জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মন রমজানের ওই রোজার শেষে

ঈদের চাঁদ দেখার খবরের সেকাল-একাল

ঈদের চাঁদ দেখার খবরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অনেক মধুর স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বদলেছি, বদলে গেছে খবর পাওয়ার মাধ্যম। কিন্তু ঈদের আগের দিন চাঁদ দেখতে পাওয়ার খবরের সেই উত্তেজনা কমেনি একটুও।

ঈদের চাঁদ দেখার খবরের সেকাল-একাল। স্ট্রিম ছবি

‘ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর।’ এই একটি খবরই যেকোনো সাধারণ মুহূর্তকে আনন্দে ভাসিয়ে তুলতে পারে। সবকিছু হঠাৎ করেই যেন হালকা হয়ে যায়। মনে হয়, দীর্ঘ এক মাসের অপেক্ষার পর অবশেষে এসে গেছে আনন্দের দিন।

ঈদের চাঁদ দেখার খবরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অনেক মধুর স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বদলেছি, বদলে গেছে খবর পাওয়ার মাধ্যম। কিন্তু ঈদের আগের দিন চাঁদ দেখতে পাওয়ার খবরের সেই উত্তেজনা কমেনি একটুও।

তোপধ্বনি আর নদীর আকাশে চাঁদ খোঁজা

১৯ শতকের ঢাকার কথা যদি ভাবি, তখনকার চিত্রটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। মোহাম্মদ আবদুল কাইউমের ‘ঢাকার ইতিবৃত্ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’ বইয়ে ১৯ শতকে ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। সেসময় এখনকার মতো টেলিভিশন, রেডিও ছিল না বলে চাঁদ দেখতে পাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হতো ঘটা করে তোপধ্বনির মাধ্যমে।

বইয়ে বর্ণিত আছে, সেসময় বড় কাটরা, ছোট কাটরা, আহসান মঞ্জিল, হোসেনি দালানে মানুষ ভিড় করতো চাঁদ দেখার জন্য। কারণ তখন এগুলোই ছিল ঢাকা শহরের উঁচু দালান। অনেকে স্পষ্টভাবে চাঁদ দেখতে পাওয়ার জন্য নৌকায় করে চলে যেতেন বুড়িগঙ্গায়।

আগের মতো সবাই একসঙ্গে বসে খবর শোনার সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই কমে গেছে। আগে পুরো পরিবার এক জায়গায় জড়ো হতো, এখন পরিবারের প্রত্যেকের হাতে আলাদা ফোন। ফলে একই খবর এলেও, সেটি পৌঁছায় ভিন্ন ভিন্ন পর্দায়, ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্তে।

শুধু তাই নয়, নিজেদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করতে শিশুদের পাশাপাশি বৃদ্ধরাও যেতেন চাঁদ দেখতে। কে আগে চাঁদ দেখতে পায়, যেন সেটাই ছিল এক মজার প্রতিযোগিতা। তারপর চাঁদ দেখতে পাওয়ার পর গুলি ছোড়া আর তোপধ্বনির মাধ্যমে তা জনসাধারণকে জানানোর ব্যবস্থা করা হতো।

রেডিও ঘিরে চাঁদরাতের অপেক্ষা

এরপর ধীরে ধীরে সময় বদলালো। মানুষের ঘরে এলো রেডিও। তখন চাঁদ দেখার খবর জানার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠল এই ছোট্ট যন্ত্রটি। ষাট ও সত্তরের দশকে সবার ঘরে রেডিও ছিল না। যাদের ঘরে রেডিও ছিল, তাঁদের কদর ছিল অন্যরকম। সত্তরোর্ধ্ব মকবুল হোসেনের চোখে এখনো সেই স্মৃতি জ্বলজ্বল করে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে একটা সুন্দর লাল রঙের রেডিও ছিল। ২৯ রোজার দিন ইফতারের পর আমরা সব ভাইবোন সেই লাল রেডিওটার চারপাশে গোল হয়ে বসতাম। শুধু আমরা নই, আশপাশের বাড়ির লোকেরাও চলে আসত খবর শুনতে। খবর পাঠক যখন গম্ভীর গলায় বলতেন, বাংলাদেশের আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে, তখন আমরা খুশিতে লাফিয়ে উঠতাম।’

মকবুল হোসেন আরও বলেন, ‘চাঁদ দেখার খবর পাওয়ার পরই শুরু হয়ে যেত ঈদের প্রস্তুতি। মেয়েরা বসে যেত হাতে মেহেদি দিতে। মা ঈদে কী রান্না হবে তার যোগাড়যন্ত্র করতেন, এভাবেই কাটতো ছোটবেলার চাঁদরাত।’

টেলিভিশনে ঘোষণার পরই বাজত ঈদের গান

এরপর ধীরে ধীরে বদলে গেল সময়, বদলে গেল খবর পাওয়ার ধরনও। রেডিওর সেই ছোট্ট বাক্সের জায়গা নিতে শুরু করল টেলিভিশন। ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ল ঝকঝকে পর্দা, চলমান ছবি আর শব্দের এক নতুন জগৎ। আগে যেখানে সবাই কান পেতে থাকত রেডিওর সামনে, সেখানে এখন চোখ আটকে থাকত টিভির পর্দায়।

রেডিওর সেই ছোট্ট বাক্সের জায়গা নিতে শুরু করল টেলিভিশন। সংগৃহীত ছবি
রেডিওর সেই ছোট্ট বাক্সের জায়গা নিতে শুরু করল টেলিভিশন। সংগৃহীত ছবি

টেলিভিশনের যুগে ঈদের চাঁদ দেখার খবর যেন আরও একটু আনুষ্ঠানিক, আরও একটু উৎসবমুখর হয়ে উঠল। চাঁদ দেখা যাওয়ার ঘোষণা আসত টিভির সংবাদে, আর তার পরপরই বাজত কাজী নজরুল ইসলামের সেই চিরচেনা গান ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। গানটি শোনামাত্রই মনে হতো—হ্যাঁ, ঈদ সত্যিই চলে এসেছে।

স্ক্রলেই পাওয়া যায় চাঁদ দেখার সংবাদ

কিন্তু প্রযুক্তির চাকা তো থেমে থাকে না। দিন বদলের পালায় টেলিভিশনও আর ঈদের খবর দেখার প্রধান মাধ্যম নেই। আমাদের ঘরে ঘরে বিশাল স্ক্রিনের রঙিন টিভি। কিন্তু মানুষ আর খবর শোনার জন্য টিভির দিকে তাকিয়ে বসে থাকে না। সবার হাতে হাতে এখন ইন্টারনেটযুক্ত স্মার্টফোন। ফেসবুক, টুইটার বা নিউজ পোর্টালগুলোতেই এখন চাঁদ দেখার খবর আসে সবার আগে। এখন মানুষ হাতে নিয়ে বারবার হোমপেজ রিফ্রেশ করে যাতে সবার আগে চাঁদ দেখার খবর জানা যায়।

এই পরিবর্তনের একটা দিক হলো, আগের মতো সবাই একসঙ্গে বসে খবর শোনার সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই কমে গেছে। আগে পুরো পরিবার এক জায়গায় জড়ো হতো, এখন পরিবারের প্রত্যেকের হাতে আলাদা ফোন। ফলে একই খবর এলেও, সেটি পৌঁছায় ভিন্ন ভিন্ন পর্দায়, ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্তে।

তবুও আসল অনুভূতিটা কিন্তু বদলায়নি। খবরটা যেভাবেই আসুক—টিভির পর্দায়, রেডিওর শব্দে, কিংবা স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনে—ঈদের চাঁদ দেখার সেই আনন্দ, সেই উত্তেজনা আজও আছে। ঈদের চাঁদ এভাবেই যুগে যুগে আমাদের জন্য আনন্দ আর ভালোবাসার বার্তা নিয়ে আসে।

সম্পর্কিত