এডমন্ড হিলারির লেখা

আমার গল্প

আজ ‘এভারেস্ট ডে’। ২৯ মে ১৯৫৩ সালে মানুষ প্রথমবারের মতো মাউন্ট এভারেস্টের শিখরে আরোহণ করেছিল। কিন্তু মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের চেয়েও যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এডমন্ড হিলারির কাছে, তা নিয়ে তাঁর একটি লেখা এভারেস্ট জয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৩ সালের মে মাসে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে প্রকাশিত হয়। লেখাটি অনুবাদ করেছেন তারেক অণু।

তারেক অণু
লেখা: এডমন্ড হিলারি

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৬, ১৮: ০৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৫৩ সালের ২৯ মের সেই সকালে, যখন তেনজিং নোরগে ও আমি প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করলাম, তখন থেকেই আমাকে এক মহান অভিযাত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হতে থাকে। কিন্তু আমি আসলে স্রেফ এক পোড় খাওয়া কিউয়ী, যে জীবনের বহু প্রতিকূলতাকে উপভোগ করেছে মনে-প্রাণে।

সত্য বলতে, আজ ৫০ বছর পর সেই দিনের দিকে ফিরে তাকালে জীবনের অনেক পদক্ষেপের চেয়ে এভারেস্টের শীর্ষে আরোহণকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। বিশেষ করে, আমার শেরপা বন্ধুদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতির জন্য এবং হিমালয়ের সংস্কৃতি ও সৌন্দর্য রক্ষার জন্য যে কাজগুলো আমার জীবনে করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

এমন নয় যে বিশ্বের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়ায় পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার জন্য আমি উদগ্রীব ছিলাম না। স্পষ্ট মনে পড়ে, তেনজিং ও আমি বরফের মুখোমুখি হয়ে চূড়ার কাছের সেই সরু ঢালের সামনে। আমাদের দলের অনেকেই বলেছিল, এই ঢাল অতিক্রম করা সম্ভব না, যদিও আমাদের কাছে তা ততটা বিপজ্জনক মনে হয়নি।

মুখোশে অক্সিজেনের নতুন বোতল এঁটে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। বরফকুঠার দিয়ে নতুন পথের ধাপ প্রস্তুত করতে করতে আমিই পথনির্দেশ করছিলাম। প্রায় এক ঘণ্টা পরে ২৯ হাজার ফুট উচ্চতায় এক বিশাল বাধা পেলাম। ৪০ ফুট লম্বা পাথুরে দেয়াল আমাদের পথ রোধ করে দাঁড়াল। অতিকায় দেয়ালের ডান দিকে ফাটলসমৃদ্ধ এক বরফের চাঙ পড়েছিল। এর পরেই পর্বত যেন ঝাড়া ১০ হাজার ফুট নিচে নেমে খ্যাংসুং হিমবাহে পরিণত হয়েছে। বরফের এই পিণ্ড কি আমার ওজন সয়ে টিকে থাকতে পারবে? উত্তর জানার একটিই উপায় ছিল।

বরফে ক্রাম্পন ঠেসে ধরে কোনোমতে প্রতিটি ফাঁকফোঁকর ব্যবহার করে সেই ফাটলের চূড়ার দিকে যাত্রা অব্যাহত থাকল। প্রথমবারের মতো মনে হলো, আমরা সফল হতেও পারি। ডান দিকে এক তুষার গম্বুজের মতো দেখা গেল যার উপর দিয়ে আমাদের পথ কেটে অগ্রসর হওয়া চলতেই থাকে। এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সেই রিজের চূড়ায় পৌঁছানোর পর চারিদিকে কেবল শূন্যতা দৃষ্টিগোচর হয়। তেনজিং আমার সাথী হয় এবং ব্যাপক আনন্দে আপ্লুত হয়ে ও স্বস্তির সঙ্গে আমরা এভারেস্ট শীর্ষে নিজেদের আবিষ্কার করি।

সেই বছরের পরে আরও বহুবার এভারেস্ট অঞ্চল ভ্রমণের ফলে আমার সেই পর্বতারোহী বন্ধুদের সঙ্গে একটা দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শেরপাদের সাহস ও শক্তি আমাকে অভিভূত করলেও তাদের বাড়িতে পরিবারের একজন হিসেবেই অনেক দিন অতিক্রম করার ফলে মনে হতে থাকে, তাদের সমাজ ব্যবস্থায় সুচিকিৎসা এবং বিদ্যালয়ের মতো জিনিসের অভাব রয়ে গেছে।

১৯৬০ সালের এক অভিযানের কথা মনে পড়ে। এভারেস্টের কাছেই হিমবাহের ওপর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ঘনীভূত ঠান্ডাকে দূর করার জন্য ক্ষুরধার বাতাসকে অগ্রাহ্য করে এক ধোঁয়াময় আগুনকে ঘিরে সবাই উষ্ণতার সন্ধান করছিলাম। তখন ভাঙা ভাঙা নেপালি ও ইংরেজিতে শেরপাদের জীবনযাত্রা নিয়ে আলাপচারিতা চলছিল।

উরকিয়েন নামের একজন শেরপা নিভে আসা আগুনে এক মুঠো জ্বালানি ছিটিয়ে নিভু নিভু আগুনকে উস্কে দিল। তাতে হিমকে ক্ষণিকের জন্য ঠেকিয়ে রাখা গেল। তাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলাম, ‘তোমার গ্রামের জন্য যদি আমরা কিছু একটা করতে পারি, সেটা কি হবে উরকিয়েন?’

তার উত্তর ছিল—‘আমাদের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চাই সাহেব। তোমার যত জিনিস আছে, তার মধ্যে অধ্যয়নই আমাদের শিশুদের জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত।

তার কথা রাখা হলো। পরের বছর কলকাতার এক কোম্পানিকে একটি অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষুদে ভবন দান করানোর ব্যাপারে রাজি করাতে সক্ষম হলাম। সুইস রেড ক্রস ভবনটি কয়েকবারে কাঠমান্ডু থেকে ১৫ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় মিংবো উপত্যকায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। এরপর একদিনের হাঁটা দূরত্বে শেরপারা সেই নির্মাণ সামগ্রী বহন করে খুমজুংয়ে নিয়ে আসে। আমাদের স্কুলটি মাথা তুলে দাঁড়ায় হিমালয়ের কোলে।

১৯৬১ সালের জুনে থিয়্যাং বোচে মনেস্ট্রির প্রধান লামাকে স্কুলে উদ্বোধনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁর সঙ্গে জনাকয়েক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ট্রাম্পেট, ঢোল এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আবির্ভূত হয়ে নানাবিধ বাজনার সাথে সাথে প্রার্থনা করে। তারপর স্কুল ভবনটিকে প্রদিক্ষণ করে মুঠো মুঠো চাল চতুর্দিকে নিক্ষেপ করে খুমজুংয়ের বিদ্যালয়টির শুভযাত্রা শুরু হয়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি ও আমার স্ত্রী জুন, সারা বিশ্ব ঘুরে হিমালয়ের অধিবাসীদের জন্য নিত্য নতুন পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করতে থাকি। শেরপা বন্ধুদের অনুরোধে ২৭টি বিদ্যালয়, ২ টি হাসপাতাল এবং ১২টি মেডিকেল ক্লিনিক স্থাপনে সক্ষম হই। সেই সঙ্গে হিমালয়ের কিছু বুনো ক্রুদ্ধ নদীর ওপরে সেতু নির্মাণও সম্ভব হয়। কয়েকটি রানওয়ে নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধমন্দির পুনঃনির্মাণেও হাত দিই সবাই এবং সাগরমাতা ন্যাশনাল পার্কে এক লাখের ওপরে বীজবপন করা হয়, যেন জ্বালানিকাঠ সংগ্রহের এবং হোটেল নির্মাণের উদ্দেশ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত বন কিছুটা হলেও আগের সবুজ অবস্থানে ফিরে যেতে পারে।

অনেক অনেক বছর ধরেই পৃথিবীর নানা দুর্গম প্রান্তরে ছোট বড় নানা অভিযান এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভিতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরুতেও পা রেখেছি তার অংশ হিসেবেই। আজ যখন সারা জীবনের স্মৃতিচারণ করি, দৃঢ় কণ্ঠে বলতে পারি, সেই সুউচ্চ পর্বতারোহণ কিংবা বন্ধুর ভূখণ্ড পাড়ি দেওয়া নয়, জীবনের সেরা অর্জন ছিল আমার হিমালয়ের বন্ধুদের জন্য সেই বিদ্যালয় এবং মেডিকেল ক্লিনিকগুলো স্থাপন করা এবং পরিচালনা করা, সেই সাথে বুদ্ধ মন্দিরগুলো পুনর্নির্মাণ করা।

সেই তীব্র সুখময় দিনটি আমার খুব স্পষ্ট মনে পড়ে যখন খুমজুংয়ের বিদ্যালয়টি আমরা মাত্র ৪৭ জন শিশু নিয়ে শুরু করি। তাদের পরনে ঠান্ডা ঠেকানোর জন্য অপ্রতুল শেরপা পোশাক থাকলেও লাল টুকটুকে গাল এবং মুখ ভরা হাসি নিয়েই তারা দিন বদলের স্বপ্ন দেখেছিল। আজ তাদেরই একজন ৭৬৭ বোয়িংয়ের বিমান চালক এবং অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে কর্মরত।

এই সেই স্মৃতিমালা, যা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত