leadT1ad

হঠাৎ বুক ধড়ফড় ও তীব্র ভয়: প্যানিক অ্যাটাক হলে কী করবেন

আজ ১৮ জুন আন্তর্জাতিক প্যানিক দিবস। এটি জাতিসংঘ স্বীকৃত কোনো দিবস নয়। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগ। প্যানিক অ্যাটাক, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ সম্পর্কে মানুষকে জানানোই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০২৬, ২২: ২৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

চারপাশে সবকিছু যখন ঠিকঠাক চলছে, ঠিক তখনই হঠাৎ মনে হলো বুকটা ধড়ফড় করছে, নিশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি বড় কোনো বিপদ ঘটে গেল! অথচ ডাক্তার দেখানোর পর জানা গেল, শরীর সুস্থই আছে বলা যায়। এই যে হঠাৎ করে ধেয়ে আসা তীব্র ভয় বা দুশ্চিন্তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্যানিক অ্যাটাক’।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, প্যানিক অ্যাটাক শরীরের স্বাভাবিক ‘ফ্লাইট-অর-ফাইট’ রেসপন্সের ভুল বা আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ। ফ্লাইট-অর-ফাইট রেসপন্স হলো যেকোনো বিপদ, ভয় বা হুমকির মুখে মানুষের শরীরের স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া। ধরুন, হঠাৎ আপনার সামনে কোনো হিংস্র কুকুর এসে দাঁড়াল। তখন আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত পরিস্থিতিকে বিপদ হিসেবে শনাক্ত করে এবং শরীরকে প্রস্তুত করে হয় বিপদের সঙ্গে লড়াই করতে, নয়তো পালিয়ে যেতে।

মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ কোনো পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক মনে করলে সঙ্গে সঙ্গে শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় করে। তখন অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। ফলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস দ্রুত হয়, পেশিতে বেশি রক্ত পৌঁছায়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, হাজার হাজার বছর আগে বন্য প্রাণী বা শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে এই প্রতিক্রিয়া মানুষের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে আধুনিক জীবনে বাস্তব বিপদের বদলে পরীক্ষা, চাকরির চাপ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা উদ্বেগের মতো মানসিক চাপও একই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

প্যানিক শুরু হলে মনে হতে পারে, সে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। এটি যেহেতু খুব বেশি স্থায়ী হয় না, তাই কিছু কৌশল জানা থাকলে নিজেকে শান্ত করা সম্ভব।

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্যানিক অ্যাটাক কেন হয় তার সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্যানিক অ্যাটাক ঠেকানোর কোনো উপায় এখনো বের হয়নি। তবে সাধারণত অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বংশগত বা জেনেটিক কারণ, মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতা কিংবা অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো বড় মানসিক আঘাত বা ট্রমা এর পেছনে দায়ী থাকে। যারা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটিতে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি অন্য মানুষের চেয়ে বেশি থাকে।

শান্ত থাকার কৌশল

প্যানিক শুরু হলে মনে হতে পারে, সে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। এটি যেহেতু খুব বেশি স্থায়ী হয় না, তাই কিছু কৌশল জানা থাকলে নিজেকে শান্ত করা সম্ভব। প্যানিক অ্যাটাকের সময় মানুষ খুব দ্রুত নিশ্বাস নিতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হাইপারভেন্টিলেশন’ বলে।

‘জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি’র একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এই সময়ে নিশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এর জন্য ‘বক্স ব্রিদিং’ ভালো কাজ করে। প্রথমে ৪ সেকেন্ড ধরে নাক দিয়ে গভীর নিশ্বাস নিন। এরপর ৪ সেকেন্ড নিশ্বাস ধরে রাখুন। তারপর ৪ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে বাতাস আস্তে আস্তে বের করে দিন। সবশেষে আবার ৪ সেকেন্ড নিশ্বাস নেওয়া বন্ধ রাখুন। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

পানি শরীরকে শান্ত করে। ঠাণ্ডা পানি স্নায়ুকে শান্ত করতে সাহায্য করে। সম্ভব হলে পানি দিয়ে মুখ ও চোখ পরিষ্কার করে আসুন। এতে শরীর যেমন শান্ত হবে, প্যানিক অ্যাটাকের মাত্রাও আস্তে আস্তে কমে আসবে।

এ ছাড়া প্যানিক অ্যাটাকের সময় মনে কাল্পনিক ভয় বা দুশ্চিন্তা কাজ করে। একে স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনার জন্য অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ‘গ্রাউন্ডিং টেকনিক’ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। এখানে বলা হচ্ছে, চারপাশে চোখ বুলিয়ে এমন ৫টি জিনিস খুঁজুন যা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। এরপর ৪টি জিনিস স্পর্শ করুন (যেমন পোশাক বা চাবির রিং)। ৩টি শব্দ মনোযোগ দিয়ে শুনুন। ২টি জিনিসের ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করুন এবং ১টি জিনিসের স্বাদ অনুভব করুন। এই পদ্ধতিটি আপনার মনোযোগ ভয় থেকে সরিয়ে বর্তমান স্বাভাবিক মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে পারে।

ধরুন, হঠাৎ আপনার সামনে কোনো হিংস্র কুকুর এসে দাঁড়াল। তখন আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত পরিস্থিতিকে বিপদ হিসেবে শনাক্ত করে এবং শরীরকে প্রস্তুত করে হয় বিপদের সঙ্গে লড়াই করতে, নয়তো পালিয়ে যেতে।

স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের এক জার্নালে বলা হয়েছে, ভয়ের সময় আমাদের শরীর শক্ত হয়ে যায়। তাই সচেতনভাবে শরীরের প্রতিটি পেশী প্রথমে ৫ সেকেন্ড শক্ত করুন এবং তারপর ছেড়ে দিন। পায়ের পাতা থেকে শুরু করে মাথার পেশী পর্যন্ত এভাবে শিথিল করলে দ্রুত আরাম পায়।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে

আমেরিকান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি-এর একটি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বারবার প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার পাশাপাশি যদি দীর্ঘদিন ধরে আবার অ্যাটাক হওয়ার ভয় কাজ করে, তবে সেটি প্যানিক ডিজঅর্ডারের লক্ষণ হতে পারে। আপনি যদি সবসময় এই ভয়ে থাকেন যে ‘আবার কখন অ্যাটাক হবে’, তাহলে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘প্যানিক ডিজঅর্ডার’ বলা হয়।

এ ছাড়া প্যানিক অ্যাটাকের ভয়ে যদি আপনি ঘরের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন, জনসমাগম এড়িয়ে চলেন কিংবা অফিসে বা পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে না পারেন, তবে প্রফেশনাল থেরাপি নিয়ে দেখতে পারেন। ‘কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি’ প্যানিক অ্যাটাক দূর করার ক্ষেত্রে অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। থেরাপিস্টরা এই থেরাপির মাধ্যমে মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভয় দূর করতে সাহায্য করেন।

প্যানিকমুক্ত জীবনযাপনের অভ্যাস

‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট নিয়ম মেনে হাঁটেন বা ব্যায়াম করেন, তাদের শরীরে ‘অ্যান্ডোরফিন’ নামক ফিল-গুড হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনটি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে।

পাশাপাশি আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনা দরকার। কফি, এনার্জি ড্রিংকস এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে পারেন। ক্যাফেইন আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, যা অনেক সময় মস্তিষ্ককে প্যানিক অ্যাটাকের ভুল সংকেত পাঠাতে সাহায্য করে।

ঘুমানোর সঙ্গেও প্যানিক অ্যাটাকের সম্পর্ক রয়েছে। ‘স্লিপ মেডিসিন রিভিউজ’ জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার পরিমিত ঘুম স্নায়ুতন্ত্র শান্ত রাখতে সাহায্য করে । রাতে ঘুমানোর আগে ফোন বা ল্যাপটপের নীল আলো এড়িয়ে চললে ঘুম ভালো হয়, মন থাকে ফুরফুরে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত