জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সেমাই যেভাবে বাঙালির ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল

ঈদে সেমাই খাওয়ার প্রচলন কি আগে থেকেই ছিল? এই মিষ্টি খাবারটি কোথা থেকে এল এবং কীভাবে বাংলাদেশে ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল?

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৫৫
সেমাই। স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। বছরে দুইবার ঈদ আসে—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ঈদ মানেই আনন্দ, প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ আর নানা রকম মজার খাবার। আর এই খাবারের তালিকায় সবার আগে থাকে সেমাই। ঈদের সকাল সেমাই ছাড়া ভাবাই যায় না। অতিথি আপ্যায়নেও এটি যেন একেবারে অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো ঈদে সেমাই খাওয়ার প্রচলন কি আগে থেকেই ছিল? এই মিষ্টি খাবারটি কোথা থেকে এল এবং কীভাবে বাংলাদেশে ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল?

ইসলামের ইতিহাসে ঈদুল ফিতরের সূচনা হয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর সময় থেকে। সেই সময় আরব সমাজে ঈদ উদযাপনের প্রধান রীতি ছিল নামাজ আদায়, দান-সদকা এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, তখন ঈদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো খাবারের নিয়ম ছিল না। সাধারণত খেজুর, দুধ বা স্থানীয় মিষ্টি খাবার খেয়েই ঈদের আনন্দ উদযাপন করা হতো।

সেমাইয়ের উৎপত্তি কোথায়

ইতিহাসবিদদের মতে, সেমাইয়ের ধারণা এসেছে পারস্য, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের নুডলস জাতীয় খাবার থেকে, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ভার্মিসেলি। এই ধরনের নুডলস দিয়ে দুধ, খেজুর, বাদাম ও মসলা মিশিয়ে একটি মিষ্টি খাবার তৈরি করা হতো, যার একটি জনপ্রিয় রূপ হলো ‘শির খুরমা’।

এই শির খুরমা প্রথম জনপ্রিয় হয় পারস্য অঞ্চলে, অর্থাৎ বর্তমান ইরান এলাকায়। এরপর এটি ধীরে ধীরে তুরস্ক, আফগানিস্তান হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম সমাজে ঈদুল ফিতরের সকালে এই শির খুরমা খাওয়ার একটি রীতি গড়ে ওঠে।

শির খুরমা। সংগৃহীত ছবি
শির খুরমা। সংগৃহীত ছবি

এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেমাই ধীরে ধীরে ঈদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় এবং পরে আমাদের অঞ্চলে এটি ঈদের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রিয় খাবারে পরিণত হয়।

যেভাবে উপমহাদেশে

ভারতীয় উপমহাদেশে সেমাই জনপ্রিয় হয় মূলত মুসলিম শাসনামলে, বিশেষ করে মুঘল আমলে (১৬শ থেকে ১৮শ শতক)। এই সময় পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে অনেক খাবার এখানে আসে। মুঘলদের রান্নাঘরে দুধ, বাদাম আর মসলা দিয়ে নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি হতো। সেই ধারাতেই সেমাই ধীরে ধীরে মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।

শুরুতে এটি ছিল রাজদরবারের খাবার, কিন্তু পরে সাধারণ মানুষের ঘরেও ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই ঈদের দিনে মিষ্টি কিছু খাওয়ার একটি রীতি তৈরি হয়। আর দুধ-বাদাম দিয়ে রান্না করা সেমাই ধীরে ধীরে ঈদের আনন্দের প্রতীক হয়ে যায়। এভাবেই বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে সেমাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে সেমাইয়ের প্রচলন

বাংলাদেশে এখন ঈদের সকাল মানেই সেমাই। প্রায় প্রতিটি ঘরেই কোনো না কোনো ধরনের সেমাই রান্না হয়। এটি শুধু খাবার নয়, একটি সামাজিক ও পারিবারিক ঐতিহ্য।

বাংলাদেশে সেমাইয়ের প্রচলন শুরু হয় মুঘল আমল থেকেই বলে ধারণা করা হয়। ধারণা করা হয়, ১৭শ শতকের দিকে প্রথমে শহরাঞ্চলে সেমাই রান্না জনপ্রিয় হয়। পরে ধীরে ধীরে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন রকমের সেমাই। সংগৃহীত ছবি
বিভিন্ন রকমের সেমাই। সংগৃহীত ছবি

বিশেষ করে উনিশ ও বিশ শতকে সেমাই আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন ঈদকে ঘিরে বাজারে আলাদা করে সেমাই তৈরি ও বিক্রি শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেমাইয়ের ধরনও বেড়েছে—ভুনা সেমাই, দুধ সেমাই, লাচ্ছা সেমাই, জর্দা সেমাই—সব মিলিয়ে আজ এটি ঈদের অপরিহার্য অংশ।

ঈদের সঙ্গে সেমাইয়ের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক

ঈদের সঙ্গে সেমাইয়ের সম্পর্ক ঠিক কখন থেকে শুরু হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, ঈদুল ফিতরের দিনে নামাজে যাওয়ার আগে মিষ্টি কিছু খাওয়ার রীতি আছে। সেই মিষ্টি খাবারের জায়গা থেকেই ধীরে ধীরে সেমাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ঈদের নামাজ শেষে যখন আত্মীয়-স্বজন বা অতিথিরা আসে, তখন প্রথমেই যে খাবারটি পরিবেশন করা হয়, তা হলো সেমাই। অনেক পরিবারে আবার ঈদের আগের রাতেই সেমাই রান্না করে রাখা হয়, যাতে সকালে সহজে সবাইকে আপ্যায়ন করা যায়।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, সময়ের সঙ্গে কিছু খাবার একটি নির্দিষ্ট উৎসবের প্রতীক হয়ে যায়। যেমন বড়দিনে কেক বা টার্কি, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের জন্য ঈদ মানেই সেমাই।

সম্পর্কিত