ফাবিহা বিনতে হক

জেমস বন্ড চরিত্রের স্রষ্টা, প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিং ১৯৫৬ সালে ‘কীভাবে বেস্টসেলার বই লিখতে হয়’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, বেস্টসেলার বই লেখার খুব সহজ একটা রেসিপি আছে। সেটি হচ্ছে পৃষ্ঠা ওলটানোর কৌশল। অর্থাৎ গল্পটি এমনভাবে বলতে হবে, যাতে পাঠক পরের পৃষ্ঠা ওলটাতে বাধ্য হয়।
‘বেস্টসেলার’ বা সর্বাধিক বিক্রীত বই—এই তকমাটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। কিন্তু বর্তমান সময়ের বেস্টসেলার বইগুলোর তালিকার দিকে তাকালে সাহিত্যপ্রেমীদের মনে একটি প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বর্তমানে যে বইগুলো ‘বেস্টসেলার’ বইয়ের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে, তার সবই কি সেই ‘পৃষ্ঠা ওলটানোর মতো’ জাদুকরী বই? নাকি এর পেছনে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার চোখধাঁধানো ট্রেন্ড বা হুজুগ?
দেশে দেশে যখন একই চিত্র
সম্প্রতি সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের একটি জরিপে বলা হয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা সবচেয়ে বেশি বই পড়েন। তাঁরা বছরে গড়ে প্রায় ১৭টি বই পড়েন। অন্যদিকে, যদি বই পড়ার পেছনে ব্যয় করা সময়ের হিসাবেও তাঁরা এগিয়ে।
মজার ব্যাপার হলো, সেই দেশের পাঠকদের মধ্যেও সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ডে গা ভাসানোর অভ্যাস আছে। ‘গ্যাবি হানা’ নামের আমেরিকার একজন জনপ্রিয় ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ২০১৭ সালে একটি কবিতার বই প্রকাশ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর প্রচুর অনুসারী থাকায় বইটি ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার’-এর তালিকায় জায়গা করে নেয়। কিন্তু বইটি পড়ার পর সাহিত্য সমালোচক ও পাঠকেরা সমালোচনা করেছেন। বইটির অনেক কবিতা ছিল মাত্র এক বা দুই লাইনের। পাঠকরা দাবি করেন, এসব কবিতায় কোনো গভীরতা নেই, নেই কোনো সাহিত্যিক মূল্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় বইটির দুর্বল বাক্যগঠন নিয়ে অনেক ট্রোলও হয়।
এমন চিত্র কি বাংলাদেশেও দেখা যায় না? হালের জনপ্রিয় সেলিব্রিটি, ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সাররা বইয়ের মলাটে নিজেদের নাম লেখাচ্ছেন। শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা বা ফ্যান-ফলোয়ার থাকার কারণে এসব বই হু হু করে বিক্রি হচ্ছে। আমেরিকার ঐ ইনফ্লুয়েন্সারের মতো দুই লাইনের কবিতা লিখে বাংলাদেশেও ট্রোলের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের একজন ‘ইনফ্লুয়েন্সার কবি’। তবে সেই ট্রোল তাঁকে জনপ্রিয়তাও দিয়েছে।
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং থাকা বইগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের এই উন্মাদনার পেছনের মনস্তত্ত্ব আসলে কী?
ট্রেন্ডিং বইয়ের প্রতি কেন এত ঝোঁক
মনোবিজ্ঞান ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে।
যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন সবাই নির্দিষ্ট কোনো বই নিয়ে কথা বলে বা রিভিউ দেয়, তখন সাধারণ নেটিজেনদের মনে একধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। তারা ভাবতে শুরু করেন, এই ট্রেন্ডিং বইটি না পড়লে হয়তো তারা অন্যদের চেয়ে বা আধুনিক সমাজ থেকে পিছিয়ে পড়বেন। ‘পিছিয়ে পড়ার এই ভয়’ বা ফোমো থেকেই মানুষ সাহিত্যমান যাচাই না করেই বই কেনেন।
এ ছাড়া বর্তমান যুগে ইনফ্লুয়েন্সার বা সেলিব্রিটিদের সঙ্গে ভক্তদের একধরনের একপাক্ষিক আবেগীয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যাকে ‘প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ’ বলে। ভক্তরা মনে করেন তাঁরা প্রিয় তারকার খুব কাছের মানুষ। ফলে তারকা যখন কোনো মানহীন বইও প্রকাশ করেন, অন্ধ অনুসারীরা কেবল তাঁকে সমর্থন করতে এবং ভালোবাসা দেখাতে বইটি কেনেন। এখানে বইয়ের চেয়ে লেখকের বাইরের ইমেজটিই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি জনপ্রিয় টার্ম হলো ‘বুকটক’ বা ‘বুকস্টাগ্রাম’। টিকটকের ‘বুকটক’ বা ইনস্টাগ্রামের ‘বুকস্টাগ্রাম’ কমিউনিটি বই পড়ার অভ্যাসকে নান্দনিক বা ‘এস্থেটিক’ রূপ দিয়েছে। অনেকেই এখন বই কেনেন পড়ার জন্য নয়, বরং কফির মগের পাশে সুন্দর প্রচ্ছদের একটি বই রেখে দারুণ একটি ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করার জন্য। স্বাভাবিকভাবেই যে বই সামাজিক মাধ্যমে বেশি জনপ্রিয়, তা নিয়ে ছবি দিলে লাইক-কমেন্টও বেশি পাওয়া যাবে।
রকমারির বেস্টসেলিং বইয়ের তালিকা কী বলছে?
বই বিক্রির অন্যতম বৃহৎ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘রকমারি’ ২০২১ সালে বিক্রীত বইয়ের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, তালিকায় স্থান পাওয়া বেশির ভাগ বই আত্মউন্নয়নবিষয়ক বই। এসব বইয়ের লেখকদের অনেকেই আবার সামাজিক মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়। এই তালিকা প্রমাণ করে, মানুষ এখন জানতে চায় কীভাবে দ্রুত সফল হওয়া যায়, কীভাবে ধনী হওয়া যায়, কীভাবে ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলা যায়। তবে বিশ্বে অনেক বেস্টসেলার বই আছে যেগুলো আত্ম-উন্নয়নমূলক বই। এর মধ্যে আছে ‘রিচ ড্যাড পউর ড্যাড’-এর মতো বইয়ের নাম। রবার্ট কিয়োসাকির এই বইটি দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বব্যাপী বেস্টসেলার। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কিয়োসাকি কোনো পেশাদার সাহিত্যিক বা লেখক নন; তিনি মূলত একজন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী। একইভাবে জেমস ক্লিয়ারের ‘অ্যাটোমিক হ্যাবিটস’ বা ‘থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ’-এর মতো বইগুলো বেস্টসেলিং বইয়ের তালিকায় আছে। এই বইগুলোর লেখকরা কেউ পেশাদার লেখক নন। তাঁরা মূলত ট্রেইনার, মোটিভেশনাল স্পিকার বা উদ্যোক্তা।
এ ধরনের বই নিয়ে মানুষের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হলো, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে যে বইগুলো পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, তার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাহিত্যপ্রেমী ও সমালোচকেরা। বিশেষ করে মানুষ যে ‘আত্ম-উন্নয়নের পাঠ’ নেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বইগুলো কিনছেন, তা পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে পারছে কিনা।
রকমারির বেস্টসেলার তালিকায় নজর দিলে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে, তা হলো ধর্মীয় বইয়ের আধিপত্য। এর একটি বড় কারণ হলো আধুনিক জীবনের অস্থিরতা। বর্তমান সময়ে মানসিক চাপ, ক্লান্তি, হতাশা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ ধর্মের কাছে আশ্রয় খুঁজছে। এছাড়া, সামাজিক মাধ্যমে এখন অনেক জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা রয়েছেন। এসব বক্তা বা ইনফ্লুয়েন্সাররা যখন কোনো বইয়ের কথা বলেন, তখন পাঠকদের মধ্যে সেটি কেনার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। জীবনে আত্মউন্নয়নবিষয়ক বই বা ধর্মীয় বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। কিন্তু যখন সৃষ্টিশীল সাহিত্যের চেয়ে এগুলোই একমাত্র পড়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন জাতির মননশীলতা নিয়ে চিন্তার কারণ তৈরি হয়।
ভালো সাহিত্য নাকি কেবলই ট্রেন্ড?
জনপ্রিয় বই আর মানসম্মত বইয়ের মধ্যে আজীবন অলিখিত রেষারেষি বা দ্বন্দ্ব থাকে। সব জনপ্রিয় যেমন বই যেমন মানহীন নয়, তেমনি সব মানসম্মত বই-ই জনপ্রিয় হয় না। এই বিতর্ক সাহিত্যের জগতে সবসময় ছিল এবং থাকবে। কিন্তু চিন্তা তখনই হয়, যখন মানহীন বইয়ের প্রতি মানুষের সীমাহীন ঝোঁক দেখা যায়। ‘ট্রেন্ডি’ বই শুধু সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণার জোরে বেস্টসেলার হয়ে গেলে প্রকৃত লেখকরা আড়ালে পড়ে যান। ভালো সাহিত্যের কদর কমে যায়।
বই কেনা বা পড়ার স্বাধীনতা প্রতিটি পাঠকের নিজস্ব অধিকার। সামাজিক মাধ্যমের এই যুগে ট্রেন্ড বা হুজুগে না মেতে আমাদের উচিত ভালো বই খুঁজে বের করা। কারণ, একটি মানহীন বই হয়তো আপনাকে সাময়িক আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু ভালো বই আপনার চিন্তার জগতকে বদলে ফেলার সামর্থ্য রাখে।

জেমস বন্ড চরিত্রের স্রষ্টা, প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিং ১৯৫৬ সালে ‘কীভাবে বেস্টসেলার বই লিখতে হয়’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, বেস্টসেলার বই লেখার খুব সহজ একটা রেসিপি আছে। সেটি হচ্ছে পৃষ্ঠা ওলটানোর কৌশল। অর্থাৎ গল্পটি এমনভাবে বলতে হবে, যাতে পাঠক পরের পৃষ্ঠা ওলটাতে বাধ্য হয়।
‘বেস্টসেলার’ বা সর্বাধিক বিক্রীত বই—এই তকমাটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। কিন্তু বর্তমান সময়ের বেস্টসেলার বইগুলোর তালিকার দিকে তাকালে সাহিত্যপ্রেমীদের মনে একটি প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বর্তমানে যে বইগুলো ‘বেস্টসেলার’ বইয়ের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে, তার সবই কি সেই ‘পৃষ্ঠা ওলটানোর মতো’ জাদুকরী বই? নাকি এর পেছনে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার চোখধাঁধানো ট্রেন্ড বা হুজুগ?
দেশে দেশে যখন একই চিত্র
সম্প্রতি সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের একটি জরিপে বলা হয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা সবচেয়ে বেশি বই পড়েন। তাঁরা বছরে গড়ে প্রায় ১৭টি বই পড়েন। অন্যদিকে, যদি বই পড়ার পেছনে ব্যয় করা সময়ের হিসাবেও তাঁরা এগিয়ে।
মজার ব্যাপার হলো, সেই দেশের পাঠকদের মধ্যেও সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ডে গা ভাসানোর অভ্যাস আছে। ‘গ্যাবি হানা’ নামের আমেরিকার একজন জনপ্রিয় ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ২০১৭ সালে একটি কবিতার বই প্রকাশ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর প্রচুর অনুসারী থাকায় বইটি ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার’-এর তালিকায় জায়গা করে নেয়। কিন্তু বইটি পড়ার পর সাহিত্য সমালোচক ও পাঠকেরা সমালোচনা করেছেন। বইটির অনেক কবিতা ছিল মাত্র এক বা দুই লাইনের। পাঠকরা দাবি করেন, এসব কবিতায় কোনো গভীরতা নেই, নেই কোনো সাহিত্যিক মূল্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় বইটির দুর্বল বাক্যগঠন নিয়ে অনেক ট্রোলও হয়।
এমন চিত্র কি বাংলাদেশেও দেখা যায় না? হালের জনপ্রিয় সেলিব্রিটি, ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সাররা বইয়ের মলাটে নিজেদের নাম লেখাচ্ছেন। শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা বা ফ্যান-ফলোয়ার থাকার কারণে এসব বই হু হু করে বিক্রি হচ্ছে। আমেরিকার ঐ ইনফ্লুয়েন্সারের মতো দুই লাইনের কবিতা লিখে বাংলাদেশেও ট্রোলের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের একজন ‘ইনফ্লুয়েন্সার কবি’। তবে সেই ট্রোল তাঁকে জনপ্রিয়তাও দিয়েছে।
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং থাকা বইগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের এই উন্মাদনার পেছনের মনস্তত্ত্ব আসলে কী?
ট্রেন্ডিং বইয়ের প্রতি কেন এত ঝোঁক
মনোবিজ্ঞান ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে।
যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন সবাই নির্দিষ্ট কোনো বই নিয়ে কথা বলে বা রিভিউ দেয়, তখন সাধারণ নেটিজেনদের মনে একধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। তারা ভাবতে শুরু করেন, এই ট্রেন্ডিং বইটি না পড়লে হয়তো তারা অন্যদের চেয়ে বা আধুনিক সমাজ থেকে পিছিয়ে পড়বেন। ‘পিছিয়ে পড়ার এই ভয়’ বা ফোমো থেকেই মানুষ সাহিত্যমান যাচাই না করেই বই কেনেন।
এ ছাড়া বর্তমান যুগে ইনফ্লুয়েন্সার বা সেলিব্রিটিদের সঙ্গে ভক্তদের একধরনের একপাক্ষিক আবেগীয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যাকে ‘প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ’ বলে। ভক্তরা মনে করেন তাঁরা প্রিয় তারকার খুব কাছের মানুষ। ফলে তারকা যখন কোনো মানহীন বইও প্রকাশ করেন, অন্ধ অনুসারীরা কেবল তাঁকে সমর্থন করতে এবং ভালোবাসা দেখাতে বইটি কেনেন। এখানে বইয়ের চেয়ে লেখকের বাইরের ইমেজটিই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি জনপ্রিয় টার্ম হলো ‘বুকটক’ বা ‘বুকস্টাগ্রাম’। টিকটকের ‘বুকটক’ বা ইনস্টাগ্রামের ‘বুকস্টাগ্রাম’ কমিউনিটি বই পড়ার অভ্যাসকে নান্দনিক বা ‘এস্থেটিক’ রূপ দিয়েছে। অনেকেই এখন বই কেনেন পড়ার জন্য নয়, বরং কফির মগের পাশে সুন্দর প্রচ্ছদের একটি বই রেখে দারুণ একটি ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করার জন্য। স্বাভাবিকভাবেই যে বই সামাজিক মাধ্যমে বেশি জনপ্রিয়, তা নিয়ে ছবি দিলে লাইক-কমেন্টও বেশি পাওয়া যাবে।
রকমারির বেস্টসেলিং বইয়ের তালিকা কী বলছে?
বই বিক্রির অন্যতম বৃহৎ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘রকমারি’ ২০২১ সালে বিক্রীত বইয়ের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, তালিকায় স্থান পাওয়া বেশির ভাগ বই আত্মউন্নয়নবিষয়ক বই। এসব বইয়ের লেখকদের অনেকেই আবার সামাজিক মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়। এই তালিকা প্রমাণ করে, মানুষ এখন জানতে চায় কীভাবে দ্রুত সফল হওয়া যায়, কীভাবে ধনী হওয়া যায়, কীভাবে ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলা যায়। তবে বিশ্বে অনেক বেস্টসেলার বই আছে যেগুলো আত্ম-উন্নয়নমূলক বই। এর মধ্যে আছে ‘রিচ ড্যাড পউর ড্যাড’-এর মতো বইয়ের নাম। রবার্ট কিয়োসাকির এই বইটি দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বব্যাপী বেস্টসেলার। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কিয়োসাকি কোনো পেশাদার সাহিত্যিক বা লেখক নন; তিনি মূলত একজন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী। একইভাবে জেমস ক্লিয়ারের ‘অ্যাটোমিক হ্যাবিটস’ বা ‘থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ’-এর মতো বইগুলো বেস্টসেলিং বইয়ের তালিকায় আছে। এই বইগুলোর লেখকরা কেউ পেশাদার লেখক নন। তাঁরা মূলত ট্রেইনার, মোটিভেশনাল স্পিকার বা উদ্যোক্তা।
এ ধরনের বই নিয়ে মানুষের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হলো, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে যে বইগুলো পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, তার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাহিত্যপ্রেমী ও সমালোচকেরা। বিশেষ করে মানুষ যে ‘আত্ম-উন্নয়নের পাঠ’ নেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বইগুলো কিনছেন, তা পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে পারছে কিনা।
রকমারির বেস্টসেলার তালিকায় নজর দিলে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে, তা হলো ধর্মীয় বইয়ের আধিপত্য। এর একটি বড় কারণ হলো আধুনিক জীবনের অস্থিরতা। বর্তমান সময়ে মানসিক চাপ, ক্লান্তি, হতাশা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ ধর্মের কাছে আশ্রয় খুঁজছে। এছাড়া, সামাজিক মাধ্যমে এখন অনেক জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা রয়েছেন। এসব বক্তা বা ইনফ্লুয়েন্সাররা যখন কোনো বইয়ের কথা বলেন, তখন পাঠকদের মধ্যে সেটি কেনার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। জীবনে আত্মউন্নয়নবিষয়ক বই বা ধর্মীয় বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। কিন্তু যখন সৃষ্টিশীল সাহিত্যের চেয়ে এগুলোই একমাত্র পড়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন জাতির মননশীলতা নিয়ে চিন্তার কারণ তৈরি হয়।
ভালো সাহিত্য নাকি কেবলই ট্রেন্ড?
জনপ্রিয় বই আর মানসম্মত বইয়ের মধ্যে আজীবন অলিখিত রেষারেষি বা দ্বন্দ্ব থাকে। সব জনপ্রিয় যেমন বই যেমন মানহীন নয়, তেমনি সব মানসম্মত বই-ই জনপ্রিয় হয় না। এই বিতর্ক সাহিত্যের জগতে সবসময় ছিল এবং থাকবে। কিন্তু চিন্তা তখনই হয়, যখন মানহীন বইয়ের প্রতি মানুষের সীমাহীন ঝোঁক দেখা যায়। ‘ট্রেন্ডি’ বই শুধু সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণার জোরে বেস্টসেলার হয়ে গেলে প্রকৃত লেখকরা আড়ালে পড়ে যান। ভালো সাহিত্যের কদর কমে যায়।
বই কেনা বা পড়ার স্বাধীনতা প্রতিটি পাঠকের নিজস্ব অধিকার। সামাজিক মাধ্যমের এই যুগে ট্রেন্ড বা হুজুগে না মেতে আমাদের উচিত ভালো বই খুঁজে বের করা। কারণ, একটি মানহীন বই হয়তো আপনাকে সাময়িক আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু ভালো বই আপনার চিন্তার জগতকে বদলে ফেলার সামর্থ্য রাখে।

ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর দশম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
৪ ঘণ্টা আগে
পৃথিবীর ১০ শতাংশের কম এলাকা জুড়ে থাকলেও ৪০ শতাংশ প্রাণের আশ্রয়স্থল এই জলাভূমি আজ বিপন্ন। ৩০০ বছরে হারিয়েছে প্রায় ৮৭ শতাংশ জলাশয়। দূষণের পাশাপাশি ‘অ্যালজি ব্লুম’ বা ক্ষতিকর শৈবাল এখন নতুন আতঙ্ক। চীন থেকে আমেরিকা—রঙিন এই ‘ভূতের’ বিষে জলজ জীবন ও বাস্তুসংস্থান আজ ধ্বংসের মুখে।
১ দিন আগে
ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে মানুষের যোগাযোগ, চিন্তা ও প্রতিবাদের ধরনকে আমূল বদলে দিয়েছে। একসময় পরিবেশ আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল মিছিল, সেমিনার কিংবা সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সেই আন্দোলন পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে, মুহূর্তের মধ্যেই।
১ দিন আগে
১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল। কাদম্বরী দেবী আফিম গ্রহণ করেন। শরীর ধীরে ধীরে বিষে নীল হয়ে যায়। ২১ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়।
২ দিন আগে