২৫০ বছর পরেও ‘আমেরিকান ড্রিম’ টিকে আছে যেভাবে

লেখা:
লেখা:
আসমাহ খালিদ

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৪৫
ছবি: বিবিসি থেকে নেওয়া

ষোলো বছর আগে আবদি নর ইফতিন কেনিয়ার বস্তিতে বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন সোমালি শরণার্থী।

একদিন হঠাৎ জানতে পারেন, তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় লটারিটি জিতেছেন। ২০১৩ সালে প্রায় ৮০ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে তিনি সেই ভাগ্যবান ৫০ হাজার জনের একজন ছিলেন যাকে ‘ডাইভার্সিটি ভিসা স্কিম’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে মার্কিন ভিসা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি মার্কিন সরকার ১৯৯০-এর দশকে শুরু করেছিল।

আবদি অনেক দিন ধরেই আমেরিকায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি এই বিষয়ে এতটাই আচ্ছন্ন ছিলেন যে, হলিউড সিনেমা দেখে ইংরেজি শিকতেন। এজন্য তার শৈশবের বন্ধুরা তাকে ‘আবদি আমেরিকা’ বলে ডাকত। ২০১৪ সালে তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘সারাজীবন আমি আমেরিকার প্রেমে পড়ে আছি। এটি বিশ্বের সেরা দেশ, স্বপ্নের দেশ, সুযোগের দেশ।’

সেই বছরই ৪১ বছর বয়সী আবদি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। মেইন অঙ্গরাজ্যের একটি ছোট শহরে বসতি স্থাপন করেন। ইনসুলেশন বসানোর কাজ পান এবং মার্কিন নাগরিক হন। কিন্তু এখন তার আশা মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে। এই বছর তিনি একটি শরণার্থী পুনর্বাসন সংস্থা থেকে চাকরিচ্যত হয়েছেন। ফলস্বরূপ তার স্বাস্থ্য বীমাও বাতিল হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে কথা হয় তার সঙ্গে। আবাদি জানান, অনেক আমেরিকানের মতো তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আবদি ডাইভার্সিটি ভিসা প্রকল্পের মাধ্যমে আমেরিকায় এসেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘আমেরিকান ড্রিম বেঁচে আছে বটে, তবে তা ভালো নেই।’

এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ২৪ বছর বয়সী অভিনেতা লুক মুলেন আমাকে বলেছেন, তিনি কানাডায় চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। কারণ হলিউডের মতো জায়গাতেও সিনেমার সুযোগের অভাব দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই দেশে সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে এবং এর ফলে সুযোগ কমে যাচ্ছে।’

আমেরিকার প্রতিষ্ঠার ২৫০তম বার্ষিকীর আগে নেওয়া একের পর এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক আমেরিকান মনে করেন ‘আমেরিকান ড্রিম’—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে যে কেউ নিজের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে—সেই প্রতিশ্রুতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিশ্বাস করে যে আমেরিকান ড্রিম এখনও টিকে আছে। অন্যান্য জরিপেও একই ধরনের মনোভাব দেখা গেছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ আমেরিকান বলছেন যে দেশের সবচেয়ে ভালো দিনগুলো এখন অতীত।

আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিন এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশটিতে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন ও দলীয় দূরত্ব দেখা যাচ্ছে। তাহলে এই স্বপ্নের—যা সিনেমা, সঙ্গীত এবং পপ সংস্কৃতির মাধ্যমে সারা বিশ্বে প্রচার করা হয়েছে—যদি নাগালে বাইরে মনে হয়, তবে তার অর্থ কী?

‘এটি কেবল মটর কারের স্বপ্ন নয়’

বিপ্লবী যুদ্ধের পরবর্তী সেই শুরুর দিনগুলোতে এবং একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত যা ‘স্বপ্ন’ হিসেবে পরিচিত হয়েছিল, তা আশা, আশাবাদ এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে ভরা এই নতুন উজ্জ্বল জাতির দিকে লাখ লাখ অভিবাসীকে প্রলুব্ধ করেছিল। কারখানার শ্রমিক, কৃষক, স্বর্ণ সন্ধানকারী এবং নতুন বসতি স্থাপনকারীরা এই বিশ্বাসে যুক্তরাষ্ট্রে ভিড় করেছিলেন যে তারা ইউরোপের শ্রেণীপ্রথা থেকে মুক্ত হয়ে একটি নতুন পরিচয়—‘আমেরিকান’—তৈরি করতে পারবেন।

ইতিহাসবিদরা বলবেন যে এই স্বপ্নে কখনোই সবাই অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নিশ্চিতভাবেই আদিবাসী আমেরিকান, দাস বা এমনকি নারীরাও ছিল না। তা সত্ত্বেও আমেরিকান ড্রিমের ধারণাটি টিকে ছিল। আমেরিকান ড্রিমের ধারণাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ছিল। কিন্তু ১৯৩১ সালে মহামন্দার সময় প্রকাশিত ‘দ্য এপিক অব আমেরিকা’ বইটির মাধ্যমে এই বাক্যাংশটি জনপ্রিয় হয়।

এতে ইতিহাসবিদ জেমস ট্রাসলো অ্যাডামস লিখেছেন, ‘এটি কেবল মটর গাড়ি এবং উচ্চ বেতনের স্বপ্ন নয়, বরং এটি এমন এক সামাজিক ব্যবস্থার স্বপ্ন যেখানে প্রতিটি পুরুষ এবং নারী তাদের জন্মগতভাবে প্রাপ্ত ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশে সক্ষম হবে।’

বছরের পর বছর ধরে এই স্লোগানটি বিবর্তিত হয়েছে। আজকাল এটি প্রায়শই উদ্যোক্তা মনোভাব, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত। ১৯ এবং ২০ শতকে অভিবাসীরা এলিস আইল্যান্ডে ভিড় করেছিলেন।

আবদি সোমালিয়ায় বড় হয়েছেন। সেখানে আল-শাবাব জঙ্গি গোষ্ঠীর গুলি থেকে বাঁচতে তাকে গর্তে লুকিয়ে থাকতে হতো। কেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেতে চেয়েছিলেন তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা ছিল একটি বড় অগ্রাধিকার। পরের দিনটি বেঁচে থাকা, পরের দিনটি শ্বাস নেওয়া ছিল একটি বিশাল বিষয়। আমি সত্যিকার অর্থে শ্বাস নিতে চেয়েছিলাম।’

গবেষকরা বলছেন, আবদির মতো প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা প্রায়ই আমেরিকার সম্ভাবনা নিয়ে বেশি আশাবাদী থাকেন। ‘ডিবেটিং দ্য আমেরিকান ড্রিম: হাউ এক্সপ্লানেশন্স ফর ইনইকুয়ালিটি পোলারাইজ পলিটিক্স’-এর লেখিকা এলিজাবেথ সুহায় বলেন, ‘অনেকেই অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশ থেকে আসছেন। আর তাই তারা যদি অভিবাসী না হতেন, তবে যে অবস্থায় থাকতেন তার চেয়ে ভালো অবস্থানেই শেষ পর্যন্ত পৌঁছান।’

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জাতি ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণাবিষয়ক পরিচালক মার্ক হুগো লোপেজ, যিনি লাতিন অভিবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তিনি বলেন, ‘অভিবাসীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বলেন যে তারা এই স্বপ্ন অর্জন করছেন।’ লোপেজ আরও বলেন, তারা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও বেশি আশাবাদী হন।

আমেরিকান ড্রিম বাধাগ্রস্ত

আমেরিকান ড্রিম সব সময়ই অভিবাসীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় বিষয় ছিল। তবে আজকাল অভিবাসী আসার সংখ্যা কমে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিহাসে বৃহত্তম গণ-বিতাড়ন কর্মসূচি পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালানোর পর অভিবাসন কমানোকে তার প্রেসিডেন্সির অন্যতম লক্ষ্য বানিয়েছেন।

তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প কেবল দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করা অভিবাসীদের সংখ্যাই কমিয়ে দেননি, বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসার কিছু আইনি পথও বন্ধ করে দিয়েছেন, যার মধ্যে আবদির ব্যবহৃত ডাইভার্সিটি ভিসা প্রোগ্রামটিও রয়েছে। কিন্তু আজ কেবল যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী কম আসছে তা নয়, রেকর্ড সংখ্যক মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলেও মনে হচ্ছে।

বর্তমান প্রশাসনের অভিবাসন বিরোধী কড়াকড়ি অভিবাসীদের সংখ্যা কমাতে সাহায্য করেছে। একটি ধারণা হলো, যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা অনেক আমেরিকান মনে করেন না যে দেশ তার প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করেছে—অর্থাৎ আপনি যদি কঠোর পরিশ্রম করেন এবং নিয়ম মেনে চলেন, তবে আপনার একটি সম্মানজনক ও আরামদায়ক জীবন থাকা উচিত।

গত বছর একটি ঐতিহাসিক উলটপুরাণ ঘটেছে। আয়ারল্যান্ডে চলে যাওয়া আমেরিকানের সংখ্যা আয়ারল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা মানুষের সংখ্যার চেয়ে বেশি ছিল। মার্কিন সরকার স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া আমেরিকানদের সংখ্যা ট্র্যাক করে না, তাই কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, এটি কেবল আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে ঘটছে না।

রেকর্ড সংখ্যক আমেরিকান যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করছেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল রিপোর্ট করেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রায় সবকটিতেই বসবাস ও কাজ করার জন্য আসা আমেরিকানদের সংখ্যা বাড়ছে।

মানুষ কেন চলে যাচ্ছে? কেউ কেউ বর্তমান মার্কিন রাজনীতির দিকে আঙুল তুলছেন। অন্যরা স্বাস্থ্যসেবা খরচ এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানের কথা বলছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি সম্ভবত বিভিন্ন কারণের সংমিশ্রণ, যার মধ্যে কিছু ব্যক্তিগত কারণও থাকতে পারে।

লুক মুলেনের জন্য এটি চাকরির সম্ভাবনার বিষয়। এই অভিনেতা, যিনি কিশোর বয়সে ডিজনির শো ‘অ্যান্ডি ম্যাক’-এ অভিনয় করেছিলেন এবং এখন লেখালেখি ও প্রযোজনার সাথে বেশি যুক্ত হয়েছেন, তিনি বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার চেয়ে কানাডার ভ্যাঙ্কুয়ারে তার চলচ্চিত্র প্রকল্পের জন্য বেশি সুযোগ রয়েছে। হলিউডের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এবং একটি প্রধান চলচ্চিত্র কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে ভ্যাঙ্কুয়ারে নতুন সরকারি ট্যাক্স ক্রেডিট (কর ছাড়) সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

  • আসমা খালিদ: বিবিসির দ্য গ্লোবাল স্টোরি পডকাস্টের সহ-উপস্থাপক

(বিবিসি থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত)

Ad 300x250

সম্পর্কিত