্মরক্ষার নাটক। লালঘর-এর মানবিকতা এটাই যে, তা মানুষকে একমাত্রিক করে না। ভীরু মানুষও কোমল হতে পারে। আত্মমুগ্ধ মানুষও প্রেম করতে পারে। বিপদে পড়া মানুষ নিজের গল্প বানিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে চায়। গরাদের ভেতরে মানুষের চরিত্র নগ্ন হয়, কিন্তু সরল হয় না।

সম্ভবত এই মানবিক জটিলতা ইচক দুয়েন্দের জীবনপাঠেও জরুরি। তাঁকে শুধু অদ্ভুত বা দুর্বোধ্য বা অবহেলিত বললে কম বলা হয়। তিনি একজন মানুষ ছিলেন—ক্ষুধা, ক্লান্তি, অভিমান, অপেক্ষা, শরীর, ঘর, সাপ, ভাষা, এবং হয়তো সামান্য সঙ্গের প্রয়োজন নিয়ে। হয়তো কোনো দুপুরে পুরোনো কাগজ সরিয়ে বসেছিলেন। হয়তো কোনো বিকেলে চা খেতে খেতে দরজার দিকে তাকিয়েছিলেন। হয়তো কেউ আসবে ভেবেছিলেন। হয়তো কেউ এলে কবিতা শুনিয়েছেন। হয়তো জানতেন, তারা বুঝবে না। তবু শুনিয়েছেন। কারণ না-বোঝাও কখনও কখনও যোগাযোগ। কেউ পাশে বসে শুনছে—এটাই অনেক।

কিন্তু আমরা কি তাঁকে যথেষ্ট শুনেছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাদের অস্বস্তিতে পড়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার আগে তার দেহকে সংকুচিত করে। জায়গা কমিয়ে দেয়। দাঁড় করিয়ে রাখে। বসার অধিকার অনিশ্চিত করে। আলো নিয়ন্ত্রণ করে। শব্দ বাড়িয়ে দেয়। অপেক্ষাকে দীর্ঘ করে।

আমরা তাঁকে মানুষ হিসেবে না দেখে ‘ইচক’ হিসেবে দেখেছি। এও একধরনের বন্দিত্ব। একজন মানুষকে কিংবদন্তি বানানো হয়তো কখনও কখনও তাকে আরেকবার একা করে দেওয়া। কারণ কিংবদন্তির ক্ষুধা নেই। কিংবদন্তির অসুখ নেই। কিংবদন্তির ঘরে সাপ ঢোকে না। কিংবদন্তি বিকেলে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে না— কেউ আসবে কি না ভেবে।

শামসুল কবীর কচি হয়তো অপেক্ষা করতেন।

ফলে তিনি যেমন একজন ভাষাশিল্পী ছিলেন, ছিলেন একজন মানুষ। এই মানুষটিকে বোঝার জন্য আবার লালঘর-এ ফিরে যেতে হয়। কারণ নভেলার ভাষা যেমন অদ্ভুত, ইচকের অভিজ্ঞতাও তেমন অদ্ভুত ছিল। কিন্তু অদ্ভুত মানে অসংলগ্ন নয়। এখানে তাঁর ভাষা ভঙ্গুর, বেসুরো, অসমতল; কিন্তু সেই ভাঙনেরও আবার নিজস্ব শৃঙ্খলা আছে। এতে উপভাষা আছে, ভাঙা ইংরেজি আছে, প্রশাসনিক পরিভাষা আছে, লোকরস আছে, শিশুভাষা আছে, প্রহসন আছে, অস্থির মনোলগ আছে, দার্শনিক উল্লম্ফন আছে। এই বহুস্বরকে বলা যায় একধরনের ভাষিক গণতন্ত্র, যদিও তা শান্ত গণতন্ত্র নয়; তা বিশৃঙ্খল, ধাক্কাধাক্কির, গরাদের ভেতরে ঠাসাঠাসি মানুষের মতো।

লালঘর-এ রাষ্ট্র এক ভাষায় কথা বলে—অর্ডার। ইচক বহু ভাষায় জবাব দেন। রাষ্ট্র বলে: আইন। ইচক বলেন: শরীর। রাষ্ট্র বলে: অপরাধ। ইচক বলেন: গুজব। রাষ্ট্র বলে: শৃঙ্খলা। ইচক বলেন: হাসি। রাষ্ট্র বলে: চুপ। ইচকের ভাষা সাপের মতো নড়ে ওঠে।

লালঘর-এ ‘অর্ডার’ একটি গভীর রাজনৈতিক শব্দ হিসেবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। আমরা দেখি, অর্ডার হলেই দাঁড়ানো, খাওয়া, ঘুমানো, ধরা, ছাড়া, বদলি, আদালত, জেল। অর্ডারই মা-বাপ। এই শব্দের মধ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত নৈতিক শূন্যতা উদোম হয়ে পড়ে। কেউ দায়ী নয়, কারণ সবাই অর্ডার পালন করছে। আবার সবাই দায়ী, কারণ সবাই অর্ডারের অংশ। উপরে উঠতে উঠতে দায় অদৃশ্য হয়, নিচে নেমে আসে তালা, লাঠি, গরাদ।

কিন্তু ইচক এখানেও সরলীকরণ করেন না। ক্ষমতার যন্ত্রের ভেতরেও মানুষ আছে। সান্ত্রি আগা আবদুর রহমান বন্দিদের প্রফেসর ভেবে মুগ্ধ হয়, চা এনে দেয়, তাঁদের জ্ঞানী মানুষ বলে দেখে। আর গোপেল পমেটম—দীর্ঘ চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতা, দুর্নীতি, টর্চারের ভয়, ঘুষ, লোকজ রসিকতা, প্রশাসনিক অমানবিকতা—সব একসঙ্গে তার ভাষায় গড়ায়। এই দুই সান্ত্রি দেখায়: রাষ্ট্রযন্ত্র পাথর নয়; তার ভেতরে মানুষ আছে। কিন্তু সেই মানুষও অর্ডারে বাঁধা। ব্যক্তিগত সহানুভূতি অর্ডারের সামনে অসহায়। মানুষ আছে, কিন্তু যন্ত্রের পোশাকে। কোমলতা আছে, কিন্তু চাবি তার হাতে নয়।

এখানেই লালঘর-এর রাজনৈতিক মানবতাবাদ। এটি শুধু পুলিশবিরোধী লেখা নয়। এটি দেখায়, ক্ষমতার যন্ত্র মানুষের ভেতর ঢুকে মানুষকে অর্ডারের অনুবাদক বানিয়ে ফেলে।

আর রাষ্ট্র যখন নিজের ভাষায় কথা বলে, তখন ক্ষুদ্র ঘটনা মুহূর্তে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এক কর্মকর্তা ফ্রিজ ফ্যালের কথাকে প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে নিয়ে যায়—‘ট্রিজন’, সার্বভৌমত্ব, ষড়যন্ত্র, পরাশক্তি, রিমান্ড—এসব শব্দ দিয়ে সাধারণ নাগরিক উদ্ধৃতিকে জাতীয় নিরাপত্তার ভাষায় অনুবাদ করা হয়।

এই অংশটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা কেবল আটক করে না, ক্ষমতা ভাষা দিয়ে অপরাধ সংঘটন করে। ক্ষমতা ঘটনাকে বড় করে তোলে, যাতে নিজের হিংসা ন্যায্য হয়। আপনি অফিসারের সামনে কথা বললেন, তখন এটি আর কথাবার্তা নয়, কর্তব্যে বাধা। আপনি ফোন করলেন—এটি আর উদ্বেগ নয়, তদবির। আপনি পরিচিতির কথা বললেন—এটি আর আত্মরক্ষা নয়, রাষ্ট্রদ্রোহী সম্ভাবনা। রাষ্ট্রের ভাষা এমনই: ছোটকে বড় করে, মানুষকে নথিবদ্ধ করে, ভুলকে অপরাধ বানায়, ভয়কে আইন করে।

লালঘর-এ সাংবাদিক হিপ হিপ হুররে এই ভাষিক সহিংসতার অন্য মুখ। সে একই সঙ্গে সত্য-উন্মোচক, ব্ল্যাকমেইলার, কেলেঙ্কারি-শিকারি, মিডিয়া-সার্কাসের কৌতুক-নির্মাতা। সে জানে না সত্য কী, কিন্তু জানে খবর কীভাবে বানাতে হয়। সে জানে ছবি, কেলেঙ্কারি, ক্রাইম, মহিলা-ছদ্মবেশ, গোপন তথ্য—এসবই বাজার। তার ভাষা নিজেই বিকৃত মিডিয়া-ভাষা; তাতে ইংরেজি, উত্তেজনা, তাড়াহুড়ো, বেচাকেনা, হুমকি, অনুরোধ—সব একসঙ্গে।

আজকের দিনে এসে আমরা এই চরিত্রকে চিনে নিতে পারি। সে শুধু এক সাংবাদিক নয়; সে প্রতিটি উত্তেজিত হেডলাইন, প্রতিটি অর্ধসত্য, প্রতিটি ভাইরাল পোস্ট, প্রতিটি ক্যামেরা-চোখ, প্রতিটি সামাজিক বিচারসভা। রাষ্ট্র মানুষকে আটক করে; মিডিয়া তাকে দৃশ্য বানায়। আর দৃশ্য হয়ে যাওয়া অনেক সময় আটক হওয়ার চেয়েও ভয়ংকর।

এসব ভয়ের ভেতরে লালঘর-এ উল্লাস ছাপ্পান্নর আগমন এক অদ্ভুত নৈতিক বিস্ফোরণ। সে ভয়ংকর। হাতকড়া, ডান্ডাবেড়ি, খালি গা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মাথার দাম, হত্যার ইতিহাস। আটকে থাকা ভদ্রলোকদের শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে যায়। সে তাদের লিঙ্গ নিয়েও ঠাট্টা করে—চুলে বেণী কোথায়, বুক চ্যাপ্টা কেন, মহিলা হাজতে কেন—এই প্রশ্নগুলোকে কেবল হাসির বলা যায় না। এখানে পুরুষত্ব, ভদ্রলোকত্ব, শিক্ষিত নাগরিকত্ব—সবকিছু এক আঘাতে উল্টে যায়। তারা নিজেদের ভদ্র পুরুষ ভাবছিল; কারাগার তাদের ‘মহিলা’ লেখা ঘরে এনে রেখেছে; ভয়ংকর অপরাধী তাদের দুধের বাচ্চা বলে দেখে।

আমরা তাঁকে মানুষ হিসেবে না দেখে ‘ইচক’ হিসেবে দেখেছি। এও একধরনের বন্দিত্ব। একজন মানুষকে কিংবদন্তি বানানো হয়তো কখনও কখনও তাকে আরেকবার একা করে দেওয়া।

এই লিঙ্গ-বিদ্রূপ গুরুত্বপূর্ণ। লালঘর রাষ্ট্রের গরাদে পুরুষ-অহংকারও আটক করে। শিক্ষিত ভদ্রলোকের পৌরুষ, যুক্তির গর্ব, সামাজিক সম্মান—সবকিছু উল্লাস ছাপ্পান্নের শরীরী উপস্থিতিতে ভেঙে পড়ে। অথচ সেই ভয়ংকর মানুষই তাঁদের টাকা ও চিঠি দিয়ে বিশ্বাস রেখে যায়। আইনের চোখে অপরাধী; কিন্তু মানুষের চোখে?

এখানে নৈতিকতা স্থান বদলায়। আইন যে মানুষকে দানব বানিয়েছে, তার ভেতরে বিশ্বাস আছে। আর সম্মানিতরা সন্দেহে কাঁপে। খাম খুলবে কি না ভাবতে থাকে। মিয়ান টিনটুই খাম খুলতে অস্বীকার করে—এই মুহূর্তে সে বড় হয়ে ওঠে। কারণ গরাদের ভেতরেও বিশ্বাসের অমর্যাদা না করার সিদ্ধান্তই মানবিকতার শেষ আশ্রয়।

তিঞ্জি খর্খরের দৃশ্য আরও গভীর। এক বালিকা, যে নিজেকে গিরিগিট্টি-টিকটিকি বলে; যার ভাষা শিশু, প্রাণী, রূপকথা, গালাগাল, পাগলামি, অপরাধ—সে আসলে সবকিছুর মিশ্রণ। আর সে যেন লালঘর-এর ভেতরে আটকে থাকা বুনো ভাষা। রাষ্ট্র তাকে আদালতে নিতে পারে, কিন্তু তার ভাষাকে শাসন করতে পারে না। তার ‘বিরগিট্টি’ বাবা, চল্লিশ পোলা-পঞ্চাশ মাইয়া, চুলে বাসা, লাফে নদী পার হওয়া—এসব একধরনের শিশু-পৌরাণিকতা, যা রাষ্ট্রের আইনি ভাষাকে হাস্যকর করে দেয়।

লালু পাঞ্জুমম তাকে দত্তক নিতে চায়। টাকা দিয়ে বাঁচাতে চায়। দৃশ্যটি হাস্যকর, প্রায় উন্মাদসুলভ, কিন্তু সেই উন্মাদনার ভেতরে হঠাৎ অদ্ভুত পিতৃত্ব জেগে ওঠে। আইন তাকে নিয়ে যায়। অর্ডার নড়ে না। লালু পাঞ্জুমম কাঁদে।

এই কান্না লালঘর-এর হৃদয়।

নভেলাটিতে ইচক দুয়েন্দে কৌতুকের আড়ালে হৃদয় লুকিয়ে রাখেন। তাঁর চরিত্ররা হাস্যকর, কিন্তু তারা পাথর নয়। তারা ভীরু, কিন্তু সম্পূর্ণ মৃত নয়। তারা আত্মমুগ্ধ, কিন্তু মমতাহীন নয়। তারা বিপদে নিজেদের বাঁচাতে চায়, কিন্তু কখনো অন্যকে বাঁচাতেও চায়। এই মানবিক দ্বৈততাই লালঘর-কে শুধু রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নয়, গভীর মানবিক উপাখ্যানে পরিণত করে।

এবং এখানেই ইচক নিজেও ফিরে আসেন। তিনি অদ্ভুত ছিলেন, হয়তো। দুর্বোধ্য ছিলেন, অনেকের কাছে। কিন্তু তিনি মানুষ ছিলেন। তাঁরও হয়তো কাউকে দরকার ছিল, যে তাঁর লেখা বুঝবে না তবু শুনবে। কেউ বলবে, ‘আপনার ভাষা কঠিন, কিন্তু আমি বসে আছি।’

আমরা সেই কথাটি বলিনি।

সময়মতো এই না-বলা কথা কেবল আমাদের সাহিত্যিক ভুল নয়, মানবিক অপরাধ।

লালঘর-এর শেষদিকে মুক্তির ঘোষণা আসে। কিন্তু সে মুক্তিকে সরল বলা যায় না। গরাদ খুললেই মুক্তি সে নয়। সাংবাদিক আছে, গোপনে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে, কাঁটাতারের বেড়া টপকানোর কথা আছে। এখানে মুক্তিও যেন পালানোর মতো। রাষ্ট্র আটক করে, তারপর মুক্তির ভঙ্গিও নির্ধারণ করে। একজন বন্দি বেরিয়ে এলেও তার মাথার ভেতর গরাদ থেকে যায়। সে সন্দেহ করে—আবার ধরবে না তো? ছবি তুলবে না তো? এই মুক্তি সত্যি তো? লালঘর আমাদের শেখায়: বন্দিত্ব শরীর থেকে শুরু হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনের মধ্যে বাসা বাঁধে।

চিকচাক রুইয়ের শেষের চিন্তায় লালঘর আরও বড় হয়ে ওঠে। কারাগার কি শুধু পুলিশ-হাজত? নাকি ফ্ল্যাটের গ্রিলও কারাগার? দেশ? পাসপোর্ট? ভিসা? কবর? পৃথিবী? মানুষ কি জন্ম থেকেই এক বিশাল লালঘরে? রাষ্ট্র কেন কারাগার রাখে? অপরাধী কি দণ্ডের বিষয়, নাকি অসুখী মানুষের চিকিৎসার বিষয়? জেলখানা কি স্কুল বা হাসপাতালে পরিণত হতে পারত না?

এই প্রশ্নগুলো লালঘর-কে স্থানীয় ঘটনা থেকে সভ্যতার শাস্তি-দর্শনের কেন্দ্রে নিয়ে যায়। লালঘর তখন আর শুধু ৯ ফুট বাই ৯ ফুট ঘর থাকে না, সমগ্র পৃথিবী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র। সমাজ। দেহ। ভাষা। স্মৃতি। মৃত্যু।

আর এই দার্শনিক বিস্তার শেষে বইটির বিস্ফোরক উচ্চারণ—লালঘরের পতন কামনা—শুধু একটি স্লোগান নয়। একে বলা যায়, কারাগার-সভ্যতার বিরুদ্ধে এক নৈতিক ঘোষণা।

‘লালঘর নিপাত যাক’—এটি শুধু একটি বাক্য নয়; এটি লালঘর-এর গভীরতম নৈতিক আকাঙ্ক্ষা। রাষ্ট্রীয় হাজত নিপাত যাক, কিন্তু শুধু সেটুকু নয়; নিপাত যাক সেই সব ঘর, যেখানে মানুষকে ভাষাহীন, সম্মানহীন, দৃশ্যহীন, শ্রুতিহীন করে রাখা হয়। নিপাত যাক রাষ্ট্রের গরাদ, সামাজিক সম্মানের গরাদ, ভাষার গরাদ, সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানের গরাদ, না-পড়ার গরাদ, কিংবদন্তি বানিয়ে একা ফেলে রাখার গরাদ।

তিনি কেবল অবহেলিত লেখক নন; তাঁকে বরং বাংলা ভাষার ভেতরে অস্বস্তির এক গোপন কেন্দ্র বলা ভালো। তিনি দেখিয়েছেন, সাহিত্য এখনও বিপজ্জনক হতে পারে। এখনও ভাষা পাঠককে পরাজিত করতে পারে। এখনও গল্প একটি ঘর বানিয়ে আমাদের সেখানে আটকে রাখতে পারে।

ঠিক এখানে এসে ইচক দুয়েন্দের জীবন আর লালঘর-এর জীবন এক হয়ে যায়। তাঁর রাজশাহীর ঘর, তাঁর একা থাকা, ঘরে সাপ আসা, তাঁর না-বোঝা ভাষা, তাঁর প্রান্তিকতা—সব যেন লালঘর-এরই বিস্তৃত সংস্করণ। তিনি যে ঘরে থাকতেন, সেটি কি কেবল একটি বাড়ি ছিল? নাকি সেটিও এক লালঘর—যেখানে তিনি আটক ছিলেন মানুষের অনুপস্থিতিতে, ভাষার বাহুল্যে, সমাজের অনাগ্রহে, নিজের শিল্পের নির্মম দাবিতে?

তবু তাঁকে কেবল করুণা দিয়ে পড়া যাবে না। কেননা তিনি করুণ নন। তাঁকে বরং দুঃসহ বলা যায়। তাঁর জীবন দুঃখময় হতে পারে, কিন্তু তাঁর শিল্প উপেক্ষণীয় নয়। তাঁর একাকিত্ব আমাদের মায়া জাগায়, কিন্তু তাঁর ভাষা আমাদের ভয় দেখায়। তিনি কেবল অবহেলিত লেখক নন; তাঁকে বরং বাংলা ভাষার ভেতরে অস্বস্তির এক গোপন কেন্দ্র বলা ভালো। তিনি দেখিয়েছেন, সাহিত্য এখনও বিপজ্জনক হতে পারে। এখনও ভাষা পাঠককে পরাজিত করতে পারে। এখনও গল্প একটি ঘর বানিয়ে আমাদের সেখানে আটকে রাখতে পারে।

ফলে তাঁকে পাঠ করতে গেলে কেবল শ্রদ্ধা যথেষ্ট নয়, দরকার ধৈর্য। দরকার না-বোঝার সামনে অপেক্ষা করা। দরকার নিজের পাঠ-অহংকার নামিয়ে রাখা। জরুরি কেবল একথা মনে রাখা যে, সব সাহিত্য আমাদের আরামের জন্য নয়। কিছু সাহিত্য আমাদের অপরাধবোধ জাগানোর জন্য। কিছু সাহিত্য আমাদের ভাষার সীমা দেখানোর জন্য। কিছু সাহিত্য আমাদের অন্ধকারে দাঁড় করানোর জন্য।

ইচক দুয়েন্দে সেই অন্ধকারের লেখক। কিন্তু এ অন্ধকার মানে আলোহীনতা নয়। অন্ধকার মানে এমন এক অঞ্চল, যেখানে আমাদের চোখ এখনও অভ্যস্ত নয়। লালঘর সেই অদেখা অঞ্চল। প্রথমে কিছুই দেখা যায় না। তারপর শব্দ শোনা যায়। তারপর দেহ। তারপর ভয়। তারপর হাসি। তারপর কান্না। তারপর আমরা বুঝি—এই ঘরে আমরা আগেই ছিলাম, শুধু জানতাম না।

আজ তাঁর মৃত্যুর পর আমরা তাঁকে ফিরিয়ে আনতে চাই। কিন্তু কীভাবে? শুধু স্মরণসভা দিয়ে? ফুল দিয়ে? পোস্ট দিয়ে? মহামতি বলে? না। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে হলে তাঁর বইগুলো পাঠের ভেতরে আনতে হবে। লালঘর, টিয়াদুর—এইসব অস্বস্তিকর বইয়ের সামনে বসতে হবে। তাঁর ভাষাকে, বিশেষ করে চরিত্রনামকে আপাত কঠিন মনে হলেও, তাঁর অস্বস্তিকে গ্রহণ করতে হবে। তাঁর লেখা নিয়ে তর্ক করতে হবে। পুনর্মুদ্রণ করতে হবে। পড়তে হবে। ভুল বুঝতে হবে। আবার পড়তে হবে।

জীবিত অবস্থায় অন্ধকার ঘরে গিয়ে তাঁর পাশে বসা কঠিন ছিল। এখন সেই ঘরে গিয়ে বসা আর সম্ভব নয়। এখন তাঁর দরজায় আর কড়া নাড়া যাবে হয়তো; কিন্তু ভেতর থেকে ছিটকিনি খুলে কেউ মুখোমুখি দাঁড়াবে না। কেউ বলবে না, ঘরে সাপ আসে। এখন তিনি কবিতা শুনিয়ে শেষে আমাদের নীরবতা দেখবেন না। এখন যা বাকি, তাঁর বইয়ের সামনে বসা। লালঘর বা টিয়াদুর বা We are not Lovers খুলে বসা। না-বোঝার সামনে বসা। এবং দেরিতে হলেও বলা—আমরা এসেছি, দেখেন ইচক। এবার আমরা আপনাকে শুনব।

আমরা শুনব ঘড়ির টিকটিক। বুকের ধুকপুক। গরাদের খটাং। পাশের ঘরের অদৃশ্য প্রহারের শব্দ। ইংরেজি বলার বিপদ। পুঁই চুলভির তিথির কাছে ফেরার আকুলতা। হিপ হিপ হুররের কেলেঙ্কারি-ক্ষুধা। ট্রিজন-ভাষার রাষ্ট্রীয় ফাঁদ। আগা আবদুর রহমানের চা। গোপেল পমেটমের লোকজ ভয়। উল্লাস ছাপ্পান্নর বিশ্বাস। তিঞ্জি খর্খরের বুনো শিশুভাষা। অর্ডারের অমানবিক ধর্মতত্ত্ব। মধ্যবিত্তের ভয়। রাষ্ট্রের ঠান্ডা হাসি। ভাষার একাকিত্ব।

রাজশাহীর সেই সাপ-আসা ঘর ফেলে ইচক দুয়েন্দে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর লালঘর রয়ে গেছে— রাষ্ট্রের ভেতরে, সমাজের ভেতরে, বাংলা ভাষার ভেতরে। আর আমাদের না-পড়া বিবেকের ভেতরে।

আমরা ভাবতাম তিনি একা। আসলে একা ছিল তাঁর ভাষা।

আমরা ভাবতাম তাঁর জীবন ছিল অদ্ভুত। আসলে অদ্ভুত ছিল আমাদের সাহিত্যসমাজ, যে এমন একজন লেখককে জীবিত অবস্থায় যথেষ্ট পড়ল না, যথেষ্ট ডাকল না, যথেষ্ট পাশে বসল না।

এখনও লালঘরের দরজা খুলেছে কি? না। দরজা এখনও বন্ধ। গরাদ এখনও আছে। তালা এখনও ঝুলছে। সান্ত্রি এখনও দাঁড়িয়ে। ঘড়ি এখনও টিকটিক করছে। বুকের ভেতর এখনও ধুকপুক। শুধু আমরা, এতদিন পরে, প্রথমবার তার ভেতর থেকে আসা শব্দ শুনতে পাচ্ছি।

সেই শব্দ ইচক দুয়েন্দের। সেই শব্দ শামসুল কবীর কচির। সেই শব্দ বাংলা ভাষার একা পড়ে থাকা ঘরের।

আর আমরা কয়েকজন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি—লজ্জিত, বিলম্বিত, অপ্রস্তুত। তবু এই প্রথম, সত্যিই শুনতে চাইছি।

কারণ লালঘর-এর ভেতর থেকে যে শব্দ আসছে, তা কেবল ইচক দুয়েন্দের নয়, তা বাংলা ভাষার সেই অংশের, যাকে আমরা এতদিন একা ফেলে রেখেছিলাম।

  • সৈকত আরেফিন: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

সম্পর্কিত