ad

মেসির জন্মদিন, আমাদের বয়স এবং সময়ের হিসাব

স্ট্রিম গ্রাফিক

২০১০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ। তখন আমি কেবল প্রাইমারি স্কুলে। খেলাধুলা বলতে বোর্ড গেম বা টিফিনের সময় দৌড়াদৌড়িই বুঝি। ফুটবল, ক্রিকেট বলতে শুধু টিভিতে হয়, বড়দের সঙ্গে দেখতে বসি— এইটুকুই।

সেই সময় শুরু হলো ফুটবল বিশ্বকাপ। চারদিক ছেয়ে গেল আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলসহ সব দেশের পতাকায়। তখন পেপসি কিনলেই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছিল খেলোয়াড়দের পরিচয় ও ছবিসহ কার্ড। সেখানেই প্রথম দেখা দশ নম্বর জার্সি পরা মেসিকে। সেই কার্ডে গায়ে রঙ মেখে পোজ দেওয়া মেসির আজ ৩৯তম জন্মদিন।

এই ষোল বছরে মেসির বয়স বেড়েছে, চুলের স্টাইল পরিবর্তন হয়েছে, ইনজুরি, প্রণয়, বিয়ে—সবই হয়েছে। তবে একই আছে তাঁর পায়ের জাদু। আর্থিক অসচ্ছলতা, হরমোনের কারণে বেড়ে উঠতে না পারা—কিছুই আটকাতে পারেনি সর্বকালের সেরা এই খেলোয়াড়কে। তাই সতের হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব অতিক্রম করে ঢাকা থেকে রোজারিও—মেসিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠাতে ভোলে না তাঁর ভক্তরা।

মেসি ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার শিল্পশহর রোজারিওতে জন্ম নেন। বাবা হোর্হে মেসি স্টিল কারখানায় কাজ করতেন, মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি কাজ করতেন একটি চুম্বক তৈরির কারখানায়। পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ছিল সবচেয়ে ছোটদের একজন। তখন কেউ জানত না, এই শিশুর জন্মদিন একদিন পৃথিবীর কোটি মানুষের কাছে পরিচিত একটি তারিখ হয়ে উঠবে।

মেসির গল্প শুরু হয়েছিল রোজারিওর ছোট ছোট গলি আর মাঠে। চার-পাঁচ বছর বয়স থেকেই তিনি বল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। স্থানীয় ক্লাব গ্র্যান্ডোলিতে তাঁর প্রথম ফুটবল শিক্ষা। দাদি সোলিয়ার হাত ধরে গিয়েছিলেন সেখানে। পরে মেসি বহুবার বলেছেন, ফুটবলের পথে তাঁর সবচেয়ে বড় উৎসাহদাতাদের একজন ছিলেন এই দাদি। দাদিই তাঁকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন, দাদিই বিশ্বাস করতেন ছেলেটির মধ্যে বিশেষ কিছু আছে।

তবে শৈশবেই প্রতিভার ঝলকের সঙ্গে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। দশ বছর বয়সে মেসির শরীরে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। চিকিৎসা না করালে স্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে যেত। চিকিৎসার খরচ ছিল পরিবারের সাধ্যের বাইরে। স্থানীয় ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ কিছুটা সাহায্য করলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। ঠিক সেই সময় সামনে আসে বার্সেলোনা।

পেপসি কিনলেই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছিল খেলোয়াড়দের পরিচয় ও ছবিসহ কার্ড। সেখানেই প্রথম দেখা দশ নম্বর জার্সি পরা মেসিকে। ছবি: সংগৃহীত
পেপসি কিনলেই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছিল খেলোয়াড়দের পরিচয় ও ছবিসহ কার্ড। সেখানেই প্রথম দেখা দশ নম্বর জার্সি পরা মেসিকে। ছবি: সংগৃহীত

২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি পরিবারসহ স্পেনে চলে যান। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি—অচেনা এই পরিবেশে তাঁর পরিচিত ছিল শুধুই—ফুটবল।

এরপর থেকে ক্লাব, দল বা ভক্তকুল—কাউকেই তিনি খুঁজে নেননি, সবাই তাঁকে খুঁজে নিয়েছে। ফুটবলের অসংখ্য রেকর্ডের সঙ্গে তাঁর হাতে উঠেছে আটটি ব্যালন ডি’অর, হাতে নিয়েছেন অধরা বিশ্বকাপ। তবে বাঁ পায়ের এই জাদুকর কেবল একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন, তাঁর সঙ্গে বড় হয়ে উঠেছে একটি প্রজন্ম।

আপনার বয়স যদি চল্লিশের কাছাকাছি হয়, তাহলে হয়তো আপনি প্রথম মেসিকে দেখেছেন বার্সেলোনার এক বিস্ময় বালক হিসেবে। তখন তিনি কেবল আলো ছড়ানো শুরু করেছেন।

আপনার বয়স যদি ত্রিশের ঘরে হয়, তাহলে আপনার কৈশোরের ফুটবল মানেই ছিল মেসি বনাম রোনালদো। স্কুলের মাঠ, টিফিনের আড্ডা, কেবল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ফেসবুকের কমেন্ট—সবখানেই সেই বিতর্ক।

আর আমাদের যাদের বয়স মেসির ক্যারিয়ারের প্রায় সমান, আমাদের ফুটবল স্মৃতির প্রায় পুরোটাই মেসিকে ঘিরে। আমরা এমন এক সময়ে বড় হয়েছি যখন কিংবদন্তি ফুটবলার হিসেবে নাম ছিল ম্যারাডোনা বা পেলের। মেসিকে আমরা নাম শুনে নয়, কিংবদন্তি হয়ে উঠতে দেখেছি। প্রায় প্রতি ম্যাচেই রেকর্ড গড়া যেন তাঁর কাছে ডাল-ভাত।

যখন তিনি বার্সেলোনার জার্সিতে প্রথম আলো ছড়াচ্ছিলেন, তখন অনেকের ঘরে স্মার্টফোন ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজকের মতো ছিল না। খেলা দেখার জন্য টেলিভিশনের সামনে বসে থাকতে হতো। আজকের দিনে প্রযুক্তি বদলেছে, বিনোদনের ধরন বদলেছে। কিন্তু প্রায় দুই দশক ধরে বারবার ফিরে এসেছেন—মেসি।

এ কারণেই তাঁর ক্যারিয়ার শুধু গোল, অ্যাসিস্ট বা ট্রফির হিসাব নয়। এটি সময়ের হিসাবও। যাঁর বেড়ে ওঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল, তিনি বিশ্বকাপ হাতে দাঁড়িয়েছেন। মেসি স্পেনে এসেছিলেন চিকিৎসার খোঁজে, হয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মানুষদের একজন।

তাই পেছন ফিরে তাকালে মনে পড়ে শুধু মেসি নয়, বয়স বেড়েছে আমাদেরও। আজকাল ফেসবুকে দেখি সেই সাইড বেঞ্চে বসা মেসি থেকে আজকের মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো মেসির ভিডিও। দেখে মনে হয় ‘কত ছোট ছিল মেসি!’ তারপরই মনে পড়ে তাঁর সঙ্গে বড় হয়েছি আমরাও!

আমাদের স্কুলজীবন শেষ হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হয়েছে, চাকরি শুরু হয়েছে, অনেকেরই সংসার হয়েছে। বদলে গেছে জীবনের হিসাব, পত্রিকার কেটে নেওয়া ছবি থেকে মেসি চলে এসেছে হাতের মোবাইলে। কিন্তু অপরিবর্তিত আছেন ‘গোট’। তাঁর বয়স যতটা বাড়ে, ততটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের নিজের সময়ের হিসাব।

আর সেই স্মৃতিগুলোর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত