গবেষণা বলছে, যারা খুব বেশি সৃজনশীল বা বুদ্ধিমান হন, তাঁদের মস্তিষ্ক অনেক সময় বাইরের অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বা তথ্য পুরোপুরি বাদ দিতে পারে না। সাধারণ মানুষ হয়তো হইচইয়ের মধ্যেও মন দিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের মাথায় সেই শব্দগুলো তীরের মতো বিঁধে।
অনন্ত রায়হান

দুনিয়া কাঁপানো দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার আর ইমানুয়েল কান্ট। তাঁরা যেমন জ্ঞানী ছিলেন, শব্দ বা গোলমাল নিয়ে মেজাজও ছিল তেমনি চড়া। বিশেষ করে পড়ার বা লেখার সময় হইচই শুনলে ভীষণ বিরক্ত হয়ে যেতেন। তাঁদের এই ‘শব্দের প্রতি তীব্র বিরক্তি’ নিয়ে ইতিহাসে অনেক মজার ও অদ্ভুত গল্প প্রচলিত আছে।
সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮২১ সালে। শোপেনহাওয়ার তখন বার্লিনে থাকতেন। একদিন তাঁর ঘরের ঠিক বাইরে তিনজন নারী জোরে জোরে গল্প করছিলেন। শোপেনহাওয়ারের কাজ করতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। তিনি রেগে গিয়ে তাঁদের চলে যেতে বললেন। দুজন নারী চলে গেলেও ক্যারোলিন মারকুয়ে নামের একজন দরজি সেখান থেকে সরতে চাইলেন না।
শুরু হলো তুমুল ঝগড়া। মারকুয়ে পরে আদালতে দাবি করেন, শোপেনহাওয়ার তাঁকে লাথি-ঘুষি মেরে ফেলে দিয়েছেন। এতে তাঁর শরীরের একপাশ অবশ হয়ে গেছে। মামলা চলল দীর্ঘ ছয় বছর। শেষ পর্যন্ত শোপেনহাওয়ার মামলায় হেরে যান। আদালত রায় দেয়, মারকুয়ে যতদিন বেঁচে থাকবেন, শোপেনহাওয়ারকে তাঁর চিকিৎসার খরচ আর মাসিক ভাতা দিয়ে যেতে হবে।
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে শোপেনহাওয়ার এই টাকা দিয়েছিলেন। ১৮৪২ সালে সেই নারী মারা যান। এরপর শোপেনহাওয়ার নিজের হিসাবখাতায় লাতিনে লিখেছিলেন, ‘বুড়ি মরল, বোঝা নামল।’ এই ঘটনার পর থেকেই প্রচলিত হয়ে যায়, ‘দার্শনিকদের আশেপাশে ভুলেও গোলমাল করতে নেই!’
আরেক বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টও ছিলেন একই স্বভাবের। শোনা যায়, পাশের বাড়ির মোরগের ডাক সহ্য করতে না পেরে তিনি একবার নিজের বাসা পর্যন্ত বদলে ফেলেছিলেন। ১৭৮৪ সালে জেলখানার কয়েদিদের বিরুদ্ধে তিনি পুলিশের কাছে নালিশ করেছিলেন। কারণ, কয়েদিরা জেলখানায় অনেক চিৎকার করে প্রার্থনা করত। কান্টের আপত্তি শুধু শব্দ নিয়ে ছিল না। তাঁর মনে হয়েছিল, কয়েদিদের উচ্চস্বরে প্রার্থনা ছিল ভণ্ডামিপূর্ণ। জেলারের কাছে ধর্মভীরু দেখানোর চেষ্টা মাত্র।
শোপেনহাওয়ার মনে করতেন, যারা শব্দে বিরক্ত হয় না, তাঁরা যুক্তি, চিন্তা, কবিতা, শিল্পের মতো গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অনুভূতির প্রতি তেমন সংবেদনশীল নয়। তিনি শব্দ নিয়ে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, কুকুরের ঘেউ ঘেউ বা বাচ্চার চিৎকার অসহ্য হলেও ‘চাবুকের আওয়াজ’ হলো চিন্তার আসল খুনি। কারণ, এই শব্দ শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, পুরোপুরি অর্থহীনও। তিনি বিশ্বাস করতেন, যার বুদ্ধি যত বেশি, শব্দের প্রতি তাঁর বিরক্তিও তত বেশি।

শোপেনহাওয়ার একটি দারুণ উদাহরণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গভীর চিন্তা করা হলো দামী হীরার মতো। হীরা আস্ত থাকলে তাঁর অনেক দাম, কিন্তু একবার ভেঙে টুকরো হয়ে গেলে আর কোনো মূল্য থাকে না। তেমনি একজন মানুষ যখন কোনো গভীর বিষয় নিয়ে ভাবে, তখন সামান্য শব্দও সেই দামী চিন্তাকে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, দার্শনিকরা কি কেবল খিটমিটে মেজাজের ছিলেন বলেই এমন করতেন? আধুনিক গবেষণা কিন্তু তাঁদের ধারণার সঙ্গে কিছুটা মিল খুঁজে পেয়েছে। গবেষণা বলছে, যারা খুব বেশি সৃজনশীল বা বুদ্ধিমান হন, তাঁদের মস্তিষ্ক অনেক সময় বাইরের অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বা তথ্য পুরোপুরি বাদ দিতে পারে না। সাধারণ মানুষ হয়তো হইচইয়ের মধ্যেও মন দিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের মাথায় সেই শব্দগুলো তীরের মতো বিঁধে।
সহজ কথায়, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের মস্তিষ্ক অনেকটা দামী ইঞ্জিনের মতো। সামান্য বাজে জ্বালানি যেমন দামী ইঞ্জিন নষ্ট করে দেয়, তেমনি অপ্রয়োজনীয় আজেবাজে শব্দও তাঁদের চিন্তার জগৎ এলোমেলো করে দেয়। তাই শোপেনহাওয়ার বা কান্টরা শব্দের ওপর যে এতটা রেগে যেতেন, তার পেছনে আসলে মজবুত বৈজ্ঞানিক কারণও ছিল।
পরের বার আপনার পাশে কেউ একাগ্র মনে কিছু করতে থাকলে আওয়াজ করার আগে একবার ভেবে নেবেন; হয়তো আপনি একজনের দামী কোনো চিন্তার হীরা ভেঙে ফেলছেন!
তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে

দুনিয়া কাঁপানো দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার আর ইমানুয়েল কান্ট। তাঁরা যেমন জ্ঞানী ছিলেন, শব্দ বা গোলমাল নিয়ে মেজাজও ছিল তেমনি চড়া। বিশেষ করে পড়ার বা লেখার সময় হইচই শুনলে ভীষণ বিরক্ত হয়ে যেতেন। তাঁদের এই ‘শব্দের প্রতি তীব্র বিরক্তি’ নিয়ে ইতিহাসে অনেক মজার ও অদ্ভুত গল্প প্রচলিত আছে।
সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮২১ সালে। শোপেনহাওয়ার তখন বার্লিনে থাকতেন। একদিন তাঁর ঘরের ঠিক বাইরে তিনজন নারী জোরে জোরে গল্প করছিলেন। শোপেনহাওয়ারের কাজ করতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। তিনি রেগে গিয়ে তাঁদের চলে যেতে বললেন। দুজন নারী চলে গেলেও ক্যারোলিন মারকুয়ে নামের একজন দরজি সেখান থেকে সরতে চাইলেন না।
শুরু হলো তুমুল ঝগড়া। মারকুয়ে পরে আদালতে দাবি করেন, শোপেনহাওয়ার তাঁকে লাথি-ঘুষি মেরে ফেলে দিয়েছেন। এতে তাঁর শরীরের একপাশ অবশ হয়ে গেছে। মামলা চলল দীর্ঘ ছয় বছর। শেষ পর্যন্ত শোপেনহাওয়ার মামলায় হেরে যান। আদালত রায় দেয়, মারকুয়ে যতদিন বেঁচে থাকবেন, শোপেনহাওয়ারকে তাঁর চিকিৎসার খরচ আর মাসিক ভাতা দিয়ে যেতে হবে।
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে শোপেনহাওয়ার এই টাকা দিয়েছিলেন। ১৮৪২ সালে সেই নারী মারা যান। এরপর শোপেনহাওয়ার নিজের হিসাবখাতায় লাতিনে লিখেছিলেন, ‘বুড়ি মরল, বোঝা নামল।’ এই ঘটনার পর থেকেই প্রচলিত হয়ে যায়, ‘দার্শনিকদের আশেপাশে ভুলেও গোলমাল করতে নেই!’
আরেক বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টও ছিলেন একই স্বভাবের। শোনা যায়, পাশের বাড়ির মোরগের ডাক সহ্য করতে না পেরে তিনি একবার নিজের বাসা পর্যন্ত বদলে ফেলেছিলেন। ১৭৮৪ সালে জেলখানার কয়েদিদের বিরুদ্ধে তিনি পুলিশের কাছে নালিশ করেছিলেন। কারণ, কয়েদিরা জেলখানায় অনেক চিৎকার করে প্রার্থনা করত। কান্টের আপত্তি শুধু শব্দ নিয়ে ছিল না। তাঁর মনে হয়েছিল, কয়েদিদের উচ্চস্বরে প্রার্থনা ছিল ভণ্ডামিপূর্ণ। জেলারের কাছে ধর্মভীরু দেখানোর চেষ্টা মাত্র।
শোপেনহাওয়ার মনে করতেন, যারা শব্দে বিরক্ত হয় না, তাঁরা যুক্তি, চিন্তা, কবিতা, শিল্পের মতো গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অনুভূতির প্রতি তেমন সংবেদনশীল নয়। তিনি শব্দ নিয়ে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, কুকুরের ঘেউ ঘেউ বা বাচ্চার চিৎকার অসহ্য হলেও ‘চাবুকের আওয়াজ’ হলো চিন্তার আসল খুনি। কারণ, এই শব্দ শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, পুরোপুরি অর্থহীনও। তিনি বিশ্বাস করতেন, যার বুদ্ধি যত বেশি, শব্দের প্রতি তাঁর বিরক্তিও তত বেশি।

শোপেনহাওয়ার একটি দারুণ উদাহরণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গভীর চিন্তা করা হলো দামী হীরার মতো। হীরা আস্ত থাকলে তাঁর অনেক দাম, কিন্তু একবার ভেঙে টুকরো হয়ে গেলে আর কোনো মূল্য থাকে না। তেমনি একজন মানুষ যখন কোনো গভীর বিষয় নিয়ে ভাবে, তখন সামান্য শব্দও সেই দামী চিন্তাকে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, দার্শনিকরা কি কেবল খিটমিটে মেজাজের ছিলেন বলেই এমন করতেন? আধুনিক গবেষণা কিন্তু তাঁদের ধারণার সঙ্গে কিছুটা মিল খুঁজে পেয়েছে। গবেষণা বলছে, যারা খুব বেশি সৃজনশীল বা বুদ্ধিমান হন, তাঁদের মস্তিষ্ক অনেক সময় বাইরের অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বা তথ্য পুরোপুরি বাদ দিতে পারে না। সাধারণ মানুষ হয়তো হইচইয়ের মধ্যেও মন দিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের মাথায় সেই শব্দগুলো তীরের মতো বিঁধে।
সহজ কথায়, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের মস্তিষ্ক অনেকটা দামী ইঞ্জিনের মতো। সামান্য বাজে জ্বালানি যেমন দামী ইঞ্জিন নষ্ট করে দেয়, তেমনি অপ্রয়োজনীয় আজেবাজে শব্দও তাঁদের চিন্তার জগৎ এলোমেলো করে দেয়। তাই শোপেনহাওয়ার বা কান্টরা শব্দের ওপর যে এতটা রেগে যেতেন, তার পেছনে আসলে মজবুত বৈজ্ঞানিক কারণও ছিল।
পরের বার আপনার পাশে কেউ একাগ্র মনে কিছু করতে থাকলে আওয়াজ করার আগে একবার ভেবে নেবেন; হয়তো আপনি একজনের দামী কোনো চিন্তার হীরা ভেঙে ফেলছেন!
তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে
.png)
চিত্রশিল্পী তৌহিন হাসান ঘুরে দেখেছেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব আর্ট মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি। প্রতিটি সংগ্রহশালায় ক্যানভাস থেকে ক্যানভাসে তিনি খুঁজেছেন শিল্পের ভাষা; রঙ, আলো আর তুলির আঁচড়ে অনুভব করেছেন শিল্পীদের জীবন, সময় ও সৃষ্টির গল্প। সেই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক ‘আর্ট মিউজ
২ ঘণ্টা আগে
ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
১ দিন আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
২৫ জুলাই ২০২৬
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
২৫ জুলাই ২০২৬