হইচই আর কোলাহলে বিরক্ত হন? তাহলে আপনি হয়তো একটু বেশিই বুদ্ধিমান!

গবেষণা বলছে, যারা খুব বেশি সৃজনশীল বা বুদ্ধিমান হন, তাঁদের মস্তিষ্ক অনেক সময় বাইরের অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বা তথ্য পুরোপুরি বাদ দিতে পারে না। সাধারণ মানুষ হয়তো হইচইয়ের মধ্যেও মন দিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের মাথায় সেই শব্দগুলো তীরের মতো বিঁধে।

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ১০: ০০
হইচই আর কোলাহলে বিরক্ত হন? তাহলে আপনি হয়তো একটু বেশিই বুদ্ধিমান! এআই জেনারেটেড ছবি

দুনিয়া কাঁপানো দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার আর ইমানুয়েল কান্ট। তাঁরা যেমন জ্ঞানী ছিলেন, শব্দ বা গোলমাল নিয়ে মেজাজও ছিল তেমনি চড়া। বিশেষ করে পড়ার বা লেখার সময় হইচই শুনলে ভীষণ বিরক্ত হয়ে যেতেন। তাঁদের এই ‘শব্দের প্রতি তীব্র বিরক্তি’ নিয়ে ইতিহাসে অনেক মজার ও অদ্ভুত গল্প প্রচলিত আছে।

সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮২১ সালে। শোপেনহাওয়ার তখন বার্লিনে থাকতেন। একদিন তাঁর ঘরের ঠিক বাইরে তিনজন নারী জোরে জোরে গল্প করছিলেন। শোপেনহাওয়ারের কাজ করতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। তিনি রেগে গিয়ে তাঁদের চলে যেতে বললেন। দুজন নারী চলে গেলেও ক্যারোলিন মারকুয়ে নামের একজন দরজি সেখান থেকে সরতে চাইলেন না।

শুরু হলো তুমুল ঝগড়া। মারকুয়ে পরে আদালতে দাবি করেন, শোপেনহাওয়ার তাঁকে লাথি-ঘুষি মেরে ফেলে দিয়েছেন। এতে তাঁর শরীরের একপাশ অবশ হয়ে গেছে। মামলা চলল দীর্ঘ ছয় বছর। শেষ পর্যন্ত শোপেনহাওয়ার মামলায় হেরে যান। আদালত রায় দেয়, মারকুয়ে যতদিন বেঁচে থাকবেন, শোপেনহাওয়ারকে তাঁর চিকিৎসার খরচ আর মাসিক ভাতা দিয়ে যেতে হবে।

পরের বার আপনার পাশে কেউ একাগ্র মনে কিছু করতে থাকলে আওয়াজ করার আগে একবার ভেবে নেবেন; হয়তো আপনি একজনের দামী কোনো চিন্তার হীরা ভেঙে ফেলছেন!

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে শোপেনহাওয়ার এই টাকা দিয়েছিলেন। ১৮৪২ সালে সেই নারী মারা যান। এরপর শোপেনহাওয়ার নিজের হিসাবখাতায় লাতিনে লিখেছিলেন, ‘বুড়ি মরল, বোঝা নামল।’ এই ঘটনার পর থেকেই প্রচলিত হয়ে যায়, ‘দার্শনিকদের আশেপাশে ভুলেও গোলমাল করতে নেই!’

আরেক বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টও ছিলেন একই স্বভাবের। শোনা যায়, পাশের বাড়ির মোরগের ডাক সহ্য করতে না পেরে তিনি একবার নিজের বাসা পর্যন্ত বদলে ফেলেছিলেন। ১৭৮৪ সালে জেলখানার কয়েদিদের বিরুদ্ধে তিনি পুলিশের কাছে নালিশ করেছিলেন। কারণ, কয়েদিরা জেলখানায় অনেক চিৎকার করে প্রার্থনা করত। কান্টের আপত্তি শুধু শব্দ নিয়ে ছিল না। তাঁর মনে হয়েছিল, কয়েদিদের উচ্চস্বরে প্রার্থনা ছিল ভণ্ডামিপূর্ণ। জেলারের কাছে ধর্মভীরু দেখানোর চেষ্টা মাত্র।

শোপেনহাওয়ার মনে করতেন, যারা শব্দে বিরক্ত হয় না, তাঁরা যুক্তি, চিন্তা, কবিতা, শিল্পের মতো গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অনুভূতির প্রতি তেমন সংবেদনশীল নয়। তিনি শব্দ নিয়ে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, কুকুরের ঘেউ ঘেউ বা বাচ্চার চিৎকার অসহ্য হলেও ‘চাবুকের আওয়াজ’ হলো চিন্তার আসল খুনি। কারণ, এই শব্দ শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, পুরোপুরি অর্থহীনও। তিনি বিশ্বাস করতেন, যার বুদ্ধি যত বেশি, শব্দের প্রতি তাঁর বিরক্তিও তত বেশি।

পরের বার আপনার পাশে কেউ একাগ্র মনে কিছু করতে থাকলে আওয়াজ করার আগে একবার ভেবে নেবেন; হয়তো আপনি একজনের দামী কোনো চিন্তার হীরা ভেঙে ফেলছেন! সংগৃহীত ছবি
পরের বার আপনার পাশে কেউ একাগ্র মনে কিছু করতে থাকলে আওয়াজ করার আগে একবার ভেবে নেবেন; হয়তো আপনি একজনের দামী কোনো চিন্তার হীরা ভেঙে ফেলছেন! সংগৃহীত ছবি

শোপেনহাওয়ার একটি দারুণ উদাহরণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গভীর চিন্তা করা হলো দামী হীরার মতো। হীরা আস্ত থাকলে তাঁর অনেক দাম, কিন্তু একবার ভেঙে টুকরো হয়ে গেলে আর কোনো মূল্য থাকে না। তেমনি একজন মানুষ যখন কোনো গভীর বিষয় নিয়ে ভাবে, তখন সামান্য শব্দও সেই দামী চিন্তাকে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, দার্শনিকরা কি কেবল খিটমিটে মেজাজের ছিলেন বলেই এমন করতেন? আধুনিক গবেষণা কিন্তু তাঁদের ধারণার সঙ্গে কিছুটা মিল খুঁজে পেয়েছে। গবেষণা বলছে, যারা খুব বেশি সৃজনশীল বা বুদ্ধিমান হন, তাঁদের মস্তিষ্ক অনেক সময় বাইরের অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বা তথ্য পুরোপুরি বাদ দিতে পারে না। সাধারণ মানুষ হয়তো হইচইয়ের মধ্যেও মন দিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের মাথায় সেই শব্দগুলো তীরের মতো বিঁধে।

সহজ কথায়, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের মস্তিষ্ক অনেকটা দামী ইঞ্জিনের মতো। সামান্য বাজে জ্বালানি যেমন দামী ইঞ্জিন নষ্ট করে দেয়, তেমনি অপ্রয়োজনীয় আজেবাজে শব্দও তাঁদের চিন্তার জগৎ এলোমেলো করে দেয়। তাই শোপেনহাওয়ার বা কান্টরা শব্দের ওপর যে এতটা রেগে যেতেন, তার পেছনে আসলে মজবুত বৈজ্ঞানিক কারণও ছিল।

পরের বার আপনার পাশে কেউ একাগ্র মনে কিছু করতে থাকলে আওয়াজ করার আগে একবার ভেবে নেবেন; হয়তো আপনি একজনের দামী কোনো চিন্তার হীরা ভেঙে ফেলছেন!

তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে

সম্পর্কিত