জন্মদিন

টম ক্রুজ: ধর্মযাজক হওয়ার স্বপ্ন থেকে হলিউডের শেষ সুপারস্টার

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯: ০৬
টম ক্রুজ। স্ট্রিম ছবি

টম ক্রুজ আজ কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত একজন সুপারস্টার। কিন্তু জীবনের শুরুতে তাঁর পরিকল্পনা ছিল একেবারেই অন্যরকম। খুব ছোটবেলায় তিনি চেয়েছিলেন ধর্মযাজক হতে। সেই লক্ষ্যেই সেমিনারিতে তিন বছর পড়াশোনাও করেছিলেন। কিন্তু একদিন বন্ধুদের সঙ্গে মিলে অ্যালকোহলের বোতল লুকিয়ে রাখার মতো ভুল করে বসেন। সেই অ্যালকোহল পান করে কয়েকজন শিক্ষার্থী ধরা পড়ে যাওয়ার পর তদন্তে টম ক্রুজের নামও বেরিয়ে আসে। যদিও চার্চ কর্তৃপক্ষ তাঁকে বহিষ্কার করেনি, কিন্তু সেই ঘটনার পর টম আর ওই সেমিনারিতে ফিরে যাননি।

একসময় রেসলার হওয়ার ইচ্ছায় যোগ দেন হাইস্কুলের রেস্লিং দলে। কিন্তু হাঁটুর চোট সেই স্বপ্নও ভেঙে দেয়। শেষ পর্যন্ত অভিনয়কেই নিজের পথ হিসেবে বেছে নেন। আর এই অভিনয়ই তাঁকে পৌঁছে দিল সাফল্যের চূড়ায়। সেখান থেকেই শুরু হলো হলিউডের বক্স অফিস কাঁপানো তারকা টম ক্রুজের এক দুর্দান্ত জয়যাত্রা।

‘ওয়েটারের সহকারী’ থেকে জনপ্রিয় অভিনেতা হোন টম ক্রুজ

মাত্র ১৬ বছর বয়সে টম ক্রুজের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এক শিক্ষক তাঁকে স্কুলের মিউজিক্যাল নাটকে অংশ নিতে বলেন। ‘গাইজ অ্যান্ড ডলস’ নামের সেই নাটকে ক্রুজ যখন প্রধান চরিত্র পান, তখন তিনি মঞ্চে খুঁজে পান অন্যরকম স্বস্তি। আর এভাবেই অভিনয় জগতের দিকে একটু একটু করে পা বাড়ান। পড়াশোনা শেষ করে চলে আসেন নতুন শহরে। নিউ ইয়র্কের মতো ব্যস্ততম শহরে শুরু যুদ্ধ। অভিনয় জগতে সফল হওয়ার জন্য নিজেকে ১০ বছর সময় দেন টম ক্রুজ। নিউ ইয়র্কে নিজের খরচ চালাতে তিনি রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের সহকারী হিসেবেও কাজ করতেন।

পাশাপাশি একের পর এক অডিশন দিতে থাকেন। অবশেষে ১৯৮১ সালে টম ক্রুজ দুটি সিনেমায় ছোট চরিত্রে সুযোগ পান। সিনেমা দুটি হলো—‘এন্ডলেস লাভ’ এবং ‘ট্যাপস’। ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা পরিচালিত ‘দ্য আউটসাইডার্স’ সিনেমায় পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করে ক্রুজ তাঁর সাফল্যের গ্রাফ ধরে রাখেন। এই সিনেমার মাধ্যমে সিনেমাবোদ্ধাদের নজরে পড়েন ট্ম ক্রুজ। ভালো ভালো অভিনেতাদের মধ্যেও আলাদা করে চোখে পড়ে তাঁর অভিনয়।

‘মিশন: ইম্পসিবল’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে একের পর এক বিপজ্জনক স্টান্টগুলো তিনি নিজেই করেছেন। সংগৃহীত ছবি
‘মিশন: ইম্পসিবল’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে একের পর এক বিপজ্জনক স্টান্টগুলো তিনি নিজেই করেছেন। সংগৃহীত ছবি

তবে এর পরের সিনেমাটিই ছিল ক্রুজের ক্যারিয়ারের আসল টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৮৩ সালের ‘রিস্কি বিজনেস’ সিনেমাটি সে বছর ৬৫ মিলিয়ন ডলার ব্যবসা করে। এটি ছিল বছরের অন্যতম লাভজনক ছবি। এর কয়েক বছর পর মুক্তি পায় ‘টপ গান’। সিনেমাটি ১৯৮৬ সালের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমা হিসেবে রেকর্ড গড়ে। এই সিনেমার পর হলিউডের সেরা তারকাদের তালিকায় নিজের নাম পাকাপোক্ত করেন টম ক্রুজ।

‘আমেরিকার শাহরুখ খান’ বলে সম্বোধন করলে কিছু মনে করব না

বর্তমানে ষাটের কোঠায় এসেও টম ক্রুজের স্টারডম আজও আকাশচুম্বী। হলিউডের ইতিহাসে এমন দীর্ঘমেয়াদি জনপ্রিয়তা খুব কম অভিনেতারই ভাগ্যে জুটেছে। হলিউড ও বলিউডের দুই সুপারস্টার টম ক্রুজ এবং শাহরুখ খানের মধ্যে মিল খুঁজে পান চলচ্চিত্রপ্রেমীরা।

আলাদা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থেকে এলেও, কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তাকে ধরে রেখেছেন তাঁরা। এই দুই অভিনেতার কারোরই কোনো পারিবারিক চলচ্চিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। নিজেদের প্রতিভা, একাগ্রতা এবং কঠোর পরিশ্রমের জোরেই আজ সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান হলিউড-বলিউডের এই দুই মহাতারকা।

২০২২ সালে টম ক্রুজ ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’ সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়ার ঝুঁকি নেন। সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যবসা করেছিল। বক্স অফিসে এই মুভির সফলতা করোনা-পরবর্তী হলিউডকে নতুন জীবন দান করে বলে মনে করেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা।

একইভাবে, ২০২৩ সালে বলিউডের মন্দা কাটাতে শাহরুখ খান ‘পাঠান’ ও ‘জওয়ান’ এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমা উপহার দিয়ে দর্শকদের থিয়েটারে ফিরিয়ে আনেন। ‘পাঠান’-এর সাফল্যের পর আমেরিকান সাংবাদিক স্কট মেন্ডেলসন তাঁর প্রতিবেদনে শাহরুখ খানকে ‘ভারতের টম ক্রুজ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। সাংবাদিক মেন্ডেলসন লিখেছিলেন, ‘ভারতের টম ক্রুজ শাহরুখ খান সম্ভবত তার ব্লকবাস্টার পাঠান দিয়ে বলিউডকে বাঁচিয়ে দিলেন।’

টম ক্রুজ। সংগৃহীত ছবি
টম ক্রুজ। সংগৃহীত ছবি

যদিও এই প্রতিবেদনে খেপে যান শাহরুখ-ভক্তরা। তাঁদের মধ্যে একজন লিখেছেন, ‘যদিও আমি টমকে পছন্দ করি, আমি কিছু মনে করব না আপনি যদি তাঁকে ‘‘আমেরিকার শাহরুখ খান’’ বলে সম্বোধন করেন।’

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ওটিটি যুগে যেখানে তারকাখ্যাতি অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, সেখানে এই দুই অভিনেতা গত চার দশক ধরে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রেখেছেন। তাঁদের এই জনপ্রিয়তার জন্য টম ক্রুজ এবং শাহরুখ খানকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের শেষ দুই ‘গ্লোবাল সুপারস্টার’ বলেন অনেকে।

‘টম, তুমি পুরো হলিউডের সিনেমা থিয়েটারকে বাঁচিয়ে দিয়েছ।’

সিনেমাকে বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য করতে সর্বোচ্চ ডেডিকেশন দেন টম ক্রুজ। সিনেমার কোনো বিপজ্জনক স্টান্টের জন্য সাধারণত ডুপ্লিকেট বা স্টান্টম্যান ব্যবহার করেন না তিনি। ‘মিশন: ইম্পসিবল’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে একের পর এক বিপজ্জনক স্টান্টগুলো তিনি নিজেই করেছেন। সিনেমার স্বার্থে কখনও চলন্ত বিমানের বাইরে ঝুলে থেকেছেন, কখনও বুর্জ খলিফার দেয়ালে চড়েছেন কিংবা কখনও সমুদ্রে নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছেন।

টম ক্রুজ পর্দায় বাস্তবসম্মত অ্যাকশন দেখানোর জন্য বাজি রাখছেন নিজের জীবন। এর বিনিময়ে পাচ্ছেন দর্শকদের অফুরান ভালবাসা।

টম ক্রুজ তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি অনেক ভিন্ন ধারার সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। ‘বর্ন অন দ্য ফোর্থ অব জুলাই’, ‘জেরি ম্যাগুইয়ার’ এবং ‘ম্যাগনোলিয়া’ সিনেমার জন্য তিনবার অস্কারের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস বা অস্কারের মূল ট্রফিটি ক্রুজের অধরাই থেকে যায়। ২০২২ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে টম ক্রুজকে হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে সামগ্রিক অবদানের জন্য সম্মানসূচক ‘পাম ডি'অর’ প্রদান করা হয়। এর কিছুদিন পরেই ২০২৩ সালের অস্কারের মঞ্চে তাঁকে বিশেষ ট্রিলজি সম্মাননা দেওয়া হয়। হলিউডের প্রভাবশালী পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ সে অনুষ্ঠানে ক্রুজকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘টম, তুমি পুরো হলিউডের সিনেমা থিয়েটারকে বাঁচিয়ে দিয়েছ।’

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত