তানভীর অপুর লেখা
২০০৫ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু হয়েছিল এক অদম্য স্বপ্নযাত্রা। দীর্ঘ ২০ বছরের নিরন্তর পথচলা শেষে চীনের শহর গুইলিংয়ে পা রাখার মাধ্যমে ১ হাজার শহর ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করলেন ভ্রমণপিপাসু তানভীর অপু।
তানভীর অপু

২০০৫ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রথম বিদেশ ভ্রমণের মাধ্যমে যে স্বপ্নযাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ সেই পথচলা এক অনন্য মাইলফলকে পৌঁছেছে। দুই দশকের দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণের পর চীনের মনোমুগ্ধকর শহর গুইলিংয়ে পা রেখে আমি স্পর্শ করেছি আমার ভ্রমণজীবনের হাজারতম শহর।
দিল্লির সেই প্রথম পদক্ষেপ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সাতটি মহাদেশ, পাঁচটি মহাসাগর, অসংখ্য দ্বীপ, পর্বত, মরুভূমি, অরণ্য এবং শত শত ঐতিহাসিক ও আধুনিক নগরী অতিক্রম করে এই অর্জন হাজারো স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও আবেগের এক মহামূল্যবান অধ্যায়। এই বিশ বছরের যাত্রায় আমি দেখেছি মানবসভ্যতার বৈচিত্র্যময় রূপ, প্রাচীন ইতিহাসের গৌরব, আধুনিক বিশ্বের বিস্ময়কর অগ্রগতি এবং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য।

পৃথিবীর নানা দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, জীবনধারা এবং মানুষের গল্প আমাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করেছে। কখনো আর্কটিকের নীরব তুষারভূমিতে, কখনো আফ্রিকার বন্য প্রকৃতির মাঝে, কখনো ইউরোপের শতাব্দীপ্রাচীন নগরীতে, আবার কখনো দক্ষিণ আমেরিকার দূর প্রান্তে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছি পৃথিবীর অসীম বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য।
আজ গুইলিংয়ের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এই হাজারতম শহরে পৌঁছানোর পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত পথচলা, অসংখ্য সীমান্ত অতিক্রম, হাজারো মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং পৃথিবীকে জানার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এটি স্বপ্ন, সাহস, অধ্যবসায় এবং অজানাকে জানার নিরন্তর প্রচেষ্টার এক জীবন্ত দলিল। দিল্লি থেকে গুইলিংয়ের এই দীর্ঘ যাত্রা আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা, অর্জন এবং স্মৃতির অবিস্মরণীয় মহাকাব্য।

এই দীর্ঘ যাত্রায় আমি পৃথিবীর প্রায় এক হাজারেরও বেশি বিখ্যাত শহর ভ্রমণ করেছি। পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ বিখ্যাত ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও পর্যটননগরী দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। প্রতিটি শহরের নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি এবং নিজস্ব গল্প রয়েছে। সেই গল্পগুলোই আজ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

হেলসিংকি, লন্ডন, ডাবলিন, বার্লিন, হেমারফেস্ট, টমসো উসুঅইয়া, জুরিখ, জেনেভা, ফ্রাঙ্কফুট, নয়াদিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, পাঞ্জাব, জয়পুর, রাজস্থান, কেরালা, বেঙ্গালুরু, কাঠমান্ডু, পোখারা, মাস্কাট, রিয়াদ, জেদ্দা, ক্যানভ্যারা, সিডনি, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা, নাইরোবি, কাম্পালা, জিনজা, জেরুজালেম, তেল আবিব, তুর্কু, স্টকহোম, গথেনবার্গ, ওসলো, বার্গেন, ব্যাংকক, সিএমরিপ, পাতাইয়া, কুনমিং, রেইগেভিক, কোলোনিয়া, বেলিজ সিটি, মেরিডা, ফ্লোরেন্স, মিলান, ওয়ারশো, লুবলিন, কোপান, লিজিয়ান, ডালি, রোভানিয়েমি, তাল্লিন, তারতু, রিগা, ভিলনিয়াস, কাউনাস, ওয়ারশ, ক্রাকোভ, বুদাপেস্ট, প্রাগ, ব্রনো, ব্রাতিস্লাভা, এথেন্স, থবুখারেস্ট, ক্লুজ-নাপোকা, সোফিয়া, কিয়েভ, লাভিভ, বেলগ্রেড, সারায়েভো, প্রিস্টিনা, স্কোপিয়ে, ওহরিদ, জাগরেব, স্প্লিট,বুদভা, তিরানা,বার্ন, জুরিখ, ভিয়েনা, সালজবুর্গ, লন্ডন, লিভারপুল, সেন্ট পিটার্সবার্গ, ভাদুজ, ব্রাসেলস, অ্যান্টওয়ার্প, আমস্টারডাম, রটারডাম, লুক্সেমবার্গ সিটি, এ বার্লিন, মিউনিখ, প্যারিস, বুয়েনস আইরেস, কুইটো, গুয়ায়াকিল, লিমা, কুসকো, সান্ত, মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা, হাভানা, সান্তিয়াগো দে কিউবা, পানামা সিটি, কোলন, সান হোসে, এল চালতেন, এল কেলাফতে, তেগুসিগালপা, সানপেদ্রো মানাগুয়া, সান সালভাদর, সান্তা আনা, বেলমোপান, বেলিজ সিটি, গুয়াতেমালা সিটি, আন্তিগুয়া গুয়াতেমালা, বেইজিং, সাংহাই, ওয়াশিংটন ডিসি এবং নিউ ইয়র্ক সিটি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, প্রকৃতি ও আধুনিকতার অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বিস্ময়কর নগরসম্ভার। এসব শহর মানবসভ্যতার বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য ও অগ্রগতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের বাকিংহাম প্যালেসের সামনে দাঁড়িয়ে রাজকীয় ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়েছি, বিগ বেনের ঘণ্টাধ্বনি শুনেছি, লন্ডন আই থেকে শহরের বিস্তীর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অমূল্য সংগ্রহ আমাকে মানবসভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাসের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিশাল ডাইনোসরের কঙ্কাল আর টেট মডার্নের শিল্পকর্ম আমাকে মুগ্ধ করেছে বারবার।

ম্যানচেস্টারে গিয়ে শিল্পবিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ওল্ড ট্রাফোর্ডে দাঁড়িয়ে ফুটবল ইতিহাসের আবেগ অনুভব করেছি। সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি মিউজিয়ামে মানব উদ্ভাবনের অসাধারণ অগ্রযাত্রা দেখেছি। ম্যানচেস্টার মিউজিয়ামের হাজারো নিদর্শন এবং ন্যাশনাল ফুটবল মিউজিয়ামের সংগ্রহ আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে মানুষের সৃজনশীলতার শক্তি।

লিভারপুলে গিয়ে খুঁজেছি দ্য বিটলসের স্মৃতি। রয়্যাল অ্যালবার্ট ডকের সমুদ্রঘেঁষা পরিবেশ, মিউজিয়াম অব লিভারপুলের ইতিহাস এবং মার্সিসাইড মেরিটাইম মিউজিয়ামের সংগ্রহ আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্যের অতীতে। সেখানে দাঁড়িয়ে বুঝেছি কীভাবে একটি শহর বিশ্বসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক শহর বাথে রোমান সভ্যতার স্পর্শ পেয়েছি। দুই হাজার বছরের পুরোনো রোমান বাথস ঘুরে মনে হয়েছে যেন ইতিহাসের পাতায় হেঁটে বেড়াচ্ছি। রয়্যাল ক্রিসেন্টের অনন্য স্থাপত্য এবং জেন অস্টেন সেন্টারের সাহিত্যিক আবহ আমাকে অন্য এক যুগে নিয়ে গিয়েছিল।

এরপরে আমেরিকার ৩৩টি অঙ্গরাজ্যে আমার অবিস্মরণীয় ভ্রমণ। প্রকৃতি, ইতিহাস ও স্বপ্নের পথে এক দীর্ঘ যাত্রা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩টি অঙ্গরাজ্য ঘুরে দেখার সুযোগ আমার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। বিশাল এই দেশটি শুধু অর্থনীতি ও প্রযুক্তির জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এর প্রতিটি অঙ্গরাজ্য নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্যের জন্য অনন্য। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর, মরুভূমি থেকে তুষারাবৃত পর্বত, আধুনিক মহানগর থেকে শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা সবকিছু মিলিয়ে আমার এই যাত্রা ছিল রোমাঞ্চ, শিক্ষা ও বিস্ময়ে ভরা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

আমার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ক্যালিফোর্নিয়া। রাজধানী স্যাক্রামেন্টো হলেও বিশ্বের কাছে ক্যালিফোর্নিয়া পরিচিত তার বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের জন্য। সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত গোল্ডেন গেট ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাস অনুভব করা ছিল এক অসাধারণ অনুভূতি। ইয়োসেমিটি ন্যাশনাল পার্কের বিশাল গ্রানাইট পাহাড়, জলপ্রপাত ও সবুজ উপত্যকা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গের মতো। ফ্লোরিডা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। টালাহাসি রাজধানী হলেও অরল্যান্ডোর ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দময় স্থানগুলোর একটি। এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্কের জলাভূমি, কুমির ও বন্যপ্রাণী আমাকে প্রকৃতির এক নতুন রূপ দেখিয়েছে। কী ওয়েস্টের সমুদ্রতীর, সূর্যাস্ত এবং দ্বীপজীবন ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছিল।
নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে পৌঁছে মনে হয়েছিল পৃথিবীর প্রাণকেন্দ্রে চলে এসেছি। স্ট্যাচু অব লিবার্টি স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। টাইমস স্কয়ারের আলোকিত রাত, আকাশছোঁয়া ভবন এবং মানুষের ব্যস্ততা আমাকে মুগ্ধ করেছে। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের গর্জন ও সৌন্দর্য এতটাই মনোমুগ্ধকর ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নেভাডার রাজধানী কারসন সিটি হলেও লাস ভেগাসের নামই সবার আগে মনে আসে। লাস ভেগাস স্ট্রিপের ঝলমলে আলো, বিলাসবহুল হোটেল এবং রাতের প্রাণবন্ত পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।

হুভার ড্যামের প্রকৌশল বিস্ময় এবং লেক তাহোর স্বচ্ছ নীল জল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের সাক্ষী। অ্যারিজোনায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের বিশালতা আমাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। মনুমেন্ট ভ্যালির লাল পাথুরে প্রান্তর এবং অ্যান্টেলোপ ক্যানিয়নের আলোর খেলা ছিল অসাধারণ। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে সিয়াটলের স্পেস নিডল থেকে পুরো শহরের দৃশ্য দেখা ছিল চমৎকার অভিজ্ঞতা।
মাউন্ট রেইনিয়ারের বরফঢাকা শিখর এবং অলিম্পিক ন্যাশনাল পার্কের বন, হ্রদ ও উপকূল আমাকে প্রকৃতির গভীরে নিয়ে গিয়েছিল। কলোরাডোর ডেনভার থেকে শুরু করে রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্ক পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত ছিল দৃষ্টিনন্দন। গার্ডেন অব দ্য গডসের লাল পাথরের গঠন এবং পাইকস পিকের উচ্চতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। পেনসিলভেনিয়ায় আমেরিকার স্বাধীনতার ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। ফিলাডেলফিয়ার লিবার্টি বেল ও ইন্ডিপেনডেন্স হল সেই ঐতিহাসিক স্থান যেখানে আধুনিক আমেরিকার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। হার্শিপার্কে কাটানো সময়ও ছিল আনন্দময়।

ভার্জিনিয়ার শেনানডোয়া ন্যাশনাল পার্কের পাহাড়ি পথ এবং শরতের রঙিন বনভূমি আমাকে মুগ্ধ করেছে। ইতিহাস, প্রকৃতি এবং সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায় এই অঙ্গরাজ্যে। মিশিগানের ম্যাকিনাক দ্বীপে গাড়িবিহীন শান্ত পরিবেশ এক অন্যরকম অনুভূতি দিয়েছিল। স্লিপিং বেয়ার ডিউনসের বিশাল বালিয়াড়ি এবং হেনরি ফোর্ড মিউজিয়ামে শিল্পবিপ্লবের ইতিহাস আমাকে সমৃদ্ধ করেছে।
ওহাইওর কলম্বাস থেকে ক্লিভল্যান্ড পর্যন্ত ভ্রমণে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে সংগীতের ইতিহাস দেখেছি। সিডার পয়েন্টের রোলার কোস্টার এবং হকিং হিলস স্টেট পার্কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল দারুণ। ইউটাহ ছিল প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গ। জায়ন ন্যাশনাল পার্কের বিশাল গিরিখাত, ব্রাইস ক্যানিয়নের অদ্ভুত পাথুরে স্তম্ভ এবং আর্চেস ন্যাশনাল পার্কের প্রাকৃতিক পাথরের খিলানগুলো যেন অন্য এক পৃথিবীর দৃশ্য।

ওরেগনের ক্রেটার লেক ন্যাশনাল পার্কের গভীর নীল জল পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর হ্রদগুলোর একটি। মাল্টনোমাহ ফলসের জলপ্রপাত এবং ক্যানন বিচের উপকূলীয় সৌন্দর্য আমাকে দীর্ঘক্ষণ মুগ্ধ করে রেখেছিল। নিউ জার্সিতে আটলান্টিক সিটির সমুদ্রতীর, লিবার্টি স্টেট পার্ক এবং ঐতিহাসিক কেপ মে শহর ভ্রমণ ছিল আনন্দদায়ক। সমুদ্র, ইতিহাস এবং আধুনিকতার এক সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায় এখানে।
মিনেসোটার সেন্ট পল শহরে অবস্থিত মল অব আমেরিকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শপিং কমপ্লেক্স। ভয়েজার্স ন্যাশনাল পার্কের হ্রদসমূহ এবং মিনেহাহা ফলস প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে। কেন্টাকির ম্যামথ কেভ ন্যাশনাল পার্ক বিশ্বের দীর্ঘতম গুহা ব্যবস্থা হিসেবে বিস্মিত করেছে। চার্চিল ডাউনসে ঘোড়দৌড়ের ঐতিহ্য এবং কেন্টাকি হর্স পার্কে ঘোড়ার জগতের ইতিহাস দেখার সুযোগ পেয়েছি।

উইসকনসিনের উইসকনসিন ডেলস তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিনোদন কেন্দ্রের জন্য বিখ্যাত। ডোর কাউন্টির উপকূলীয় দৃশ্য এবং হার্লে ডেভিডসন মিউজিয়াম আমাকে আমেরিকান সংস্কৃতির আরেকটি দিক দেখিয়েছে। মন্টানার গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক ছিল আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর পার্বত্য অঞ্চলগুলোর একটি। বরফে ঢাকা পর্বত, নীল হ্রদ এবং বন্যপ্রাণীতে ভরা এই অঞ্চল প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। লিটল বিগহর্ন ব্যাটলফিল্ড ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে, আর ফ্ল্যাটহেড লেকের সৌন্দর্য মনকে শান্ত করে।
ওয়াইয়োমিংয়ে বিশ্বের প্রথম জাতীয় উদ্যান Yellowstone National Park এবং Grand Teton National Park ভ্রমণ ছিল জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। গিজার, উষ্ণ প্রস্রবণ, বন্যপ্রাণী এবং পর্বতমালার সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এ ছাড়াও নিউ হ্যাম্পশায়ার, নিউ মেক্সিকো, নর্থ ক্যারোলাইনা, নর্থ ডাকোটা, সাউথ ক্যারোলাইনা, সাউথ ডাকোটা, টেনেসি, আইওয়া, কানসাস, নেব্রাস্কা, আইডাহো এবং আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ঘুরে আমি যুক্তরাষ্ট্রের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, মানুষ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি।

এই ৩৩টি অঙ্গরাজ্য ভ্রমণের মাধ্যমে আমি উপলব্ধি করেছি যে যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি দেশ নয়, এটি অসংখ্য সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, প্রাকৃতিক বিস্ময় এবং স্বপ্নের সমন্বয়ে গঠিত এক বিশাল জগৎ। প্রতিটি শহর, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি জাতীয় উদ্যান এবং প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় আমি দেখেছি মানুষের সৃজনশীলতা, প্রকৃতির মহিমা এবং ইতিহাসের গভীরতা। আজও সেই স্মৃতিগুলো আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। পৃথিবীর পথে আমার দীর্ঘ ভ্রমণ জীবনের অন্যতম গর্বের স্মৃতি হয়ে থাকবে এই অসাধারণ আমেরিকা অভিযান।
জার্মানির বার্লিনে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট এবং বার্লিন ওয়াল স্মৃতিসৌধ আমাকে বিভক্ত ইউরোপের ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়েছে। মিউনিখের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ এবং হামবুর্গের বন্দরনগরীর প্রাণচাঞ্চল্য জার্মান সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখিয়েছে।

ফ্রান্সের প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অন্যতম রোমান্টিক শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। ল্যুভর জাদুঘরে মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম দেখেছি। মার্সেইয়ের সমুদ্রতীর, লিওঁর ঐতিহাসিক অঞ্চল এবং ফরাসি খাবারের অসাধারণ স্বাদ আমাকে মুগ্ধ করেছে।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে খালপথে ভেসে বেড়িয়েছি, ভ্যান গগ মিউজিয়ামে শিল্পের গভীরতা অনুভব করেছি এবং আনা ফ্রাঙ্ক হাউসে ইতিহাসের বেদনাময় অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়েছি। রটারডামের আধুনিক স্থাপত্য এবং দ্য হেগের আন্তর্জাতিক পরিবেশ নেদারল্যান্ডসকে আমার কাছে বিশেষ করে তুলেছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গের হার্মিতাস মিউজিয়ামের অগণিত শিল্পকর্ম এবং পিটারহফ প্রাসাদের সৌন্দর্য আমাকে অভিভূত করেছে। কাজানের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রাশিয়ার বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরেছে।

ইন্ডিয়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস অনুভব করেছি, লালকেল্লার প্রাচীর ছুঁয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের গৌরবময় অতীতের গল্প কল্পনা করেছি এবং কুতুব মিনারের দিকে তাকিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা স্থাপত্যশিল্পের প্রতি মুগ্ধ হয়েছি।
কাঠমান্ডুতে পৌঁছে মনে হয়েছিল যেন পাহাড়, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং ইতিহাস একসঙ্গে মিশে গেছে। পশুপতিনাথের আধ্যাত্মিক পরিবেশ, স্বয়ম্ভুনাথের উঁচু পাহাড়চূড়া এবং প্রাচীন দরবার স্কয়ারের অলিগলি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পোখরার ফেওয়া লেকের শান্ত জলে অন্নপূর্ণার প্রতিচ্ছবি দেখা ছিল এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। লুম্বিনীর নীরবতা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

মাস্কাটে পৌঁছে আরব সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলাম। সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদের শৈল্পিক নকশা, আল জালালি দুর্গের ঐতিহাসিক আবহ এবং মুত্রাহ স্যুকের প্রাণবন্ত পরিবেশ ভ্রমণকে সমৃদ্ধ করেছিল। সালালাহর সবুজ পাহাড় ও ঝরনা দেখে বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে আমি আরব উপদ্বীপে আছি। নিজওয়ার ঐতিহাসিক দুর্গ ও পুরোনো বাজারে ঘুরে প্রাচীন আরব সভ্যতার ছোঁয়া অনুভব করেছি।
রিয়াদ, জেদ্দা এবং মক্কা ছিল আমার ভ্রমণ জীবনের আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি। রিয়াদের আধুনিকতা, জেদ্দার সমুদ্রতীর এবং মক্কার পবিত্র পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। কাবা শরিফের সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেই মুহূর্তগুলো আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে।

ক্যানবেরা, সিডনি এবং মেলবোর্নে কাটানো দিনগুলো ছিল আধুনিক নগর সভ্যতার সঙ্গে পরিচয়ের অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সিডনি অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজ এবং বন্ডি বিচ যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো স্বপ্নের অংশ। মেলবোর্নের শিল্পসংস্কৃতি এবং গ্রেট ওশেন রোডের উপকূলীয় সৌন্দর্য আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
কায়রোতে এসে মানব সভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। গিজার পিরামিড, স্ফিংস এবং প্রাচীন নিদর্শনগুলো দেখে বিস্মিত হয়েছি। আলেকজান্দ্রিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় আবহ এবং লুক্সরের মন্দিরগুলো আমাকে প্রাচীন বিশ্বের গল্প শুনিয়েছে।
রাবাত, ক্যাসাব্লাঙ্কা এবং মারাকেশে ঘুরে উত্তর আফ্রিকার রঙিন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সরু গলি, ঐতিহ্যবাহী বাজার, প্রাসাদ এবং মসজিদগুলো যেন আরব্য রজনীর কোনো গল্পকে জীবন্ত করে তুলেছিল।

নাইরোবি, লেক তুরকানা, আফ্রিকার প্রকৃত রূপ দেখেছি। বন্যপ্রাণী, সাভানা এবং স্থানীয় মানুষের প্রাণবন্ত জীবন আমাকে মুগ্ধ করেছে। আরুশা আর মশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল অসাধারণ।আরুশার কাছাকাছি তানজানিয়ার বিখ্যাত Serengeti National Park এবং Ngorongoro Conservation Area ভ্রমণ ছিল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সেরেঙ্গেটির বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে অসংখ্য বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ দেখে প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছি। সিংহ, জিরাফ, জেব্রা ও হাতির দলকে তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে দেখতে পাওয়া ছিল এক অনন্য অনুভূতি। অন্যদিকে, নগোরোঙ্গোরো ক্রেটারের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত বিস্ময়।
পাহাড়, সবুজ উপত্যকা এবং বন্যপ্রাণীর অপূর্ব সমন্বয় এই স্থানকে করেছে অনন্য। সূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় আফ্রিকার প্রকৃতি যেন নতুন রূপে ধরা দিয়েছিল। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রোমাঞ্চ, বিস্ময় ও আনন্দে ভরপুর। এই ভ্রমণ আমাকে প্রকৃতির আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। তানজানিয়ার এই দুই বিখ্যাত পার্কের স্মৃতি আমার হৃদয়ে আজীবন অমলিন হয়ে থাকবে। এবং পাহাড়ি অঞ্চল সাফারি সারেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক, এন গড়ো গড়ো ন্যাশনাল পার্ক আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

কাম্পালা, জিঞ্জা এবং মবালের পথে ভ্রমণ করতে গিয়ে নীল নদের উৎস দেখার সুযোগ হয়েছিল। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এবং স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছিল।
জেরুজালেম এমন একটি শহর, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম এবং সংস্কৃতি একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। প্রাচীন দেয়াল, পবিত্র স্থান এবং হাজার বছরের ইতিহাস আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। এরপর হেলসিঙ্কি, স্টকহোম এবং অসলোতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার শান্ত, পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক জীবনধারা কাছ থেকে দেখেছি। ফিয়র্ড, দ্বীপপুঞ্জ এবং উত্তর ইউরোপের নির্মল প্রকৃতি আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে।
তাল্লিন, রিগা এবং ভিলনিয়াসে মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। পাথরের রাস্তা, পুরনো গির্জা এবং ঐতিহাসিক চত্বরগুলো যেন সময়কে কয়েক শতাব্দী পেছনে নিয়ে গিয়েছিল। ওয়ারশ, ক্রাকো এবং গদানস্কে ইউরোপের ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছি।
হ্যামারফেস্ট, নরওয়ে পৃথিবীর উত্তরের শেষ শহরের পথে আর্কটিক অঞ্চলের অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা হ্যামারফেস্ট ভ্রমণ ছিল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর উত্তরের অন্যতম শেষ শহর হিসেবে এর পরিচিতি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ। চারদিকে তুষারাবৃত পাহাড়, নীল সমুদ্র আর দীর্ঘ শীতের নীরবতা শহরটিকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। মধ্যরাতের সূর্য ও অরোরার মোহনীয় আলো আমার যাত্রাকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছিল। প্রকৃতির বিশালতা ও নিস্তব্ধতার মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেকে যেন পৃথিবীর একেবারে প্রান্তসীমায় আবিষ্কার করেছিলাম। হ্যামারফেস্ট তাই আমার বিশ্বভ্রমণের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বুদাপেস্টের দ্যানিউব নদী, প্রাগের ঐতিহাসিক সেতু এবং ব্রাতিস্লাভার দুর্গ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। এথেন্সে এসে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার নিদর্শনগুলো দেখে বিস্মিত হয়েছি। পার্থেনন এবং অ্যাক্রোপলিসের সামনে দাঁড়িয়ে মানব সভ্যতার এক গৌরবময় অধ্যায়কে অনুভব করেছি।
বুখারেস্ট, সোফিয়া, কিয়েভ এবং কিশিনাউতে পূর্ব ইউরোপের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আধুনিকতার সমন্বয় দেখেছি। বেলগ্রেড, সারায়েভো, প্রিস্টিনা এবং স্কোপিয়েতে বলকান অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য আমাকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে।
জাগরেব, কোটর, বুদভা এবং তিরানায় পাহাড়, সমুদ্র এবং ইতিহাসের অনন্য মেলবন্ধন দেখেছি। প্রতিটি শহর ছিল আলাদা, প্রতিটি অভিজ্ঞতা ছিল নতুন। বার্ন, জুরিখ এবং জেনেভায় এসে সুইস আল্পসের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। তুষারাবৃত পর্বত, নীল হ্রদ এবং নিখুঁত নগরজীবন আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
ভিয়েনার রাজকীয় স্থাপত্য, সালজবুর্গের সংগীত ঐতিহ্য এবং ইনসব্রুকের পাহাড়ি সৌন্দর্য ছিল অসাধারণ। ভাদুজের শান্ত পরিবেশ এবং আল্পসের দৃশ্য যেন রূপকথার কোনো রাজ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।
ব্রান, রোমানিয়া ড্রাকুলার কিংবদন্তির দুর্গে রোমানিয়ার মনোরম ট্রান্সিলভানিয়া অঞ্চলে অবস্থিত ব্রান শহরে পৌঁছে যেন রূপকথা ও রহস্যের জগতে প্রবেশ করেছিলাম। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত ব্রান ক্যাসেল, যা ড্রাকুলা ক্যাসেল নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে। মধ্যযুগীয় স্থাপত্য, রহস্যময় করিডোর এবং দুর্গের ঐতিহাসিক পরিবেশ এক ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয়। দুর্গের প্রতিটি দেয়াল যেন শতাব্দী পুরোনো গল্প ও কিংবদন্তির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের সবুজ পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই ভ্রমণকে আরও মনোমুগ্ধকর করেছে। ব্রান শহর ও ড্রাকুলা ক্যাসেল দর্শন আমার বিশ্বভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
ব্রাসেলস, আমস্টারডাম এবং লুক্সেমবার্গ সিটিতে ইউরোপের আধুনিক ও ঐতিহাসিক রূপ একসঙ্গে দেখেছি। খালপথ, পুরনো ভবন এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ এই শহরগুলোকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
বুয়েনস আইরেসে এসে ফুটবল, ট্যাঙ্গো এবং প্রাণবন্ত সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। কর্ডোবা ও রোজারিওর ঐতিহাসিক পরিবেশ এবং নদীতীরের সৌন্দর্য মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। কিতো, গুয়াকিল এবং কুয়েনকার পাহাড়ি শহরগুলো আমাকে লাতিন আমেরিকার বৈচিত্র্য দেখিয়েছে। এবং পৃথিবীর দক্ষিণের শেষ শহরে দক্ষিণ আমেরিকার প্রান্তে অবস্থিত আর্জেন্টিনার উশুইয়া, যা পৃথিবীর দক্ষিণতম শহর হিসেবে পরিচিত, আমার ভ্রমণ জীবনের এক অনন্য গন্তব্য। আন্দিজ পর্বতমালা ও বিগল চ্যানেলের মাঝখানে অবস্থিত এই শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এখান থেকে অ্যান্টার্কটিকার অভিযাত্রার সূচনা হওয়ায় শহরটিতে এক বিশেষ অভিযাত্রিক আবহ অনুভব করা যায়। তুষারঢাকা পর্বত, স্বচ্ছ জলরাশি এবং শীতল বাতাস আমাকে মুগ্ধ করেছে প্রতিটি মুহূর্তে। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। উশুইয়া আমার বিশ্বভ্রমণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গন্তব্যগুলোর একটি।

সান্তা ক্রুজ, গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ প্রকৃতির জীবন্ত গবেষণাগারে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত সান্তা ক্রুজ দ্বীপে পৌঁছে মনে হয়েছিল যেন প্রকৃতির এক বিস্ময়কর জগতে প্রবেশ করেছি। শতবর্ষী বিশালাকার কচ্ছপদের ধীর পদচারণা এবং ডারউইনের বিখ্যাত ফিঞ্চ পাখিদের কাছ থেকে দেখা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। জীববৈচিত্র্যের এই স্বর্গভূমি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে পরিচিত। দ্বীপের প্রতিটি কোণ প্রকৃতির বিবর্তনের একেকটি জীবন্ত গল্প বলে। স্বচ্ছ সমুদ্র, আগ্নেয়গিরির ভূমি এবং বিরল প্রাণীদের উপস্থিতি ভ্রমণকে করে তুলেছিল আরও আকর্ষণীয়। সান্তা ক্রুজে কাটানো সময় আমার বিশ্বভ্রমণের অন্যতম মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে।
লিমা, কুজকো এবং আরেকিপায় ইনকা সভ্যতার স্মৃতি খুঁজে পেয়েছি। কুজকোর পাথরের রাস্তা ধরে হাঁটার সময় মনে হয়েছিল ইতিহাস যেন এখনও জীবন্ত। সান্তিয়াগো, ভালপারাইসো এবং কন্সেপসিওনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রশান্ত মহাসাগরের দৃশ্য ছিল অনন্য।

সমুদ্রতীরবর্তী শান্ত পরিবেশ উপভোগ করেছি মেক্সিকো তে ঐতিহাসিক কেন্দ্র, কানকুনের নীল সমুদ্র এবং গুয়াদালাহারার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
চে গুয়েভারার স্মৃতির শহরে কিউবার ঐতিহাসিক শহর সান্তা ক্লারা ভ্রমণ ছিল ইতিহাস ও বিপ্লবের স্পর্শ অনুভব করার সুযোগ। এই শহরটি বিশ্বখ্যাত বিপ্লবী চে গুয়েভারার স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর সমাধিসৌধ ও স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের সময় লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী ইতিহাস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। শহরের রাস্তাঘাট, স্থাপত্য এবং মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো সেই বিপ্লবী চেতনার ছাপ স্পষ্ট। ইতিহাসপ্রেমী একজন ভ্রমণকারী হিসেবে এই অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সান্তা ক্লারা তাই আমার ভ্রমণ ডায়েরির এক গর্বিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। হাভানার পুরনো রাস্তা, রঙিন গাড়ি এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্য যেন সময়কে থামিয়ে রেখেছে। ত্রিনিদাদ ও সান্তা ক্লারা কিউবায়। সান্তা ক্লারাতে চে গুয়েভারার এবার সমাধি আছে। কিউবার ইতিহাস ও সংস্কৃতির গভীরতা অনুভব করেছি।
পানামা সিটিতে আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের পাশে বিশ্ববিখ্যাত খাল দেখে বিস্মিত হয়েছি। সান হোসে, তেগুসিগালপা, মানাগুয়া, সান সালভাদর, বেলমোপান এবং গুয়াতেমালা সিটিতে মধ্য আমেরিকার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, আগ্নেয়গিরি, প্রাচীন সভ্যতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য সমন্বয় দেখেছি।

সবশেষে আমার চীনের এক বিস্ময়কর ভ্রমণকাহিনী সাংহাই, শিয়ান, ইউনানের কুনমিং, ডালি, লিজিয়ান, সাংরিল, ডংচুয়াং, হুয়ানসো, লেসন, চেংদু, চংকিং, ইচাং, হুলিংগিয়ান পথ ধরে আমার শেষ ভ্রমণটি ছিল এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। একই যাত্রায় প্রাচীন ইতিহাস, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশাল নগরজীবন আর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পেয়েছি।
পেকিংয়ের নিষিদ্ধ নগরী যেন আমাকে মিং ও কিং রাজবংশের রাজকীয় মহিমায় নিয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে সাংহাইয়ের আকাশছোঁয়া ভবনগুলো দেখিয়েছিল আধুনিক চীনের উড়ন্ত স্বপ্ন। শিয়ানের টেরাকোটা আর্মি নীরব হয়ে ইতিহাসের এক অধ্যায় পাঠ করালো, আর ইউনানের পাহাড়ি গ্রামগুলো যেখানে সবুজের বর্ণিল আয়োজন ভ্রমণস্মৃতিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলল।
এই বৈচিত্র্যময় চীন আমার বিশ্বভ্রমণের ডায়েরিকে সমৃদ্ধ করেছে অনন্য এক মাত্রায়।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে আমি শুধু শহর দেখিনি, দেখেছি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং স্বপ্ন। প্রতিটি শহর আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে, নতুন গল্প উপহার দিয়েছে। পৃথিবীর পথে এই চলার শেষ নেই, বরং প্রতিটি গন্তব্য আমাকে আরেকটি নতুন যাত্রার আহ্বান জানিয়েছে।

২০০৫ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রথম বিদেশ ভ্রমণের মাধ্যমে যে স্বপ্নযাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ সেই পথচলা এক অনন্য মাইলফলকে পৌঁছেছে। দুই দশকের দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণের পর চীনের মনোমুগ্ধকর শহর গুইলিংয়ে পা রেখে আমি স্পর্শ করেছি আমার ভ্রমণজীবনের হাজারতম শহর।
দিল্লির সেই প্রথম পদক্ষেপ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সাতটি মহাদেশ, পাঁচটি মহাসাগর, অসংখ্য দ্বীপ, পর্বত, মরুভূমি, অরণ্য এবং শত শত ঐতিহাসিক ও আধুনিক নগরী অতিক্রম করে এই অর্জন হাজারো স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও আবেগের এক মহামূল্যবান অধ্যায়। এই বিশ বছরের যাত্রায় আমি দেখেছি মানবসভ্যতার বৈচিত্র্যময় রূপ, প্রাচীন ইতিহাসের গৌরব, আধুনিক বিশ্বের বিস্ময়কর অগ্রগতি এবং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য।

পৃথিবীর নানা দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, জীবনধারা এবং মানুষের গল্প আমাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করেছে। কখনো আর্কটিকের নীরব তুষারভূমিতে, কখনো আফ্রিকার বন্য প্রকৃতির মাঝে, কখনো ইউরোপের শতাব্দীপ্রাচীন নগরীতে, আবার কখনো দক্ষিণ আমেরিকার দূর প্রান্তে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছি পৃথিবীর অসীম বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য।
আজ গুইলিংয়ের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এই হাজারতম শহরে পৌঁছানোর পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত পথচলা, অসংখ্য সীমান্ত অতিক্রম, হাজারো মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং পৃথিবীকে জানার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এটি স্বপ্ন, সাহস, অধ্যবসায় এবং অজানাকে জানার নিরন্তর প্রচেষ্টার এক জীবন্ত দলিল। দিল্লি থেকে গুইলিংয়ের এই দীর্ঘ যাত্রা আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা, অর্জন এবং স্মৃতির অবিস্মরণীয় মহাকাব্য।

এই দীর্ঘ যাত্রায় আমি পৃথিবীর প্রায় এক হাজারেরও বেশি বিখ্যাত শহর ভ্রমণ করেছি। পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ বিখ্যাত ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও পর্যটননগরী দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। প্রতিটি শহরের নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি এবং নিজস্ব গল্প রয়েছে। সেই গল্পগুলোই আজ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

হেলসিংকি, লন্ডন, ডাবলিন, বার্লিন, হেমারফেস্ট, টমসো উসুঅইয়া, জুরিখ, জেনেভা, ফ্রাঙ্কফুট, নয়াদিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, পাঞ্জাব, জয়পুর, রাজস্থান, কেরালা, বেঙ্গালুরু, কাঠমান্ডু, পোখারা, মাস্কাট, রিয়াদ, জেদ্দা, ক্যানভ্যারা, সিডনি, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা, নাইরোবি, কাম্পালা, জিনজা, জেরুজালেম, তেল আবিব, তুর্কু, স্টকহোম, গথেনবার্গ, ওসলো, বার্গেন, ব্যাংকক, সিএমরিপ, পাতাইয়া, কুনমিং, রেইগেভিক, কোলোনিয়া, বেলিজ সিটি, মেরিডা, ফ্লোরেন্স, মিলান, ওয়ারশো, লুবলিন, কোপান, লিজিয়ান, ডালি, রোভানিয়েমি, তাল্লিন, তারতু, রিগা, ভিলনিয়াস, কাউনাস, ওয়ারশ, ক্রাকোভ, বুদাপেস্ট, প্রাগ, ব্রনো, ব্রাতিস্লাভা, এথেন্স, থবুখারেস্ট, ক্লুজ-নাপোকা, সোফিয়া, কিয়েভ, লাভিভ, বেলগ্রেড, সারায়েভো, প্রিস্টিনা, স্কোপিয়ে, ওহরিদ, জাগরেব, স্প্লিট,বুদভা, তিরানা,বার্ন, জুরিখ, ভিয়েনা, সালজবুর্গ, লন্ডন, লিভারপুল, সেন্ট পিটার্সবার্গ, ভাদুজ, ব্রাসেলস, অ্যান্টওয়ার্প, আমস্টারডাম, রটারডাম, লুক্সেমবার্গ সিটি, এ বার্লিন, মিউনিখ, প্যারিস, বুয়েনস আইরেস, কুইটো, গুয়ায়াকিল, লিমা, কুসকো, সান্ত, মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা, হাভানা, সান্তিয়াগো দে কিউবা, পানামা সিটি, কোলন, সান হোসে, এল চালতেন, এল কেলাফতে, তেগুসিগালপা, সানপেদ্রো মানাগুয়া, সান সালভাদর, সান্তা আনা, বেলমোপান, বেলিজ সিটি, গুয়াতেমালা সিটি, আন্তিগুয়া গুয়াতেমালা, বেইজিং, সাংহাই, ওয়াশিংটন ডিসি এবং নিউ ইয়র্ক সিটি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, প্রকৃতি ও আধুনিকতার অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বিস্ময়কর নগরসম্ভার। এসব শহর মানবসভ্যতার বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য ও অগ্রগতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের বাকিংহাম প্যালেসের সামনে দাঁড়িয়ে রাজকীয় ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়েছি, বিগ বেনের ঘণ্টাধ্বনি শুনেছি, লন্ডন আই থেকে শহরের বিস্তীর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অমূল্য সংগ্রহ আমাকে মানবসভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাসের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিশাল ডাইনোসরের কঙ্কাল আর টেট মডার্নের শিল্পকর্ম আমাকে মুগ্ধ করেছে বারবার।

ম্যানচেস্টারে গিয়ে শিল্পবিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ওল্ড ট্রাফোর্ডে দাঁড়িয়ে ফুটবল ইতিহাসের আবেগ অনুভব করেছি। সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি মিউজিয়ামে মানব উদ্ভাবনের অসাধারণ অগ্রযাত্রা দেখেছি। ম্যানচেস্টার মিউজিয়ামের হাজারো নিদর্শন এবং ন্যাশনাল ফুটবল মিউজিয়ামের সংগ্রহ আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে মানুষের সৃজনশীলতার শক্তি।

লিভারপুলে গিয়ে খুঁজেছি দ্য বিটলসের স্মৃতি। রয়্যাল অ্যালবার্ট ডকের সমুদ্রঘেঁষা পরিবেশ, মিউজিয়াম অব লিভারপুলের ইতিহাস এবং মার্সিসাইড মেরিটাইম মিউজিয়ামের সংগ্রহ আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্যের অতীতে। সেখানে দাঁড়িয়ে বুঝেছি কীভাবে একটি শহর বিশ্বসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক শহর বাথে রোমান সভ্যতার স্পর্শ পেয়েছি। দুই হাজার বছরের পুরোনো রোমান বাথস ঘুরে মনে হয়েছে যেন ইতিহাসের পাতায় হেঁটে বেড়াচ্ছি। রয়্যাল ক্রিসেন্টের অনন্য স্থাপত্য এবং জেন অস্টেন সেন্টারের সাহিত্যিক আবহ আমাকে অন্য এক যুগে নিয়ে গিয়েছিল।

এরপরে আমেরিকার ৩৩টি অঙ্গরাজ্যে আমার অবিস্মরণীয় ভ্রমণ। প্রকৃতি, ইতিহাস ও স্বপ্নের পথে এক দীর্ঘ যাত্রা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩টি অঙ্গরাজ্য ঘুরে দেখার সুযোগ আমার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। বিশাল এই দেশটি শুধু অর্থনীতি ও প্রযুক্তির জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এর প্রতিটি অঙ্গরাজ্য নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্যের জন্য অনন্য। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর, মরুভূমি থেকে তুষারাবৃত পর্বত, আধুনিক মহানগর থেকে শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা সবকিছু মিলিয়ে আমার এই যাত্রা ছিল রোমাঞ্চ, শিক্ষা ও বিস্ময়ে ভরা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

আমার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ক্যালিফোর্নিয়া। রাজধানী স্যাক্রামেন্টো হলেও বিশ্বের কাছে ক্যালিফোর্নিয়া পরিচিত তার বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের জন্য। সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত গোল্ডেন গেট ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাস অনুভব করা ছিল এক অসাধারণ অনুভূতি। ইয়োসেমিটি ন্যাশনাল পার্কের বিশাল গ্রানাইট পাহাড়, জলপ্রপাত ও সবুজ উপত্যকা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গের মতো। ফ্লোরিডা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। টালাহাসি রাজধানী হলেও অরল্যান্ডোর ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দময় স্থানগুলোর একটি। এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্কের জলাভূমি, কুমির ও বন্যপ্রাণী আমাকে প্রকৃতির এক নতুন রূপ দেখিয়েছে। কী ওয়েস্টের সমুদ্রতীর, সূর্যাস্ত এবং দ্বীপজীবন ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছিল।
নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে পৌঁছে মনে হয়েছিল পৃথিবীর প্রাণকেন্দ্রে চলে এসেছি। স্ট্যাচু অব লিবার্টি স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। টাইমস স্কয়ারের আলোকিত রাত, আকাশছোঁয়া ভবন এবং মানুষের ব্যস্ততা আমাকে মুগ্ধ করেছে। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের গর্জন ও সৌন্দর্য এতটাই মনোমুগ্ধকর ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নেভাডার রাজধানী কারসন সিটি হলেও লাস ভেগাসের নামই সবার আগে মনে আসে। লাস ভেগাস স্ট্রিপের ঝলমলে আলো, বিলাসবহুল হোটেল এবং রাতের প্রাণবন্ত পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।

হুভার ড্যামের প্রকৌশল বিস্ময় এবং লেক তাহোর স্বচ্ছ নীল জল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের সাক্ষী। অ্যারিজোনায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের বিশালতা আমাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। মনুমেন্ট ভ্যালির লাল পাথুরে প্রান্তর এবং অ্যান্টেলোপ ক্যানিয়নের আলোর খেলা ছিল অসাধারণ। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে সিয়াটলের স্পেস নিডল থেকে পুরো শহরের দৃশ্য দেখা ছিল চমৎকার অভিজ্ঞতা।
মাউন্ট রেইনিয়ারের বরফঢাকা শিখর এবং অলিম্পিক ন্যাশনাল পার্কের বন, হ্রদ ও উপকূল আমাকে প্রকৃতির গভীরে নিয়ে গিয়েছিল। কলোরাডোর ডেনভার থেকে শুরু করে রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্ক পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত ছিল দৃষ্টিনন্দন। গার্ডেন অব দ্য গডসের লাল পাথরের গঠন এবং পাইকস পিকের উচ্চতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। পেনসিলভেনিয়ায় আমেরিকার স্বাধীনতার ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। ফিলাডেলফিয়ার লিবার্টি বেল ও ইন্ডিপেনডেন্স হল সেই ঐতিহাসিক স্থান যেখানে আধুনিক আমেরিকার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। হার্শিপার্কে কাটানো সময়ও ছিল আনন্দময়।

ভার্জিনিয়ার শেনানডোয়া ন্যাশনাল পার্কের পাহাড়ি পথ এবং শরতের রঙিন বনভূমি আমাকে মুগ্ধ করেছে। ইতিহাস, প্রকৃতি এবং সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায় এই অঙ্গরাজ্যে। মিশিগানের ম্যাকিনাক দ্বীপে গাড়িবিহীন শান্ত পরিবেশ এক অন্যরকম অনুভূতি দিয়েছিল। স্লিপিং বেয়ার ডিউনসের বিশাল বালিয়াড়ি এবং হেনরি ফোর্ড মিউজিয়ামে শিল্পবিপ্লবের ইতিহাস আমাকে সমৃদ্ধ করেছে।
ওহাইওর কলম্বাস থেকে ক্লিভল্যান্ড পর্যন্ত ভ্রমণে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে সংগীতের ইতিহাস দেখেছি। সিডার পয়েন্টের রোলার কোস্টার এবং হকিং হিলস স্টেট পার্কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল দারুণ। ইউটাহ ছিল প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গ। জায়ন ন্যাশনাল পার্কের বিশাল গিরিখাত, ব্রাইস ক্যানিয়নের অদ্ভুত পাথুরে স্তম্ভ এবং আর্চেস ন্যাশনাল পার্কের প্রাকৃতিক পাথরের খিলানগুলো যেন অন্য এক পৃথিবীর দৃশ্য।

ওরেগনের ক্রেটার লেক ন্যাশনাল পার্কের গভীর নীল জল পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর হ্রদগুলোর একটি। মাল্টনোমাহ ফলসের জলপ্রপাত এবং ক্যানন বিচের উপকূলীয় সৌন্দর্য আমাকে দীর্ঘক্ষণ মুগ্ধ করে রেখেছিল। নিউ জার্সিতে আটলান্টিক সিটির সমুদ্রতীর, লিবার্টি স্টেট পার্ক এবং ঐতিহাসিক কেপ মে শহর ভ্রমণ ছিল আনন্দদায়ক। সমুদ্র, ইতিহাস এবং আধুনিকতার এক সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায় এখানে।
মিনেসোটার সেন্ট পল শহরে অবস্থিত মল অব আমেরিকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শপিং কমপ্লেক্স। ভয়েজার্স ন্যাশনাল পার্কের হ্রদসমূহ এবং মিনেহাহা ফলস প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে। কেন্টাকির ম্যামথ কেভ ন্যাশনাল পার্ক বিশ্বের দীর্ঘতম গুহা ব্যবস্থা হিসেবে বিস্মিত করেছে। চার্চিল ডাউনসে ঘোড়দৌড়ের ঐতিহ্য এবং কেন্টাকি হর্স পার্কে ঘোড়ার জগতের ইতিহাস দেখার সুযোগ পেয়েছি।

উইসকনসিনের উইসকনসিন ডেলস তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিনোদন কেন্দ্রের জন্য বিখ্যাত। ডোর কাউন্টির উপকূলীয় দৃশ্য এবং হার্লে ডেভিডসন মিউজিয়াম আমাকে আমেরিকান সংস্কৃতির আরেকটি দিক দেখিয়েছে। মন্টানার গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক ছিল আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর পার্বত্য অঞ্চলগুলোর একটি। বরফে ঢাকা পর্বত, নীল হ্রদ এবং বন্যপ্রাণীতে ভরা এই অঞ্চল প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। লিটল বিগহর্ন ব্যাটলফিল্ড ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে, আর ফ্ল্যাটহেড লেকের সৌন্দর্য মনকে শান্ত করে।
ওয়াইয়োমিংয়ে বিশ্বের প্রথম জাতীয় উদ্যান Yellowstone National Park এবং Grand Teton National Park ভ্রমণ ছিল জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। গিজার, উষ্ণ প্রস্রবণ, বন্যপ্রাণী এবং পর্বতমালার সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এ ছাড়াও নিউ হ্যাম্পশায়ার, নিউ মেক্সিকো, নর্থ ক্যারোলাইনা, নর্থ ডাকোটা, সাউথ ক্যারোলাইনা, সাউথ ডাকোটা, টেনেসি, আইওয়া, কানসাস, নেব্রাস্কা, আইডাহো এবং আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ঘুরে আমি যুক্তরাষ্ট্রের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, মানুষ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি।

এই ৩৩টি অঙ্গরাজ্য ভ্রমণের মাধ্যমে আমি উপলব্ধি করেছি যে যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি দেশ নয়, এটি অসংখ্য সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, প্রাকৃতিক বিস্ময় এবং স্বপ্নের সমন্বয়ে গঠিত এক বিশাল জগৎ। প্রতিটি শহর, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি জাতীয় উদ্যান এবং প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় আমি দেখেছি মানুষের সৃজনশীলতা, প্রকৃতির মহিমা এবং ইতিহাসের গভীরতা। আজও সেই স্মৃতিগুলো আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। পৃথিবীর পথে আমার দীর্ঘ ভ্রমণ জীবনের অন্যতম গর্বের স্মৃতি হয়ে থাকবে এই অসাধারণ আমেরিকা অভিযান।
জার্মানির বার্লিনে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট এবং বার্লিন ওয়াল স্মৃতিসৌধ আমাকে বিভক্ত ইউরোপের ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়েছে। মিউনিখের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ এবং হামবুর্গের বন্দরনগরীর প্রাণচাঞ্চল্য জার্মান সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখিয়েছে।

ফ্রান্সের প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অন্যতম রোমান্টিক শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। ল্যুভর জাদুঘরে মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম দেখেছি। মার্সেইয়ের সমুদ্রতীর, লিওঁর ঐতিহাসিক অঞ্চল এবং ফরাসি খাবারের অসাধারণ স্বাদ আমাকে মুগ্ধ করেছে।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে খালপথে ভেসে বেড়িয়েছি, ভ্যান গগ মিউজিয়ামে শিল্পের গভীরতা অনুভব করেছি এবং আনা ফ্রাঙ্ক হাউসে ইতিহাসের বেদনাময় অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়েছি। রটারডামের আধুনিক স্থাপত্য এবং দ্য হেগের আন্তর্জাতিক পরিবেশ নেদারল্যান্ডসকে আমার কাছে বিশেষ করে তুলেছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গের হার্মিতাস মিউজিয়ামের অগণিত শিল্পকর্ম এবং পিটারহফ প্রাসাদের সৌন্দর্য আমাকে অভিভূত করেছে। কাজানের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রাশিয়ার বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরেছে।

ইন্ডিয়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস অনুভব করেছি, লালকেল্লার প্রাচীর ছুঁয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের গৌরবময় অতীতের গল্প কল্পনা করেছি এবং কুতুব মিনারের দিকে তাকিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা স্থাপত্যশিল্পের প্রতি মুগ্ধ হয়েছি।
কাঠমান্ডুতে পৌঁছে মনে হয়েছিল যেন পাহাড়, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং ইতিহাস একসঙ্গে মিশে গেছে। পশুপতিনাথের আধ্যাত্মিক পরিবেশ, স্বয়ম্ভুনাথের উঁচু পাহাড়চূড়া এবং প্রাচীন দরবার স্কয়ারের অলিগলি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পোখরার ফেওয়া লেকের শান্ত জলে অন্নপূর্ণার প্রতিচ্ছবি দেখা ছিল এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। লুম্বিনীর নীরবতা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

মাস্কাটে পৌঁছে আরব সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলাম। সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদের শৈল্পিক নকশা, আল জালালি দুর্গের ঐতিহাসিক আবহ এবং মুত্রাহ স্যুকের প্রাণবন্ত পরিবেশ ভ্রমণকে সমৃদ্ধ করেছিল। সালালাহর সবুজ পাহাড় ও ঝরনা দেখে বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে আমি আরব উপদ্বীপে আছি। নিজওয়ার ঐতিহাসিক দুর্গ ও পুরোনো বাজারে ঘুরে প্রাচীন আরব সভ্যতার ছোঁয়া অনুভব করেছি।
রিয়াদ, জেদ্দা এবং মক্কা ছিল আমার ভ্রমণ জীবনের আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি। রিয়াদের আধুনিকতা, জেদ্দার সমুদ্রতীর এবং মক্কার পবিত্র পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। কাবা শরিফের সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেই মুহূর্তগুলো আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে।

ক্যানবেরা, সিডনি এবং মেলবোর্নে কাটানো দিনগুলো ছিল আধুনিক নগর সভ্যতার সঙ্গে পরিচয়ের অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সিডনি অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজ এবং বন্ডি বিচ যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো স্বপ্নের অংশ। মেলবোর্নের শিল্পসংস্কৃতি এবং গ্রেট ওশেন রোডের উপকূলীয় সৌন্দর্য আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
কায়রোতে এসে মানব সভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। গিজার পিরামিড, স্ফিংস এবং প্রাচীন নিদর্শনগুলো দেখে বিস্মিত হয়েছি। আলেকজান্দ্রিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় আবহ এবং লুক্সরের মন্দিরগুলো আমাকে প্রাচীন বিশ্বের গল্প শুনিয়েছে।
রাবাত, ক্যাসাব্লাঙ্কা এবং মারাকেশে ঘুরে উত্তর আফ্রিকার রঙিন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সরু গলি, ঐতিহ্যবাহী বাজার, প্রাসাদ এবং মসজিদগুলো যেন আরব্য রজনীর কোনো গল্পকে জীবন্ত করে তুলেছিল।

নাইরোবি, লেক তুরকানা, আফ্রিকার প্রকৃত রূপ দেখেছি। বন্যপ্রাণী, সাভানা এবং স্থানীয় মানুষের প্রাণবন্ত জীবন আমাকে মুগ্ধ করেছে। আরুশা আর মশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল অসাধারণ।আরুশার কাছাকাছি তানজানিয়ার বিখ্যাত Serengeti National Park এবং Ngorongoro Conservation Area ভ্রমণ ছিল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সেরেঙ্গেটির বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে অসংখ্য বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ দেখে প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছি। সিংহ, জিরাফ, জেব্রা ও হাতির দলকে তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে দেখতে পাওয়া ছিল এক অনন্য অনুভূতি। অন্যদিকে, নগোরোঙ্গোরো ক্রেটারের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত বিস্ময়।
পাহাড়, সবুজ উপত্যকা এবং বন্যপ্রাণীর অপূর্ব সমন্বয় এই স্থানকে করেছে অনন্য। সূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় আফ্রিকার প্রকৃতি যেন নতুন রূপে ধরা দিয়েছিল। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রোমাঞ্চ, বিস্ময় ও আনন্দে ভরপুর। এই ভ্রমণ আমাকে প্রকৃতির আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। তানজানিয়ার এই দুই বিখ্যাত পার্কের স্মৃতি আমার হৃদয়ে আজীবন অমলিন হয়ে থাকবে। এবং পাহাড়ি অঞ্চল সাফারি সারেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক, এন গড়ো গড়ো ন্যাশনাল পার্ক আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

কাম্পালা, জিঞ্জা এবং মবালের পথে ভ্রমণ করতে গিয়ে নীল নদের উৎস দেখার সুযোগ হয়েছিল। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এবং স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছিল।
জেরুজালেম এমন একটি শহর, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম এবং সংস্কৃতি একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। প্রাচীন দেয়াল, পবিত্র স্থান এবং হাজার বছরের ইতিহাস আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। এরপর হেলসিঙ্কি, স্টকহোম এবং অসলোতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার শান্ত, পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক জীবনধারা কাছ থেকে দেখেছি। ফিয়র্ড, দ্বীপপুঞ্জ এবং উত্তর ইউরোপের নির্মল প্রকৃতি আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে।
তাল্লিন, রিগা এবং ভিলনিয়াসে মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। পাথরের রাস্তা, পুরনো গির্জা এবং ঐতিহাসিক চত্বরগুলো যেন সময়কে কয়েক শতাব্দী পেছনে নিয়ে গিয়েছিল। ওয়ারশ, ক্রাকো এবং গদানস্কে ইউরোপের ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছি।
হ্যামারফেস্ট, নরওয়ে পৃথিবীর উত্তরের শেষ শহরের পথে আর্কটিক অঞ্চলের অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা হ্যামারফেস্ট ভ্রমণ ছিল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর উত্তরের অন্যতম শেষ শহর হিসেবে এর পরিচিতি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ। চারদিকে তুষারাবৃত পাহাড়, নীল সমুদ্র আর দীর্ঘ শীতের নীরবতা শহরটিকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। মধ্যরাতের সূর্য ও অরোরার মোহনীয় আলো আমার যাত্রাকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছিল। প্রকৃতির বিশালতা ও নিস্তব্ধতার মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেকে যেন পৃথিবীর একেবারে প্রান্তসীমায় আবিষ্কার করেছিলাম। হ্যামারফেস্ট তাই আমার বিশ্বভ্রমণের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বুদাপেস্টের দ্যানিউব নদী, প্রাগের ঐতিহাসিক সেতু এবং ব্রাতিস্লাভার দুর্গ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। এথেন্সে এসে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার নিদর্শনগুলো দেখে বিস্মিত হয়েছি। পার্থেনন এবং অ্যাক্রোপলিসের সামনে দাঁড়িয়ে মানব সভ্যতার এক গৌরবময় অধ্যায়কে অনুভব করেছি।
বুখারেস্ট, সোফিয়া, কিয়েভ এবং কিশিনাউতে পূর্ব ইউরোপের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আধুনিকতার সমন্বয় দেখেছি। বেলগ্রেড, সারায়েভো, প্রিস্টিনা এবং স্কোপিয়েতে বলকান অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য আমাকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে।
জাগরেব, কোটর, বুদভা এবং তিরানায় পাহাড়, সমুদ্র এবং ইতিহাসের অনন্য মেলবন্ধন দেখেছি। প্রতিটি শহর ছিল আলাদা, প্রতিটি অভিজ্ঞতা ছিল নতুন। বার্ন, জুরিখ এবং জেনেভায় এসে সুইস আল্পসের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। তুষারাবৃত পর্বত, নীল হ্রদ এবং নিখুঁত নগরজীবন আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
ভিয়েনার রাজকীয় স্থাপত্য, সালজবুর্গের সংগীত ঐতিহ্য এবং ইনসব্রুকের পাহাড়ি সৌন্দর্য ছিল অসাধারণ। ভাদুজের শান্ত পরিবেশ এবং আল্পসের দৃশ্য যেন রূপকথার কোনো রাজ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।
ব্রান, রোমানিয়া ড্রাকুলার কিংবদন্তির দুর্গে রোমানিয়ার মনোরম ট্রান্সিলভানিয়া অঞ্চলে অবস্থিত ব্রান শহরে পৌঁছে যেন রূপকথা ও রহস্যের জগতে প্রবেশ করেছিলাম। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত ব্রান ক্যাসেল, যা ড্রাকুলা ক্যাসেল নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে। মধ্যযুগীয় স্থাপত্য, রহস্যময় করিডোর এবং দুর্গের ঐতিহাসিক পরিবেশ এক ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয়। দুর্গের প্রতিটি দেয়াল যেন শতাব্দী পুরোনো গল্প ও কিংবদন্তির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের সবুজ পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই ভ্রমণকে আরও মনোমুগ্ধকর করেছে। ব্রান শহর ও ড্রাকুলা ক্যাসেল দর্শন আমার বিশ্বভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
ব্রাসেলস, আমস্টারডাম এবং লুক্সেমবার্গ সিটিতে ইউরোপের আধুনিক ও ঐতিহাসিক রূপ একসঙ্গে দেখেছি। খালপথ, পুরনো ভবন এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ এই শহরগুলোকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
বুয়েনস আইরেসে এসে ফুটবল, ট্যাঙ্গো এবং প্রাণবন্ত সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। কর্ডোবা ও রোজারিওর ঐতিহাসিক পরিবেশ এবং নদীতীরের সৌন্দর্য মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। কিতো, গুয়াকিল এবং কুয়েনকার পাহাড়ি শহরগুলো আমাকে লাতিন আমেরিকার বৈচিত্র্য দেখিয়েছে। এবং পৃথিবীর দক্ষিণের শেষ শহরে দক্ষিণ আমেরিকার প্রান্তে অবস্থিত আর্জেন্টিনার উশুইয়া, যা পৃথিবীর দক্ষিণতম শহর হিসেবে পরিচিত, আমার ভ্রমণ জীবনের এক অনন্য গন্তব্য। আন্দিজ পর্বতমালা ও বিগল চ্যানেলের মাঝখানে অবস্থিত এই শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এখান থেকে অ্যান্টার্কটিকার অভিযাত্রার সূচনা হওয়ায় শহরটিতে এক বিশেষ অভিযাত্রিক আবহ অনুভব করা যায়। তুষারঢাকা পর্বত, স্বচ্ছ জলরাশি এবং শীতল বাতাস আমাকে মুগ্ধ করেছে প্রতিটি মুহূর্তে। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। উশুইয়া আমার বিশ্বভ্রমণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গন্তব্যগুলোর একটি।

সান্তা ক্রুজ, গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ প্রকৃতির জীবন্ত গবেষণাগারে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত সান্তা ক্রুজ দ্বীপে পৌঁছে মনে হয়েছিল যেন প্রকৃতির এক বিস্ময়কর জগতে প্রবেশ করেছি। শতবর্ষী বিশালাকার কচ্ছপদের ধীর পদচারণা এবং ডারউইনের বিখ্যাত ফিঞ্চ পাখিদের কাছ থেকে দেখা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। জীববৈচিত্র্যের এই স্বর্গভূমি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে পরিচিত। দ্বীপের প্রতিটি কোণ প্রকৃতির বিবর্তনের একেকটি জীবন্ত গল্প বলে। স্বচ্ছ সমুদ্র, আগ্নেয়গিরির ভূমি এবং বিরল প্রাণীদের উপস্থিতি ভ্রমণকে করে তুলেছিল আরও আকর্ষণীয়। সান্তা ক্রুজে কাটানো সময় আমার বিশ্বভ্রমণের অন্যতম মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে।
লিমা, কুজকো এবং আরেকিপায় ইনকা সভ্যতার স্মৃতি খুঁজে পেয়েছি। কুজকোর পাথরের রাস্তা ধরে হাঁটার সময় মনে হয়েছিল ইতিহাস যেন এখনও জীবন্ত। সান্তিয়াগো, ভালপারাইসো এবং কন্সেপসিওনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রশান্ত মহাসাগরের দৃশ্য ছিল অনন্য।

সমুদ্রতীরবর্তী শান্ত পরিবেশ উপভোগ করেছি মেক্সিকো তে ঐতিহাসিক কেন্দ্র, কানকুনের নীল সমুদ্র এবং গুয়াদালাহারার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
চে গুয়েভারার স্মৃতির শহরে কিউবার ঐতিহাসিক শহর সান্তা ক্লারা ভ্রমণ ছিল ইতিহাস ও বিপ্লবের স্পর্শ অনুভব করার সুযোগ। এই শহরটি বিশ্বখ্যাত বিপ্লবী চে গুয়েভারার স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর সমাধিসৌধ ও স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের সময় লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী ইতিহাস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। শহরের রাস্তাঘাট, স্থাপত্য এবং মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো সেই বিপ্লবী চেতনার ছাপ স্পষ্ট। ইতিহাসপ্রেমী একজন ভ্রমণকারী হিসেবে এই অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সান্তা ক্লারা তাই আমার ভ্রমণ ডায়েরির এক গর্বিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। হাভানার পুরনো রাস্তা, রঙিন গাড়ি এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্য যেন সময়কে থামিয়ে রেখেছে। ত্রিনিদাদ ও সান্তা ক্লারা কিউবায়। সান্তা ক্লারাতে চে গুয়েভারার এবার সমাধি আছে। কিউবার ইতিহাস ও সংস্কৃতির গভীরতা অনুভব করেছি।
পানামা সিটিতে আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের পাশে বিশ্ববিখ্যাত খাল দেখে বিস্মিত হয়েছি। সান হোসে, তেগুসিগালপা, মানাগুয়া, সান সালভাদর, বেলমোপান এবং গুয়াতেমালা সিটিতে মধ্য আমেরিকার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, আগ্নেয়গিরি, প্রাচীন সভ্যতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য সমন্বয় দেখেছি।

সবশেষে আমার চীনের এক বিস্ময়কর ভ্রমণকাহিনী সাংহাই, শিয়ান, ইউনানের কুনমিং, ডালি, লিজিয়ান, সাংরিল, ডংচুয়াং, হুয়ানসো, লেসন, চেংদু, চংকিং, ইচাং, হুলিংগিয়ান পথ ধরে আমার শেষ ভ্রমণটি ছিল এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। একই যাত্রায় প্রাচীন ইতিহাস, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশাল নগরজীবন আর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পেয়েছি।
পেকিংয়ের নিষিদ্ধ নগরী যেন আমাকে মিং ও কিং রাজবংশের রাজকীয় মহিমায় নিয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে সাংহাইয়ের আকাশছোঁয়া ভবনগুলো দেখিয়েছিল আধুনিক চীনের উড়ন্ত স্বপ্ন। শিয়ানের টেরাকোটা আর্মি নীরব হয়ে ইতিহাসের এক অধ্যায় পাঠ করালো, আর ইউনানের পাহাড়ি গ্রামগুলো যেখানে সবুজের বর্ণিল আয়োজন ভ্রমণস্মৃতিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলল।
এই বৈচিত্র্যময় চীন আমার বিশ্বভ্রমণের ডায়েরিকে সমৃদ্ধ করেছে অনন্য এক মাত্রায়।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে আমি শুধু শহর দেখিনি, দেখেছি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং স্বপ্ন। প্রতিটি শহর আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে, নতুন গল্প উপহার দিয়েছে। পৃথিবীর পথে এই চলার শেষ নেই, বরং প্রতিটি গন্তব্য আমাকে আরেকটি নতুন যাত্রার আহ্বান জানিয়েছে।

অ্যালেন গিন্সবার্গের শততম জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা বিট প্রজন্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবিকে শ্রদ্ধা জানানো, একই সঙ্গে সেই বিশ্বনাগরিক বিবেককে স্মরণ করা—যিনি ক্ষমতার ভাষার বিপরীতে মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন। শতবর্ষ পরেও তিনি কেবল একজন আমেরিকান কবি নন; বাংলাদেশের ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সাক্ষী।
১৭ ঘণ্টা আগে
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। মুক্তিযুদ্ধ চলছে। পশ্চিমবাংলার দমদম পার হতেই অ্যালেন গিন্সবার্গের চোখে পড়ল চারদিকে সারি সারি তাঁবু আর ছাউনি। এখানে থাকছেন শত শত শরণার্থী। সেই বছরের তুমুল বৃষ্টিতে রাস্তার পাশের ছোট ছোট নালাগুলোও ভরে গেছে কানায় কানায়। নোংরা জলের ধারেই অমানবিক পরিবেশে দিন কাটছে মানুষগুলোর।
১৮ ঘণ্টা আগে
অনেক সময় শুধু হাতের লেখা দেখেই আমরা আন্দাজ করতে পারি, সেটি কোনো ছেলে নাকি মেয়ের। বিষয়টি অনেকের কাছে কেবল অনুমান মনে হলেও, গবেষণা বলছে এর পেছনে কিছু বাস্তব কারণ আছে।
২১ ঘণ্টা আগে
উৎসবের আমেজে খরচের সময় হয়তো আমরা অতটা হিসাব করি না। কিন্তু ছুটি কাটিয়ে যখন আবার কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরি, তখন পকেটের শূন্যতা আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়।
২ দিন আগে