কেমন চলছে ডিজিটাল যুগে পরিবেশ আন্দোলন

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

স্ট্রিম গ্রাফিক

ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে মানুষের যোগাযোগ, চিন্তা ও প্রতিবাদের ধরনকে আমূল বদলে দিয়েছে। একসময় পরিবেশ আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল মিছিল, সেমিনার কিংবা সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সেই আন্দোলন পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে, মুহূর্তের মধ্যেই।

যুক্তরাষ্ট্রের পাখিবিষয়ক গবেষক জেমস অডুবনের ভাষায়, ‘একজন সত্যিকারের সংরক্ষণবাদী এমন এক ব্যক্তি, যিনি জানেন পৃথিবী তার পিতার মাধ্যমে দেওয়া হয়নি কিন্তু তার সন্তানদের কাছ থেকে ধার করা হয়েছে।’ অর্থাৎ পরিবেশ সংরক্ষণের মূলে রয়েছে শিক্ষা ও সচেতনতা। প্রশ্ন হলো, পরিবেশ আন্দোলনের এই পরিবর্তন কি কেবলই লোকদেখানো, নাকি বাস্তবেও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর প্রভাব ফেলছে?

ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে বাস্তব উদ্বেগ

বর্তমানে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব কিংবা ইনস্টাগ্রাম শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং মত প্রকাশের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, নদী দূষণ কিংবা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এসব বিষয় নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষ করে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। একটি পোস্ট, ভিডিও বা হ্যাশট্যাগ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে স্থানীয় কোনো পরিবেশগত সমস্যাও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মনোযোগ পেতে শুরু করেছে।

হ্যাশট্যাগ আন্দোলন

ঢাকা শহরের রাস্তায় হাঁটলেই বায়ুদূষণের মাত্রা অনুভব করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখো মানুষ শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণ কাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণের অভাব, নির্বিচারে গাছ কাটা ও পুরোনো যানবাহনের বিষাক্ত গ্যাস নগরীর বায়ুকে প্রতিদিনই প্রাণঘাতী করে তুলছে। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুরবস্থা মাটি ও পানিদূষণকে ত্বরান্বিত করছে। তবে বর্তমানে এই সমস্যায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে ‘হ্যাশট্যাগ অ্যাক্টিভিজম।’ যেমন: #SaveTheSundarbans, #Climate Action, #NoPlastic এসব ক্যাম্পেইন শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বাস্তবেও মানুষের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় নদী দখল, বন উজাড় কিংবা বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ দেখা গেছে। এসব আন্দোলনের ফলে প্রশাসনের নজর কাড়ার ঘটনাও কম নয়। আগে যেখানে একটি বিষয় মিডিয়ায় আসতে অনেক সময় লাগত, এখন মুহূর্তেই একটি ভাইরাল পোস্টই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।

এক্ষেত্রে সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গের নাম বলা যায়। ২০১৮ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একা ধর্মঘট শুরু করেন। তাঁর হাতের সেই ‘জলবায়ুর জন্য স্কুল ধর্মঘট’ সংবলিত প্ল্যাকার্ডের ছবি ইনস্টাগ্রাম ও টুইটারে ভাইরাল হওয়ার পর তা বিশ্বব্যাপী এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নেয়। হ্যাশট্যাগ #FridaysForFuture ব্যবহার করে বিশ্বের কোটি কোটি শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসে। গ্রেটা প্রমাণ করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে কীভাবে একজন সাধারণ কিশোরী বিশ্বনেতাদের গদি নাড়িয়ে দিতে পারে।

সহজ তথ্যপ্রাপ্তি, সচেতনতা বৃদ্ধি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তথ্যের সহজলভ্যতা। পরিবেশবিষয়ক জটিল তথ্য এখন সহজ ভাষায় ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক কিংবা পোস্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগত। কিন্তু এখন মানুষ নিজেরাই তথ্য খুঁজে নিচ্ছে, শেয়ার করছে এবং অন্যদের জানাচ্ছে। ফলে সচেতনতার একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি হচ্ছে।

ঢাকার স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশবিষয়ক সংস্থা বিডি ক্লিনের এক পরিবেশকর্মী জানান, ‘আগে একটি কর্মসূচিতে ৫০-১০০ জন মানুষ জড়ো করা কঠিন ছিল। এখন একটি ফেসবুক ইভেন্ট তৈরি করলেই অনেক মানুষ আগ্রহ দেখায়।’

ইউটিউব বা ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যে পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারেন, তার বড় উদাহরণ মিস্টার বিস্ট এবং মার্ক রোবার। তাঁরা অনলাইনে প্রচারণা চালিয়ে মাত্র কয়েক মাসে কোটি কোটি ডলার সংগ্রহ করেন এবং যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ গাছ লাগানো এবং সমুদ্র থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের কাজ করা হয়। এটি মূলত ইন্টারনেটের ‘ক্রাউডফান্ডিং’ শক্তিকে পরিবেশের কাজে লাগানোর এক অনন্য উদাহরণ।

চাপ সৃষ্টি ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব

ডিজিটাল আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। যখন কোনো পরিবেশগত ইস্যু সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ড হয়ে যায়, তখন সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক ব্যবহার বা নদী দখলের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে, যা পরে মূলধারার গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ বা প্রশাসনিক পদক্ষেপও দেখা গেছে।

আফ্রিকার জলবায়ু সংকটকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে উগান্ডার কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভেনেসা নাকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করছেন। যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো আফ্রিকার পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে নীরব ছিল, তখন তিনি টুইটার ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উগান্ডার জঙ্গল রক্ষা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে সচেতনতা তৈরি করেন। তিনি বর্তমানে বৈশ্বিক দক্ষিণের বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর।

সীমাবদ্ধতাও কম নয়

তবে সবকিছুরই যেমন ইতিবাচক দিক আছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবেশ আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রথমত, অনেক সময় এই আন্দোলন শুধুমাত্র ভিউজেই সীমাবদ্ধ থাকে। যাকে ‘ক্লিকটিভিজম’ বলা হয়। অর্থাৎ, মানুষ পোস্টে লাইক, শেয়ার বা কমেন্ট করলেও বাস্তবে কোনো কার্যক্রমে অংশ নেয় না। ফলে বাস্তব পরিবর্তন সীমিত হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। যাচাই ছাড়া তথ্য শেয়ার করার ফলে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে, যা পরিবেশ আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে।

তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ট্রেন্ড খুব দ্রুত বদলে যায়। আজ যে বিষয়টি আলোচনায়, কাল সেটি হারিয়ে যেতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

তরুণদের নেতৃত্বে নতুন ধারা

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে পরিবেশ আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তারা শুধু অনলাইনে নয়, অফলাইনেও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করছে। যেমন: গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতা ক্যাম্পেইন ইত্যাদি।

আমরা দেখেছি, ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়, জেন-জি প্রজন্ম কিভাবে অনলাইন ক্যাম্পেইনিং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে নেমেছিল। দেশের প্রতিটি জেলায় তরুণ প্রজন্ম রাস্তা ঘাট, ডোবা, বর্জ্য অপসারণ ও দেয়ালে চিত্রাংকন কর্মসূচি করেছিল একটি হ্যাশট্যাগ পোস্টের মাধ্যমে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এই প্রজন্ম প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পরিবেশ রক্ষায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে । কারণ তারা তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ এবং দ্রুত সংগঠিত হতে সক্ষম।

এক্ষেত্রে এশিয়ার অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ পরিবেশকর্মী হিসেবে পরিচিত লিসপ্রিয়া কাঙ্গুজামের নাম বলা যায়। মাত্র ৯-১০ বছর বয়সেই তিনি ভারতের সংসদ ভবনের সামনে জলবায়ু আইন পাশের দাবিতে অবস্থান নেন। তাঁর এই আন্দোলনের বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি বিশ্বজুড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন ব্যবহার করে বাতাসের দূষণ কমানোর জন্য ‘সার্ভাইভাল কিট’ তৈরির আইডিয়া প্রচার করে অনলাইনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন।

ডিজিটাল যুগে পরিবেশ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক ব্যবহারের ওপর। যদি এই প্ল্যাটফর্মগুলো শুধু প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন কিংবা লাইভ রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশগত সমস্যাগুলো আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। এতে করে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়বে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিবেশ আন্দোলনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এটি সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কেবল অনলাইন কার্যক্রমই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপ যুক্ত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সম্পর্কিত