বাংলা ভাষার জন্য আবারও সেদিন রক্ত ঝরেছিল আসামের রাজপথে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ১৮: ৫০
বাংলা ভাষার জন্য আবারও সেদিন রক্ত ঝরেছিল আসামের রাজপথে। স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৮৬ সালের ২১শে জুলাই। আসামের করিমগঞ্জের বিক্ষোভ মিছিলে জড়ো হয়েছে প্রতিবাদী জনতা। সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস। দুই তরুণের রক্তে সেদিন রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। তবে মাতৃভাষা রক্ষার এই লড়াই শুধু সেদিনের নয়; এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের দীর্ঘ বঞ্চনা আর সংগ্রামের ইতিহাস। এরও আগে ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের শিলচরে ভাষার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ১১ জন বাঙালি প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁদের সেই আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৬ সালে শহীদের তালিকায় যুক্ত হয় আরও দুটি নাম।

অনেকের ধারণা, ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার নজির শুধু আমাদের দেশেই আছে। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বাংলা ভাষার ওপর বারবার আঘাত এসেছে, চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নানা শোষণমূলক আইন। দেশভাগের পর থেকেই আসামের তৎকালীন সরকার বাংলাভাষীদের ওপর একের পর এক ভাষানীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ বারবার রাস্তায় নেমেছে, লড়াই করেছে এবং শহীদ হয়েছে।

দেশভাগের পর থেকেই আসামে বাংলাভাষীদের অস্তিত্ব সংকট ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে মাত্র চার বছরে ২৫০টি বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ের ২৪৭টিই বন্ধ হয়ে যায়। সে সময়ই শুরু হয় ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন এবং অসমিয়াকে শিক্ষার মাধ্যম ও একমাত্র সরকারি ভাষা করার জোরালো প্রচেষ্টা। ১৯৫৩ সালে আসাম বিধানসভায় বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দিতে বক্তব্য দেওয়ার বিধান বাতিল করা হয়। ১৯৫৪ সালে অসমিয়াকে সরকারি ভাষা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

আসামের আন্দোলন, ১৯৬১ সালে। সংগৃহীত ছবি
আসামের আন্দোলন, ১৯৬১ সালে। সংগৃহীত ছবি

সংকট আরও তীব্র হয় ১৯৬০ সালের ৩ মার্চ। সেদিন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা বিধানসভায় ঘোষণা দেন, অসমিয়াকেই আসামের সরকারি ভাষা করা হবে। এরপর ২১ ও ২২ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেসও সেই প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর প্রতিবাদে বরাক উপত্যকাসহ রাজ্যজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। ২ ও ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় ‘নিখিল আসাম বাংলা ও অন্যান্য অনসমিয়া ভাষা সম্মেলন’। সেখানে বাঙালিদের পাশাপাশি লুসাই, খাসিয়া, গারো ও মণিপুরি প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। কিন্তু সেই সম্মেলনের পর বাঙালিদের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। তাঁদের ওপর শুরু হয় হামলা, নির্যাতন ও উচ্ছেদ অভিযান।

সেই বছরের ১০ অক্টোবর ভাষাবিষয়ক বিল বিধানসভায় উত্থাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা। পরে তা ‘আসাম অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট’ আইনে পরিণত হয়। ২৪ অক্টোবর বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হলে বরাক উপত্যকার লাখো বাঙালি নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়ার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ ও বাঙালি উচ্ছেদ অভিযান। ১৯৬০ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে প্রতিবেশি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে উদ্‌বাস্তু হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ ছাড়া আরও প্রায় ৯০ হাজার বাঙালি নিজেদের সবকিছু হারিয়ে বরাক উপত্যকায় এসে উদ্বাস্তু হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন শুরু করেন।

এরপর ১৯৮৬ সালে আসাম সরকার ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বরাক উপত্যকার বিদ্যালয়গুলোতে অসমিয়া ভাষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেয়। এই সিদ্ধান্তকে ১৯৬১ সালের ভাষা-আন্দোলনের অর্জনের পরিপন্থি মনে করে বরাক উপত্যকার মানুষ আবার রাজপথে নামে।

কিন্তু এসব দমন-পীড়ন বাংলাভাষীদের থামাতে তো পারেনি বরং আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে। ১৯৬১ সালের শুরু থেকেই বরাক উপত্যকাজুড়ে গড়ে ওঠে বাংলা ভাষা রক্ষা সমিতি। ১৪ এপ্রিল কাছাড় জেলার সর্বত্র শপথ নেওয়া হয়—‘জান দেব, জবান দেব না।’ রথীন্দ্রনাথ সেনের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’। সংগঠনটি ভাষা আইন সংশোধনের দাবিতে সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দেয়। কিন্তু সেই দাবি পূরণা না হওয়ায় ১৯ মে শিলচরসহ পুরো বরাক উপত্যকায় সর্বাত্মক হরতাল ও সত্যাগ্রহের ডাক দেওয়া হয়।

আন্দোলন পণ্ড করতে ১৮ মে গভীর রাতে পুলিশ রথীন্দ্রনাথ সেন, বিধুভূষণ চৌধুরীসহ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু এতে আন্দোলন থামেনি, বরং জনরোষ আরও বেড়ে যায়। ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, নারী ও সাধারণ মানুষ পরদিনের কর্মসূচি সফল করতে রাস্তায় নেমে আসেন।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক ১৯ মে। দিনটি ছিল শুক্রবার। সকাল থেকেই শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হতে থাকে। শিলচরের তারাপুর রেলওয়ে স্টেশনে হাজারো হাজার মানুষ জড়ো হন। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের উপস্থিতিতে স্টেশন চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তারা রেললাইনের ওপর বসে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়ে সত্যাগ্রহ পালন করছিলেন। সকালের দিকে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলেও পরিবেশ মোটামুটি শান্তই ছিল। কিন্তু বেলা আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি হঠাৎ এক নাটকীয় রূপ নেয়। সেসময় পুলিশের একটি ট্রাক স্টেশনে এসে পৌঁছায়। ওই ট্রাকে করে এর আগে গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজন সত্যাগ্রহী ও পিকেটারদের নিয়ে আসা হচ্ছিল। ট্রাক থেকে তাদের নামানোর সময় আকস্মিকভাবেই ট্রাকটিতে আগুন ধরে যায়। কীভাবে এই আগুন লেগেছিল, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। তবে এই আগুন লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের পরিবর্তিত নাম ভাষা শহিদ স্টেশন। সংগৃহীত ছবি
শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের পরিবর্তিত নাম ভাষা শহিদ স্টেশন। সংগৃহীত ছবি

ট্রাকে আগুন লাগার পরপরই সেখানে উপস্থিত পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী বা আসাম রাইফেলস বাহিনী নিরস্ত্র জনতার ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। সেই চরম বিশৃঙ্খল মুহূর্তে আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিস ডাকার জন্য এক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ইংরেজিতে 'ফায়ার, ফায়ার' বলে চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা শব্দটির ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে। তারা এটিকে সাধারণ জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ ‘ওপেন ফায়ার’ ভেবে ভুল করে বসে। কোনো আগাম সতর্কবাণী ছাড়াই তারা স্টেশনে উপস্থিত নিরস্ত্র, অহিংস জনতার ওপর বন্দুক তাক করে। মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা ১৭ রাউন্ড নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে।

আসাম রাইফেলসের সেই পৈশাচিক গুলিবর্ষণে মুহূর্তের মধ্যে শিলচর স্টেশনের মাটি রক্তে লাল হয়ে যায়। প্রাণ হারান ১১ বাঙালি। এই শহীদদের মধ্যে ছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী স্কুলছাত্রী, নাম কমলা ভট্টাচার্য। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রাণ দেওয়া এই কমলা ভট্টাচার্যকেই বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম নারী ভাষা শহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ডের খবর মুহূর্তেই পুরো বরাক উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড ক্ষোভ আর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে জনপদ। ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বরাক উপত্যকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়। এমনকি কথিত আছে, কারাগারের বন্দিরাও সেদিন শোক পালন করেন। ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে পালিত হয় সর্বাত্মক হরতাল। গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে লোকসভা, বিধানসভা, মহকুমা পরিষদ, পঞ্চায়েত ও বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অনেক জনপ্রতিনিধিও পদত্যাগ করেন। আন্দোলনের কৌশলেও আসে পরিবর্তন। সত্যাগ্রহীরা আর শুধু অফিসের সামনে অবস্থান নেননি; অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে ঢুকে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিতে না পেরে ফিরে যেতেন। টানা প্রায় এক মাস প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

আসামে ১৯ মে যেমন মাতৃভাষা অর্জনের প্রতীক, তেমনি ২১ জুলাই হয়ে ওঠে সেই অর্জিত ভাষা-অধিকার রক্ষার সংগ্রামের অনন্য স্মারক।

প্রশাসনের দমন-পীড়নেও আন্দোলন স্তব্ধ হয়নি; বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে। আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত আসাম সরকার ভাষানীতি পুনর্বিবেচনায় বাধ্য হয়। ‘আসাম অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট’ সংশোধনের মাধ্যমে বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে প্রশাসনিক ও সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ভাষার অধিকারের সংগ্রামে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক বিজয়।

তবে ১৯৬১ সালের সাফল্যের পরও ভাষার অধিকার নিয়ে সংগ্রাম শেষ হয়নি। ১৯৭২ সালে শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে আবারও প্রাণ যায় বাচ্চু চক্রবর্তী নামে এক শিক্ষার্থীর।

এরপর ১৯৮৬ সালে আসাম সরকার ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বরাক উপত্যকার বিদ্যালয়গুলোতে অসমিয়া ভাষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেয়। এই সিদ্ধান্তকে ১৯৬১ সালের ভাষা-আন্দোলনের অর্জনের পরিপন্থি মনে করে বরাক উপত্যকার মানুষ আবার রাজপথে নামে।

১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল কুমার মহন্তের করিমগঞ্জ সফরের দিন ভাষাবিরোধী সার্কুলার প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল হয়। আন্দোলনকারীরা সার্কিট হাউসের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪-তে। ১৯ মে যেমন মাতৃভাষা অর্জনের প্রতীক, তেমনি ২১ জুলাই হয়ে ওঠে সেই অর্জিত ভাষা-অধিকার রক্ষার সংগ্রামের অনন্য স্মারক।

Ad 300x250

সম্পর্কিত